সিদ্দিক প্রেসের সিসার হরফ || সরোজ মোস্তফা

সিদ্দিক প্রেসের সিসার হরফ || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

ছোট্ট শহরের চল্টা-ওঠা লাল ইটের রাস্তায় তখনও দেখা যেত সবুজ ঘাসের অস্তিত্ব। এই শহরের কয়েকটা তরুণ আমরা এই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে টিয়া পাখির চেয়ে সবুজ হতে চাইতাম। পাখির চোখের মতো পৃথিবীর দিকে উড়তে চাইতাম। আমরা বুঝতে পারতাম সবুজ অক্ষরে শান্তি আছে। আমরা বুঝতে পারতাম নদী ও অক্ষর অনন্তের দিকে গেছে। নদীর কণ্ঠ খুঁজতে খুঁজতে, জাম্বুরা ফুলের সাদা শিহরণগুলোকে আমরা খাতায় নামাতে চাইতাম। চাইতে চাইতে ভরে যায় খাতা। ইকোনো বলপেন থেকে নেমে আসা কালো অক্ষরের খাতা। অক্ষরের খাতা চটের ভেতরে রেখে আমরা সারা শহর ঘুরতাম।

দুই

আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছিলেন আমার বন্ধু মিজান মল্লিক। এমন বন্ধু পৃথিবীতে দুইজন হয় না। মল্লিকের কথায় থাকত দোলনচাঁপার নীরব স্পর্শ। থাকত দীপ্তি ও আদর। মরমি সহচর হয়ে আমরা সারা শহর হাঁটতাম। মল্লিকের আব্বা মতিকাক্কুর এবটা ফনিক্স সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলে আমরা সারা শহর ঘুরতাম। আমি প্যাডেল দিতাম; মল্লিক বসতো পেছনে। আমরা বলতাম, এই শহরে আমাদের জন্য রান্না হয়। যে-কোনো বাসায় ঢুকে গেলেই পিতলের চকচকে থালায় মা কিংবা দিদিরা গরম ভাত ঢেলে দেবে পরম মায়ায়। আসলে আমরা তখন কবিতা লিখি। আমাদের ঝোলার ভেতরে স্বপ্ন ও কবিতা। স্রোতস্বিনী মগরায় তখনও গারো পাহাড়ের পলি নামত। কী সুন্দর দুই তীর! কালীবাড়ির ঘাট থেকে থানার ঘাট। বহু দিন দেখি না এই নদীর রূপ। বুকের ভেতরে বইতে থাকে এই নদী।

তিন

আমি এবং মল্লিক আমরা দুজনেই জানতাম, যারা কবিতা লিখতে আসে তারা চালতা ফুলের মতো নরম হয়ে আসবে। অনেক পথ হাঁটলে পরে পাওয়া যাবে কবিতার চাবি। আমারা শিবমন্দিরের বটতলায় বটপাতার নাচন দেখার জন্য বসে থাকতাম। আমরা ভাবতাম শব্দেরাও এইভাবে নড়েতে নড়তে নামবে। আমাদের পকেটে টাকা থাকত না। আসলে আমাদের কোনো টাকার দরকারই হতো না। কবিতা লিখলে টাকার দরকার হয় না। আমরা জানতাম কবিতা লিখলে চক্ষু লাগে। লাগে বটপাতার মতো মসৃণ মন। পৃথিবীর নরম হাওয়ায় আমাদের সাইকেলটা তখন বেশ চলছিল। আকাঙ্ক্ষা কিংবা লোভ না থাকলে মানুষের জীবন বেশ ভালোই চলে। চলতে চলতে শব্দ কুড়াতে কুড়াতে একদিন ভাবলাম একটা লিটলম্যাগ করব। নাম ঠিক হলো ‘অনুধ্যান’। আমাদের মনের ভেতরে যে কল্পনা ও শব্দের ধ্যান নিত্য বিরাজ করে সেখানে ‘অনু’ যুক্ত হলো মাত্র। আমরা তখন নেত্রকোণা কলেজের বাংলা বিভাগের ছাত্র। লেখক আছেন। কিন্তু পত্রিকা করার রসদ নেই। কী করা। মল্লিক বললেন, ‘বস, চিন্তা কইরেন না। আগে নামি। টাকা যোগাড় হয়ে যাবে’।

চার

পত্রিকা করার বাসনাতেই একদিন পৌরসভার দিকে গিয়ে সিদ্দিক প্রেসের সামনে দাঁড়াই। আমাদের শহরে তখন একটাই প্রেস। লেটারপ্রেস। দোকানের মালিককে চিনতাম না। একটা বয়স্ক মানুষকে দেখতাম গোলাকার ভারী চশমায় অক্ষরের দিকে ঝুঁকে আছেন। ঝুঁকে আছে লোকটার কোমর। দেখতাম বয়স্ক মানুষটা গোলাকার চশমার ভেতর থেকে একটা একটা করে সিসার অক্ষর তুলে আনেন। মানুষটার শরীর খুব ছোট। কিন্তু চোখে ও আঙুলে মানুষটা একটা প্লেট সাজাচ্ছেন। সাজানো এই সিসার হরফেরা কেমন যেন উল্টানো। একটা অদ্ভুত শব্দ, ছন্দময় শব্দ করে  পৃষ্ঠায় পৃষ্টায় নেমে আসে মানুষটার বর্ণমালা। কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি ছোটখাট সেই কম্পোজিটরের নাম। মানুষটার চশমাটা পৃথিবীর মতো গোলাকার। গোলাকার চশমাটা নিয়ে লেটারপ্রেসের লোকটা চিরতরে হারিয়ে গেলেন। লোকটার চোখে কোনোদিন বিষণ্নতা দেখিনি। দেখিনি লোকটার নরম অসুখ। আমি ও মিজান মল্লিক এই লোকটার গোলাকার চশমার রহস্যে বেশ কয়েকদিন ঘুরঘুর করেছি। তাকিয়ে দেখেছি লেটারপ্রেসের পৃখিবী।

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি মুদ্রণশিল্পের খোলনলচে একেবারেই পাল্টে দিয়েছে। এই ধাক্কায় গাছের পাতা ফুরিয়ে যাওয়ার মতো মরে গেছে অনেক ক্ষুদ্রশিল্প। তবে, পোস্টঅফিসের হলুদ খামের বারোটা বাজলেও প্রেস টিকে গেছে নতুন চুম্বনে। এসেছে বেগ, হারিয়ে গেছে আবেগ। সিসার হরফে কর্ণফুলী ছত্রিশে ছাপা কবিতার কালো হরফের আবেগমাখা প্রকাশ কতটা আলোড়িত করত তা আজকের তরুণ হয়তো কখনোই জানবে না । জানবে না একজন বৃদ্ধ কী নিষ্ঠায় একটা একটা করে সিসার হরফ সাজায়! বড় অর্থনীতির কাছে এইভাবেই মার খায় ছোট অর্থনীতি। মার খায় সিসার হরফের বৃদ্ধ কারিগর।

পাঁচ
আমি সেদিন থেকে জানি শব্দ ও দৃশ্য মানুষকে অবাক করে। অবাক হতে হতে আমরা সেই লেটারপ্রেসটির কাছে চলে আসি। প্রেসের অদ্ভুত শব্দ আমাদের খুব ভালো লাগে।  আমরা ভাবি একটি পত্রিকা করব। পত্রিকার নাম হবে ‘অনুধ্যান’। মনের ভেতরে অনুধ্যানের পৃষ্ঠা ওড়ে; আমরা সেই পৃষ্ঠার শব্দ শুনি। কিন্তু টাকা কোথায়! আমরা এই প্রেসের মালিক সাদা পাঞ্জাবির মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর কাছে গেলাম। ঠিকভাবে উনাকে বুঝিয়েও বলতে পারলাম না যে আমরা একটা পত্রিকা করতে চাই। আমাদের কাছে পত্রিকা প্রকাশের সবটা টাকা নেই। ভাষায় সবল না হলেও ভাবে আমরা ঠিকই বুঝাতে পেরেছিলাম। উনি চুপ করে ছিলেন।

শেষে মনে হলো তিনি খুশিই হলেন। আমি স্মরণ করতে পারি, উনার দোকানের সামনে এখন পৌরমেয়র একটা  ফোয়ারা তৈরি করেছেন, তখন ফোয়ারাটা  ছিল না। বলতে পারি তিনি আমাদের টাকার ঘটতির কথা শুনে ফোয়ারাটার মতো হাসলেন। বললেন, তোমরা পত্রিকাটা করো। লাল গোধূলির মতো থেমে যাওয়ার দরকার নেই। পত্রিকাটা বের করো। পরে বিক্রি করে টাকা দিয়ে যেয়ো। আসলে আমরা উনার কথামতো খুব সামান্য একটা টাকা উনার হাতে দিয়ে দিলাম। লেটারপ্রেসের হলুদ মলাটে বের হলো ‘অনুধ্যান’ ।

ছয়
১৯৫৬ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় সিদ্দিক প্রেস। এইটাই নেত্রকোণার প্রথম প্রেস। প্রতিষ্ঠাতা আলী উসমান সিদ্দিকী পুলিশ এবং শিক্ষাবিভাগের চাকরি ছেড়ে স্বাধীনভাবে প্রেসব্যবসা শুরু করেন। কেন করেন? হয়তো নতুন অর্থনীতির উপযোগিতার কথা বিবেচনাইয় রেখেই প্রেসব্যবসার কথা মাথায় এসেছিল তার। নেত্রকোণার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে এই প্রেসের সিসার হরফ। মূলত সিদ্দিক প্রেস স্থাপন করে তিনি ইতিহাস রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই প্রকাশিত হতো খালেকদাদ চৌধুরীর সম্পাদনায় পাক্ষিক-পত্রিকা ‘উত্তর আকাশ’। জনাব আলী ওসমান সিদ্দিকী ছিলেন ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকার  প্রকাশক।

সিদ্দিক প্রেস ছিল নেত্রকোণার তৎকালীন কবিসাহিত্যিকদের প্রধান সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র ও আড্ডাস্থল। সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী তখন চাকরিসূত্রে নেত্রকোণাতেই ছিলেন। খালেকদাদ চৌধুরীর ছায়াতলে একটি নতুন সাহিত্যপরিমণ্ডল তৈরি হয়। আলী ওসমান সিদ্দিকী ছিলেন সেই সাহিত্যআড্ডার প্রাণপুরুষ। মোট কথা, তাঁদের দু জনের অক্লান্ত পরিশ্রম, সাহিত্যানুভব আর পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই নেত্রকোণা হয়ে উঠেছিল একঝাঁক নবীন ও প্রবীণ মেধাবী কবিসাহিত্যিকের বিচরণক্ষেত্র। লোকায়ত নেত্রকোণায় তখন উঁকি দিচ্ছিলেন অনেক উদীয়মান লেখক। এঁরা প্রত্যেকেই পরে বিখ্যাত হয়েছেন।

সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী ছিলেন পাক্ষিক ‘উত্তর আকাশ’ ও সাহিত্যসাময়িকী ‘সৃজনী’ পত্রিকা দুইটির সম্পাদক। সিদ্দিক প্রেস ছিল এই পত্রিকা দুটির কার্যালয়। এখান থেকেই  ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হতে শুরু করে ‘উত্তর আকাশ’। আইয়ুব খান সরকারের একটি প্রয়াসকে শুধু প্রজ্ঞানের ক্ষমতায় খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্যপত্রিকায় রূপান্তরিত করেছিলেন। আলী ওসমান সিদ্দিকী ছিলেন আন্তরিক প্রকাশক, এই দুইটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করে তখনকার নবীন ও প্রবীণ লেখকদের উৎসাহিত করেন। কে-না আসতেন এই আড্ডায়! আড্ডা ছাড়া কী মসৃণ হয় মন ও মনন! আড্ডার ভেতরেই তৈরি হয় প্রজন্ম ও নবীন দিনের ভাষা। সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, লোকসাহিত্যের গবেষক সিরাজ উদ্দিন কাসিমপুরী, কবি রওশন ইজদানী, বাউল জালাল খাঁ, খুরশেদ আলী তালুকদার (পাগড়িওয়ালা মাস্টার), অ্যাডভোকেট দুর্গেশ পত্রনবীশ, অধ্যক্ষ শামসুদ্দিন আহমেদ, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার , কবি নির্মলেন্দু গুণ, অধ্যাপক নূরুল হক, রফিক আজাদ, জীবন চৌধুরী, শান্তিময় বিশ্বাস, হেলাল হাফিজের মতো আরও অনেকেই এখানে এসেছেন আড্ডায়। তাঁরা তখন ‘উত্তর আকাশ’ ও ‘সৃজনী’ সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। সিদ্দিক প্রেসের আড্ডা না থাকলে হয়তো এমনটা সম্ভব হতো না।

ষাটের দশকে সিদ্দিক প্রেস ও ‘উত্তর আকাশ’ যে একটা সাহিত্যিক ঘরানা তৈরি করতে পেরেছিল, কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখার ভেতরে এর প্রমাণ স্পষ্ট : “সুসাহিত্যিক মরহুম খালেকদাদ চৌধুরী তাঁর সম্পাদিত পাক্ষিক ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় আমার জীবনের প্রথম কবিতা ‘নতুন কাণ্ডারী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সংখ্যায়। তাতে নেত্রকোণার কবিমহলে আমার কদর বাড়ে। সেই ঘটনাটি যে একটি দীর্ঘ কাব্যজীবনের শুরু ছিল, তখন তা আমি বা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। তাঁকে নিত্য শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। ভাবি, আহা, তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন! কত খুশি হতেন তিনি!”

সাত
জীবনে সবাইকে মুঠো খুলে দিতে হয়। কাউকে ধরে রাখতে হয় না। সিদ্দিক প্রেসের আড্ডা ও ছাপাখানা ষাটের দশকে নেত্রকোণায় একটা চিন্তার পাঠশালা খুলে দিয়েছিল। সেই পাঠশালার ছায়াতলে অনেকেই ঋদ্ধ হয়েছিলেন।

ছাপাখানা হচ্ছে পবিত্র মন্দির। ছাপাখানা ছাড়া সভ্যতা দাঁড়ায় না। সিদ্দিক প্রেস নেত্রকোণার সেই সভ্যতার পাখি, যে-পাখি মন ও মননের বার্তা বহন করেছে।

সিদ্দিক প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মালিক আলী ওসমান সিদ্দিকী মুসলিমলীগ করতেন। কিন্তু তার ছেলে মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী আওয়ামীলীগ করতেন। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযুদ্ধের সকল বুলেটিন, লিফলেট, ছয়দফার ম্যানিফেস্টোও এই সিদ্দিক প্রেস থেকেই বেরিয়েছিল। এটা সবাই জানত কে, কোথা থেকে বেরোচ্ছে এই লিফলেট, এই বুলেটিন। তাই দ্বিধাহীন মিলিটারি ৭১-এ এই প্রেসটিকে সিলগালা করে দেয়। কিন্তু একটা প্রেসকে কী সিলগালা করে দেয়া যায়! ভীষণ অন্ধকারে ঠিক ঠিক জমতে থাকে সিসার হরফ। কী ভীষণ শক্তিমান এই হরফ! মুক্তিযোদ্ধার মনকে, এই শহরকে, জাগিয়ে দিয়েছিল এই সিসার হরফ। ইতিহাস তাই মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীকে স্যালুট করে। আলোতে মাখামাখি এই সিসার হরফ।

আট
মিজান মল্লিক, অনেক দিন আপনার চেহারা দেখি না! আপনার রান্না-করা ছোটমাছ দিয়ে বিরুই চালের ভাত খাই না। কী নিষ্পাপ ছিল আমাদের মন! কী দরদী ছিল আমাদের মন! আমরা কী হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেছি? নিজেদের হাত ছুঁয়ে দেখলে বুঝতে পারি আমরা আজো আছি। শুধু ছোট শহর থেকে সিদ্দিক প্রেসটা উঠে গেছে বন্ধু! মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীও চলে গেছেন। আহত ঝিনুকের মতো আমরা তবু বেঁচে আছি।

বিশ বছর আগের মলিন অক্ষর কী মরে যায়! আমি কাকে জিজ্ঞেস করব এই প্রশ্নের উত্তর? আজো পৌরমার্কেটের উল্টোদিকে সিদ্দিক প্রেসের একটি সাইনবোর্ড তবু আছে। জানি লেটারপ্রেস মরে গেছে। কিন্তু ইতিহাস তো মরে যায় না বন্ধু! নতুন ধানের পাতার মতো উঁকি দেয় নতুন দিনের ইতিহাস। মুখ মুছতে মুছতে উঁকি দেবে নতুন দিনের সিদ্দিক প্রেস। কে করবে? দিলশাত সিদ্দিকা স্বাতী করবে। সোহাগ করবে। অনেকে মিলে রচনা করতে হয় তালগাছের ছায়া।

… …

COMMENTS

error: