জয়ধরখালী ৯ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ৯ || শেখ লুৎফর

আফরোজ পঞ্চমবারও মেট্রিক ফেল করে একেবারে ভেঙে পড়ে। লজ্জায় চার-পাঁচদিন ঘর থেকেই বেরোতে পারেনি। শেষমেশ তার মা বলল, —

তর ছোট মামু সাতবার পরীক্ষা দ্যায়া মেট্রিক পাশ করছিন, তুই আরেকবার দ্যা। আর বাড়ির কাছে মসজিদ, নামাজ পড়, আল্লারে ডাক, দ্যাখবেনে পরীক্ষা ভালা অইব।

মায়ের কথায় আফরোজ নামাজ পড়া শুরু করে। আর সারাদিন বই নিয়ে টেবিলে বসে থাকে। তাদের মসজিদের কোনো নির্দিষ্ট ইমাম নাই, মোয়াজ্জিনও নাই। আজানের টাইমে যে আগে আসে সে-ই আজানটা দেয়। ফরজ নামাজের সময় উপস্থিত দুই-চারজন নামাজির মাঝে যে বেশি বয়স্ক সে-ই ইমামতিটাও করে। শুধু শুক্রবারে চারমাইল দূর থেকে একজন বুড়া হুজুর এসে জুম্মার নামাজটা পড়িয়ে যায়।

বুড়ারা দুনিয়াবি ঝক্কিঝামেলায় মহাব্যস্ত। তাদের অধিকাংশই বয়সে বুড়া হলেও নিরোগ ও বলবান গতরের জন্য আজো মাটি কাঁপিয়ে হাঁটে। দুপুরের দিকে পানি কিংবা তামাকের তৃষ্ণা লাগলে সেই পুবের সড়কের কাছের জমিন থেকেই বাড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে জোরে ডাক দিলে, পাকঘরের কাজে ব্যস্ত বুড়িরা ঠিকই শুনতে পায়।

আফরোজের সময়ের কোনো শেষ নাই। তাই সে টাইমে টাইমে পাঁচবার আজান দিয়ে জামাতের জন্য বুড়াদের অপেক্ষায় বসে থাকে। জুম্মাঘরে বসে থাকার সময়টায় তার অলস কল্পনাশক্তি প্রবল হয়ে বেহেস্তের কথা ভাবে। সেখানে কোনো পরীক্ষা নাই। কাজ নাই। হাত বাড়ালেই নাকি ইচ্ছামতো খাবারও চলে আসে। শুক্কুরবারে বুড়া হুজুর বয়ানের সময় বলেছে, সবচে ছোট বেহেস্তি মানুষটাও নাকি আশিজন অনন্ত যৌবনা হুর-গেলমান পাবে। হুররা প্রত্যেকেই হবে ষোড়শী কুমারী। এইসব ভাবনায় আফরোজের শরীরটা শিরশির করে ভেঙে আসে। এই সময় নিজের শুকনা ও কালো চেহারার জন্য তার খুব দুঃখ হয়। দুঃখ ও ক্রোধ জাগে তারা কেন আরেকটু বেশি ধনী হলো না?

চেংড়াপোলারা কেউ নামাজে আসে না। মাঝবয়েসি কৃষকেরা নামাজের কথা কল্পনাও করতে পারে না। সারাদিন হাল-গিরস্তি, ধান-পাট, গরু-বাছুর …  তাদের মরবার টাইম নাই নামাজে আসে কী করে? অবশ্য তাদের বিশ্বাস ও আল্লাভীতির কোনো অভাব নাই। সেই ভয়েই হয়তো মসজিদের সামনে দিয়ে সহজে কেউ কোথাও যায় না। মসজিদ মানে আল্লার ঘর। সেখানে গেলে যদি কোনো বেয়াদবি করে ফেলে!

রাতারাতি বুড়াদের সমাজে আফরোজের খুব সুখ্যাতি হয়ে গেল। তারা মাঝে মাঝে তাকে অভয় দিয়ে বলে, — ডরাইছ না, এইবারে আল্লায় তরে পাশ করাইব।

তবে বন্ধুদের মাঝে তাকে এখন আর কেউ আফরোজ ডাকে না। সবাই তাকে পিয়াইজালী মুন্সি ডাকে।

ষষ্ঠবারও আফরোজ মেট্রিক ফেল করলে লেখাপড়ার সাথে নামাজটাও সে ছেড়ে দেয়। এবং এলাকা থেকেও নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেয়। অলস দুপুর-বিকাল কিংবা রাতে জমিয়ে আড্ডা মারে সাহাপাড়ার বন্ধুদের সাথে। রাত একটু গভীর হলে বাজারের ক্লাবঘরে নাটকের রিহার্সাল দেয়। জয়ধরখালীর আখড়া নাট্যপ্রিয় ছাত্রদের একটি স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ। প্রতি বছরই এখানে নাটক মঞ্চায়ন হয়। এবারও মঞ্চায়ন হবে ‘একটি পয়সা’ নামের একটি সামাজিক নাটক। এই নাটকে আফরোজ অভিনয় করবে কলকাতাবাসী ধনাঢ্য পরিবারের এক ভোগসর্বস্ব ভোংভাং তরুণের চরিত্রে। নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শিল্পী আনতে হবে ময়মনসিং থেকে। নৃত্যপটিয়সী একজোড়া বাঈজীও আনতে হবে। আনতে হবে মিউজিক পার্টি। এইবাবদ আফরোজের ঘাড়ে মোটা টাকা চান্দা পড়ে যায়। এই ঘটনায় তার চান্দি সবসময় খুব গরম থাকে। বাড়িতে খাবার খেতে এসে একটু উনিশ-বিশ হলেই হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। ঠাস-ঠুস হাড়িপাতিল ভাঙে। বুড়া মা-বাবার সাথে ঝগড়া করে।

গালিগালাজ শুরু হলেই আমুদের বায়স্কোপ দেখার জন্য আশপাশের বাড়িগুলো থেকে নারী ও শিশুরা এসে আফরোজদের বাড়ির চারপাশে ভিড় জমায়। রাগে আফরোজের ইচ্ছা হয়, কাঁচা কঞ্চি দিয়ে পিটিয়ে সব চুতমারানির পাছার ছাল ছাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে কয়জনকে মারবে? রাগে দিশাবিশাহারা আফরোজ পরনের লুঙ্গিটাই খুলে ফেলে দিয়ে চিৎকার দেয়, — দ্যাখ চুতমারানিরা মজা দ্যাখ।

এই বলতে বলতে সে মধ্যাঙ্গটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখায়। পাড়ার বউ-ভাবীরা আবিল আমুদে হাসতে হাসতে একে অন্যের গতরে ঢলে পড়ে। মা-চাচিরা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে পালাতে পালাতে বলে, — আস্তা একটা খবিশ।

পাড়াপড়শির সাথে আফরোজের মা-বাবাও দুহাতে চোখ ঢেকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এই ফাঁকে আফরোজ তাড়াতাড়ি লুঙ্গিটা পরে যতটা সম্ভব ধান-পাট কিংবা চাল নিয়ে গাঙপাড়ের জংলার দিকে সরে পড়ে।

আফরোজের মা-বাপকে পাড়ার কেউ বলে, — ছেরারে বিয়া করাও। বিয়ার লাইগ্গ্যা এইরহম করতাছে।

কেউ বলে, — যুদা (আলাদা সংসার) কৈরা দ্যাও। ঘাড়ে সংসারের জোয়াল পড়লে সব ঠিক অইয়া যাইব।

একজন-দুইজন করে পাড়ার মরুব্বিরা আসে। তাদের একটা দায়িত্ব আছে না! সমাজে এইরহম একটা ঝক্কি কয়দিন চলতে দেওয়া যায়? বেশ কয়েকদিন ধরে আফরোজদের বারান্দায় বসে বসে পাড়ার মুরব্বীরা মেলা পান-তামাক ধ্বংস করে সিদ্ধান্তে আসে, আফরোজকে যুদা করে দেওয়াটাই এখন ফরজে আইন।

পরের সপ্তাহেই আফরোজ বিলপাড়ের দুইকাঠা ক্ষেত বেচে দেয়। নাটকের চান্দা বাদে বাকি টাকা দিয়ে সে পাঁচ জোড়া প্যান্টশার্ট ও চামড়ার একজোড়া দামি শ্যু কিনে আনে শহর থেকে। নাটকের প্রতি অঙ্কে অঙ্কে তাকে যে অত্যাধুনিক পোশাকের জলুশ দেখাতে হবে! বিলাতি মদের বোতল হাতে টলতে টলতে ইংরেজিতে ডায়ালগ দিতে হবে! সে তো যে-সে নয়; শিল্পপতি রূপনারায়ণবাবুর ছোটপুত্র লম্পট অরূপনারায়ণ!

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: