গ্রন্থবন্ধন, বস্তনি, রেহেল, খৎবর প্রভৃতি

গ্রন্থবন্ধন, বস্তনি, রেহেল, খৎবর প্রভৃতি

SHARE:

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতে ছোটদের যে বিখ্যাত পত্রিকার জন্ম এবং সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায়ের হাতে বড় হয়ে ওঠা, সেই সন্দেশ  পত্রিকা ২০১৩-তে এসে পা দিয়েছে একশ বছরে। এই খবর পড়ে ভেসে উঠল কিছু পত্রিকার বাঁধানো রূপ, ছোটবেলা বাঁধানো পত্রিকাপুঞ্জ সংগ্রহ অনেক দেখেছি, আমাদেরও ছিল কয়েকটা এমন। উল্লেখযোগ্য : ‘সচিত্র সন্ধানী’, ‘উল্টারথ’ ইত্যাদি এবং ‘সন্দেশ’। ওইকালে বই বাঁধাই করানো কর্তব্যের মধ্যেই পড়ত, প্রতিবছরের প্রিয় সাময়িকপত্রিকাগুলারে একমলাট করাটাও সেইসঙ্গে, বছরশেষে এটা গ্রন্থসংগ্রাহক প্রতিটি বাড়িতেই করা হতো। কোরানশরিফ-অজিফা বাইন্ডিং করার পরে একদম নতুনের মতো দেখাত, যদিও ওই কোরানশরিফ কি অজিফা হয়তো প্রপিতামহের আমলের। অবাক হয়ে যেতাম। খুব শিল্পসৌকর্যপূর্ণ মনে হতো। ওই ব্যাপারটাকে আমরা বলতাম ‘জিল করানো’, কোরান-অজিফা জিল করানো, শব্দটাই আজকাল শুনি না আর।

শুনি না আরো অনেক শব্দই, ব্যবহারও ক্রমে বিরল হয়ে এসেছে সেসবের, শুধু শব্দেরই নয় উপরন্তু ওইসব শব্দনামচিহ্নিত বস্তুসামগ্রীর উপযোগ অধুনা প্রায় বিলুপ্ত বলা চলে। যেমন বস্তনি শব্দটা। মানে কি এই শব্দের — নতুন দিনের অরুণবরুণকিরণদ্যুতিকীর্ণ সন্তানসন্ততি জানে না বিলকুল। কোরানশরিফ সযত্নে হেফাজত করার জন্য বস্ত্রনির্মিত বিশেষ ধরনের বইঢাকনি বা বইপোশাক ছিল, প্রধানত কোরানশরিফেই বস্তনি পরিয়ে রাখা হতো। অন্যান্য বই যত্নে রাখার অন্য উপায়/প্রক্রিয়া আলাদাভাবেই ছিল, সবচেয়ে কমন উপায় ছিল বই কিনে এনে ক্যালেন্ডার ইত্যাদির পাতা কেটে মলাট লাগিয়ে রাখা। রাশান ম্যাগাজিন ছিল, রঙিন সুশ্রী ও সচিত্র, ওইগুলা বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হয়েছে কেবল বইয়ের আলগা মলাট লাগাবার কাজে। এবং নব্বইয়ের দশক মধ্যভাগ পর্যন্ত রুশি চিত্রখচিত শক্ত কাগজের পত্রিকাগুলা রাস্তাঘাটে বিককিরিও হতো দেদার। কেউ কোনোদিন ওইসব পত্রিকা পড়েছে বলে মনে হয় না। পার্টিপিপলদেরেও কোনোদিন পড়তে দেখেছি বলে মনে হয় না।

আমাদের বাড়িতে এখনও কোরানশরিফ বস্তনি দিয়েই আবৃত করে রাখা হয়। আদবের সঙ্গে। একসময় দেখেছি প্রতিবছর বস্তনি পাল্টানো হতো, অথবা নিয়মিত ধোয়া হতো বস্তনি খুলে এবং রোদে শুকিয়ে ফের কোরানশরিফে পরিয়ে রাখা হতো। সচরাচর বস্তনির রঙ, মানে বস্তনির কাপড়ের রঙ, আসমানি কি ফিকে-গোলাপি হতো, শাদা দ্রুত ময়লা হয়ে যেত বলে কম প্রেফার করা হতো। কোরানশরিফ সযত্ন তুলিয়া রাখার একটা আবশ্যিক আদব হিশেবে গণ্য হতো বস্তনি জিনিশটা।

কোরানশরিফ ঘরে রাখার আদব যেমন বস্তনি, ঠিক তেমনি রোজ কোরানতেলাওয়াতকালীন আদবের সঙ্গে যুক্ত অতি-আবশ্যক বস্তুটির নাম রেহেল। কাঠের জিনিশ। মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখার জন্য ছিল যেমন শামাদান বা বাতিদান, তেমনি রেহেল হলো গ্রন্থদান/কিতাবদান। রেলিঙের মতো দুইভাগে বিভক্ত, কোরানশরিফ তেলাওয়াতের সময় রেহেলে রেখে পড়া হতো, তেলাওয়াত শেষে রেহেল মুড়ে রাখা হতো বস্তনি-আবৃত কোরানশরিফেরই নিচে। রেহেল অনেকটা দরোজার মতোই খোলা ও ভেজানো যেত, অথবা অনেকটা ফোল্ডিং-ইজিচেয়ারের মতো, ফোল্ড করা যেত। প্রস্থে দশ ইঞ্চি, দৈর্ঘে বারো ইঞ্চি বড়জোর। আজকাল তো চেয়ারে বসে টেবিলে কোরান রেখে তেলাওয়াত করা হয়, এতে অবশ্য কোনো কসুর হয় না, রেহেল বা বস্তনি ইত্যাদি বিধিবদ্ধ কোনো অবশ্যমান্য আদব নয়।

তেমনি কোরান-অজিফা পাঠকালে আদবের আরেকটা অনুষঙ্গ ছিল খৎবর। রঙিন রাঙতাকাগজ কেটে বানানো বইচিহ্নক, বুকমার্কার/পেজমার্কার, ত্রিভূজাকৃতিক। কোরানশরিফ তেলাওয়াত ছাড়াও খৎবর অন্যান্য বইয়ের ভেতর গুঁজে রাখতাম আমরা। পাতাকোণ মুড়িয়ে রাখলে অবধারিত ছিল গঞ্জনা। আর খৎবর সংগ্রহ করে রাখতাম একটা-একটা করে, একসময় মুঠোভরা খৎবর বের করে বোনের চোখের সামনে ছড়িয়ে রেখে ঝকঝকে মাস্তানি দেখাতাম। কত বিচিত্র রঙের খৎবর! এই খৎবরসঞ্চয়িতায় অনাকাজ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের ঘটনা কেন্দ্র করে ভাইবোন-মধ্যকার বিরোধ প্রায়শ সংঘর্ষে রূপ নিত, সেইসব সংঘর্ষের ঘটনা উপজীব্য করে একটা ঢাউস জঙ্গনামা ফাঁদা সম্ভব। পাঠক পাবো না বলেই বিরত রইছি।

যা-হোক, কথায় কথায় বেইল ভাটি নিয়া নিলো। কথার মুখে এখন কুলুপ আঁটা দরকার। শুরুতে ফিরছি আপাতত, শেষ করারই জন্য। শতবর্ষে এই পত্রিকার চেহারা কেমন হয়েছে — সেই আমাদের স্বর্ণদিনের হৃদয়রোচক কল্পনাপ্রাচুর্যঋদ্ধ সন্দেশের — দেখতে পারলে বেশ হতো। ছোটবেলাটা রোমন্থন করা যেত। সম্ভবত ‘সন্দেশ’ বাংলাদেশে আসে না আজ আর, আমাদের অবশ্য অন্যান্য কোম্প্যানির সন্দেশ-রসকদম্ব রয়েছে এবং সেসবও কম মুখরোচক নয়। এখন কথা হলো, শৈশবের সন্দেশ  প্রৌঢ়বেলায় এসে এমন খোঁজাখুঁজি কেন, বটে, লা-জোয়াব প্রশ্ন। ও আচ্ছা, আম্মার ‘বেগম পত্রিকা’ বাঁধাই করানোর গল্পটা তো করা হয় নাই। বারান্তরে। শুভ শতবর্ষ, সন্দেশ!

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

COMMENTS

error: