আরেকটা গান ও বব ডিলান

আরেকটা গান ও বব ডিলান

SHARE:

সম্ভবত দুইহাজারসাতের সিনেমা ‘আই অ্যাইন্ট দ্যেয়ার’ দেখতে যেয়ে এই গানটা কানে এসেছিল, যদিও এইটা ঊনিশশোপঁচাত্তরে লেখা গান, প্রকাশ পায় ‘ডিজায়ার’ অ্যালবামে যেইটা রিলিজড ইন ছিয়াত্তর। সিনেমাটা দেখতে দেখতে দেরি হয়ে যায়, রিলিজের অনেক বছর পরে দেখা, যেখানে কেবল এই একটাই নয় আরও অনেক গান অচেনায়-চেনায় ডিলানের অরিজিন্যাল স্টুডিয়োরেকর্ড অ্যালবামগুলো থেকে আমার মতো অল্পপ্রাণ শ্রোতার কানে এসে পশেছে। এখন তো দুনিয়ায় কাভার-ভার্শনের ঠ্যালায় আসলের নাগাল পাওয়া ভার। অ্যানিওয়ে। সেই থেকেই লিরিকটা তার ফরাশি সৌরভের সুরসমেত রয়ে যায় স্মৃতিতে এবং বিশেষত “ওয়ান মৌর কাপ অফ কফি ফর দ্য রোড / ওয়ান মৌর কাপ অফ কফি বিফোর আই গ্য / টু দ্য ভ্যেলি বিলো” সূচনালাইনগুলো।

সুর শুনে এই আনপড় কানেও মনে হয়েছিল এইটা বোধহয় ফ্রেঞ্চ সাউন্ডস্কেইপ থেকে ধৃত। তর্জমার ট্রাই করতে যেয়ে ফ্যাক্টশিট সার্চ করে দেখা গেল অনুমান অমূলক নয়। জানা গেল, গ্যুগল্ করেই জানা গেল, চৌত্রিশ বছর বয়সে একবার ফ্রান্সভ্রমণে গেসিলেন বব ডিলান। সফরকালে একটা সার্কাস দেখতে যেয়ে ববি ভীষণ আলোড়িত হন ভবঘুরে-বেদে জিন্দেগির একটা ন্যাচারাল নজিরের সাক্ষাতে। সেইখানেই তিনি লিরিকস্থিত নায়িকার দেখা পান। এই গানে সেই নায়িকাকে কেন্দ্রে রেখেই বয়ান চালানো হয়েছে দেখব। ওর বাপের, ওর বইনের এবং মায়ের যেই হাজিরা আমরা দেখি ইংরেজিতে, সেইটা বাংলায় তেমন-তেমনটা রাখা যায় নাই, কিন্তু ঘুরিয়েফেরিয়ে হলেও মোচ্ছব-মজমার কিছুটা আঁচ তো খোঁড়া বাংলাতেও অগোচর নয়।

স্পেসিফিক ইন্সপিরেশনের এই কিচ্ছাকাহিনি খোদ রচয়িতার জবানিতে জানলেও রচনাটা আমাদেরে এইসব ঘটনাবলির উর্ধ্বে এবং বাইরেই নিয়া যায়। তা না-হলে তো খর্ব হয় যে-কোনো রচনাই। প্রিফেসের প্রয়োজনে এইটুকু কথাভাষ্য লগ্নি করা হয়েছে এইখানে, মূল রচনার পাঠান্তরে হেল্পফ্যুল হতে পারে আবার ডিস্টার্বিং হতেও পারে। এক জিপ্সি গার্ল যদিও কম্পোজিশনে নেচে যেতে দেখা যায়, শেষের স্তবকে যেয়ে দেখব ববি সিচ্যুয়েশনটা পাল্টায়ে দেন তার একতুড়ির স্ট্রোকে : “ইয়োর ভোয়েস্ ইজ্ লাইক অ্যা মিডোলার্ক / বাট ইয়োর হার্ট ইজ্ লাইক অ্যান ওশ্যিন / মিস্টেরিয়াস্ অ্যান্ড ডার্ক।” কাজেই, লিনিয়ার কিছু নয় জিনিশটা। আর, ববির গানের সাধারণ অনবদ্যতা তো এইখানেই। সবসময়।

সেভেন্টিসিক্সের গ্রীষ্মে সেই গ্রিনিচ ভিলেজ নামে খ্যাত অঞ্চলের একটা নাইটক্লাবে কর্নারটেবিল ও কফি-সিগার রসদমাত্র সম্বল করে ববি এই লিরিকটা কাগজে লেখেন। পরে ম্যাসাচুসেটসের প্লাইমাউথে এইটা লাইভ গেয়ে শোনান। জানা যায় ইট ওয়্যজ্ সেভেন্টিফাইভ। স্টুডিয়োয় রেকর্ডেড হয়ে বেরোয় সেভেন্টিসিক্সে। এইসব গ্যুগল্ করে জানা যায়।

আচ্ছা। তাইলে একটাই রইল বাকি, ডিলানের পরিচয়। কে বব ডিলান? জন্ম কবে? পিতামাতা? দারাপুত্রপরিবার? রগরগে প্রেমট্রেম? পুরস্কার-তিরস্কার? রিলিজিয়ন ও অন্যান্য রঙঢঙ? লাম্পট্য ও লিম্যুজিন?

বলি কি, এতকিছু যদি শুনিতে-জানিতে সাধ হয়, মিউজিকটা না-শুনে একটা-কোনো গণ্ডারখাঁচার পাহারাদার হলে বেশ হতো।

ওয়ান মৌর কাপ অফ কফি
তোমার নিঃশ্বাসে পাই শিউলিফুলের ঘ্রাণ
চোখজোড়া যেন গগনের নীল তারা
খাড়া-শিরদাঁড়া একহারা দেহ পিঠখানা টানটান
চুলগোছা ভারি স্নিগ্ধ এবং স্বচ্ছ পারদপারা

তারপরও দ্যাখো বলছি না ভালোবাসি
কিংবা আদরে একটুও নই নরম
দুচোখে তোমার প্রশ্রয়ভরা হাসি
নিকটকে করে সুদূর ও মনোরম

নক্ষত্রেই দৃষ্টি রেখেছ বুঝে গেছি শুরুতেই
পান্থজনের সখা হে আমারও চাইবার কিছু নেই
বিদায় নেবার আগে একবার চায়ে চুমুকটি দিয়ে
নেমে যাব পথে তৃষা হরিয়ে পরান ভরিয়ে নিয়ে

দেখলাম তুমি পিতৃভক্ত সোহাগে শেহেরজাদি
পিতাও তোমার দশাসই এক তাগড়া অকুতোভয়
তারই কাছে তুমি শিখেছ যা-কিছু জীবনের শিক্ষাদি
শিখেছ কোথায় কেমন করিয়া সাহসে দাঁড়াতে হয়

বাপটি তোমার জবর মেজাজি নিজস্ব রাজপাট
আগলে রাখেন সাধ্যিও নাই দেবে কেউ উঁকিবুকি
পান থেকে চুন খসলেই তার শুরু হয় চোটপাট
হম্বিতম্বি তিনবেলাতেই পাত চেটে খেয়ে সুখী

নক্ষত্রেই দৃষ্টি রেখেছ বুঝে গেছি শুরুতেই
পান্থজনের সখা হে আমারও চাইবার কিছু নেই
বিদায় নেবার আগে একবার চায়ে চুমুকটি দিয়ে
নেমে যাব পথে তৃষা হরিয়ে পরান ভরিয়ে নিয়ে

এবং তোমার বড়বোনটি তো দ্রষ্টা ভবিষ্যতের
অবিকল তুমি এবং তোমার মাতৃদেবীটি যেমন
পড়তে-লিখতে শেখো নাই তাতে থোড়াই তো হেরফের
ঘরের দেয়ালে নকশিকথায় বিদ্যা অমূল্য ধন

তোমার খুশি তোমার ফুর্তি সীমাহারা বেগে ধায়
ধানক্ষেতে যেন কোমল কেঁচোটি তোমার কণ্ঠস্বর
কিন্তু তোমার হৃদয়টি যেন সমুদ্র মহাকায়
তেমনই অজানা-অচেনায় মৃদু রহস্যবন্দর

নক্ষত্রেই দৃষ্টি রেখেছ বুঝে গেছি শুরুতেই
পান্থজনের সখা হে আমারও চাইবার কিছু নেই
বিদায় নেবার আগে একবার চায়ে চুমুকটি দিয়ে
নেমে যাব পথে তৃষা হরিয়ে পরান ভরিয়ে নিয়ে

ভূমিকা ও তর্জমা : জাহেদ আহমদ

… …

গানপার

COMMENTS

error: