বৌঠান অ্যাগেন

বৌঠান অ্যাগেন

SHARE:

কথা তো ওইটাই যে একটা ফ্ল্যাট গল্প বলিয়া যাওয়াতেই সিনেমার কামকীর্তি কামিয়াবি কি না। তা আদৌ সমস্যা হবার কথা নয় সিনেমায় কিচ্ছাকাহিনি পিকচারাইজ্ করে গেলে। সমস্যা তো হয়ও না, আমরা তো কুড়িটা সিনেমার মধ্যে এগারোটায় ফ্ল্যাট গল্পগাছাই দৃশ্যায়িত হতে দেখি। কিন্তু গল্পবলা ছায়াছবিগুলো, গণ্ডদেশে টোলপড়া বা নিটোল যেমনই হোক গল্পসুরত, কোনো-না-কোনোভাবে কাহিনি ‘চিত্ররূপময়’/চলচ্চিত্ররূপময় না হলে ব্যাপারটা ক্যামেরাশৌখিন কারবার ছাড়া আর কিছু হবার চান্স বাই ডিফল্ট কোটিতে একলাখের বেশি না। ‘কাদম্বরী’ দেখতে যেয়েই যে এই কথাগুলো প্রথম মনে উদয় হয়েছে, এমন মোটেও না। হামেশা মনে হয়, হিন্দি সিনেমা দেখে, বিশেষভাবেই পিরিয়ড ম্যুভির নামে যে-সমস্ত গুচ্ছগাদার আংরেজি/হিন্দি সিনেমারাজি ইন্দ্রিয়গোচর হয় ফি-বছর, সেইসবের ভিতরে এন্তার চেনাজানা ন্যারেটিভের হুবহু অনুবর্তন দেখে এহেন কথাবার্তার কিরণ মনের মুকুরে ঝিল্কিয়া যায় প্রায়শ। ওরেব্বাপ্পু! কথাবার্তার কিরণ … মনের মুকুর … দাদাভাই কি শ্রীনিকেতন থেকে বেঙ্গলি ডিসিপ্লিনের ডিগ্রিধারী নাকি? বোলপুরের ভাষায় হৃদয়ের ভাব প্রকাশেন যে বড়! আজ্ঞে না, দিদিভাই, ঠাকুরের বায়োপিক্ নিয়া আলাপ জুড়েছি তো, তাই ইকটু বললুম আর-কি। বলতে চেষ্টা করলুম বড়জোর, বুঝলেন ভায়া, পারলুম আর কই!

Kadambariকী! শ্রী ভানুদার বায়োপিক্! ওই হলো, কথা তো অভিন্ন, বৌঠানের বায়ো। বৌঠান তো একজন নন আমাদের, অন্যান্য নন্দিনীও রয়েছেন, নতুন বৌঠান বলবে তো! নিশ্চয় নিশ্চয়। কিন্তু বৌঠান আবার বায়ো লিখলেন কবে যে সেইটা অবলম্বনে এই পিক্? ঘটনাটা রাবীন্দ্রিক রামের মতো, রবীন্দ্রনাথেরই মনোভূমে বিরচিত, অযোধ্যার চেয়ে সত্য বলিয়া গ্রাহ্য বঙ্গজগতে। সেই-যে এক গল্প ‘নষ্ট নীড়’, সেই-যে এক সিনেমা ‘চারুলতা’, সত্যের শুরু ওই দুই উৎস হইতেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ সত্যটাকে এত প্রতিষ্ঠিত করে যে এরপর থেকে এমনকি বাংলাদেশেরও মোস্ট সার্কুলেইটেড সংবাদব্যবসা হয়ে ওঠে এইটা। মান্নান সৈয়দ বলিয়া না-দিলেও বুঝতে আমরা পারতাম অচিরাৎ যে ‘সত্যের মতো বদমাশ’ দুনিয়ায় দ্বিতীয়রহিত।

সত্যের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া যাওয়া সাহিত্য-সিনেমা লইয়া আমরা কি করিব, বঙ্কিম বা আজিজ বাৎলাবেন আমাদিগেরে। এখন বলি, সত্য নাম্নী এই কঠিনেরে কেন গঞ্জনা করতে উদ্যত হয়েছি। সিনেমাটা ছাড়া হয়েছে ২০১৫ সালের বাজারে। এরই মধ্যে এই পিকপ্লট গণ্ডায়-গণ্ডায় উপন্যাসে/নভেলেটে, ঊনসহস্র ছোটগল্পে, লক্ষাধিক প্রবন্ধে-নিবন্ধে পেয়ে গেছি বিভিন্ন ভক্তিরস ও মনমাধুরী মিশিয়ে পরিবেশিত বর্তনে বর্তনে। ব্যত্যয় একেবারেই নেই তা বলছিনে, ব্যতিক্রম সবসময় নিরুল্লেখ্য রূপে হাজির থাকেই, সেইসব ধরছিনে। একই ‘সত্য’, রবীন্দ্রনাথের গল্পসত্য, বড়জোর উনার কিছু কবিতায়-গানে ঠারেঠোরে এবং চিঠিপত্রে-উৎসর্গপঙক্তিতে প্যাঁচিয়ে কষিয়ে বলাবলি থেকে আমরা সাধু গোলাম মুরশিদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অক্ষরে অক্ষরে পেন্নামপূর্বক ফোলো করে করে এ-পর্যন্ত এয়েচি। কিন্তু আমার কি গল্প বানাবার হক নাই? বিন্দুমাত্র মূল্য নাই গরিবের কল্পনা ম্যাডামের!Kadambari রবির মাধুরী মুহতারিমা, রাবীন্দ্রিক ইম্যাজিনেশন্, আমাদের মনের রঙগুলোকে একদম আমলেই নিবে না কদাপি? নেহি, কাভি নেহি। শ্রীযুক্তদের গল্প তোমার মতো করে তুমি বলতে পারো না, নেভার এভার, তাদের গল্প বলার এখতিয়ার শুধু অনুমোদিত ভক্তদিগের। বেচারা আস্তিকের জন্য বড্ড মমতা হয়, তাদিগের গুরুর রবিগল্পতুল্য কোনো বায়োপিকসম্ভব ‘সত্য’ নাই; তা, তাদিগের, মানে আস্তিকদের, সমস্তই ‘সত্য’, কদমে কদমে ‘সত্য’, নমস্তস্যৈ নমো নমঃ, তাদের গুরুজির যা সত্য নয় তা আরও অধিকতর ‘সত্য’, ওই গাঁয়ে ‘নাই’ বিলকুল ঠাঁই পায় না, আর ভিনগাঁ হইতে বেচারা ‘আছে’ একেবারে একবস্ত্রেই বিতাড়িত। বৌঠানগল্পে যা-কিছু উপভোগ করি আমরা, তাতে রবীন্দ্র রচনাবলির গল্পচরিত্রযুগল চারু-অমল আর জ্যোতিদার মধ্যে ভূপতিছাপ। বাংলা মুক্ত করবে কে? একটা সময়ে মনে হয়েছিল চলচ্চিত্র হয়তো মুক্তি দিতে পারে, এখন ইদানীং তা আর মনে হয় না আগের সেই কিশোরবেলার ডাঁটের সঙ্গে, এদ্দিনে জেনেছি যে এই শিল্পে ভক্তি আর সত্য ছাড়া মাড়োয়ারি/বাঙালি চিত্রপ্রযোজক জোটানো অসম্ভবনদীর সুদূরপারের ব্যাপার। কাজেই সিনেমার নামে ‘সত্যমেব জয়তে’ এবং ভক্তগাথা জারি রইবে। এখনও নয়, কিন্তু সম্মুখে মুক্তি পারাবার … এইটা আশা যারা করে তারা বাংলা সাহিত্যসিনেমার হালফিল খবর রাখে না। তাদেরে একটু খবর যোগাই নিচে।

Kadambari

এই সিনেমার রিভিয়্যু করতে যেয়ে সাহিত্যিক ও সিনেমাসংগীতরসজ্ঞ শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, কলকাতানাগরিক, এবং অভিনয়শিল্পী ও লেখক-অনুবাদক-কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উনিও তথাকার, ভূয়সী প্রেইজ্ করেছেন। দুইজনেই সত্যানুসন্ধানী, সিনেমানুসন্ধানী কিঞ্চিৎ হইলেও ঘটনাটা আহ্লাদের হতো অতীব। “যখন রবি ও নতুন বৌঠানকে উদ্ঘাটন ও ঔপন্যাসিকতার দোহাই পেড়ে প্রায় শয্যাসঙ্গী করে এনেছে বঙ্গীয় লেখক-প্রকাশককুল, তখন সুমনের এই ছবি — প্রাপ্ত তথ্য ও কল্পনার সুস্থ সন্নিবেশে — জাহাজের জ্বলন্ত ডেকে একক কাসাবিয়াঙ্কার মতো হয়েছে। ইতিহাস ও কল্পনার সংস্রবে এক সূক্ষ্ম লক্ষ্মণরেখা টেনে নিয়েছেন সুমন, কাদম্বরীর আখ্যায়িকাকে বটতলায় গ্রাস হতে দেননি।” — বলছেন ভটচাজ্ মশাই। শ্রী চাটুজ্জেও অনুরূপ, “ঠাকুর পরিবারের এই বিষয় নিয়ে পূর্বতন লেখক-লেখিকারা, কথাকারেরা তাঁদের গল্পে, উপন্যাসে এই তিনটি চরিত্রকে যে ভাবে দাঁড় করিয়েছেন তাতে অনেকাংশে অসত্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ছবিতে সেই অসত্য নেই। সেই তুলনায় রবীন্দ্রনাথ, কাদম্বরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে নিয়ে সুমন ঘোষের ‘কাদম্বরী’ ছবিটি অনেক বেশি মাটি ছুঁয়ে থাকে। বাস্তব মানুষ হিসেবে তাঁদেরকে দেখাবার চেষ্টা করেছে পরিচালক। সব থেকে বড় কথা হিউম্যান কোয়ালিটি আছে ছবিটার।” — দুই নিরুক্তির মধ্যকার সাদৃশ্যমজাটা আড়ালে থাকে না নিশ্চয়।

এবং হ্যাঁ, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য সম্ভবত ইঙ্গিত করছেন ওই দেশের রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কায়কারবারের দিকে। তা, আমরা পড়ে দেখেছি তো খান-পাঁচেক, খারাপ কিছু তো দেখি না। ‘আদরের দাগ’, ‘কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড-নোট’ ইত্যাদি আমাদের গোলাম মুরশিদ সাহেবকে খেপিয়ে তুললেও মজাই পেয়েছি আমরা। ব্র্যাভো! কল্পনার সুযোগ নাও, রবীন্দ্রনাথকে বাঁচাও। সোজা রাস্তা। তা, আমার রিজার্ভেশন্ থাকতে পারে, আছেও বটে, তাই বলে ফেলনা তো নয় ইনিশিয়েটিভটা। সাহিত্য বলি, কিংবা সিনেমা, গালগল্পেই প্রাণ পায়, সত্যে যায় মরে ধুঁকে ধুঁকে, কিংবা যায় ধর্ম হয়ে আসমানে উবে। সেইটাই। সিম্পলি।

কিন্তু ‘সত্য’ ধুইয়া আমরা পানি খাব কোন পাত্রে, এহেন প্রশ্নে আসর বিব্রত করার হক্ আপনারে কেউ দেবে না; কেবল প্রশ্ন নয়, চিন্তার বিষয় যে লাখ-লাখ রুপিয়া/টাকা ব্যয়ে নির্মিত ম্যুভিও যদি বলপয়েন্টের সত্য উৎপাদনে জেরবার হয়, শিবনাথ লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ বইটা যারা মার্কেটে ছেড়েছেন তারা তো কদম্বতলায় খাজুল হয়ে বসে থাকবেন। তাছাড়া উপায় কী, বলুন! প্রোক্ত দুইজনেই বলছেন যে এই সিনেমায় তারা নাকি রিসার্চের উৎকৃষ্ট নমুনা হেরিয়াছেন! অথচ ক্রেডিটলাইনে গ্র্যাফিক্স দিয়া সাঁটানো সুনীল ও প্রথম আলো, আমরাও দুইকাৎরা বেশিও পাই নাই কিংবা কমও, তবু পণ্ডিতবাক্য স্কন্ধধার্য। অগত্যা মানিয়া লই।

কিন্তু যদি কোনো দর্শক গল্পটা না-জানেন আগে থেকে, দেড়-শতাব্দী আগে যে-গল্পের জন্ম এবং যে-গল্পের শেষ নেই ওবিয়াস্লি, সেক্ষেত্রে সেই দর্শক নাটকটা ভালো উপভোগ করবেন সন্দেহ নাই। ভীষণ ভালো বলতে না-পারলেও বলতে বাধ্য যে কঙ্কনা আসলেই ভালো অভিনয় করেছেন নতুন বৌঠান ক্যারেক্টারে। একটু পোশাক আর সাজুগুজুর স্মার্টনেস্ চোখে লেগেছে যদিও, রবির ‘সত্য’ প্রচারকেরা ব্যাপারটা ‘গবেষণা’ করার সময় খেয়াল করেন নাই বোধহয়। আর পরমব্রতও তো ভালো অভিনেতা। তবে, এত ঢুলুঢুলু রোম্যান্টিক্ ললিতমোহন নৃত্যকলাশিক্ষকের বাচন-চলনফিরন দিয়া আর কত রবীন্দ্রনাথ সইব আমরা? আর কবে থেকে ট্যাগোরের এই গুরুদেব ব্র্যান্ডের আগরবাত্তিমার্কা ছাঁচটা গড়ে উঠেছে, এবং কীভাবে, এই ব্যাপারে একটা গা-ভাসানো গবেষণা করার ইচ্ছা আমার অনেকদিনের। অ্যানিওয়ে। এই সিনেমার আবহসংগীত সত্যিই ভালো। রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া একবার একটা রাবীন্দ্রিক সিনেমা বানায়ে দেখতে পারলে কেমন হয়, এমন চিন্তা চকিতে এসেছিল দেখতে দেখতে। এর কস্টিউম্ যিনি করেছেন, তিনি অল্পের জন্য রবিকে ট্রেনস্টেশনের ঝালমুড়িহকার বানিয়েই ফেলেছিলেন, অলমোস্ট দুই-তিনজায়গায় ফেলেছেনও। অসুবিধা নাই। কিন্তু ভাই, উপরোক্ত দুই ক্রিটিক্ কমন যে-কয়টা বিজ্ঞ অভিমত প্রকাশ করেছেন ম্যুভিটার সপ্রশংস সমালোচনায়, যেমন সিনেমার আখ্যানে নাকি লিরিক্যাল্ কোয়ালিটি বেরিয়ে এসেছে, সিনেম্যাটোগ্র্যাফি নাকি বিন্দাস্, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বিশ্বাস করুন, আমার সর্বাঙ্গে ব্যথা, তদুপরি মিথ্যেবাদী, এবং সংজ্ঞা জানি না।

Kadambari

আমি শুধু একটা লাইন জানি, শক্তিশালী, রিয়্যালি শক্তির, সেইটে এই-রকম যে, কবিতার সত্যে আমি মিথ্যার একফোঁটা বাতাস লাগাই। ঠিকঠাক মুখস্থ নাই বলিয়া লাইনটায় কোটেশনমার্ক দিলাম না। হ্যাঁ, সেইটাই, মিথ্যের এই ফোঁটা ছাড়া সাহিত্য অসম্ভব। সুমন ঘোষের এবং সুনীলের গবেষণাসাহিত্য অবশ্য সম্ভব। বলি কি, সিনেমাকে বেচারির নিজের গল্পটা বলতে দিন, অথবা বেছে নিন এমন গল্প যা সিনেমামূলক, অন্য মাধ্যমে বহুলভাবে প্রচারিত গল্পগাছা ছায়াছবিতে এনে বেফায়দা টাকাটা/ঘামটা গাঙে ফেলবেন না, আর খালি লিক্যুয়িড অর্থটাই নিরখিয়া যাইবেন? তাইলে শিল্প! ওরে ত্যাগ করিবেন কোন বুকে! একটু সুযোগ দিয়ে দেখুন মিথ্যেকে, এই পৃথিবীসিনেমারাজ্য ফুল্লসুশোভিত হবে এক-লহমায়, এবং গুরুদেব তো স্বয়ং বলে গেছেন যে সাহিত্যফাহিত্য করতে গেলে বিদ্যার সঙ্গে যথেষ্ট অবিদ্যা মেশাতে হয়, না-হয় শিল্পফিল্প তো হয়ই না সাহিত্যও মরিয়া যায়।

এবং বলি কি যে আগরবাতির ব্যবসাটা এইবার একটু বাদই দেন। প্রোফিটমার্জিন আপলিফট করার একটা ব্যাপার তো রয়েছে ‘গুরুদেব’ ব্র্যান্ডের আগরবাতিটিরও। তবু ওই ইন্ডিয়ান আগরবাতির সঙ্গে এই সিনেমাব্যবসার একটা ব্যবধান রচিবার জরুরৎ রয়েছে। কেবল সচ্চরিত্র খুশবু দিয়া জ্যান্ত ম্যুভিলিট্রেচার হয় না। আগরবাতির খুশবুর সঙ্গে শবসৎকারের ব্যাপার জড়িত। সো, পুষ্পপবিত্র রবিচরিত্র আর কত, অনেক হয়েছে না?

Film Title: Kadambari ।। Released Year: 2015 ।। Genre: DramaHistory ।। Duration: 1h 27 min ।। IMDb Score: 7.4/10 ।। Director: Suman Ghosh ।। Stars: Konkona Sen Sharma, Parambrata Chatterjee, Kaushik SenTitas BhowmikSanjoy Nag, Srikanto Acharya ।। Music Score: Bickram Ghosh

লেখা:  জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

Posari IT Solution
error: