প্যারা ২ || শেখ লুৎফর

প্যারা ২ || শেখ লুৎফর


মাটির বিছানায় শুয়ে শুয়ে নাদিন গার্ডিমারের ‘ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প’ বইটা নেড়েচেড়ে দেখছি, এই সময় জানালায় একটা মুখ উঁকি মারে, — স্যার কৈ?

বহুদিন ধরেই সে আমার জানালার সামনে এসে এই রকম করে আমাকে তালাশ করে। আমি প্রতিবারই প্রথমে বিরক্ত হই। কারণ সে যখন আসে তখন আমি প্রায়ই লেখাপড়ায় ব্যস্ত থাকি। এর ব্যাতিক্রম খুব-একটা মনে পড়ে না। লোকটা জানালার সামনে অস্থিরভাবে নড়াচড়া করে। দুই হাত জমিনের উপর বিড়ালের মতো পাক খায়। একবার চোখ দেয় সামনের আমগাছে তো আরেকবার আমার ছাদের দিকে। তারপরই আবার জানালার কাচে তার বনি আদমের মতো দাড়িওয়ালা মুখটা ভেসে ওঠে। সেটা সেকেন্ডখানেকের জন্য। কারণ তাকে যেন আমার ছাদটা গলায় দড়ি বেঁধে টানছে। তাই সেইদিকে ঘনঘন আরেকটু দেখতে হয়।

তার আওয়াজ পেয়েই আমি পড়া থামিয়ে বই হাতে বিছানায় শুয়ে আছি কিংবা কিবোর্ড থেকে আঙুল তুলে ফেলেছি এইটা বড় কথা না। আমি যেন তার প্রতিটা নিশ্বাস শুনতে পাচ্ছি।

তার দুই-তিন ডাকের মাথায় আমি জোরে আওয়াজ দেই, — আছি…।

তারপর উঠে জানালার সামনে যাই। গ্রিল ধরে খুব কাছ থেকে তাকে আমি একপলক জরিপ করি। চোখের গভীরে কী লেখা আছে তা ঠাহর করতে নীরবে দেমাক খাটাই। এইদিকে আমাদের আলাপ শুরু হয়েছে। সে তার ভাঙাচোরা গোটা জীবনটা নিয়েই যেন আমার দিকে তাকিয়ে আক্ষেপে কাতরে ওঠে, — ইস, ইস…স্যার, একবস্তা চাইলের দাম তিন হাজার ট্যাহা!

তার গলায় কারবালার আহাজারি। তার মাথার উপর দিয়ে খরায়-পোড়া হাওরের দিকে তাকাই : খালাসের সময় অর্ধেকটা আটকা-পড়া মায়ের মতো হাওরের বোরো জমিন। অনেক ক্ষেত পুড়ে খড়ের মতো হয়ে গেছে। আমি তার মুখের বলিরেখার ভাঁজে ভাঁজে একান্ত তার পৃথিবীটা দেখতে দেখতে জোরে চেঁচাই, — বৃষ্টি হয় না কয় মাস?

সে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি মনে করে না। তার বদলে জোরে একটা শ্বাস ছাড়ে। আমি তার দীর্ঘশ্বাসের তাপে একপাশে কাত হয়ে পড়ি, তার ন্যাতান্যাতা গতরের দিকে তাকিয়ে নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেই, — পাঁচ মাস।

এই বলে আমি তার দিকে ডান হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে আবার বলি, — বৃষ্টি হয় না সেই আশিন মাস থেকে। সামনে চার হাজার টাকা বস্তা চাল কিনে খেতে হবে।

এইভাবেই আমাদের মাঝে আলাপ শুরু হতে না হতে শেষের দিকে গড়ায়। সে গলাখাকারি দিয়ে আমার কাছে যেন নালিশ করছে এমনি ভঙ্গিতে বলে, — খোদার কোনো বিচার নাই, নাইলে কী আর আউরের (হাওরের) ধান পোড়ে?

এবং এই-রকম ছোটখাটো বাক্য দিয়ে আমাদের আলোচনাটা রাষ্ট্র, অর্থনীতি কিংবা দৈবিক চেতনায় টুকা মেরে হঠাৎ থেমে যায়।

আমি জানালা থেকে বিছানার দিকে ফিরে আসি। শিথান দিকে তুষকের নিচে আমার একটা গুপ্তি কোষাগার আছে। মাঝে মাঝে বাজার থেকে ফিরে এসে বউকে ফিরিয়ে দেবার আগে বিশ-পঞ্চাশ টাকা সেখানে লুকিয়ে রাখি। এই পদ্ধতিতে মাসের শেষের দিকে যা পাই তা দিয়ে ছোটখাটো একটা সফর দিতে পারি। পারতপক্ষে আমি সেখানে হাত দেই না। কিন্তু লোকটা এলে কেন জানি আমি তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদায় দিতে চাই। ভেতরে কতকিছু কলকল করছে! সেই পানিতে ছোট ছোট ঝিনুকের বুকে অধিক ছোট মুক্তার দানা। আমি কোন পরানে ভাতের দানাকে মাথায় ঠাঁই দেই?

ছাদে লাউ-ঝিঙা থাকলে বুঝমতো দিয়ে ভাগিয়ে দেই। যদি না থাকে তবে তুষকের নিচ থেকে দশটাকা দিয়ে দেই, — এই নেন … পান খান যে।

লোকটা চলে যেতেই বউ আসে, — একটা পানের দাম পাঁচ টাকা, তুমি দশ টাকা দিছ?

তার এই কথার মাঝে আমি চিরন্তনী নারীর দেখা পাই। আমার লেখায় নারীচরিত্রের আটআনাই তার কাছ থেকে পাওয়া। সেই হিসাবে সে আমার গুরু। তাই তাকে আমি মনে মনে খুব পছন্দ করি। মুখে কিছু বলি না। মেয়েরা লাই পেলে দিনদিন খালি গেরো টাইট দেয়।

লোকটার নাম তঞ্জু। তাকে আমি কোনোদিন হাসতে দেখিনি। কিন্তু সে দুঃখবাদী না। সংসারটা একটু বড়। ছেলেমেয়েগুলা ইস্কুল-মাদরাসায় পড়ে। একলাই সাত-আটজনের সংসারটা টানে। তাই অকালে বুড়িয়ে গেছে। খুব-যে কষ্ট লাগে এমন না। কিন্তু লোকটা আমার জানালার সমানে এলেই কেমন একটা অস্বস্তি হয়। ছাদের বাগানের গোবর জোগাড়ের জন্য বছরে দুই-একজন কামলা রাখলে আমি তাকে ডাকি। আমার অবশ্য কামলার অভাব নাই। তবু দরকারমতো আমি তার জন্য দুই-চারদিন অপেক্ষা করি। আমি না বললেও বউ সেদিন একটু ভালো পাক করে। দুপুরে আমি তাকে টেবিলে নিয়ে সামনাসামনি খেতে বসি। আলাপ করি। লোকটা হাপুতহুপুত করে খায়। খাওয়ার সবটুকু সময় শরীরে একটা তাল ধরে রাখে। আরও কত কী…!

দশটাকা নিয়ে তঞ্জু চলে যায়। কিন্তু আগুনের মতো বাস্তব কিছু গরম সে আমার মাঝে দিয়ে যায়। আমি জানি এইসব সাহিত্যের মশলা। রান্নায় মশলার আনুপাতিক হারে গোলমাল থাকলে সালুনের স্বাদ নষ্ট হয়। এই জিনিস শিখেছি লকডাউনের সময়। মেয়েটা খেতে বসে সারাবছর নাকবাঁকা করে, — আম্মা যে কী রান্না করে!

মাঝে মাঝে আমারও রাগ লাগে। তাই লকডাউনের অফুরন্ত অবসরে তার সাথে লেগে গেলাম। দুইজনে আলোচনা করে বাটিতে মশলা উঠাই। আমি সেই মশলার বাটিতে পানি দিয়ে চা-চামচে নাড়াচাড়া করি। সে আনাজ-তরকারি কুটে। আমি গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে কড়াই বসাই। তেল দেই। হয়ে এলে পেঁয়াজ ভাঁজি, গুড়ামশলা ভিজে নরম হলে তেলে ছাড়ি। মশলা অনেকক্ষণ কষাই।

সালুনের মশলা কষানির মতো লেখারও কষানি আছে। শব্দ, বাক্য, ভাব ও বিষয়ের মিলিত মালমশলার কষানি ঠিকমতো না হলে লেখাটা স্বাদ-গন্ধহারা একটা অখাদ্য হবে।

অনভ্যাসের দরুন হাড়িপাতিল-চামিচ এইসবের ব্যবহারে বেশি বেশি শব্দ হয়। মেয়ে পড়া থেকে উঠে এসে আমার ওপর নাক ঝাড়ে।

প্রথম প্রথম খুব খারাপ হতো। মোটকথা রান্নাটা মুখে দেওয়ার মতো না। বউ চুপচাপ খায়। এমনিতেই ঠাণ্ডা মানুষ তার উপর আবার ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিটা তার চমৎকার। আমি চোরের মতো আড়ে আড়ে মেয়েকে ঠাহর করি। তার দুই ভ্রæর মাঝে বিরক্তির গিঁট। আমি আবার ভয়ে ভয়ে বউয়ের মুখের দিকে তাকাই। সে দিব্যি গিলছে। আমি মনমরার মতো বিস্বাদ সালুন দিয়ে পেট ভরাই। বউ খাওয়া শেষ করে একবার আমার দিকে তাকায়। আমি চোরের মতো নিশব্দে আমার রুমে ফিরে এসে বাঁচি। চক্ষুলজ্জার পাশাপাশি বউয়ের সহ্যশক্তি দেখে মনে এক লহর আমোদও বয়ে যায়।

পনেরো-বিশদিন পরেই মেয়ে আমার রান্নার তারিফ করতে শুরু করে। মশলা কষানির সময় আমি খুব সতর্ক থাকি। বারবার চামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে পরখ করি। কষানিটা একটু এদিক-সেদিক হলে স্বাদের বারোটা বাজবে। হলুদ-মরিচ-জিরার অনুপাত ঠিকমতো না হলে স্বাদ তো স্বাদ সালুনের চেহারাও ফুটবে না।

আমি আবার নাদিন গার্ডিমারের ‘ঝাঁপ’ গল্পে মন দেই। একটু পরেই বউ এসে পেছনে দাঁড়ায়, — আসো …।

ঝাঁপ  গল্পটা আর একটানে শেষ হচ্ছে না দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে কার মুখ দেখেছিলাম?

গত একবছর ধরে আমাকে রোজ দুপুরে বউয়ের সাথে পাকঘরে কাটাতে হয়। এইসময় তাকে খুব আপন লাগে, খুশি লাগে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে এটা-সেটা আলাপ করে। তার নরম গলা আর শরীরের হালকা সুবাস আমার বুক ছুঁয়ে যায়। সেও ঝাঁপি উজাড় করে আলাপ করে। আজব আজব গল্প শোনায়। মেয়েদের গল্প। … তার বান্ধবীরা কে কীভাবে নিজেদের জীবনে ঝুঁকি বয়ে এনেছে, কেমনভাবে স্কুলের প্রবীণ শিক্ষকদের কাছ থেকে পান জোগাড় করে খেয়েছে, কীরকম ফন্দি করে ছেলেদের সাথে প্রেম করেছে। তাদের গ্রামের এক চোর চুরিতে বাধা দিত বলে বউকে কেমন করে খুন করে ফেলেছিল। কীভাবে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। … সে খুব ধীরে ধীরে বলে। নিরপেক্ষ এইসব বয়নে আবেগের জায়গাগুলোতেও সে আলোড়িত হয় না, গলার স্বর খুব-একটা উঠানামা করে না। তার শীতলতা আমাকে বরাবরই চমকে দেয়। আমি আরো সচেতনভাবে তার প্রতিটা কথার মাঝে নারীজগতের অনেককিছু দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি।

সে বলতে থাকে, — আমাদের গ্রামের জাফর আছে না?
— কোন বাড়ির?
এই প্রশ্ন করে আমি তার ডানগালে পাশাপাশি রক্ততিল দুইটার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে বলে, — মান্দাই ভিটার দক্ষিণের বাড়ির।
আমি নীরবে কান পেতে রাখি। চোখ কড়াইয়ে। সে আবার শুরু করে, — জাফরের বোনটা যে গতবছর পালিয়ে গেছিল, তার একটা মেয়ে হয়েছে। সে নাকি এখন কান্দে, কেন লেখাপড়া রেখে পালাইছিন?
আমি জিগাই, — রিভারে দ্যাখছ?
— হ।
— মেয়েটা দারুণ ছিল না?
— হ।
— একটা বাচ্চা হওয়ার পর এখন ফক্কিনির মতো লাগে!
আমার এই কথার পরেই সে আস্তে করে বলে, — বিয়ের আগে চাকরি হলে আমি বিয়ে করতাম না।

তার আস্তে বলা কথাটা আমার বুকে কামান দাগে। আমি মুখ চুঙ্গা করে সালুনের স্বাদ পরখ করি। জিবটা এত ভোঁতা হয়ে গেছে যে সালুনের স্বাদ নিতে পারছে না।

আমি মরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। এখন তার সারা মুখ জুড়ে রক্তের আনাগোনা বেড়ে গেছে। মুখটা লাল। আমার ইচ্ছা হয় সরপুঁটি মাছের দোপেঁয়াজার কড়াইটা উল্টে দিয়ে বিছানায় ফিরে যাই।

যতটা সম্ভব আস্তে আমি দ্বিতীয় বার্নারে শাকের কড়াই বসাই। রান্নায় সে তেলে কৃপণ। আমি ইচ্ছা করেই তেল বেশি দেই। মুঠি ভরে পেঁয়াজ দেই। আমার মনের ভাব বুঝে সে বলে, — তোমরা মেয়েদের কী বুঝ?

আমি নীরব থাকি। সে এখন তার জাত নিয়ে কথা বলছে। তাকে বলতে দিলে আখেরে আমি লাভবান হব। সে বলতেই থাকে, — আনন্দ মোহনে এমএ পড়ার সময় ময়মনসিং প্লাটফর্মে তোমার কিছু বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল। তারা আলাপসালাপের মাঝে আমাকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল, ভাবী, পাগলটারে দেখে রাখবেন।

সে নাম না বললেও আমি আনুমান করতে পারি। তারা স্কুলজীবন থেকেই আমার কবিতা লেখা নিয়ে হাসাহাসি করত। বর্তমানে তাদের টাকা হয়েছে। কিন্তু বাড়ি গেলে আমি তাদেরকে সময় না দিয়ে রতনের সাথে ঘুরাফেরা করি। রতন বাঁশি বাজায়। তার বাপ ছয়বালীচাচাও দারুণ বাজাত। কিন্তু ছেলেকে শিখিয়ে যায়নি। ছেলে নিজের থেকে শিখে নিয়েছে। তার লম্বা লম্বা চুল। কালো চোখের মণি দুইটা সবসময় আমোদে চকচক করে, — ভাইয়ো…গরিবের লাইগ্যা দোয়া কৈর। আমি দেশবিদেশ ঘুইরা বাঁশি বাজাই। মানুষে শিল্পী কৈয়া ফোন দেয়। ট্যাহাও দেয়। চলতারি। বেশি ট্যাহা দ্যায়া কী অইব ভাইয়ো?

সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি তার উজ্জ্বল চোখদুইটা পড়ি, মনে মনে তার বাপের সাথে মিলাই। ঠিক তার বাপের মতো হয়েছে। সেইরকম লম্বা-চওড়া, উজ্জ্বল গায়ের রঙ। চিত্তখোলা মুখটায় একটা উজ্জ্বল আভা সবসময় চকচক করে। আমি তাকে একটু বাজিয়ে শুনাতে বলি। সে তার বাপের মতো কোমরের দিকে গেঞ্জির আড়াল থেকে একটা বাঁশি বের করে বলে, — লও যাই গাঙপারে, ইচ্ছামতন হুনায়াম।

পালপাড়া পেরিয়ে নদীর পারের একটা নির্জন রেন্ট্রিতলায় আমরা বসি। সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ছোট নদী সুতিয়া। সে তার বাঁশিতে সুর তোলে :

রাই নামের গাছে গো
যে-ফল ধইরাছে গো,
সেই ফল খাইতে বড় মিঠা।

আয়ানের ফল গোপাল খাইল,
তারে বানাইল কুলটা গো —
সেই ফল খাইতে বড় মিঠা।

ফলের নামটি ভুবননটী
আর যতসব নটা গো
আর যতসব নটা …

ইসহাকপুর / ১৬. ০৩. ২০২১


প্যারা ১

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: