যমুনা পাড়ের রাখালী || বিজয় আহমেদ

যমুনা পাড়ের রাখালী || বিজয় আহমেদ

SHARE:

মধুপুরে, আবুল ভাইয়ের খোঁজে


কী এক ঘোরের ভিতর থেকে যেন মধুপুর উত্থিত হয় আমার কাছে৷ সেই ঘোরের আদি-অন্ত জানা নাই। শুধু জানি মধুপুর যেতে পড়ে জলছত্র নামের এক বাসস্ট্যান্ড। সেখানে সিজনে বসে আনারসের বাজার। আমি চা আর সিগ্রেট খেতে নামি জলছত্রে। বন্ধুস্থানীয় ওসি আখেরভাই আমাদের সাথে ছিল প্রথমবার। তারপরে যে দুইবার গেছি, আখেরভাই বদলি হয়ে গেছেন ততদিনে।

মধুপুরে তুমি কী কী কারণে যাবে? ছোট-হয়ে-আসা বন? হাড্ডিসার কয়েকটা বানর? আর একটা রোঁয়া-ওঠা ওয়াচটাওয়ার দেখতে? অথবা আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য দেখতে? এসব প্রশ্ন নিজেকে শুধাতে শুধাতে আমরা মধুপুর বনের ভিতরে ঢুকে হারিয়ে যেতে থাকি। আর গারো-মান্দীদের পল্লি, চোখে-পড়া মায়াময় চার্চ ফেলে আমরা সূর্যাস্ত কাঁধে করে আসলে ঘরে ফির এসেছিলাম প্রতিবার।

আমি আসলে মধুপুর যাই আনারসের লোভে। আর আবুল সুন্দরের খোঁজে। ‘আবুল সুন্দর’ কাজল শাহনেওয়াজের একটা গল্পের নাম। গল্পটা আছে তার ‘গতকাল লাল’ গ্রন্থে। এ বইটি বেরিয়েছিল দীর্ঘদিন পর। তার আগেই কাজল শাহনেওয়াজ একটা মিথ হয়ে গেছেন। তখনো আমি কাছিমগালার নাম শুনতাম। আজিজ মার্কেটে দাঁড়িয়ে। এর ওর কাছে। গাণ্ডীব সম্পাদক তপনদা, একদিন উদাত্ত প্রশংসা করছিলেন, আজিজ মার্কেটের নিচতলায়। কাছিমগালাকেন্দ্রিক সে-প্রশংসা। তখনো তাঁকে দেখিনি। তাঁর নতুন লেখা গল্পও দুষ্প্রাপ্য তখন৷ এরপর বহুদিন পর ‘গতকাল লাল’ বেরোলে কিনে পড়ে ফেলি। আর সেইটার ‘আবুল সুন্দর’ এক অজানা কারণে মনে গেঁথে যায়৷

মাঝে একটা সময় কাজলদা নিজের ব্যবসা বা কাজে একটু দূরেই ছিলেন হয়তো (আমার তা-ই মনে হয়)। বইমেলায় দেখা হয়েছে এরপর। মাঝে আজিজ মার্কেটেও। ছোটখাটো, কিছুটা ভারী শরীরের, তাগড়া এক মানুষ। মুখে-লেগে-থাকা হাসির উজ্জ্বল এক মানুষ। এক দুর্ধর্ষ গল্পকার। দুরন্ত এক কবি। হাতে থাকত প্রায়শই পানির বোতল। সে-বোতলে পানি না শরাব তা অবশ্য জিজ্ঞাস করাও হয়নি।

কাজল শাহনেওয়াজ হীরে কেটে কেটে তাকে অবয়ব দেয়া এক স্রষ্টা। তাঁর গল্প বা কবিতা বাংলাদেশে বিরলই। এ ধরনের অপ্রচল ধারা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন যে-গ্রুপটি ’৮০-র দশকে, তা মেবি শিল্পতরুকেন্দ্রিক। কেন্দ্রে মান্নান সৈয়দ। আর কোঅর্ডিনেটর মেবি ছিলেন বিখ্যাত কবি আবিদ আজাদ। তাদের সাথে রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ সহ আরো অনেকেই। কেন যেন আজো আমার মনে হয়, শিল্পতরুগোষ্ঠী প্রচলের বাইরে যাওয়ার একটা জেহাদে লিপ্ত ছিল তখন।

০২
জলছত্র বাজারে দাঁড়িয়ে আমি/আমরা চা খাই। এক মেরুন সন্ধ্যা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিটুমেনের পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে আসে আমাদের চোখে। কাছেপিঠেই আনারসের স্তূপ। লক্ষ-কোটি চোখ আনারসের। কী দেখে এত চোখে আনারসগুলো? কী তাদের বিষয়-বাসনা? যেন তারা বলতে চায় :

আসবে যদি ভাব নিতে তবে পিপা নিয়ে এসো
কোলো ওয়েল্ডিংগ্লাস চোখে পরে এসো
সীসার জ্যাকেট পরে এসো
মিলিটারি বুট পায়ে এসো
গ্লাভস নিয়ে এসো

বলা তো যায় না কখন কি ঘটে যায়!

(পরিস্থিতি; জলমগ্ন পাঠশালা)

মিলিটারি বুট সাথে না থাকলেও প্রথমবার যেবার জলছত্রে আসি, সাথে আখেরভাই ছিলেন। আখেরভাই প্রখর বুদ্ধির এক পুলিশ অফিসার। আমার মতো আমপাব্লিকের সাথে তাঁর পরিচয় একটা ঘটনা বটে। যা-ই হোক সে-গল্পে পরে আসি। মোটকথা আমার যে মধুপুর ভ্রমণ তা ক্ষণিকের। ঘণ্টা দুই বা তিনেকের। বেড়াইতে যাওনের মতো আর-কি। আরো একটা উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল, ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়ক হওয়ার আগে আমার পিতৃপুরুষেরা কিশোরগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে ময়মনসিংহ পাড়ি দিয়ে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতেন। তাদের মুখে শোনা সেই মধুপুরের অতিকায় বন দেখাও একটা উদ্দেশ্য। আর কেন্দ্রে ছিল কাজল শাহনেওয়াজের ‘আবুল সুন্দর’ গল্পের ৫৫ বছর বয়স্ক আবুলভাই আর অজস্র চোখের আনারসের মাতৃবংশের সন্ধান।

গল্পের আবুলভাইকে হয়তো দেখেছিলেন গল্পকার। কিন্তু আমি তার দেখা পাই নাই তিনবারের ভ্রমণেও। শুধু প্রতিবার ফেরার সময়টা ছিলো ফ্যাকাশে নির্জন। মন-কেমন-করা টাইপের। যেন সেই অবসন্নতার ভিতরে কাজল শাহনেওয়াজ নামের এক বেঁটেখাটো তাগড়া লেখক, ভীষণ মদ্যপানের পর, সুর তুলে তুলে পড়ছেন …

আবুল পরদিন ভোরে আবার গিয়ে খোঁজে। তখন কেবল লিচুর আলো আবছা আবছা। সারারাত দুশ্চিন্তার চোখ মনের ভিতর। দেখে কী সুন্দর দুটি শালপাতার ভিতর শুয়ে আছে ঈশ্বরের কন্যা! দাদিমার গল্পের আঁচল থেকে বেরিয়ে এল যেন শে। শ্যামলা লাল মোরগফুলের মতো। এই সামান্য আলোতেও চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে তার। কন্যা আগে ছিলে কার? মায়ের? এখন কার? শালপাতার! কাল হবে কার? যার হাতে যাব তার!

এটুকু শুনে কল্পিত শ্রোতাদের ভিতর কান্নার রোল ওঠে। শ্রোতারা সবাই নিজ নিজ কন্যাশিশুর স্মৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ে। অনিয়ন্ত্রিত হয়ে। আর সর্বহারা নদীভাঙনের শিকার লোকজন যেভাবে বুক চাপড়ে কাঁদে বেহুশ হয়ে, সে-রকম কান্নার কল্পিত শব্দ অবসন্ন মধুপুরগড় এলাকার আকাশ বাতাস ভারী করে তোলে।

তবুও, কাজল শাহনেওয়াজ নামের বেঁটেখাটো এক অমিত তেজের গল্পকার সুর করে করে পড়ে যান …

ভ্রমণ করে হিরার সাঁকো, পার হয়ে তিনধারা নদী, উজিয়ে ত্রিবেণী দেখা পেয়েছিল মাতৃডিম যে পুংবীজ, উদরপীতে বাস করে মাকে খেয়ে আস শে কন্যা হলো। তাকে আবার পথে পথে সাত সাগর পাড়ি দিয়ে বাস করতে হবে সাদা মায়ের কোলে। এই ছিল যে নিয়তি।

০৩
বহুদিন আমি মধুপুর যাই না। জলছত্রেও না। অন্য জেলাশহর থেকে মধুপুরের আনারস যদিও খাওয়া হয়েছে এবার অনেক। লোকজন বলাবলি করে, এসব আনারসে মেডিসিন দেওয়া। তবু মুখ ভর্তি করে উপচে-আাসা মধুপুরের আনারেসর স্বাদ ভুলতে পারি না আমি। যেমনটা পারি না কাজল শাহনেওয়াজের কবিতা বা গল্পের ক্ষেত্রেও। ভাবছি, ভবিষ্যতে জলছত্রে গেলে কাজল শাহনেওয়াজের গল্পসমগ্র সাথে করে নিয়ে যাব। মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠান গিলতে না-পারা, এখনো প্রকাশকদের লোকসানের খাতায় থাকা অমিয় ও অমর এই কথাশিল্পীর সাথে জলছত্রে ভ্রমণ চমকপ্রদ হবে নিশ্চয়ই! কেননা তিনি সেই লেখক, যিনি বলেছেন, অনেকগুলো চোখ দিয়ে একসাথে অনেককিছু দেখার আকাঙ্ক্ষায়, একদিন তিনি আনারস হয়ে গিয়েছিলেন।

… …

 

COMMENTS

error: