কমলগঞ্জের রাসমেলা

কমলগঞ্জের রাসমেলা

SHARE:

বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকৃত্যগুলোর মধ্যে এসে যুক্ত হয়েছে দেশান্তরের কতশত অনুষঙ্গ, যুগ যুগ ধরে সেসব অনুষঙ্গ ঘনিষ্ঠ আপন করে নিয়েছে বাংলা তার নিজের শরীরে এবং আত্মায়। মেশামেশির এই প্রক্রিয়া কোনোটা সম্পন্ন হয়েছে শত বছর ধরে, কোনোটা-বা হাজার বছর। এমনই একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকৃত্যের নাম রাসলীলা। বাংলাদেশের মণিপুরী জনগোষ্ঠীর বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে এইটা অনন্য বৈশিষ্ট্যবহ।

মণিপুরী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের আবাসভূমি বৃহত্তর সিলেট বিভাগের জেলাগুলোতে ছাড়ানো। বছরের বিভিন্ন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর আচরিত উৎসব-বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানগুলো সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ উপভোগ করে আসছে এবং কালক্রমে এর বর্ণবিভা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়টিতে যোগ করেছে নয়া পালক। দুর্গাপূজায় মণিপুরী উৎসবমুখরতা ছাড়াও অন্তত দুইটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুধু মণিপুরী ঋদ্ধ সংস্কৃতির আবিরে উজ্জ্বল করেছে এই ভূখণ্ডের উৎসব-উন্মীলনের তৎপরতাগুলোকে, এদের মধ্যে একটা হচ্ছে ঝুলন-উৎসব এবং অন্যটা রাস-উৎসব।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় রাসের সবচেয়ে বড় উৎসবটা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর বাইরেও বৃহত্তর সিলেটের যেখানেই মণিপুরী নিবাস সেখানে রাসলীলার উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতা নজরে পড়ে। একই কথা খাটে ঝুলনের ক্ষেত্রেও। উৎসবের রঙ এবং ধর্মীয় ভাবগম্ভীরতা পাশাপাশি গেলে কেমন ম্যাজিক সংঘটিত হয় এর একটা নজির এই ঝুলন ও রাসলীলা।

রাসের উৎসব হয় কার্তিক মাসের শেষদিকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৌলভীবাজারস্থ কমলগঞ্জের রাসলীলায় মানুষজন এসে শামিল হন। শুধু দেশেরই সংস্কৃতিসন্ধানী লোকজন নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ার মণিপুর রাজ্য থেকেও মণিপুরী সম্প্রদায়ের মানুষজন সমবেত হন কমলগঞ্জের উৎসবে। এখানে যেমন লেখক-সংস্কৃতিকর্মী-গুণীজন জড়ো হন, সঙ্গে সাধারণ দর্শকজনতা, সনাতনধর্মীয় মানুষদেরও উল্লেখযোগ্য সমাবেশ ঘটে এই উৎসব চলাকালে। দেশের এবং বিদেশের কৃষ্ণভক্ত সর্বসাধারণ তাদের মান্নত নিয়া হাজির হন শ্রীকৃষ্ণের এই বৃহৎ লীলায়। রাসলীলা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা ইভেন্ট এই উৎসবটাকে তাৎপর্যগভীর করে তোলে এই সময়টায়, সেই ইভেন্টের নাম রাখীলীলা। মান্নত পুরা হবে কৃষ্ণের কৃপায়, এমন সরল ও শক্তপোক্ত বিশ্বাস নিয়াই ধর্মমগ্ন লোকজন রাসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অন্যরা আসেন দেখতে এবং সংহতি দেখাতেও।

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের শিববাজার নামে একটা জায়গা আছে, সেইখানেই উৎসবের মূল অধিষ্ঠান। উৎসবকালীন সাজ-সাজ সাড়া পড়ে যায় আস্ত তল্লাট জুড়ে। এই শিববাজারেরই দুই-তিন ফার্লং দূরে দূরে পরপর স্থাপিত তিন-তিনটা মণ্ডপ। রাসলীলায় এই তিনটা মণ্ডপেরই সিগ্নিফিক্যান্স রয়েছে। এই তিন মণ্ডপ মিলেই রাসোৎসবের মিলনক্ষেত্র। মহামিলনের জয়োৎসব।

ক্রমে এই উৎসবটা বাংলাদেশের ব্যাপক মানুষের আগ্রহ-উদ্দীপনার একটা আকর্ষণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রাসের সময় যে মেলাটা আয়োজিত হয়, সেইটাকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পী এবং গ্রামীণ বণিকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাসের অন্ত থাকে না। রাসের উৎসব কমিটি ও মেলা কমিটির গণনা গ্রাহ্যিতে নিলে বলা যায় এই মিলনোৎসবে জনসমাগম কুড়ি-তিরিশ হাজার ছাড়িয়ে যায় প্রত্যেকবার।

কার্তিক মাসের অনেক আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় উৎসবে যোগদানেচ্ছু দলের বিবিধ প্রস্তুতির। রাসলীলায় অংশ নিতে যেসব নৃত্যদল নথিভুক্ত করে নিজেদেরে তারা ছাড়াও অন্যান্য নৃত্য-গীতের দলগুলোর মঞ্চপ্রযোজনা নিয়া তালিমের ধুম পড়ে যায়। এমনকি গৃহশিক্ষক রেখে রেওয়াজের প্রচলনও অনেক পুরনো। উৎসব সামনে রেখেই এতসব প্রস্তুতি।

রাসের উৎসবের চূড়ান্ত দিনে দূরদুরান্ত থেকে আগত ভক্ত-পুণ্যকামীরা শিবমন্দিরের বারান্দায় আশ্রয় নেন গাট্টিবোঁচকা আর লটবহর সমেত। পূজারীদের বিশ্বাস, মনস্কাম নিয়া মাধবেশ্বর শিবের পায়ে পূজা দিলে দেবতার খাঁটি কৃপা লাভ করা যায়। এইখানে ব্যক্ত মনোবাসনা শিবের কাছে সরাসরি পৌঁছায় এবং শিব তার ভক্তকুলের মনোবাঞ্ছা আধুরা রাখেন না। আগে এখানে যে-শিবমূর্তিটি ছিল তা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার অভাবে আশঙ্কার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে মন্দিরের হাল ফিরেছে এবং বড় ও সুরক্ষিত মন্দিরের বেদিতে শিবের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। এখন মন্দিরভবন পাকাঘরে পরিণত হয়েছে, এক-সময় ছিল কাঁচাঘরের মন্দির। বর্তমানে এখানকার শালগ্রামশিলাটা পাথরের তৈরি, আগে ছিল মাটির মূর্তি, এবং অত্যন্ত নয়নভোলানো নান্দনিক।

জনশ্রুতি অনুসারে এই কথাটা আমরা আমলে নিতে পারি যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে এই শিববাজারের জোড়মণ্ডপে মণিপুরী রাসলীলা আয়োজিত ও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এইটাও আমরা জেনে রাখতে পারি যে বৃন্দাবনে যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লীলা করতেন শ্রীরাধা আর তার নিত্যসাধনসিদ্ধা ব্রজগোপীদের সমভিব্যহারে, সেই-সময় একবার স্বয়ং উমাদেবী ও শিবঠাকুর রাসমণ্ডপের সেবা গ্রহণ করেছিলেন। কথিত আছে যে উমা নিজেই পরে রাসলীলা আয়োজনের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন এবং তার রাসের জন্য উপযুক্ত স্থান হিশেবে মণিপুর ভূখণ্ডটিকে নির্ধারণ করেছিলেন।

মণিপুরীরা কাজেই দুর্গাপূজা ইত্যাদি উৎসবের চেয়েও মহাসমারোহে রাসলীলাটাকে উদযাপন সংগত কারণেই। এবং তারা দুনিয়ার যেখানেই গিয়েছেন রাসলীলা ও ঝুলন সঙ্গে নিয়েছেন। এইভাবে এক-পর্যায়ে এসেছে বাংলাদেশেও। তবে কমলগঞ্জে এই উৎসবের পত্তনি কীভাবে হলো? জবাবে জানা যায়, একদিন জোড়মণ্ডপের এক ব্রাহ্মণ নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হন যে এই জঙ্গলাকীর্ণ পরিসরের শান্তিশ্রী অঞ্চলে রাসলীলা আয়োজন করতে। সেই থেকেই শুরু। প্রথম রাসধারী ছিলেন বকলাল সিংহ, তথ্যটাও জেনে নেয়া গেল প্রয়াত লোকগবেষক মো. সাইদুর প্রণীত একটা নিবন্ধ থেকে।

লেখা : সুবিনয় ইসলাম

সহায়ক তথ্যসূত্র /
* ধানশালিকের দেশ, বর্ষ ২৫ সংখ্যা ২, এপ্রিল-জুন ১৯৯৭, বাংলা অ্যাকাডেমি, ঢাকা
* আনন্দভুবন, বর্ষ ২ সংখ্যা ২২, এপ্রিল ১৯৯৮, বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেড, ঢাকা
* বিভিন্ন লোককথা ও জনশ্রুতি

… …

COMMENTS

error: