মুখস্থ মুজরো ১

মুখস্থ মুজরো ১

আমার শিরায় শিরায় রক্তের ধ্বনি
শরীর-আধারে মা জননী
আমায় জন্ম দেয়ার ব্যথা না-পাইলে
তোমার জন্মশব্দ পাবো না

যদি আকাশের গায়ে কান না-পাতি
তোমার কথা শুনতে পাবো না
যদি বাতাসকে আমি ছুঁয়ে না দেখি
তোমার শরীরস্পর্শ পাবো না

যদি ভিজে মাটির গন্ধ তোমার
গল্পকথা শুনাতে চায়
আমি মাটির তলায় ঘর না-বাঁধিলে
তোমার জঠরশব্দ পাবো না

যদি আকাশের গায়ে কান না-পাতি
তোমার কথা শুনতে পাবো না
_______________________________
বোধাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের গীতিকথায় অর্ক মুখোপাধ্যায়

কথাগুলো তখন পর্যন্ত ছিল একটা গানের লিরিকের পঙক্তি মাত্র। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। রোম্যান্টিক একটা জায়গা থেকে দেখতাম গানে-কবিতায় হাজির এই কিসিমের সিচ্যুয়েশনগুলো। বছরখানেকের মধ্যেই জিনিশগুলা আমার জন্য বদলে গেল। ওই সিনেমায় ফার্স্ট শোনা গানটার এই কথাগুলো। শুধুই কিছু পঙক্তির স্ফূর্তিনির্জীব গান মাত্র নয়, এই কথাগুলা, আরও এমন অনেক গানের অনেক কিছুর, চিরতরে চেইঞ্জ হয়ে মেটামর্ফোসাইজড একটা মানে নিয়া আমার অভিজ্ঞতায় আসে। এমন হয়। আমার মতো অনেকেরই হয়। বেঁচে থাকলে চেইঞ্জগুলা আস্বাদ করতে হয়। বিষাদের মতো ভালো ও বদখত কিছুই তো হতে পারে না। কান্নার মতো করুণ ও কমনীয়। সৃজিত মুখার্জির ‘নির্বাক’ ম্যুভিটা দেখেছিলাম ২০১৫ সনের ডিসেম্বরে। দেখার পরে এই গানটা বারবার প্লে করে, প্যজ দিয়ে দিয়ে, রেখেছিলাম লিখে এইখানে। এইটা নিয়া বাদে একদিন ইনিয়েবিনিয়ে লিখব একটাকিছু, এমন একটা ধান্দা ছিল। পরে, ২০১৭-র এক আকস্মিক রাত্রে, মে মাসের বরষামেদুর এক সন্ধ্যারাতে, এমন অভিজ্ঞতা হলো যে এ নিয়া আর লেখা যাবে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, কারো পক্ষেই সম্ভব হয় না। যা হয়, তা হচ্ছে প্রকাশের ছলে একটা আড়াল নেয়া। সাহিত্য অনেকটা তা-ই, যত-না প্রকাশ তারচেয়ে বেশি চুপানো, প্রচ্ছন্ন রাখা প্রাণপণ। তাতে সিগ্ন্যালগুলা ট্র্যান্সমিশনের রেইঞ্জ বাড়ে। নাইলে যা হয় তা সাংবাদিকতা। সাহিত্যে এই জিনিশটাই হয় বেশি, কিন্তু সাহিত্যকরিয়েরা তা সবসময় ফাইন্ডাউট করতে পারে বলে মনে হয় না। সাংবাদিকতা বাংলাদেশে এখন তার আপন ক্ষেত্রে খুবই বিপন্ন অবস্থায় আছে, কিন্তু সাহিত্যক্ষেত্রে কেবল সাংবাদিকতাই হচ্ছে। সবকিছুই ক্লিয়ার সাক্ষীপ্রমাণ-সইসাবুদ সহ ফকফকা। মানিকের বাত্তি। বিজ্ঞাপনী ফিলিপ্স। মাছের রাজা ইলিশ, বাত্তির রাজা ফিলিপ্স, আর সাহিত্যের রাজা সাংবাদিকতা। রাজা কন্ডম বেচা হতো আগে গ্রামের মুদিদোকানগুলায় লাঙ্গার ধরে ঝুলিয়ে। সেই তখনটায় আমাদের বাপচাচারা তা ব্যবহার করতেন বলে মনে হয় না, আমাদেরে কিনে দিতেন। আমরা বেলুন বলতাম। ফুলায়া ফাটাইতাম। আগে জানলে এইটা সাংবাদিকতাসাহিত্য নিয়ন্ত্রণে এস্তেমাল করে দেখতাম, অবস্থা আজকের চেয়ে একটু সহনীয় হতো মনে হয়। অ্যানিওয়ে। এই গানটা, এই ধরনের আরও অনেক লোকগান আমাদের এলাকার, আম্মা বারণ করতেন যেই গানগুলা গাইতে, এতিম হয়ে যাব বলে ভয় দেখাইতেন, কিন্তু নিজে গাইতেন, কেননা উনার মা উনারে ক্লাস থ্রিতে রেখে ইন্তেকাল করেন, এই গল্পগুলা আর কি করা হবে? লেখা তো দরকার যে আম্মা গানের বাণী বিশ্বাস করতেন, বহু উদাহরণ তুলতে পারব এখন এই বয়সে এসে সেই রিয়্যাললাইফ মেমোরি থেকে, আমাদের আম্মা-চাচিআম্মারা গানের কথা অক্ষরে-অক্ষরে বিশ্বাস করতেন। আমরা গানটারে স্রেফ ফান হিশেবে দেখি। নিছক আইটেম। সাহিত্যআইটেম বড়জোর। আম্মারা আমাদেরে এইজন্যেই শীতের সকালে ইশকুলে পাঠাইবার আগে গোসল করাইবার সময় নিজেরা হিহি শীতপানিতে ভিজতে ভিজতে কাঁপতেন। এখন আর কাঁপাকাঁপি নাই। এতিম হবার চান্স নাই। ভয় দেখাইবারও কেউ নাই। কিছু গানবাজনা গাইবার বেলায় যে নিষেধাজ্ঞাটা ছিল, যেমন মাকসুদের বাউলিয়ানায় গাওয়া ‘জনমদুখী কপালপোড়া গুরু আমি একজনা’ বা প্রিন্স মাহমুদের কথায় এবং সুরে জেমসের গাওয়া ‘মা’ আর ‘বাবা’ ইত্যাদি বা আরও অনেক এমন, বর্তমানে সেই নিষেধাজ্ঞা নাই। কিন্তু গাইতে কি পারি? তখন গাইতাম, গুনগুনাইতাম, আম্মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে। এখন, দেখেছি চেষ্টা করে, সম্ভব হয় না। সাধ্যাতীত ভালোবাসা আটকায়ে দেয় গলা।

  • হিরণ মিত্র চিত্রকর্ম প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়েছে। লেখা : জাহেদ আহমদ


ভূমিকার পরিবর্তে একটা পাদটীকার ন্যায় ভাষ্য যুক্ত করিয়া রাখতে চাইছি নিবন্ধপ্রবাহ ‘মুখস্থ মুজরো’ প্রত্যেকটা পার্টের সঙ্গে। বেঁটেখাটো কৈফিয়ত গোছের একটা ভাষ্য। পুনরাবৃত্তাকারে এইটা অ্যাটাচ করা থাকবে এর এপিসোড প্রত্যেকটার লগে। এই নিবন্ধপ্রবাহ সংগীতবিষয়ক কোনো কড়া আলোচনা নয়। আদৌ সংগীতগদ্য নয় এই রচনা। নামের মধ্যে একটা নাচাগানাবাজানার আভাস থাকলেও মোদ্দায় এইটা গালগপ্পো। অনুষঙ্গ-উপানুষঙ্গ-অনুপান হিশেবে এইখানে শ্রবণাভিজ্ঞতাগুলা আসবে এবং চলেও যাবে। সে-অর্থে এইখানে রেফ্রেন্সের খোঁজপাত্তা খামাখা। আদতে এইখানে রেফ্রেন্সেস নাই বিধায় রেফ্রেন্স চেকের পরিশ্রম করতে যাওয়াটাই বৃথা। ধারাবাহিক মুক্তগদ্য ধাঁচের রচনা, ব্যক্তিগতিকতায় ভরা বা আবোলতাবোল, আবার অতটা ধারাফারা মান্য করবার বাঁধিধরা নাই কিছু। অনিয়মিত, সবিরত, কখনও সময়ে-সুযোগে একনাগাড় নিয়মিতও হতে পারে। একেকটা পার্টে একটামাত্র অনুচ্ছেদ, পরিকল্পনা আপাতত অতটুকুই। মিউজিক-লতানো গল্পগুলা, গান গাইবার বা গানের সমুজদারিতার গল্পও নয়, গানশোনার আবছা আলাপচারি। স্মৃতিরই রোমন্থন, মুখস্থ মুজরো, সুরাশ্রিত অটোবায়োগ্র্যাফিকতা। — জা.আ.

… …

মুখস্থ মুজরো ২

জাহেদ আহমদ
Latest posts by জাহেদ আহমদ (see all)

COMMENTS

error: