কবিদের নির্বাচন || সরোজ মোস্তফা

কবিদের নির্বাচন || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

বাংলা কবিতার গভীর নির্জন পথরেখা নিয়ে নানান প্রশ্ন ও প্রস্তাবনার সন্ধানী উচ্চারণ খুঁজে পাই এখনকার অনেকের লেখায়। বাংলা কবিতার জাহাজটা যারা চালাবেন, সেই নবাগত নাবিকেরা এইসব উচ্চারণে খুব প্রাণিত হন। মহৎ প্রশ্নের আয়োজনে কাল-কালান্তরের বন্ধুরাও খুঁজে নেন শব্দ ও কল্পনার উৎস।

কবিদেরও ইশতেহার থাকে। যেমনটা ছিল ত্রিশের দশকে। আশির দশকে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। আচ্ছা, সব পেশাজীবীরাই দেখি নির্বাচন করে। ভেতরে ভেতরে প্রায় সবাইকে দেখি পার্লামেন্টমেম্বার হতে চায়। কেন? শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে শ্রেণির কথা বলার জন্য। কবিদের কি বলার কিছু নেই? তাহলে, কবিরা নির্বাচনে আসেন না কেন? আমার তো মনে হয় বৌদ্ধিক, যৌক্তিক ও নান্দনিক জীবন প্রস্তাবে কবিদের নির্বাচন দরকার। পার্লামেন্টে ভাষা, ছন্দ ও নান্দনিকতা অপরিহার্য। কাড়াকাড়ি-মারামারি-বিবাদ-বিরোধ-বিঘ্ন-ঈর্ষা-হিংসা-ঘৃণা-সংঘাত-সংঘর্ষের পৃথিবীতে কবিতার পঙক্তি দরকার। সামান্য চোখের মতো কবিতার ছোট ছোট পঙক্তিতে একটা শক্তি থাকে। কবিতার সে-পঙক্তি রাজনীতির মহারোলে স্থাপন করবে শান্তি ও সংযম। আহার-নিদ্রা-মৈথুনের প্রায়োগিক পৃথিবীতে কবিতার জীবিত পঙক্তি দরকার। কবিদের নির্বাচন দরকার।

ভোটের এই লড়াইয়ে নেমেছিলেন বাংলা ভাষার দু’জন শক্তিমান কবি। ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগ (তৎকালীন ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ জেলা) থেকে স্বরাজ দল-এর প্রার্থীরূপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনী প্রচারকাজে তিনি এ-সময় ফরিদপুরে যান এবং সেখানকার জননেতা ও পির বাদশা মিয়ার সমর্থন চান ও পান। এ-নির্বাচনে কবির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বরিশালের অন্যতম জমিদার মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী। তিনি নির্বাচনে কী পরিমাণ ভোট পান কিংবা কত ভোটে ফেল করেন কিংবা জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল কি না সে-তথ্য আমার কাছে নেই। তবে, কবি যে নির্বাচনে ফেল করেছিলেন — এটা সুনিশ্চিত।

অনেক পরে বাংলার আরেক কবি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চার প্রথম সকালে ভোটের লড়াইয়ে নেমে জামানত হারিয়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। গুণের প্রধান গুণ হচ্ছে তিনি অকপট। সেবার তিনি হয়তো রাজনৈতিক দল থেকেই নমিনেশন চেয়েছিলেন। পাননি। না-পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার কাজে নেত্রকোনা শহরের সর্বমহলের সহযোগিতা পেয়েছিলেন তিনি।

আমরা তখনও অল্পবয়সী, আমাদের ভোটের বয়স হয়নি সেবার। কিন্তু ছোট শহরে আমরা গুণের পেছনেই ছিলাম। মহুয়া  ট্রেন থেকে নেমে গুণ হ্যামিলনের বাঁশিওলার মতো শহরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। পুরো শহর গুণের দিকে তাকাল। শহরটা চোখে-মুখে হাসিতে গুণকে অভিবাদন জানাল। গুণও পাকা জননেতার মতো হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অভিবাদনের উত্তর দিলেন। সে-এক আশ্চর্য সুন্দর গতিতে গুণের সঙ্গে পুরো শহর হেঁটে হেঁটে আমরা ডিসিঅফিসে গেলাম এবং নমিনেশনপেপার জমা দিলাম। আমরা আশ্চর্য চোখে গুণের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বলতাম লোকটা কুমির মার্কা । আমরা জানতাম গুণ কবি। হুলিয়া  নামের কবিতার কবি কুমির মার্কায় নির্বাচন করছেন।

আমাদের আগের বা পরের জেনারেশনের কেউই এমন একটি দৃশ্য দেখার সুযোগ পাবেন কিংবা পেয়েছেন বলে মনে হয় না। গুণ মিছিলের সামনে। তারও সামনে কাঠের কয়েকটা কুমির। মানুষের কাঁধে কাঠের কুমির। গুণের নির্বাচনী প্রচারণায় শ্রদ্ধেয় আসাদুজ্জামান নূর সহ অনেক তারকারা পর্যন্ত এসেছিলেন। গুণের সে-মিছিলের দিকে পুরো শহর তাকিয়ে ছিল। নৌকা, কাচি মার্কা, কিংবা ধানের শিষের মিছিলের চেয়ে গুণের মিছিলটা ছোটই ছিল। কিন্তু মিছিলটা আশ্চর্য সুন্দর ছিল। আমার মতো নিরীহ বালক ছাড়া শহরের সংস্কৃতিমনা মানুষেরাও মিছিলে ছিলেন। গুণ কিন্তু নির্বাচনটাকে তামাশার পর্যায়ে নিয়ে যাননি। সিরিয়াসলি মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন। এমনকি অনেক নৌকার কর্মীরাও গুণের মিছিলে ছিলেন। যদিও মিছিলে যাওয়ার জন্য কবি আমাদের কোনোদিনই জিলাপি খাওয়াননি। আমরা খুব অখুশি না-হলেও ভাবতাম, একটা কবিতার বই বিক্রি করলেই তো লাখ লাখ টাকা। তাহলে লোকটা টাকা খরচ করে না কেন?

আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে-সময় লোকজন বলাবলিও করেছিল যে, ‘কুমিরডা নাওডারে খাইয়ালবো’। অর্থাৎ নৌকা হারব, কুমির পাশ করব। নেত্রকোনার মানুষ ভাবে সবল, অঙ্কে দুর্বল। নাও খাওয়া তো দূরের কথা, যারা মিছিলে ছিল মনে হয় তারাও কবিকে ভোট দেয়নি। কবি জামানত হারিয়ে হাসতে হাসতে ট্রেনে ঢাকায় ফিরিছেন। আমাদেরও মনখারাপ হয়েছে। পৌষমেলার স্টেজে কুমির মার্কার কবিকে দেখেছি। ভেবেছি আবারো তিনি নির্বাচন করবেন। বাংলার মাটি, বাংলার জলের কবি আর নির্বাচন করেননি। জনগণের চেহারা কবির কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তাই হয়তো তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়ালেন না।

… …

COMMENTS

error: