আত্মজৈবনিক আলাপচারিতায় মঈনুস সুলতান পর্ব ২

আত্মজৈবনিক আলাপচারিতায় মঈনুস সুলতান পর্ব ২

SHARE:

আগের পর্বের আলাপ যেটুকু আমরা শুনেছি তা আঠাশ মিনিটের ব্যাপ্তি, লিখিত রূপে নেয়ার সময় রেকর্ডযন্ত্রে যেসব জায়গায় সাউন্ড ত্রুটিপূর্ণ সেই জায়গাগুলো আমরা লাফায়ে গেছি, কিন্তু কোথাও যেন অর্থ উত্তোলনে বেগ পেতে না হয় পাঠকের, বা বাদ না যায় গুরুত্বপূর্ণ কোনোকিছু, সেই দিকটা মাথায় রাখতে হয়েছে সবসময়। সে-যাক, সুলতানের সঙ্গে আমাদের কথাচারিতার চারভাগ থেকে একভাগ আগে ছাপা হয়েছে, এখানে আরেকটা ভাগ রাখা যাচ্ছে, চেষ্টা করছি নেক্সট দুইটা পার্টে আলাপের সবটুকু তুলে আনতে। সেইটা পারা গেলে নেক্সট দুই পার্ট অনেক বড় কলেবর হবে, সেক্ষেত্রে পাঠকের সুবিধা ও অসুবিধা দুইই হয়। এখনকার অংশটা অনেক ছোট ভল্যুম নিচ্ছে, কম্পোজিটরের ধৈর্য এক আশ্চৰ্য জিনিশ এবং বিশেষভাবে রেকর্ডার শুনে একটাকিছু কম্পোজ করা আরও শক্ত কাজ।

তো, মধ্যবিরতিতে আমরা আপ্যায়িত হই সুলতানের সাহচর্যে এবং সুলতানের গদ্যের মতোই সুন্দর ও সরস সেই আপ্যায়নবিরতি। ফিরে এসে রেকর্ডার অন করে যখন কথা শুরু করি, দ্বিতীয় কোনো বিরতি ছাড়া টানা আড়াইঘণ্টা আমরা আলাপ চালিয়ে শেষ করি ইন্টার্ভিয়্যু। মধ্যবিরতির পরে এসে শুরুতে সুলতানের সাম্প্রতিক কিছু নয়া আঙ্গিকের কাজ নিয়া খানিক আলাপ হয়, ভাঙা ভাঙা আলাপ, উনি রিসেন্টলি ভ্রমণগল্পের বাইরেও প্রকরণগত অর্থে যেই জিনিশগুলারে আমরা শর্টস্টোরি বা ছোটগল্প বলি সেইগুলা লিখছেন এবং গোটা-পাঁচেক গল্প আমরা বাংলাদেশের কয়েকটা জাতীয় দৈনিকে সেই-সময় দেখেছি/পড়েছি। জিগ্যেশ করছিলেন উনিই আমাদেরে যে কেমন হচ্ছে লেখাগুলো এবং আরও বলছিলেন অনেক পাঠক নাকি ইমেইলে লেখককে জানাচ্ছিলেন যে লেখাগুলো বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদেরে সিলেটি শব্দের ব্যাপকতার কারণে। এইসব নিয়া আমরা খানিকটা বলি আমাদের অভিজ্ঞতা, সুলতান মনোযোগ দিয়া আমাদের পাঠপ্রতিক্রিয়া শোনেন এবং পরে আমরা গানের আলাপে যেতে অনুরোধ করলে ফের ছেড়ে-যাওয়া আলাপটা সুলতান আবার ধরেন। মাঝখানে গল্প-আঙ্গিক নিয়া আলাপটা আমরা রেকর্ডার থেকে লেখারূপে নেই নাই, নিশ্চয় একসময় জিনিশটা আলাদাভাবে অন্য কোনো উসিলায় গোছায়ে নেয়া যাবে।

এই আলাপের প্রথম পর্ব গানপারের কথাবার্তা বিভাগের আর্কাইভে দেখে নেয়া যাবে চাইলে। এইখানে পাঠকের সুবিধার কথা ভেবে আগের অংশের লিঙ্ক এগিয়ে দেয়া যাচ্ছে নিচে :

আত্মজৈবনিক আলাপচারিতায় মঈনুস সুলতান পর্ব ১

মঈনুস সুলতানের মুখোমুখি ছিলাম আমরা : আলফ্রেড আমিন, শোভন সরকার ও জাহেদ আহমদ। দোসরা আলাপের ভিতরে এইবার আসুন উঁকি দিয়ে দেখি, আত্মজৈবনিক আলাপচারিতায় মঈনুস সুলতান দ্বিতীয় পর্ব, নিচে :

Mainus Sultan-gaanpaar

আপনার ভ্রমণগল্পগ্রন্থগুলোর শুরু থেকে, সেই ‘মৃত সৈনিকের জুতোর নকশা’ থেকে শুরু করে, সর্বশেষ প্রকাশিত বইটা পর্যন্ত কমন একটা ব্যাপার দেখতে পাই যে আপনি বিভিন্ন জায়গায় যেয়ে সেখানকার কালচারাল হাবগুলো ঢুঁ মারছেন, ওখানকার গানের সাউন্ডটাউন্ড শুনতেছেন ইত্যাদি; এবং তারপর আবার যখন এই কন্টিনেন্টে আপনি ঢুকতেছেন, আফগানিস্তানে বা ক্যাম্বোডিয়ায় বা লাওসে বা ভিয়েতনামে, দেখি যে সেখানকার ট্র্যাডিশন্যাল পার্ফোর্মিং আর্টস বা ফোক ফর্মগুলো, ধরেন যে শের বা উর্দু গজলগুলো, বা অনেক ধরনের নাচটাচ এইগুলোর বর্ণনা আছে, খুব কালার এবং ফেস্টিভিটি ইত্যাদি নিয়া আছে দেখতে পাওয়া যায়; এখন, এই জায়গাগুলোতে গিয়া আপনার তো অনেককিছু সংগ্রহ করতে হয় লেখায় ব্যবহারের গরজে, একবার আপনি বলছিলেনও যে এই গজল/শের ইত্যাদি জিনিশগুলো কালেক্ট করতেছেন আপনি, কিন্তু ভ্রমণগল্পে তো সবকিছু একলগে এস্তেমাল করা যায় না নিশ্চয়? এই জিনিশগুলো নিয়া আলাদাভাবে প্ল্যান আছে? এবং আরেকটা জিনিশ জিগাই যে, ধরেন বাংলা গানশোনার অভিজ্ঞতা নিয়া আপনি নানা দেশে যাচ্ছেন, ইংরেজি গানশোনার অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই ছিল ধরে নিচ্ছি, হিন্দি-উর্দুও ধরছি, কিন্তু আফ্রিক্যান গানশোনার অভিজ্ঞতা তো ছিল না, বা ধরেন আপনি যখন লাওসে গেলেন, লাওসের গানশোনার তো অভিজ্ঞতা ছিল না আগে থেকে, এই ব্যাপারগুলো, যে-সাউন্ডগুলা আমরা আগে শুনি নাই, এইগুলা আপনি শুনতেছেন, উর্দু সাউন্ডটা আমরা শুনেছি আগে, আমরা পরিচিত একরকমের, ইংরেজি সাউন্ডটা শুনেছি, হিন্দি-উর্দুও পরিচিত, এইগুলা ছাড়া আর-সব সাউন্ড তো আমরা শুনি নাই, আপনার কান এইগুলা কিভাবে রিসিভ্ করল কিভাবে? একেবারে ফার্স্ট এনকাউন্টার, একদম শুরুর দিককার ইম্প্রেশন জানতে ইচ্ছে করছে।

ইটা, একটা ছোট্ট ঘটনা বলি, যখন খুবই ছোট ছিলাম, খুবই ছোট ছিলাম, যে-গানগুলো বারবার শুনতাম, নজরুলগীতির ব্যাপারটা ছিল, নজরুলগীতি শুনতে ভালো লাগত, গান অত বুঝতাম না যদিও, অনেক ছোট ছিলাম। নজরুলগীতি কানে লেগে থাকত, এইটা জানতাম। তারপর আরো কিছু কিছু পপুলার গান, “কাজল নদীজলে, পড়া ঢেউ ছলছলে, প্রদীপ ভাসাও তুমি কারে স্মরিয়া” … এটা শৈশবে শুনেছি। আমার যতটা বিশ্বাস আর-কি, আমি অনেক ছোট ছিলাম, পরে কাজলনদীটা দেখতে গেছিলাম, আমজুতির কাছে, মেহেরপুরের ওইদিকে, ওইখানে একটি নদীই আছে কাজল, এই নদীর সাথে এই গানের কোনো সম্পর্ক আছে কি না আমি জানি না, কিন্তু ঐ নদী দেখতে গেছিলাম পরে। তারপর ঐ গানগুলা শুনতাম, গীতা দত্তের গান। গীতা দত্তের গান ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনো কিন্তু খুব ছোট। তারপর ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’ … এই গানগুলা কিন্তু চেতনায় ছিল, পূর্ববাংলার গান যেগুলো হচ্ছিল, এখন অত মনে নাই। শাহনাজ বেগমের কথা মনে আছে।

পরে হয়েছেন শাহনাজ রহমতু্ল্লা …
হমতুল্লা অনেক পরে হয়েছেন। উনি ছোট ছিলেন তখন, মানে শিশুশিল্পী ছিলেন। উনি বোধহয় আমার বয়সীই বা এইরকম কাছাকাছি কিছু-একটা হবেন। বা একটু বেশিও হতে পারে। তো এই স্মতিগুলা আছে। তারপর আরেকদিনের ঘটনা, আমার চাইতে বয়সে বেশ বড় এক আত্মীয়, ‍আমাদের খালেদভাইয়ের বড়ভাই, হুমায়ুনভাই ডাকতাম আমরা, খালেদভাই এবং আমাদের আরেক কাজিন আছেন কামরুলভাই, উনারা বলতেছেন যে উনাদের রবীন্দ্রসংগীত ভালো লাগে না। আধুনিক গানগুলো ভালো লাগে — এই মন্তব্যটা করতেছেন, মৌলভীবাজারে ‘নাহার মঞ্জিল’ নামে একটা বাসা ছিল আমাদের আত্মীয়স্বজনদের, ঐখানকার বৈঠকখানায় বসে। তো হুমায়ুনভাই, খালেদভাইয়ের ইমিডিয়েট বড়ভাই, উনি বললেন যে, এক কাজ কোরো, যখন রবীন্দ্রসংগীত বাজাবে, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে, স্থির মস্তিষ্কে একবার শুনে দেখো। একবার একটু মনোযোগ দিয়ে ‍শুনে দেখো, তারপর তোমরা ছাড়তে পারবে না। ঐটাই তোমাদের ভালো লাগবে। তো তারপর কি কি জানি কথাবার্তা হলো, অতকিছু আর মনে নাই। কিন্তু আমি, এরা তো আমার চাইতে একটু সিনিয়র, ওরা আমার সাথে কথা বলতেছে না, আমি কথাগুলা ‍শুনতেছি। তো পরে রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত বাজল, আমি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, এই যে শোনা, আজ পর্যন্ত আর ছাড়তে পারি নাই। সে-তো অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি কতবড় ছিলাম, ধরেন সাত-আট বছর হতে পারে। নয়-দশও হতে পারে। ওইগুলো তো মনে নাই, অনেক ছোটবেলায় এই-যে রবীন্দ্রসংগীতের সাথে দেখা, তারপর তো শুরু হয় রাতের বেলা গানশোনা। ফুলবাড়িতে আমি যখন মামাবাড়িতে ছিলাম, রাতে একটা ব্যাপার হতো কি, নানি একা থাকতেন, বাড়িটা ছিল বিশাল, চারটা ঘর বোধহয় তখন ছিল আলাদা আলাদা, তো নানি এক কামরায় ঘুমাতেন, আমি ফটিকের দিকে, সেইসময় ড্রয়িংরুম জিনিশটাকে আমরা বলতাম ফটিক, তো ওইখানে একটা কামরায় ঘুমাতাম, তার একটা কারণ হচ্ছে আমি তখন সিগারেট খেতাম, গোল্ডেন কি যেন নাম ছিল, কালো রঙের একটা সিগারেট ছিল, আমি রাত্রে একটু ধুমপান করতাম আর-কি। নিভৃতে। তারপর পয়সাকড়ি একটু বেশি জুটলে হয়তো পাঁচশলা ক্যাপস্টেন সিগারেট নিয়ে আসলাম, তো রাত্রে খেতাম। তখন আবার রেডিওতে আকাশবাণীর গানগুলো শোনা যেত। এবং আমার পরিস্কার স্মৃতি আছে, ওইখানেই শুনেছিলাম, তালাত মাহমুদের গান হতো মাঝে মাঝে। তারপর আরো ভারতীয় শিল্পীদের, অনেকেরই তো, তারপর রবীন্দ্রসংগীতের পুরা আসরটাই আমরা শুনতাম। বেশ রাতের দিকে ওইটা হতো।

মানে, আমরা শুনতাম বলতে কি পারিবারিকভাবে সবাই রেডিও সামনে নিয়া গান শুনতেন?
না, আমি শুনতাম, ওই-যে আলাদাভাবে। তারপর ওই বাড়িতে অন্যান্য কাজিনরা আসলেন, একসাথে এক কামরায় দুইটা পালং বিছায়া আমরা ঘুমাচ্ছি, আনসারভাই বলে একজন ছিলেন, উনি হিন্দি গানগুলো শুনতেন, তারপর আরেকজন ছিলেন উনি সবসময় ঠিকঠাক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সময়টা জানতেন, কখন রবীন্দ্রনাথের গানগুলো বাজানো হবে, তো এই স্মৃতিগুলা আছে আর-কি। আরেকটা ব্যাপার কি, ক্লাসিক্যাল মিউজিকে, শোনার ক্ষেত্রে, এক্সপোজার খুব ছোটবেলা হয়েছে। বাড়িতে এইগুলা শুনেছি তো। রেকর্ডটেকর্ড বাজানো হতো, বড়ে গোলাম আলী খান ইত্যাদি।

কে বাজাতেন মূলত, এলপিগুলো?
রেই তো বাজতো। আব্বা শুনতেন, তারপর আত্মীয়স্বজনরা শুনতেন। তারপর ওই যে-গানগুলা পরে ওস্তাদ ফজলুল মৌলা … তেরি ইয়াদ পে … জুগন বনে ম্যায় তেরি ইয়াদ পে … এই গানগুলা খুব ছোটবেলা আমরা শুনেছি, সম্ভবত বড়ে গোলাম আলী খানের। তারপর তখন তো কলের গান, কলের গানের আরেকটা ব্যাপার ছিল, ফুলবাড়িতে আমাদের এক আত্মীয় ছিলেন, উনি আমাদের আরেক নানা, উনার বাড়িতে যেতাম, ওইখানে একটা কলের গান ছিল, কুকুরমাথাওয়ালা ছবি ছিল ওইখানে সাঁটা, আমরা কখনোই বুঝতে পারতাম না রিলেশনশিপটা, গানের সঙ্গে কুকুরমস্তকের ছবি দেবার কী অর্থ, ওইখানে একটা কুকুরের ছবি ছিল, ছোটবেলায় মানে খুঁজতাম মনে মনে কিন্তু বুঝতে পারি নাই, হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) ঘুরতেছে। এই স্মৃতিগুলা তো আছেই। তো তখনই কিন্তু, মানে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের প্রতি, ওই কানের ব্যাপারটা বোধহয় তৈরি হয়েছিল। আরো একটু পরে যখন কিশোর হলাম, পৃথ্বীমপাশার নওয়াববাড়ির নওয়াব আলী সবদর খান রাজাসাহেব উনিও তো শুনতেন ক্লাসিক্যাল মিউজিক। উনার ওইখানে বেড়াতে গেলে উনি বাজায়ে শোনাতেন। চুন্নু নওয়াব সাহেব শুনতেন, ওইখানে গেলেও শুনতে পেতাম বাজতেছে। … এখনও আমার পরিচিতদের মধ্যে এইখানে যেহীনভাই, যেহীন আহমেদ, এই জিনিশগুলা করেন, মানে মিউজিকে আগ্রহীদের কান তৈরি করার কাজটা এরা রেকর্ড বাজিয়ে অজান্তেই করে চলেছেন। যেহীনভাই যেগুলো করেন ওইটা কিন্তু একটা সিলসিলা। ওই সিলসিলাটা ছিল শ্রীহট্ট অঞ্চলের কিছু কিছু ফ্যামিলিতে, এই গানের ব্যাপারটা ছিল, ডেকে ডেকে রেকর্ড বাজিয়ে শোনানোর ব্যাপারটা ছিল। তখনকার দিনে এদের কাজকম্ম বলতে তেমন বিশেষ কিছুই ছিল না। এইটাও একটা বড় ব্যাপার। … (হাসি) … তারপর, মজার একটা কাহিনি বলি শোনেন। গল্প শুনেছি যে সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেব নাকি এই গল্পের সঙ্গে জড়িত। উনি কোথা থেকে যেন, গোয়ালিয়র থেকে ফিরেছেন সম্ভবত, তো বেড়াতে এসছেন আমাদের ওখানে, সবাই তাকে ওস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের রেকর্ড বাজিয়ে শোনাচ্ছেন, মুজতবা আলী ওস্তাদ ফৈয়াজ খানের গান শুনলেন, তারপর নাকি বললেন যে ফৈয়াজ খানজির সাথে তো দেখা হয়েছে … মুজতবা আলী তো এইভাবেই কথাবার্তা বলতেন, তো এইগুলা গল্প শুনেছি, আমি দেখি তো নাই। এই গল্পগুলা শুনেছি আমাদের সুলতানপুররের এক চাচা ছিলেন, উনার নামও তো মনে পড়তেছে না, নিশ্চয় নামের শেষে চৌধুরী ছিল, সুলতানপুরের এই চাচা অত্যন্ত জ্ঞানীগুণী লোক ছিলেন, নক্ষত্রের গতিপথ জানতেন, তারপর ভূগোল সম্পর্কে প্রচুর ধারণা ছিল, পুরাতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা ছিল, শেষদিকে আমার যুগে গালগল্প করেই কাটাতেন। তো উনার কাছ থেকেও আমরা কিছু কিছু গান শুনেছি। উনার ওইখানে যেতাম, ম্যাচবক্স কালেক্ট করতে; মানে, উনি কলের গান বাজায়ে অনবরত সিগারেট খেতেন। অনবরত। আর প্রচুর ম্যাচ জমে যেত, আমি ওই ম্যাচ কালেক্ট করে রেলগাড়ি বানাতাম, সেই যুগ থেকে শুনতেছি এবং উনার ওই-যে মীরাবাঈয়ের গান, তারপর কমলা ঝরিয়ার গান, ওগুলা ক্লাসিক্যাল না হলেও তো ক্লাসিক্যালের মতোই, …

কমলা ঝরিয়া তো নজরুলসংগীতও করতেন …
রাইট, তো এইগুলার সাথে একটা পরিচয়, তারপর কানা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম তো শুনতাম। এরা কিন্তু খুব-দূরের মানুষ ছিলেন না একেবারে …

মান্না দের চাচা মনে হয় কানাকৃষ্ণ …
রাইট, আর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তো সিস্টেম্যাটিক্যালি ওই-যে শুদ্ধ সংগীতগোষ্ঠীর আসরে যাওয়া ইত্যাদি … তখন থেকে তো সচেতনভাবে এইগুলার প্রতি আকর্ষণ জন্মেছে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর কথাটা বললেন। আপনি কি মিট করেছেন কখনো সৈয়দ মুজতবা আলীকে? করার তো কথা।
ইরকমভাবে দেখাসাক্ষাৎ হয় নাই। অনেক গল্প শুনেছি পরিবারে। তারপর আমার নামের ব্যাপারে উনার অবদান আছে, এইটা গল্প শুনেছি, সত্যমিথ্যা তো বলা মুশকিল।

যেমন? কেমন ব্যাপারটা? আপনার একটা নাম তো কায়সুল?
ইটা ডাকনাম। জন্মের পর নাম, নামের ব্যাপার নিয়ে কথাবার্তা চলতেছিল, তখন মামার সাথে মুজতবা আলীর দেখাসাক্ষাৎ হয়, তো মুজতবা আলী বললেন যে, এতই যখন গুরুত্বপূর্ণ একজনের জন্ম হয়েছে, এর নাম মঈনুস সুলতান রাখতে হয় (হেসে)। এইধরনের কি-একটা হাসিঠাট্টার ব্যাপার আমি শুনেছি। এইভাবেই হয়েছে আর-কি। উনি আসছিলেন আমি যখন ঢাকাতে, উনি ঢাকাতে আসলেন, ঢাকা বেতার উনার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, সম্ভবত শহীদ কাদরী সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন, আমি সাক্ষাৎকার দেখি নাই। তখন উনার সাথে দেখা হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি। উনি বিচিত্রাতে একটা না দুইটা কলামও লিখছিলেন, ওই আফগানিস্তানের জহির শাহের সরকারকে উৎখাত করে, কে এল তখন ক্ষমতায় — বোধহয় দাউদ খান এল, — তখন বোধহয় বিচিত্রার লোকজন উনাকে বলছিল, লিখে দেওয়ার জন্য, তো উনি দুই পৃষ্ঠার  একটা কলাম বোধহয় লিখেছিলেন, এই স্মৃতিটা আছে।

রেডিও-ইন্টার্ভিয়্যুটা আপনি বলতেছেন সম্ভবত শহীদ কাদরী নিয়েছেন?
রেডিও না, টেলিভিশন-ইন্টার্ভিয়্যু। সম্ভবত কারণ আমি নিজে গিয়ে দেখি নাই, আমি শুনেছি। বিটিভি তখন তৈরি হয়ে গেছে, ওইখানে উনাকে ইন্টার্ভিয়্যু করছিল। এইটা আমাদের পরিবারে অনেক আলোচিত হয়েছে যে, শহীদ কাদরী একটার পর একটা ইন্টেলেকচুয়ালি চার্জড  প্রশ্ন করে ফেলছেন মুজতবা আলীকে, আর সৈয়দ মুজতবা আলী বললেন যে — “দেখো, লোকজন লারেলাপ্পা গান শুনবে, এইসব না করলে হয় না? অনেকক্ষণ ধরে তুমি প্রশ্ন করতেছ।” এইটা আমি শুনেছি, লোকমুখে শুনেছি। আমি ট্রান্সক্রিপ্ট পড়ি নাই। আচ্ছা, সুলতানপুরের চাচার কাছ থেকে শুনেছি, মুজতবা আলী সাহেব আমাদের এলাকাতে এসেছেন, তো আমাদের এলাকাতে আসলে অন্যত্র যাওয়ার উনার কোনো অবকাশ নাই। যে-ই আসত, যিনিই আসতেন আমাদের এলাকায়, উনিই আমাদের বৈঠকখানাতে আসতেন আর-কি। বৈঠকখানা ছিল, অতিথিরা আসলে ওইখানে কামরা ছিল, বৈঠকখানা লাগোয়া বাথরুম ছিল, তো আমরা আপ্যায়ন করতাম। উনি যাবেনই-বা কোথায়। তো অনুমান করা যায়, উনি ওইখানে বসে গালগল্প করেছেন, উনি তো — সৈয়দ মুজতবা সাহেব, খুব আড্ডাবাজ মানুষ।  সুলতানপুরের চাচার নাম এখন মনে পড়তেসে, ফয়েজ আহমদ চৌধুরী সাহেব, উনার কাছেই শুনেছি সৈয়দ মুজতবা আলী ফৈয়াজ খানের গান শুনে তারপর আবার বাগাড়ম্বর করলেন ফৈয়াজ খান সাহেবের সাথে উনার মোলাকাত হয়েছে গোয়ালিওরে। এই কাহিনিগুলা শুনেছি। তো এইগুলা তো পরে বই পড়ে জানলাম, আসলেই উনার, মুজতবা আলী যখন গোয়ালিওরে চাকরি করতেন, মহারাজার, ফৈয়াজ খানও এইখানে চাকরি করতেন। তো দেখা হওয়াটা অসম্ভব কিছু না। দেখা তো অবশ্যই হয়েছে।

(চলবে)

গানপার

COMMENTS

error: