রাজা মাইকেল || জোডি রোজেন

রাজা মাইকেল || জোডি রোজেন

মাইকেল জ্যাকসন নিজেরে কিং অফ পপ বলতে শুরু করেন উনিশশ একানব্বইয়ের দিকে। এরই মধ্যে অবশ্য উনার রাজপাট হাতছাড়া হয়ে যেতে লেগেছিল। পরের বছরেই, বিরানব্বইয়ের জানুয়ারিতে, বেরোয় মাইকেলের ‘ডেঞ্জারাস’ অ্যালবামটা। সারাবছরের অ্যালবামগুলো থেকে বাছাই ‘বিলবোর্ড ২০০’ তালিকায় নির্ভানা ব্যান্ডের ‘নেভারল্যান্ড’ অ্যালবামের কাছে ‘ডেঞ্জারাস’ শীর্ষ দখলের লড়াইয়ে হেরে যায়। এই পরাজয়ের ভিতর দিয়া মাইকেলের শাসনামল প্রথমবারের মতো রাজত্বখোয়ানো হুমকির মুখোমুখি হয় এবং পপযুগের মঞ্চে মহামহোপাধ্যায় মাইকেল জ্যাকসনের রচিত পালায় পর্দা টানাইবার সূচনা আমরা দেখি। আজকের দিনের লঘু সংগীত বলি কিংবা পপুলার মিউজিকের ল্যান্ডস্কেইপটা আগের মতো অত একচেটে-একাধিপত্যের জায়গায় নাই, সীমাসরহদ্দিও সংকুচিত হয়ে এসেছে পপমিউজিকের, শত শত মার্কেটনিশে এখন ক্রিয়াশীল, প্রচুর সাবজন্রা মাইক্রোজন্রা চারপাশে, এই কিসিমে শতপুষ্প মুখরতার বাজারে এখন কিং হয়ে কেউ দুইদণ্ড খাড়াইবার টাইম নাই। মিউজিকে-ম্যুভিতে-আর্টকালচারে এখন সেই কিং হয়ে বিরাজিবার দিন অবসিত।

যদিও ক্বচিৎ-কদাচিৎ কোনো কোনো শ্রোতানন্দিত সংগীতকাজ দুনিয়ার বিচিত্র অডিয়েন্সের মাঝখানকার ব্যবধান এখনও কমায়ে আনে, ভেঙে ফেলে দেশদশের অনেক সীমানাপ্রাকার, এরপরও আমরা কিন্তু এখন আর আগের মতো অতটা আশা করতে পারি না যা মাইকেলযুগে হয়েছে। এখন আমরা ভাবতেও পারি না যে একটা অ্যালবাম দুনিয়াসুদ্ধু শ্রোতা হা হয়ে শুনছে, যেমন শুনেছে জ্যাকসনের ‘থ্রিলার’ অ্যালবামটা। আশির দশকে এই অ্যালবাম রিলিজ পাবার পরে দেখা গিয়েছিল গোটা বিশ্বজুড়ে এর সর্বস্তরে সর্বশ্রোতায় ইম্প্যাক্ট। মনে হয়েছিল গোটা দুনিয়াটাকে যেন সংকুচিত করে এই অ্যালবাম একটা বাদামখোলে এনে পুরে ফেলতে চাইছে। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আর হবে না। কাজেই, যে-জিনিশটা আমার মনে হয় যে, মাইকেলের মৃত্যুর পরে এত এত ক্রন্দন চারদিকে, এত মানুষের বুকচেরা আর্তনাদ, শুধু মাইকেলের জন্যই মানুষ কাঁদছে না, মানুষ কাঁদছে সেই স্মৃতিসুরের ধূসর দশকটির লাগিয়া, আমরা কাঁদছি পিছনের সেই দিনগুলোর জন্য, যখন গোটা দেশ গোটা দুনিয়া মাইকেলের একটা অ্যালবামই শুনেছে, ভাষা বুঝেছে কি বোঝে নাই তাতে কিচ্ছু যায় আসে নাই, পৃথিবী উন্মত্ত পাগলিনীর দশায় মাইকেলের সুর আর বাদ্য শুনেছে। সেই বিগত শতকের আশির দশকে। এতটাই মিউজিক্যাল মনোকালচার মাইকেলের পরে এবং আগে কেউ কল্পনাও করতে পারে নাই।

থ্রিলার  (১৯৮২) অ্যালবামটা মাইকেলের মাস্টারপিস। দুর্ধর্ষ সংগীতাভিজ্ঞতার এই সংকলনটা মাইকেলের ক্যারিয়ারে একদিকে যেমন বলা যায় আশীর্বাদ তেমনি অন্যদিকে ভেবে দেখলে এইটা তার লাইফের অভিশাপও। দুনিয়ায় জ্যাকসনের খ্যাতি এবং প্রতিপত্তি মনুষ্য অভিজ্ঞতার সমস্ত সীমা ছাড়ায়ে এতই বিস্তার পেয়ে যায় যে এর তুল্য অভিজ্ঞতা আগামী কোনো শতকেও হবে বলিয়া ভাবা যায় না। মাইকেলের আগের কালের মিউজিক্যাল গ্রেইট যারা তাদের কেউই এত প্রভাবশালী বিস্তৃতি পান নাই — না ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, না এল্ভিস প্রিস্লি, এমনকি বিটলসও না। মাইকেলের এই থ্রিলার অ্যালবামটা বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক উভয় দিক থেকেই নিঃসন্দেহে একটা মাইলস্টোন; এবং এই মিউজিক্যাল মাইলস্টোনটাকেই রিপিট করবার চেষ্টায় বৃথা মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে দেখব আমরা মাইকেলকে বাকি জিন্দেগিভর।

এমনিতে এমজের অ্যালবামগুলোর সব-কয়টাই নিজের ধারায় পৃথিবীকাঁপানো সংগীতাভিজ্ঞতা আমাদেরে উপহার দিয়ে গেছে। যেমন ধরা যাক ‘ব্যাড’ (১৯৮৭) অ্যালবামটা মাইকেলের ধারায় আরেকটা মাস্টারপিস; একই সাফল্যধারায় ‘ডেঞ্জারাস’ (১৯৯১), ‘হিস্টোরি’ (১৯৯৫) এবং ‘ইনভিন্সিবল’ (২০০১) অ্যালবামগুলোর অবিস্মরণীয় অভিঘাত উল্লেখ করা যায়। এইখানে একটা কথা ভাবার আছে যে, এমজের মিউজিক একসময় কেবল মিউজিকের গুণেই দুনিয়াজোড়া সাক্সেস লাভ করছিল বলাটা আদৌ সুবিবেচনার হবে না, কারণ তখন মাইকেল জ্যাকসন ব্র্যান্ড মঞ্চে অ্যাপিয়ার করার আগে-পরে এত বড় পুঁজির লগ্নি হতো, ‘মেগ্যালোম্যানিয়া’ কর্তৃক এলাহি খর্চার প্রযোজনা, আরও রাজ্যির ধামাকা ইত্যাদির কারণে একটা টাইমে এসে এমজের মিউজিকটা আলাদা করে কেউ খেয়াল করছিল না। মাইকেল জ্যাকসনের মিউজিকের অ্যাপ্রিসিয়েশন করার সময় এইসব ধামাকা আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয় অর্থেই ক্রিয়াশীল ছিল।

মাইকেলের গানগুলোতে একটা আত্মকরুণা আর আত্মহননেচ্ছু শুশ্রূষাকারীর উদ্বেল উপস্থাপন লক্ষণীয়। ধরা যাক ‘হিয়িল দ্য ওয়ার্ল্ড’ গাইছেন উনি, কিন্তু উনার নিজের মুখাবয়বে-চেহারায় তখন প্ল্যাস্টিক সার্জারির কাটাছেঁড়া, নিজের হিলিঙের কোনো চিহ্ন তো নাই বরঞ্চ উল্টো, সার্জারি আর শরীরী রঙের কিম্ভূত হাজিরায় মাইকেল নিজের সিকনেস উদাম করে দেখাচ্ছিলেন যেন সবাইকে। এই সিকনেস যতটা বাইরের তারচেয়ে বেশি ভিতরের। সিকনেসটা মাইকেলের যতটা না তারচেয়ে বেশি পৃথিবী নামক এই প্ল্যানেটের। এই প্রসঙ্গে আরেকটা গ্র্যান্ড ইভেন্টের স্মৃতি ইয়াদ করা যাক। সময়টা নাইন্টিফাইভ। গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের ইক্যুয়িভ্যালেন্ট ব্রিট অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চ। এই মঞ্চে এমজে ‘আর্থ স্যং’ পার্ফোর্ম করলেন। পার্ফোর্ম্যান্সের সময় একদল পূজারি শিশুর কয়্যার এবং রাবাইয়ের লেবাসে একজন অভিনেতা সারামঞ্চে দেখা গেল চমৎকারভাবে এমজের সঙ্গে পার্ফোর্ম করতে। একপর্যায়ে দেখা গেল অলমোস্ট যিশুপোশাকের মাইকেল সেই শিশুদল ও ধর্মযাজক রাবাইটিকে ব্লেস্ বা আশীর্বাদ করছেন। চমৎকার রিফ্রেশিং অভিজ্ঞতা। বাধ সাধেন ব্রিটপপ ‘পাল্প’ ব্যান্ডের লিডসিঙ্গার জার্ভিস ক্যুকার, যিনি স্টেজে এসে অডিয়েন্সের দিকে করমর্দনের ভঙ্গির বদলে পাছামর্দনের ভঙ্গি করেন, অব্যবহিত ওই সময়েই মাইকেল মঞ্চ থেকে উত্তোলিত হচ্ছিলেন ঊর্ধ্বপানে একটা হাইড্রোলিক লিফটের সহায়তায় দর্শকের দিকে যিশুবরাভয়ের হাত নাড়তে নাড়তে। স্টেজ থেকে নেমে ক্যুকার বলেছিলেন যে সেই পাছাদেখানোর ব্যাপারটা ছিল তার তরফ থেকে একটা প্রতিবাদ যেখানে এমজে নিজেকে যিশুর মতো উপশমকারী হিশেবে প্রেজেন্ট করেছিলেন।

খুবই বিব্রতকর ছিল পরিস্থিতিটা। প্রায় বিপর্যয়কর মিউজিক্যাল একটা মিসক্যাল্কুলেশন। বলতে হয় যে এমজের সংগীত পরিবেশনায় সেইগুলাই ভীষণ উজ্জীবক যেইগুলায় ধামাকা কম। ‘ডোন্ট স্টপ টিল্ ইয়্যু গেট এনাফ’, ‘বিলি জিন’, ‘ওয়ানা বি স্টার্টিং সামথিং’, এবং ‘দ্য ওয়ে ইয়্যু মেইক মি ফিল’ গানগুলো শুনলে আপনার মনে হবে এমজে একজন অলটাইম গ্রেইটেস্ট পপস্টার হওয়া সত্ত্বেও ছিলেন তার সময়ের অতুলনীয় একজন গীতিকারও। তার বেস্ট রেকর্ডগুলোতে এমজে একজন উন্নত গীতিকার, যার গীতাখ্যগুলোতে একটা ভাস্কর্যপ্রতিম কোমল-দৃঢ় কারুকাজ লক্ষণীয়, মোটাউন রেকর্ডস্ কোম্প্যানিতে ছেলেবেলা থেকেই কাজ করার সুবাদে এমজে যেই স্কিল গেইন করেছিলেন সেসবের ব্যবহার আমরা পেয়েছি তার পরবর্তী জীবনের সংগীতকাজে। এত স্যংক্র্যাফট সম্ভবই ছিল না আবাল্য সংগীতনিমজ্জিত না থাকলে। এবং আমরা যেন ভুলিয়া না যাই যে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের পারিবারিক আবহে এগারো বছর বয়সের বালক মাইকেল তার/তাদের ডেব্যু সিঙ্গেলে যে ব্যাপক তুজুর্বা দেখায়েছিলেন তা জ্যাকসনফাইভের অ্যালবামটিকে গ্রেইটেস্ট বাবলগাম পপরেকর্ড অফ অলটাইম হিশেবে হিস্ট্রিতে রেখেছে।

জ্যাকসনের জজবাতিয়ার গল্প শুনে যে-প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তাদের পক্ষে এইটা বুঝে ওঠা কঠিনই যে এই লোকটা একদা বিলবোর্ড চার্টগুলা শাসনই করেছে দস্তুরমতো। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের দশকসীমায় দেখা যাচ্ছে জ্যাকসনের মাত্র দুইটা টপফোর্টি হিটস্। উনার সর্বশেষ নাম্বার-ওয়ান সিঙ্গেলটি ‘ইয়্যু আর নট অ্যালোন’, মৃত্যুর বছর-চোদ্দ আগের। গোটা একটা পপ জেনারেশন বুড়ো হয়েছে জ্যাকসনকে ছাড়া, জ্যাকসনের নয়া অ্যালবাম না শুনে, তাই বলে জ্যাকসনিজমের বাইরে কেউ রইবার উপায় ছিল না। জ্যাকসনের প্রভাব বা জ্যাকসনের তুজুর্বার আঁচ সবাইকেই পেতে হয়েছে। এবং অনির্বচনীয় সুখকর সেই আঁচটুকুও। তার ইনফ্লুয়েন্সে এখনকার বিগেস্ট মিউজিক সেন্সেশন সকলেই নিজেদের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কেউ হয়তো হবেন আগামীদিনের মাইকেল, হতে পারে সে জাস্টিন টিম্বার্লেক বা আশার, হতে পারে সে বিয়োন্সি বা রিহানা, এদের গানের রেন্ডিশনে জ্যাকসনের হিট গানগুলোর রেশ টের পাওয়া যায়, সেই স্পিড, যেমন ‘স্মুদ ক্রিমিন্যাল’ গানে দেখেছিলাম আমরা,  যাদের মঞ্চপরিবেশনায় জ্যাকসনেস্ক উন্মাতাল হাই-শোবিজ ধাঁচটা আঁচ করতে পারি। মিউজিকের হিস্টোরিয়্যানরা একদিন পিছন ফিরে তাকায়ে দেখবেন নিশ্চয় এবং গত শতকের শেষার্ধে জ্যাকসনের প্রভাবেই আরঅ্যান্ডবি মিউজিকফর্মটা অ্যামেরিকার ডিফাইনিং মিউজিক হয়ে উঠেছিল লক্ষ করবেন। এবং এইটা আর-কারো নয়, মাইকেল জ্যাকসনের অমোঘ প্রভাবের কারণেই হয়েছিল। লক্ষ করা যাবে এইরকম আরও বহুকিছু, যেমন একটা হচ্ছে যে আজকের শীর্ষ চল্লিশ বাছাইয়ের যে-ধারাটা চলছে এবং যেইভাবে সেইটা জ্যাকসনের আশির দশকের রীতিনির্ভর চার্টসিস্টেম। সেই একটা টাইম এসেছিল আমাদের সভ্যতায় যেদিন অ্যামেরিকার বেতার আর টেলিভিশনের বর্ণবাদী শিল্পচর্চার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন মাইকেল অত্যন্ত স্মুদলি।

মাত্র পঞ্চাশে এসেই থেমে যাওয়া মাইকেলের অকাল প্রয়াণের পরবর্তী আর পূর্ববর্তী পৃথিবীর মধ্যে একটা দাগ কেটে যদি তা ভাগ করে ফেলতে যাই, রিসার্চারদের জন্যে সেইটা উদ্দীপক একটা কাজ হতে পারে। এমজের জীবনযাপন নিয়া ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলা ব্যাপক রভসে বেলা কাটিয়েছে। সেসবের সত্যমিথ্যা নিয়া আলাপ করা আরেক ট্যাবলয়েডকর্ম, সংগীতানুসন্ধানীর কাজ সেইটা না। মাইকেল এই পৃথিবীর এক অবিসংবাদিত মহৎ বিনোদনশিল্পী। তিনি ছিলেন নাচে আর গানে বিভাজন-দুঃসাধ্য অভিজ্ঞতার এক অপার্থিব উপহার আমাদের জন্য। অবিস্মরণীয় মঞ্চের পর মঞ্চে তার অ্যাগ্রেসিভ ডিসপ্লেগুলো। অনস্বীকার্য প্রতিভা আর বিপন্ন বিস্ময়ের তার ক্যারিশমা। আগত সমস্ত শতকেই স্মরণ করতে হবে এই বিংশ শতকের জাতক শিল্পী আচার্যটিকে।

জ্যাকসনের মিউজিকে যে-সমস্ত প্রতিপাদ্য ঘুরেফিরে এসেছে, সেসবের মধ্যে ভয়, শঙ্কা, যৌন-উদ্বেগ, অবসাদগ্রস্ততা, দুঃখ ও বিষাদ, সহিংসতা, সন্ত্রাস, সেলেব্রিটি সিচ্যুয়েশন ইত্যাদি দৃষ্ট পুনঃপুনঃ। এইগুলাই তার গানের পৌনঃপুনিক থিম। মাইকেলের গান শোনার সময় আমরা তার ‘অফ দ্য ওয়াল’-এর এই লাইনগুলো মনে রাখব : “লেট দ্য ম্যাডনেস ইন দি মিউজিক গেট টু ইয়্যু” …

তর্জমা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: