সঞ্জীবিত সংগীতাঢ্য || জাহেদ আহমদ

সঞ্জীবিত সংগীতাঢ্য || জাহেদ আহমদ

বাক্যের শুরু অন্য কোথাও
তোমাতেই দেই দাঁড়ি
যখন যেখানে নোঙর ফেলেছি
সবাইকে আজ আড়ি
— সঞ্জীব চৌধুরী (জোছনাবিহার  অ্যালবামে একটা গানের কয়েক চরণ)

সঞ্জীবের গেয়ে-যাওয়া শেষ অ্যালবামের গানগুলো শুনে একটা প্রশ্নাকার বিস্ময় জাগে ভেতরে, যেমন জাগত তখন জাগে তেমনি আজও, সঞ্জীব কি কোনোভাবে টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি চলে যাচ্ছেন মাটিপৃথিবীর মায়া ছেড়ে! তাঁর মৃত্যুর মাত্র একমাসকাল অব্যবহিত আগে অ্যালবামটা বাজারে এসেছিল, ‘দলছুট’ ব্যান্ডের ‘জোছনাবিহার’, সেখানে সঞ্জীবের গাওয়া গান যদ্দুর মনে পড়ে মোটমাট পাঁচটিই ছিল। বড় ভালো গলা ও গায়কী ছিল, অন্যতর দ্যোতনাব্যঞ্জক, যদিও গাইতেন বরাবরই কম। সহশিল্পীকে বেশি গাওয়ার সুযোগ দিতেন সবসময়, যেইটা আমাদের অনেকের কাছেই ছিল আক্ষেপের, কিন্তু তারপরও সঞ্জীবই ছিলেন দলছুটের প্রাণ অথবা বায়ান্ন তাস। যে-দেশে লিড-ভোক্যালের একনায়কোচিত আচরণে ব্যান্ড ভেঙে যায় ভোর হবার আগেই রাতারাতি, সেইখানে এই বিরল একজনকে আমাদের মনে হয়েছে এইসব হুড়োহুড়ির ব্যাপারে নিস্পৃহ রইতে। এবং আমরা জানতাম, বলাবলি করতাম, ‘দলছুট’ কোনোদিনই ভাঙবে না। দলের হৃৎপিণ্ডের অপর অলিন্দ বাপ্পা মজুমদারও গুণী গাইয়ে, কিন্তু অতি ভালো গলা আর সুর ও সংগীতবোধ থাকা সত্ত্বেও বাপ্পা যেন কোথাও আটকে-যাওয়া, সেই আটকে-যাওয়া হতে পারে বাপ্পার চাঁদফুলজোছনাসর্বস্বতার কারণে। একঘেয়ে চাঁদফুলজোছনা বাপ্পার গানে ম্যাড়ম্যাড়ে চাঁদফুলজোছনাই থেকে যায়, এর থেকে তেমন উত্তরণ ঘটে না তার, ব্যাহত হয় বাংলাদেশের বাংলাগানের আশাকরোজ্জ্বল উদ্ধার, এর দায় একলা জুলফিকার রাসেল নামের জনৈক চাঁদফুলজোছনা গীতিকারেরই নয় মনে হয়। এমনিতে বাপ্পার গানবাঁধুনিতে ওয়েস্টার্ন টিউনস্কেপের ব্যবহার খুব মেধাবী ও মেলোডিয়াস। বাপ্পার নির্মাণের চূড়া দেখেছিলাম শম্পা রেজার একটা অ্যালবামে, যেখানে একপিঠের ইস্টার্ন আবহের গানগুলো সুরযোজন ও সংগীতায়োজন করেছিলেন আলাউদ্দীন আলী, অন্যপিঠের ওয়েস্টার্ন নির্মিতিগুলোর মিস্ত্রী ছিলেন বাপ্পা। অ্যালবামটার নাম ছিল সম্ভবত ‘দূরের আকাশ’ বা এইরকম কাছাকাছি কিছু। খুব উপভোগ্য হয়েছিল উভয়পিঠই। ফিতার ক্যাসেটযুগের ঘটনা সেটা। সেইখানে বাপ্পা মজুমদারের পিয়ানোপ্রয়োগ আজও কানে লেগে আছে। যেমনটা দেখেছিলাম কবীর সুমনের “তুমি তো চললে, সক্কলে যায় / থাকতে এসেছি ভাবতে ভাবতে সবাই পালায়” — এই গানটায় একচ্ছত্রভাবে দুর্ধর্ষমধুর পিয়ানোবর্ষণ। শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা আয়োজিত ওই গীতাঞ্জলির দুইপিঠের মধ্যে একপিঠে-ধৃত ছয়টা গানের সব-কয়টাতেই পিয়ানো ব্যবহৃত হয়েছিল। অসাধারণ বললেও কঞ্জুসি হয়, অ্যানিওয়ে, গেয়েওছিলেন আমাদেরে অবাক করে নিজের সাধ্যাকাশসীমার উপর দিয়ে যেয়ে অ্যাক্ট্রেস শম্পা রেজা। বাপ্পার নিজের গলাতে তো খুবই ব্যক্তিত্বছাপ রয়েছে। বলা বাহুল্য, গলায় সুর দিয়েছেন আল্লা অনেককেই, কিন্তু গলায় ব্যক্তিত্ব খুব বেশি গাইয়ের মধ্যে মেলে না।

০২.
মানুষ কী তবে আগেভাগেই তার নিজের মৃত্যু বুঝতে পারে! টের পেয়ে যায় কোনোভাবে মৃত্যুর শমন! অবশ্য মৃত্যুর শমন কারো কারো কাছে মৃত্যুর পয়গামও হইতে পারে। যেমন “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান” — এইরকম মনে-মনে ভাবার মতো লোক তো কম নেই সংসারে। সেসব অন্য প্রসঙ্গ। বলছিলাম, লোকে টের পেয়ে যায় কি না তার নিজের মৃত্যুমুহূর্ত। আমাদের অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনা আছে অনেকেরই, নিকটাত্মীয়ের কেউ নিজের কবরের জমি ঠিকঠাক করে বিকেলবেলা আসর-ওয়াক্তের সালাত আদায় করে ফেরার পথে কবরের জমির ঘাসপাতা নিজহাতে সাফ করে ঘরে এসে ছেলেদেরকে ডেকে পারিবারিক বিরোধ বা সম্পত্তি ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ভাইয়ে-ভাইয়ে ফ্যাসাদফিৎনা না-করার উপদেশ দিয়ে শয়নচৌকি উত্তর-দক্ষিণ করিয়ে কাছাকাছি সবাইকে কলমা পড়ার রিকোয়েস্ট করে সুস্থশান্তভাবে নিজে মারা যাচ্ছেন। অথবা দূরে-থাকা আত্মজা বাড়িতে আনিয়ে মেয়ের ঘরের নাতিপুতিদেরে আদর করে দেখেটেখে নিঃশ্বাস ছাড়ছেন শেষের। এইরকম অনেক উদাহরণ প্রত্যেকেরই পারিবারিক পরিমণ্ডলের অভিজ্ঞতায় পাওয়া যাবে। এসবের হয়তো অনেকধারা ব্যাখ্যা দান করবার লোকেরও অভাব হবে না, ব্যাখ্যা নানাভাবেই তো করা যায়, এমনকি ম্যাক্লুহানের ভূত ডেকে আনা যায় প্ল্যানচ্যাটে। সেইটাই ফিলহাল স্ট্যাটাস হবে, হয়তো। হুদা হুদা আমি ধান ভেঙে দুইটা ভাতের দানা মুখে তুলতে গিয়া শিবঠাকুর-সাহেবসুবো বসাইতে চাই না আঙিনায়। সেইটা বাহুল্য হবে, বুড়ো এই শালিকের ঘাড়ে এমনিতেই প্রচুর জোয়ালের দাগ, নতুন করে ফার্স লিখতে আর নাইবা বসলুম। সহায় বাবা মধুসূদন। কিন্তু আমাদের খাসলতটাই এমন, আল্লা নিয়া গালগপ্পো ফাঁদতে বসে স্টিফেন হকিং মহোদয়কে হেকিম-কোব্রেজ সাব্যস্ত করি, উল্টোদিকে বিগ-ব্যাং বা ব্ল্যাকহোল বিষয়ক বিচারসালিশে মাতব্বর বানাইয়া বসি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আল্লামা-মাশায়েখ মশাইকে। ব্যাপারগুলো অতীব উত্তম সন্দেহ নাই, এই পথেই মুক্তি আসবে আমাদের, বটে! হালজমানায় আমরা তো ইশকুলকালেজে যাওয়াআসা শুরু করেছি, ইয়া ইলাহি, ক্যায়া ক্যাহনা! মায়নাপাশের আগেই আমাদের খায়েশ জাগে এইবার একটা ডাণ্ডাডিগ্রি লওয়া যাউক। শুরু করো তবে উলটোবুজলি প্রজার বাক্যাবলি, সিন্ট্যাক্সের মায়েরে বাপ, কোটেশনের একটা বাঁশঝাড় বানাও। মকসুদ পুরা হইব তোমার। করো হো শোকর গোজার। সুরের জন্য সুরম্য ঘর-ঘাট বানাবে এমন সহৃদয় নির্বাহী ডিরেক্টর বঙ্গনগরে অ্যাক্সিডেন্টালি মেলে। কেননা “আমাদের স্কুল-কলেজে শেখে লোকে লেখাপড়া / প্রাণে গান নাই মিছে তাই ম্যাক্লুহানের মূর্তি গড়া” … আহা! খাসা গানখানা বাঁধিয়াছিলায় হে কবীরভায়া! আজও তাই বিপদাপদে সেই শিরোধার্য সুর ও গানের প্যারোডি গেয়ে ব্যাজস্তুতিবিপুল ভুবনে হেন সঙ্গহারা আমাদিগের ন্যায় জ্ঞানহীনা গানোন্মাদ গুটিকয়ের ক্যাথার্সিস পাওয়া। আমরা গানবাজনা ছাড়ি’ পিয়েচডিপিপীলিকা হইবার চাই না মা-জননী, তীর ও তরণীহারা গায়েন করিম দীনহীনের ন্যায় “আর কিছু চাই না আমরা গান ছাড়া” …। আমাদের হরকিসিমের বালামুসিবতের ভেতরে এইটা আরেকটা যে, অ্যাকাডেমিয়ার প্রতি প্রীতিভক্তি চিরকালের ভালোবাসাকেও হার মানিয়ে এখন বল্গাহারা। ব্যাঘ্রপাগলপারা। আহা! শক্তির লাইনে না-যাই আর … “চিরকালের ভালোবাসার বাঘ বেরোলো বনে” … ম্যাক্লুহানেই থাকি বরং, যেহেতু আমার মুক্তি ম্যাক্লুহানে, এই ফিদা অ্যাকাডেমিয়াভকতিতে। দুনিয়া যদিও উল্টোদিকে। একটা আদ্দিকালের স্মৃতি জাগায়ে এই প্রসঙ্গের ইতি টেনে ভিন প্রসঙ্গে যাই। আমার বয়সী বৃদ্ধ ভোঁতাভাম যারা, তাদিগের মনে পড়বে, একটা কালপর্বে এই কানাগলির মেট্রোপোলিটান শহুরে দেশে দেদার লিটলম্যাগাজিন বেরোত। এবং সেইসব লিটলম্যাগাজিনে ইন-ওয়ান-ফাইন-মর্নিং আমরা দেখতে পাইলাম প্রবন্ধে প্রবন্ধে দেশকালপাত্র উপচিয়া উঠিছে মাধুরীতে, সেইসব প্রবন্ধের বিষয় একচ্ছত্র জীবনানন্দ অথবা আরও অমুক-তমুক কবির কবিতায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপাদান অনুসন্ধান ও অনিবার্য-অবধারিত উদ্ভাবন ও আবিষ্কার! সেইসময়ে তো জোয়ার উঠিয়াছিল সিলিকনের, মাইটোকন্ড্রিয়া আর প্লাজমা-মেমব্রেনের উচ্চ উচ্চ ব্যবহার বাংলা কবিতায়। কেউ হইসিলেন সিলিকন কবি, ইয়ারা-সিলি-সিলি বাকিদের অবস্থা তথৈবচ তথা খোদার খাসি কবিতাফাঁসি। কিন্তু ওইসবও তো মন্দ ও অনুপভোগ্য ছিল বলে মনে করি না আজি। বিধি বাম। ধরণী কোনোকালেই তো আমাদের প্রতি দ্বিধাসম্মত সদয় ছিল না, যার ফলে সেইসব উচ্চাসীনগণ আজ আর নাই, টিমটিম করিয়া থাকলেও থাকতে পারেন জনা-দুই, কিন্তু এত ক্লেশ সহিয়াও আমাদিগের ন্যায় নালায়েকদেরকে আজিও জীবন কষ্টেমষ্টে ধারণ করিয়া যাইতে হইতেসে, আর মরা ম্যাক্লুহানের চাঁদমুখ দেখে নিঃশ্বাস নিতে হইতেসে। একটা ইন্টারেস্টিং ফাইন্ডিং এমনও হইতে পারে যে, সেই সময়টায় বেওয়াচবালা পামেলা অ্যান্ডার্সনের প্রথমত লণ্ডভণ্ড-ঝড়-ওঠানো বক্ষদেশে সিলিকন সার্জারির শুভ মহরৎ হয়, দ্বিতীয়ত ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গসংস্থানিক অদলবদলের প্রকৌশল লোকালয়ে ইন্ট্রোডিউস হয়, এবং ওই ডিকেডেই বাংলাপ্রান্তিকে ক্যাঁচম্যাঁচানি শুরু হয় লিটারেরি থিয়োরি নিয়া জোরেশোরে নবোদ্যমে, এরই ধারাবাহিকতায় এমনকি বাংলা কবিতার সঙ্গে কম্যুনিকেশন থিয়োরির মহাযোগসাজশ দেখাইতেও সম্প্রতি মরিয়া হয়ে উঠেছেন বঙ্গাল বুদ্ধিপাড়ার নবতর নিবাসীগণ। জনৈক অ্যান্ডার্সনতনয়া নয় কেবল, বুকের সহজিয়া স্থাপনা আর সহজাত সুর নিয়ে দেখা গেল কবিরাও সন্তুষ্ট নন, শুরু হলো অতএব কবিতায়-গানে ক্যারেংব্যারেং কচকচানির হিড়িক। সেই হিড়িকে মদত জোগাইতে অ্যাকাডেমিয়া তো তক্কেতক্কে থাকে ব্যাপক দুনিয়া জুড়েই, বাংলায়ও তার ব্যত্যয় হলো না, উদ্ভট অভিসন্দর্ভের পিঠে চড়ে স্বদেশের উন্নতমানের তরুণ কবিদিগেরেও বৈতরণী পাড়ি দিতে দেখা যাইল। হোয়াটেভার। রুটিরোজগার জুটাইতে যেয়ে এবং সোসাইটিতে থোড়া-সা স্ট্যাটাস হাসিলের নিমিত্তে এমনধারা হাজারেবিজারে ধান্দা আমরা হামেশা করিয়া থাকি যেখানে কবিতা-গান ও অন্যান্য নাজুক ললিতকলা আমাদিগের মারফতে হয় ভূলুণ্ঠিতা। আমাদের থিসিস-স্যুপারভাইজররা যেন গরিবদুঃখী আমাদিগের দিকে মুখ তুলিয়া না-হউক একটু মুখ বেঁকাইয়া হইলেও তাকান, ভূতের যা ভয় আমাদের, আর রামনামও শিখি নাই ভালোমতো। হরি … হরি …

০৩.
‘জোছনাবিহার’ অ্যালবামে সাকুল্যে পাঁচটা গান সঞ্জীবের, বাকিগুলো বরাবরের ন্যায় বাপ্পা মজুমদারের কণ্ঠে তোলা। সঞ্জীবের প্রত্যেকটা গানেই এখানে মৃত্যুচিন্তা এত ঘনসন্নিবিষ্ট ও নিকটসম্পর্ক, সন্দেহ হয়, সঞ্জীব তাঁর নিজের অনুপস্থিতির বীণা নিজে শুনে ফেলেছিলেন বোধহয়। হয়তো, বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন, হয়তো নয়। কিন্তু সঞ্জীবের গানে মৃত্যুসুর আগাগোড়াই ছিল, শুরু থেকেই ছিল, একদম সেই ‘আহ্’ অ্যালবাম থেকেই। ছিল নিজের একমাত্র একক সংকলন ‘স্বপ্নবাজি’ অ্যালবামেও। তা সত্ত্বেও, অন্তিম অ্যালবামে ব্যাপারটা প্রকট, প্রচ্ছন্নতার কোনো আড়াল নাই যেন আর — তার সেই মৃত্যুর-একমাস-আগে-বেরোনো অ্যালবামটাতে। প্রথমদিকের “পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে ফিরেও আসবে না, পাগল রাগ করে চলে যাবে…”  ইত্যাদি গানের সুরের ও পরিবেশনধরনের সঙ্গে শেষের “হাতের ওপর হাতের পরশ রবে না…” গানের ভাবগতিকের ফারাক আরও স্পষ্টগোচর করে তোলা অসম্ভব হবে না। এই বান্দাও একবার চেষ্টা করে দেখতে পারত, তবে এখানে সেই টাইম নাই। ইট ইজ নাও ম্যাক্লুহান মিডনাইট। ভুতুড়ে মধ্যরজনী। ডিগ্রিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থিণী ও স্যুপারভাইজর-প্রোমোটর সকলেই নিদ্রা যাইছেন, তাদিগের নিদ্রার আমরা ব্যাঘাত না-ঘটাই। ইন-শর্ট কথাটা এ-ই যে, মৃত্যুসুর লগ্নি করতে দেখা যায় দুনিয়ার গ্রেইট ক্রিয়েটিভ সকলকেই তাদের নিজ নিজ কাজে, এইটা কেন ঘটে সেই আলাপ আলাদা জায়গার, বাট ঘটে, দেখা যায় যুগে যুগে এমনটা ঘটতে। একটা আন্দাজ এমন হতে পারে যে, একজন অনুভূতিনিষ্ঠ মানুষ যিনি জগতের ভেতরে বাস করে এবং জগতের সঙ্গে যুঝে থেকে একটা আপন জগৎবাড়ি নির্মাণে নিজেরে লিপ্ত-নিয়োজিত রাখেন, তার কাছে এই জগতের নশ্বরতা আর ক্ষণস্থায়িতা প্রায় পীড়নকর প্রতিভাত হয়। এর ফলে বেঁচে-থাকা তার কাছে এক দুঃসহ অথচ মধুরতম ট্রমা বলে বোধ হতে থাকে, তিনি মৃত্যু নিয়া ভাবতে ভাবতে এই ট্রমা থেকে পরিত্রাণ খোঁজেন হয়তো-বা। তাই বলে এমন নয় যে তিনি মৃত্যুডুবন্ত; মরণাচ্ছন্ন নন তিনি, মৃত্যুর আবাহন করা ভালো কোনো শিল্পের কাজ হতে পারে না, ভালো একজন শিল্পী ও তার শিল্পকর্ম শুরুতেই জেনে যায় যে সমস্ত উদযোগ ও উদ্যমের শেষে এক অলঙ্ঘনীয় বিচ্ছেদ অপেক্ষমাণ। কাজেই তিনি কাঁটা দিয়ে কাঁটাটাকে পুষ্পায়িত করার পথ ধরেন, বিষ দিয়ে বিষক্ষয়ে নামেন, মৃত্যুকথার ক্যামোফ্লেজে জীবনেরই মধু মন্থন করে তোলেন। যতক্ষণ জীবনের ভেতরে একজন শিল্পস্রষ্টা, তার কাছে এই জীবনগোলকের ধাঁধাটা ভাঙবার একটা উপায় এর আল্টিমেইট এক্সিটপয়েন্ট তথা মৃত্যু; — ফলে তিনি মৃত্যুসুর ধরতে ব্যয় করেন তার ফুর্তির সবটুকু সময়, মৃত্যুসহনীয় সুর খুঁজে ফেরেন, খোঁজেন মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনের দরোজা। ‘টাইটানিক’ সিনেমার সেই ভায়োলিনবাদকদলের কথা আমরা ভাবতে পারি, নিশ্চিত মৃত্যুমুহূর্তেও সুরচ্ছটা ছড়ানোর কাজ একজন জাতশিল্পীরই, নিরালম্ব নরকতোরণে যেয়েও সুরান্বেষণ করা। কাজেই মৃত্যুসুর সঞ্জীবের গানে খুঁজে পাওয়া আচমকা কিছু নয়। জীবন নিয়ে নাচনকুঁদন, ড্যান্সফ্লোরে সিটি-বাজানো উল্লাস, সবকিছুই দরকারি, কিন্তু দুনিয়া নাচিতেছে নিজেরই ভাবাবেগে নিজেরই নিয়মে, কেবল ক্রন্দনের নন্দন জোগাইতে প্রকৃতি পারে না, মানুষের সৃজনাবশ্যকতা এইখানেই। এই ক্রন্দনে। এইসব মনে হয়। এছাড়া আমরা তো অনবহিত নই যে, আমাদের স্যুইটেস্ট স্যং সেইগুলোই যেগুলো উপহার দিয়া যায় স্যাডেস্ট থট জগতেরে। গানদুনিয়ার এই এক প্রত্যয়, এই এক থিয়োরি বলা যায়, এইখানে-ওইখানে-সবখানে এই এক ফুরিয়ে-যাওয়াজনিত ক্রন্দনাহাজারির উদ্ভাস। সঞ্জীবের গানগুলো স্যুইটেস্ট এই জীবনের স্যাডেস্ট সাউন্ড ও টিউনট্র্যাক ধরে রেখেছে। কান পেতে শোনো ওই নিগূঢ় সুধা-সঞ্জীবনী …

০৪.
কিন্তু মনে থাকবে অনেকদিন সঞ্জীবকে, তাঁর লেখা ও গাওয়া গান, তাঁর সুরসৃজন ও আবহ-আয়োজন ও অনন্য আধুনিক গায়কীর জন্য। সঞ্জীব তাঁর গলার মাদকে আমাদেরে আমর্ম চুবিয়ে, আসক্ত বানিয়ে তাঁর মহুয়ামদ্যভেজা গানে ও গায়নভঙ্গিমায়, অতি অল্পকালের মধ্যে বিদায় নিয়ে নিলেন। এখনও সেই আসরখানা তাঁর আর-কেউ এসে জুড়তে পারেনি। কেউ কারো আসর জুড়তে পারেও না আসলে, যে যার মতো এসে তার নিজের আসর বানিয়ে নেয়। একজন লেখক যেমন, অথবা কবি কি সিনেমাকার বা আঁকশিল্পী, নিজহাতে নেন গড়ে নিজের পাঠক ও দর্শক। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিজনের আলোবাতাসের বাবু সন্দীপন, এ-প্রসঙ্গে এহেন স্মরণীয় বচন দিয়েছিলেন একটি ইন্টার্ভিয়্যুতে : “যে-কোনো ভালো লেখক তার পাঠক তৈরি করে নেয়, আগে থেকে কোনো পাঠক থাকে না। জীবনানন্দ দাশের আগে থেকে কোনো পাঠক ছিল না। অত্যন্ত বাজে লেখক যারা, পুরনো লেখকদের অনুকরণ করে যারা লিখে যান, যেমন, ধরা যাক সুবোধ ঘোষের মতো করে যারা পরে লিখেছেন, তাদের পাঠক আগে থেকেই আছে; কারণ সুবোধ ঘোষই তাদের পাঠক তৈরি করে গেছেন। এ যেন বাপের টাকা খাওয়ার মতো।” কথাসাহিত্য বলি কি সিনেমা বা গানাবাজানাবাদ্য, সর্বত্র ঘটনা তা-ই তো, সরস্বতীর সনে এ-ই বিবাহতরিকা। আমাদের সৌভাগ্য, সঞ্জীব চৌধুরী গীত-ও-সুরারোপিত-ও-সংগীতবিন্যস্ত কাজগুলি পিতৃঋণ-মাতৃঋণ কবুল করে নিয়েই নিজের শালপ্রাংশু শরীর মেলে ধরেছে আমাদের ফিঙেফ্যাসাদ-ও-সারমেয়হুল্লোড়ের আউলাঝাউলা আঙিনায়। এবং মনে পড়বে আমাদের যে, এমন একটা আকালে সঞ্জীবের আবির্ভাব, সুপ্রযুক্ত সুর ও সুপুষ্ট কথাচিত্রের এমন মঙ্গা চলছিল তখন, এমনকি বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ব্যান্ডগানেও যখন ধুম লেগেছিল পুতুপুতু কথা আর নকলনবিশি সুরের, ফলত অনেকটা বাধ্য হয়েই আমরা ভালো ও বুদ্ধিস্নিগ্ধ সহৃদয়স্মিতাবেগ বাংলা গানের কথাচিত্র ও সুরের খোঁজে ইন্ডিয়ান বাংলায় এক্সপেডিশন করে বেড়াচ্ছিলাম ধুমিয়ে দিবারাত। তখন সুমনের পদচ্ছাপ ধরে বাংলা গানের বিপ্লব সাধিত হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গে, ফুটে উঠছিল নতুন বাংলা গানের ভোর, এদিককার বাংলা গানের সবচেয়ে সফল স্থিতাবস্থাবিরোধী ব্যান্ডমিউজিক ম্যুভমেন্ট স্থবিরতার জাবর চিবোচ্ছিল ও চর্বিতচর্বন উগরাচ্ছিল ভোর হইতে গভীর রাত অব্দি। কিন্তু ওই নিরাশানিস্তেজ সময়েও দুইয়েকটা আশার চারা মাথাচাড়া দিয়ে একটু একটু উপরের পানে এগোচ্ছিল বলতে হবে। জেমস্ একলাই বাংলা গানের গ্র্যামার গুবলেট করে দিতে এগোচ্ছিলেন প্রথমত ধীরে, এরপর ঝড়ো পদক্ষেপে। এইটা আমরা দেখছিলাম যে, এমনকি তারুণ্যস্পন্দী ব্যান্ডগানেও, এখানকার মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট ইত্যাদিতে বেশ যুগধর্ম মেনে মডার্নাইজেশনের হাওয়া লাগলেও কথায়-লিরিকে সেই তিতপুরানা মান্দাতা আমলের স্বর্ণযুগ — মান্না দে মার্কা আধুনিক গানের কথা ও ক্রিয়াকলাপ — লিরিকের ভেতর ক্রিয়াপদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেকেলেপনা বা বিশেষ্য অথবা ‘তোরা’-‘মোরা’ বা ধরা যাক সম্বোধন হিশেবে ‘ওগো’ ‘ও প্রিয়া’ বা ‘পাষাণী’-‘বিবাগী’ ইত্যাদি এবং বিতিকিচ্ছিরি ইমেইজারি প্রয়োগ আর তুমি-আমি দ্বৈরথের ফ্ল্যাট প্রেজেন্টেশন — আমাদেরে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত-বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। ঠিক সেই সময়েই অবতরণ করেন ওইদিকে সুমনের পথ ধরে অঞ্জন-নচিকেতা-চন্দ্রবিন্দু-মৌসুমী প্রমুখ, এইদিকে জেমস্ ও ‘ফিলিংস’ তথা পরবর্তীকালের ‘নগরবাউল’ এবং ‘দলছুট’ তথা বাপ্পা মজুমদার ও সঞ্জীব চৌধুরী। ভীষণ মরুখরায় যেন ওয়েসিস, মরুদ্যান যেন সঞ্জীব-বাপ্পার যুগলবন্দী, অন্যদিকে জেমস্ যেন মরুঝড় তথা মায়াবী সিমুম। গুমরি-গরজি ফিরিয়া যাইছিলাম আমরা আমাদের যেসব না-বলা বাণীর তরে দীর্ঘ-দীর্ঘ যত ঘনযামিনী ভরে, জেমস্ ও সঞ্জীবের লিরিক্স ধরেছে এসে সেইসবের অনেকটাই।

০৫.
‘আহ্’ অ্যালবাম দিয়ে শুরু দলছুটের, সঞ্জীবের, বলতে গেলে জেমসযুগে ভিন্ন একধারা বাংলা গানের। উল্লেখ করা দরকার যে, জেমসযুগ ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছেই প্রায়, জেমসের যাত্রা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে, একটা লিমিটেড শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে জেমসের কদর ততদিনে প্রশ্নাতীতভাবে বেড়ে চলছিল। একেবারে হার্ডকোর ব্যান্ডগানের শ্রোতাগোষ্ঠী জেমসে বুঁদ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। ‘জেল থেকে বলছি’, ‘পালাবে কোথায়’, কিংবা ‘নগরবাউল’ নামধারক অ্যালবাম ততদিনে অডিয়োমার্কেটে ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই দিয়ে ফেলেছে, এবং এর আগের প্রাথমিক পর্যায়ের ‘অনন্যা’ বা ‘স্টেশন রোড’ অ্যালবামে জেমসের ভবিষ্যদিনের আবছা আদল পাওয়া যাচ্ছিল বটে। হেনকালে এক ফাল্গুনে, ফেব্রুয়ারিদিনের বইমেলা চলাকালীন, সন ঊনিশ শ সাতানব্বই, পৃথিবীর আলোবাতাসে আসে একজোড়া স্টুডিয়োরেকর্ডেড অডিয়ো সংকলন — বাংলা গানের — একটা ছিল দলছুটের ‘আহ্’ এবং অন্যটা জেমসের সোলো ‘দুঃখিনী দুঃখ কোরো না’ — বাংলাদেশের বাংলাগানে এই দুইটাই ভিন্ন দুই দিবারাত্রি তথা আহ্নিক ও বার্ষিক গতির শুভ মহরৎ ঘটায়। এরপরের ইতিহাস শ্রোতৃবর্গ সকলেরই জানা। তারপর বাংলাগানে, বাংলাদেশের বাংলাগানে, মৃদুমন্দ সুস্থস্বচ্ছ ও রুচিকর বাতাস বইতে শুরু করল। অস্বীকার তো করা যাবে না যে, ‘দলছুট’ ব্যান্ডটি সেই সময়ের তরুণদের সাহস যুগিয়েছে ভালো কিছু কথা ও সুরের বাংলাগান বাঁধতে এবং গাইতে। সেইধারায় ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়েও তরুণ গাইয়েরা নানারকম আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে নিয়ে কাজটা শুরুও করেছিলেন। হতাশাবাতাস ধেয়ে এল অল্পকাল পরে আবারও। অনেকেই একটু পরিচিতি পেয়ে আরও বড় ও ব্যাপক পরিচিতির প্রয়োজনে পথ ঘুরিয়ে নিয়েছেন যদিও, সুস্থতাবাতাস এখনও বহমান। আশা এখনও আছে, আমাদের, সুরসঞ্জীবনের। তবে যদি জিগানো হয়, কেন হেন পরিস্থিতির অভ্যুদয় ঘটিল, ট্রেন কেন ডিরেইল্ড হইল, ম্যাক্লুহানের ময়দা না-ছেনেই কিছু কথাবার্তা লাইটডিগ্রি টোনে বলা সম্ভব। বারান্তরে। এখানে কেবল কথাটা এ-ই যে, এক-দশকের সময়সীমার হ্রস্বাকৃতি শিল্পীজীবন পেয়েও সঞ্জীব তাঁর জাত চিনিয়েছেন, সঞ্জীবস্বাক্ষর গড়ে উঠেছে এই অপরিসর সময়সীমার মধ্যেই, অত্যুক্তি হবে না কথাটা এইভাবে বিবৃত হলে যে এইটুকু সময়ে বাংলাদেশের বাংলা আধুনিক গানের সুরে-বর্ণে-গীতিতে-ছন্দে সঞ্জীবের সিগ্নেচার সমাদৃত হয় এমনকি নগরগণ্ডীর বাইরে ব্যাপ্ত বিশাল বাংলায়। একটাবারের জন্যও সঞ্জীবকে ডিরেইল্ড হইতে দেখা যায় নাই স্বীকার করবেন মনোযোগী ও গীতনিষ্ঠ শ্রোতা সকলেই।

০৬.
সঞ্জীবের গানের একটা ব্যাপার ব্যাখ্যা না-দিয়ে, উদাহরণ-দৃষ্টান্ত ব্যতিরেকে নগ্নভাবে, এইমতো বলা যাক : সঞ্জীবের সুর শুনলেই মনে হয়েছে কোথায় যেন শুনেছি সুরটা, আহা! যেন জনমজনম চেনা, তবু কোথাও ধরা যাচ্ছে না যেন গোধূলিবিকেলের ঘুলঘুলিতে চড়ুইপাখির মতো! সবসময় মনে হয়েছে আমার, যে, এই সুর ভেসে আসছে “কোন সুদূরের ওপার হতে”, যেন আমার ছেলেবেলা ছেনে! সঞ্জীব এমনকি যখন কোনো পরিচিত বিদেশি শিল্পীর গানের ধুন তাঁর নিজের গানের মুখে বা প্রেলিউডে-ইন্টার্লিউডে ব্যবহার করেছেন খুব কদাচিৎ, কিংবা তাদের গিটারের ছোট্ট কোনো টুকরো, অ্যাক্নোলেজ করেই অবশ্য, সেই জায়গাটা বাংলা মাটিবৃষ্টিই হয়েছে, বিদেশি থাকেনি আর। এই মুহূর্তে স্মৃতি থেকে নিচ্ছি একটা এক্সাম্পল, প্রথম অ্যালবামে লেড জেপ্লিনের ধুন নিয়ে করা “ওকে দাও ফিরিয়ে দাও, তার হারানো গিটার আর হৃদয়ের ঝঙ্কার” গানটা, মৃত বন্ধুর স্মৃতির সম্মানে গাওয়া সেই গান, আজও অনবদ্য। এইধারা কাজ প্রভূতভাবে, সফলভাবে, করেছেন কবীর সুমন। সিগার আর ডিলান আর রোবসনের খুব পরিচিত কিছু ব্যালাড আঙ্গিকের গান সুমন এমনভাবে অন্তরা-আস্থায়ী ও সঞ্চারী জুড়ে পুরাদস্তুর বাংলা করে তুলেছেন যে, অ্যাক্নোলেজ করা না-থাকলে কোনোভাবে বোঝার কুদরত নাই এইটা ডিলান প্রমুখের কোনো গান অবলম্বী। কিংবা হালফিল কারো কারো গানে, যেমন ‘জলের গান’, এমন ছেলেবেলামাখোমাখো সুর পেয়েছি স্বীকার করব সানন্দ সুস্মিতচিত্তে। শেষোক্ত দলটির অ্যালবাম বাজারে উঠেছে বেশিদিন হয়নি, কিছু কিছু গানে বেশকিছু স্থলে এরা গ্রামীণ পটভূমির সঙ্গে সাযুজ্যসুন্দর এমনকিছু কারুকৃতি দেখিয়েছেন যে, এই বিতিকিচ্ছিরি নিতিদিনকার জীবন লহমায় শৈশবমুখর হয়ে ওঠে, এবং ওই বিপুলা বিস্ময়সুরের জায়গাগুলোতে যেয়ে আমরা বিপন্ন-তোলপাড় হরষে বুঁদ হয়ে রই। ঠিক এক-দুই জায়গায় নয়, এমন কয়েকটা জায়গা পাওয়া যাবে অতল জলের গানগুলো শুনতে শুনতে, একটা আপাতত শোনাই : “আয় আয়, আয় আয় চাঁদ, জোছনাআলোয়-মাখা আঁধারকালো রাত” — এই লিরিকাংশের সুরে সেই কবেকার আমার সন্ধেবেলার হাঁসডাকা “আআআয় চৈ চৈ … চৈ চৈ …” শৈশবটাকে পেয়েছি। জিনিশটা আরও পোক্ত-পরিপাটি রূপ পরিগ্রহ করেছে এই গানদলের নিউলি-রিলিজড্ ‘পাতালপুরের গান’ সংকলনে, যেখানে এরা যা করতে চাইছেন তা আরও বলিষ্ঠভাবে করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে এইভাবে এই কায়দায় নিছক ঐতিহ্যানুবর্তন সুন্দর কিছু সুরঝরা হাহাকার অথবা শান্তিস্বস্তি তৈয়ার করে নিশ্চয়, এবং মরমিয়া ভাবান্দোলনও সম্পন্ন হয় বেশ, সেইসঙ্গে এও মনে রাখা আবশ্যক যে এ-ধারার ভাবাবদ্ধতা বাংলা গানকে ফের একটি বৃত্তঘূর্ণনেই নিয়ে যেতে পারে। এ-বাবতে এইখানটায় আলাপোত্থাপন অতিপ্রসঙ্গ হবে। যেমন সঞ্জীব তথা ‘দলছুট’,  তেমনি ‘জলের গান’ তথা রাহুল আনন্দ ও কনক আদিত্য প্রমুখ, শৈশবসুর লগ্নিকরণে সফল। বলবার কথাটা হলো, শৈশবজাগৃতি। শিল্পের কাছে, গানের কাছে, কবিতা বা সিনেমার কাছে এরচেয়ে বেশি কিছুই চাই না আমি। সঞ্জীবে এই জিনিশ বহুবার বহুভাবে পেয়েছি, ফলত সঞ্জীব গলায় তুলে লয়েছি দ্বিধাহীন, দুইয়েকটা দৃষ্টান্ত তো দেনা থাকিয়া যায়। একটা দেনা না-চাহিতেই শোধ করে দেই। যেমন, টোকন ঠাকুরের বেশকিছু বাণীচিত্রে একদা সুরনীল মণিহার পরায়েছিলেন সঞ্জীব, যেমন ধরা যাক একটা লিরিক : “হাওয়া রে তুই বাজা নূপুর / হাওয়া রে তোর বউ কি ঝুমুর / গানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে / বিষণ্ন সেই একলা দুপুর” — এই গানের সুরাশ্রয়ে ছেলেবেলার হল্কায়ে-জিকির বহুদিন বাদে কানে ফিরেছে আবার। আমরা যারা গ্রামে থেকেছি এ-জীবনে, এই নিধুয়া হাওরের মায়াসভ্যতার দেশে, আমরা নিশ্চয় পাশরিয়া যাই নাই যে, গেল-সহস্রাব্দীর অন্তিম শতকের প্রান্তদশকে বাংলা গ্রামঘরগেরস্তালিতে বেশকিছু নিত্যকৃত্যাদি ছিল যা আজ লুপ্ত-পূজাবিধির ন্যায় নিঃশেষ। সেইসব রিচ্যুয়ালের একটি ছিল সন্ধেবেলা ইশকুলের পড়া করতে বসার আগে একান্নবর্তী হাউজহোল্ডের একদঙ্গল ভাইবোনকাজিন একতলা বাড়ির বারান্দার সিমেন্টমেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে মিনিট-দশেক সুরচিৎকারে জিকিরাজগার করা, তারপর মাগরেবের ওয়াক্ত শেষ হলে পরে গুমড়োমুখে হোমওয়ার্ক করতে বসা, রাত আটটা বাজার আগেই শুরু হতো ঘুমঢুলুনি। জিকিরের ওই মিনিট-দশেক সময়টুকু, সত্যি, কৈশোরে একটু হলেও সুরবোধ জন্ম দিয়েছিল মৎসদৃশ অসুরেরও মনে, এইটা আজ বুঝতে পারি। সেইসব সান্ধ্য জিকিরের কোনোটা ছিল হামদ্-নাত্, কোনোটা কাওয়ালি, কোনোটা-বা ক্বাসিদা-মার্সিয়া ও গজলাঙ্গিকী। বহুদিন বাদে সেইসব জিকিরের সুরচূর্ণ সঞ্জীবের কোনো কোনো গানে এসেছে চকিতে ফিরে। একাধিক গানের টুকরো-ট্র্যাক থেকে এর পক্ষে এক্সাম্পল টানতে পারি। একটার কথাই না-হয় বলি, এখানে বেশি জায়গা না-নিয়ে একটাই কুল্লে। সেই-আমার ছেলেবেলায় একটা জিকিরের শ্লোকপঙক্তি ছিল এ-রকম : “আল্লা আল্লা আল্লাহু, লা ইলাহা ইল্লাহু” — এই আদলের সুরের উঁকি সঞ্জীবের “হাওয়া রে তুই বাজা নূপুর” গানটাতে শুনতে পেয়েছি। কিংবা “তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও, করি প্রেমের তর্জমা / যে-বাক্য অন্তরে ধরি, নাই দাঁড়ি তার নাই কমা” — এই গানের সুর লক্ষণীয় এতদপ্রসঙ্গে। এছাড়া ‘বায়োস্কোপ’ ইত্যাদি হিউজ-হিট গানগুলোতে এই-রকম শৈশবাচ্ছন্ন সুরের সৃজনোজ্জীবক প্রয়োগ অম্লান আজও। মোদ্দা কথা, সঞ্জীবের ছোঁয়া-পাওয়া যাবতীয় সুরের ভেতর এই ব্যাপারটা আমাদের নজর এড়ায় না যে, যেভাবেই হোক-না তার শৈশব তথা তার শৈশবের সুর জায়গা করে নিয়েছে তার সমস্ত রচনাকাজে, নেভিগেইট করেছে সঞ্জীবকে সবসময় তার শৈশবে-শোনা আচ্ছন্নকর সুরগুলো, ধুনগুলো, গুনগুনগুলো। কথাটা খানিক অন্তরঙ্গরকমেই হৃদয়ঙ্গম করবেন তারা, যারা বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট তথা বানিয়াচং-হবিগঞ্জের লোকমুখাশ্রিত সুরগুলোর সঙ্গে অ্যাক্যুয়েইন্টেড, এতদঞ্চলের জলের গানগুলোর সঙ্গে পরিচিত, অরিয়েন্টেশন রয়েছে হেথাকার নিত্যপুরাণের সঙ্গে, একটা আন্দাজ রয়েছে গোটা এই জনপদটা সম্পর্কে। এমন নয় যে একেবারেই র’ ফর্ম্যাটে যেমন-আছে-তেমন সুরে উপরি লিরিকের কথাগুলো উড়িয়ে এনে জুড়ে দিয়েছেন তিনি যদৃচ্ছা গানে যেখানে-সেখানে, যেমনটা আমরা করতে দেখি হামেশা ইন্ডাস্ট্রির মহামহিম মিউজিক কম্পোজারদিগেরে, যেমনটা তারা করে থাকেন হরদম রিমেইকের নামে বা ফিউশনের দোহাই পেড়ে। এইখানেই ইউনিকনেস্ খুঁজিয়া পাওয়া যায় সঞ্জীবকৃত সুরায়োজনের। সঞ্জীব রক্তটুকু নেন, অথবা অন্যভাবে যেতে পারে এমনও বলা যে সঞ্জীব ততটুকুই নেন যতটুকু লুকিয়ে ছিল রক্তজারিত হয়ে ভেতরে মিশিয়া তার। অযথা বাউলসম্রাট বা গ্রামগীত বা ফোকলোর বা মাটির গান নিয়া আদেখলাপনা নাই তার মধ্যে। তেমনি সিটিড্যুয়েলার হবার কারণে চুল-দাড়ি দিয়া নাক-চোখ বন্ধ রেখে লেফ্ট-রাইট না-তাকায়ে ক্র্যাশরক্-সাইকেডেলিক-ব্ল্যুজ-ফাঙ্কি মিউজিক করে যাওয়ার দুরারোগ্য ব্যামোও অনুপস্থিত ছিল সঞ্জীবে। ব্যাপার তো এ-ই যে — যেমন-যখন-দরকার, তেমনই-তখন-করবার — এ-ই তো মূল কারবার, সুরের বা সাহিত্যের বা সিনেমার সৃজনযজ্ঞে এ-ই তো গোড়ার কথাটা। খামাখা আনুনাসিক সুরে প্রেমকান্না ‘আমারও দেশেরও মাটিরও গন্ধ বস্রাই-গোলাপের চেয়েও সুমিষ্ট’ ফোঁপাইবার তো দরকার নাই। শিল্পে ও সুরে ঐতিহ্যের অনুশাসনের নিগড় সম্পর্কে সঞ্জীব আগাগোড়া জানতেন বলেই ভাবতে ভালো লাগে। যেটুকুর সঙ্গে ছিল তার যাপনের যোগ, সেটুকুই তিনি নিয়েছেন। শৈশব থেকে নেয়া অংশটুকুই সঞ্জীবকে সঞ্জীব করে তুলেছে, তা না-হলে হতেন তিনি নামজাদা কোনো ভুঁইফোঁড় রকার বড়জোর। মনে পড়বে একটা আত্মজৈবনিক বর্ণনাংশ একজন কথাকারের, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তিনি, ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ শিরোনামের লেখায় এমন একটা বাক্য লভেছিনু : পকেটে যার শৈশব নেই, প্রতিভার নদীতে তার সাঁতার কাটতে যাওয়া বৃথা। বাক্যটা হুবহু উদ্ধৃত করা যায় নাই, কিন্তু কথাটা তা-ই। শ্যামলবাক্যের এক্সটেনশন করা যায় এইভাবে যে, যার গাঁটে যত বেশি শৈশব, সে ততই দলছুট, সে ততই অ্যালিয়েন। সঞ্জীবের শৈশবই সঞ্জীবকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে এত অপার্থিব সুরমূর্ছনা, করিয়ে নিয়েছে এত অল্প সময়ের সীমা ও বাহুল্যমুক্ত আয়োজনের ভেতর।

০৭.
দলছুটের অভিষেক ঘটে ‘আহ্’ অ্যালবাম দিয়ে। এই অ্যালবাম প্রকাশের সময়টায় বাংলাদেশের গানে, এমনকি তারুণ্যপ্রগতিঋদ্ধ ব্যান্ডগানেও, চলছিল কাব্যদ্যোতনামণ্ডিত কথা ও সুরের খরা। ‘আহ্’ অ্যালবামের গানের কথাবস্তু ও সুরকাঠামোতে দেশজ অনুষঙ্গের মেধাদীপ্ত প্রয়োগ লক্ষ করা যায়, এবং এরই ফলে বলতে গেলে আমাদের প্রজন্মের গানোন্মাদ শ্রোতারা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে একপ্রকার বাধ্য হয় দলছুটের দিকে। এরপর ‘দলছুট’ থেকে একে একে বের হয় ‘হৃদয়পুর’, ‘আকাশচুরি’ এবং অন্তিম অ্যালবাম ‘জোছনাবিহার’। দশ বছরের পার্ফোর্মিং ক্যারিয়ার — ১৯৯৭ টু ২০০৭ — এর মধ্যে ব্যান্ড ব্যানারে চারখানা অ্যালবাম ও ‘স্বপ্নবাজি’ শিরোনামক সঞ্জীব চৌধুরীর ওয়ান-অ্যান্ড্-ওনলি সোলো অ্যালবাম — খুব অতিপ্রজ বলা যাবে না, আবার কমও নয়। কেননা আমরা দেখেছি যে, সেই সময়টায় একদম মোচ্ছব লাগিয়াই ছিল মিক্সড অ্যালবাম নামের এক-ধরনের অ্যাক্টিভিটিতে ব্যান্ডগুলোর হুমড়ি খেয়ে পড়বার, যার ফলে এক্সটেন্ডেড একটা পপ্যুল্যারিটি ব্যান্ডগুলোর কপালে জুটেছে ঠিকই, কিন্তু মুখ ফিরিয়েছে একইসঙ্গে ব্যান্ডের দীক্ষিত ও হার্ডকোর শ্রোতা, এও অসত্য নয়। এমনিতে দেখতে গেলে দেখা যাবে যে এই মিক্সড অ্যালবাম অ্যাক্টিভিটি এসে ব্যান্ড মিউজিকটাকে বেশ বেগবান করেছে, ব্রেক-থ্রু দিয়েছে, দৃশ্যত তা-ই কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ব্যান্ডগুলো কোমর ভাঙতে শুরু করে এই সময়ে এই পয়েন্টে এই মিক্সড পগারের পারে এই মিশ্র মুড়ি-নাড়ু দশমেশালির ফেরেব্বাজিতে পড়ে। ব্যবসাটা খানিক বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু গরিষ্ঠ লভ্যাংশ ঢুকেছে যেয়ে ক্যাসেটকোম্প্যানিগুলো তথা সাউন্ডটেক-সংগীতা-সারগাম প্রভৃতি তৎকালীন অডিয়োরেকর্ডিং হাউজের ক্যাশবাকশে। মাঝখান থেকে ব্যান্ডগুলো খুইয়েছে তাদের মিউজিক্যাল কমিটমেন্ট, মুহূর্মুহূবর্ধমান বাজারচাহিদার উনোনে লাকড়ি জোগাইতে যেয়ে ব্যান্ডগুলোর পরিচয়স্বাতন্ত্র্য খসে যেতে যেতে একসময় বনেদওয়ালা ব্যান্ডগুলোও পর্যবসিত হয় রিমেইক ও রিমিক্সপ্রধান মেশিনে। ম্যাস্-কম্যুনিটি রিচ্ করতে যেয়ে ব্যান্ড হারাতে থাকে তার আপনকার সিগ্নেচার ও আইডেন্টিটি। কিন্তু ‘দলছুট’ এহেন হুজ্জোতির কালেই বিকশিত হতে থাকে, এবং সর্বজনতোষিত হইবার প্রলোভন ওভার্ল্যুক করেই, এ-সময়ের মিক্সড অ্যালবাম কাল্চারে দলছুটের পার্টিসিপেশন দুইয়েকবার ছাড়া চোখে পড়ে না। আর এর মধ্যেও লক্ষণীয় যে, দলছুটের দুই ইক্যুয়ালি-ইম্পোর্ট্যান্ট কান্ডারির একজন বাপ্পা মজুমদার তার নিজের আলাদা ক্যারিয়ার সুশোভন ফুলবেলপাতায় নিচ্ছেন সাজায়ে, মিক্সড অ্যালবামগুলোতে বাপ্পা পার্ফোর্ম ও কন্ট্রিবিউটও করছেন দুইহাতে দেদার, প্রোফেশন্যালি মিউজিশিয়ান হবার কারণে ব্যান্ডের বাইরেও বাপ্পার সক্রিয়তা রিক্যোয়ার্ড ছিল অবশ্য। সঞ্জীব ছিলেন, আমরা দেখেছি, বিলকুল দলছুট। দুইটি কি একটি মিক্সড অ্যালবামে দেখা যায় তিনি টিউন করছেন, এর মধ্যে টেরিফিক একটা গানের লিরিক মনে পড়ে এ-রকম : “বুলবুলি গান গায় বকুলেরও ডালে / ভ্রাম্যমাণ ভ্রমর বসে গন্ধরাজগালে” — এবং ‘কালা পাখি’ নামে ডাকা এই গানটা আস্থায়ীতে এ-রকম :  “কালা পাখি শোন তোর চোখ-কান কিছু নাই / মনেরও ভেতরে মাঝি তোমার রাঙা নাও বাই” — লিরিসিস্ট সঞ্জীব নিজেই কি না তা বলতে পারছি না। তবে সুর সঞ্জীবের, এবং সনাক্তযোগ্যরকমেই সঞ্জীবীয়। এই ব্যাপারটা, সঞ্জীবীয় সুর ব্যাপারটা, খানিক সবিস্তার বলার চেষ্টা চালানো যাবে নেক্সট কোনো-একটা প্যারাগ্রাফে। একটা মামুলি ইনফোর্মেশন দিয়ে এই প্যারাগ্রাফ থেকে বেরোব। দল ও সোলো উভয় জায়গা মিলিয়ে সঞ্জীব চৌধুরীর গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘গাড়ি চলে না’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘আমি তোমাকেই বলে দেবো’, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইসে’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘শাদা ময়লা রঙিলা পালে’, ‘হৃদয়ের দাবি’, ‘রিকশা কেন আস্তে চলে না’, ‘চোখ’, ‘নৌকাভ্রমণ’, ‘কথা বলব না’ প্রভৃতি।

০৮.
কিন্তু অর্বাচীন ম্যাক্লুহানবাচালতা এইবার থামাতে হয় যে! হ্যাঁ। ভুলে গেলে চলবে না, সঞ্জীব ছিলেন কবি। আশির দশকের লিটলম্যাগাজিনগুলোতে তাঁর কবিতা ছাপা হয়েছে বেশ নিয়মিত। পরে এইসব পূর্বপঠিত কবিতার বেশকিছু অনবদ্য সুরারোপ পেয়েছি আমরা তাঁর হাত থেকে। যেমন, যদ্দুর মনে পড়ছে, সানগ্লাস  গানটা। “দেয়ালে তোমার ছবি, অন্ধকার / তুমি ছায়াঘেরা সুদূরের মুখ / বাগানে দাঁড়িয়ে আছো, স্মৃতির পাথর / ওই পাথরের চোখে সানগ্লাস” … ইত্যাদি লাইন দিয়া সানগ্লাস  গানের শুরু। কোনো-একটা লিটলম্যাগে এইটা আগেই পড়েছি ইয়াদ করব। সঞ্জীবের একটামাত্র বই বেরিয়েছিল, তাঁর গায়ক পরিচিতির আগে, গল্পের বই। সেই বইয়ের নামটাই জানি আমি, বিজ্ঞাপনে দেখেছি বিশবছর আগের কোনো ছোটকাগজে, নামটা বড় সুন্দর : রাশপ্রিন্ট । সঞ্জীব চৌধুরী, মৃত্যুর পর বিভিন্ন মিডিয়ায় ট্রিবিউটগুলো পড়ে জেনেছেন সকলেই, ছিলেন তুরন্ত্ মেধাবী। বিদ্যায়তনিক পড়াপড়িতে শীর্ষস্থল দখল করেছিলেন পরীক্ষারেজাল্ট দিয়ে। উচ্চতর অধ্যয়নের অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন ছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা। কাজেই ডিফিকাল্ট ছিল না তার পক্ষে ম্যাক্লুহানের থিয়োরি দিয়া আখাম্বা কায়দায় বাংলা গানের ভাবসম্পদ ও শৈলী বিচার। খোদাতালার অশেষ রহমতে, এবং বাংলা গানের কপালজোরে, এমন বদকিসিম কীর্তি তিনি করেন নাই। কিন্তু পেশাগত ক্ষেত্রে তিনি তার বিদ্যা ও দক্ষতার ব্যবহার করেছেন সপ্রেম। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের দৈনিকী নিউজপেপারগুলোতে একটা তারুণ্যস্পন্দিত খোলা হাওয়া আমদানি হয়েছিল যাদের হাত দিয়ে, সঞ্জীব ছিলেন তাদের অন্যতম। দৈনিকের ফিচার পাতাগুলো, বিশেষভাবে এন্টার্টেইনমেন্ট ফিচারগুলো, হপ্তান্তিক পাঠক-পার্টিসিপেশনমূলক পেইজগুলো সঞ্জীবের হাতে ব্যাপকভাবে ক্রিয়েটিভ ও নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করেছিল — ওই শ্রীধারা আজও বহমান — সকলেই স্বীকার করবেন এই বিবৃতি, যারা নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রজগতে সূচিত তরুণোদয় সম্পর্কে সম্যক ওয়াকেফহাল। তবে এইসব বড় কথা নয় তেমন; বড় কথা হলো, সঞ্জীব ছিলেন সর্বাংশেই সুরে সমর্পিত সংগীতশিল্পী। নিজের অন্তরের স্বপ্নেই তিনি বিভোর ছিলেন সমাজে, উল্টোটি নয়; সমাজের চাপিয়ে-দেয়া স্বপ্নে তিনি নৃত্য করেন নাই, বিদ্বৎসমাজের ভড়ং হইবার খোয়ায়েশ ছিল না বলেই তিনি শিল্পীজীবন যাপন করে যেতে পেরেছেন, সম্ভবত।

০৯.
বলা হচ্ছিল যে, মৃত্যুর আগে অ্যালবাম ভরে কেবল মৃত্যুসুর পুরে রেখে গেছেন সঞ্জীব, বিদায়বারতা লাইনে লাইনে জোছনাবিহারে বেরোনোর অভিযান-প্রাক্কালে। এইটা এই নিবন্ধকারের উর্বর মস্তিস্কসঞ্জাত খোঁজপাত্তা বলবেন আপনি, ঠিক তা-ই, বটে। সেক্ষেত্রে একবার ফের অ্যালবামটা শুনে দেখা দরকার হবে আপনার। প্রত্যেকটা গানেই, সঞ্জীবের গাওয়া, নস্ট্যালজিয়্যা আর মেলাঙ্কোলিক টিউন লক্ষ করুন, শুনুন লিরিকে ব্যক্ত ও অব্যক্ত বাণীর ইশারাভাস। দুই-একটা থেকে এখানে নজির কয়েক লাইনে : “এই কান্নাভেজা আকাশ আমার ভালো লাগে না / থমকে-থাকা বাতাস আমার ভালো লাগে না / তুড়ির তালে নাচতে থাকা ভালো লাগে না / এই মরে মরে বেঁচে থাকা ভালো লাগে না” … আপনার বুঝি ভালো লাগে, হে আল-ক্বাপোন, বলুন, ভালো লাগে এই মরে মরে বেঁচে-থাকা? বা সেই-যে বন্ধুর সঙ্গে চিরবিচ্ছেদের ক্ষণ ও অভিজ্ঞান নিয়া গানটা : “হাতের উপর হাতের পরশ র’বে না / আমার বন্ধু, আমার বন্ধু হবে না, হবে না / হাতের উপর হাতের পরশ রবে না / শিশির ঝরবে সকালবেলা / আমাকে তুমি করবে হেলা / আমাকে ভালোবাসবে ঠিকই কিন্তু আমার হবে না” … আহা! শঙ্খ ঘোষের কবিতা ম্লান হয়ে যাবার মতন দুর্বিষহ গানকথা! বা আরেকটা গান যেমন : “এই সময়ের ক্রীতদাসদের মুক্তি দিও / প্রভু, আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও” — প্রভৃতি প্রার্থনা ও আকুতি ও অনুনয় ও মৃদু অভিমানফোঁটাগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে যেনবা গানগুলোর গা থেকে। এইসব এমনকিছু গুরুত্বপূর্ণ খোঁজপাত্তা না অবশ্য।

১০.
সঞ্জীব চৌধুরী, সো-ফার অনুমান করি, ছিলেন আগাগোড়া সুরগ্রস্ত লোক। সুরগ্রস্ত, সুরের ঘোরে গ্রস্ত, অন্য কোনো গ্রস্ততার ব্যাপার অবশ্য শ্রোতার পক্ষে এন্ডোর্স অথবা আন্দাজ করা বাহুল্য-কল্পনা। আর এ-লেখা আদৌ তেমনধারা অ্যানেকডোটাল হয়ে উঠতে চাইছেও না। গানের জন্য বইয়ে দিয়ে একটি জীবন, ‘ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়া স্বপ্নের ওই পাখি ধরতে’ চেয়ে কেটেছে যে-জীবন, ‘স্বপ্নেরই’ ও ‘অন্তরের কথা বলতে’ চেয়ে যে-জীবন ফুরায়েছে, সেই জীবন সার্থক এমনিতেই, কিংবা আমাদের সমস্ত মোটাগাট্টা গ্র্যান্ড-মেটা মানদণ্ডে নিষ্ফল ও নিরর্থক। অর্থ নয়, প্রতিপত্তি নয়, ধরণী চাহিছে কেবলি হৃদয় — এই কথাটা সত্যি হোক অথবা ডাহা মিথ্যে, সঞ্জীব চৌধুরী হৃদয়পুরের এহেন জটিলতায় করিয়া গিয়াছেন খেলা আমৃত্যু। সঞ্জীবের হৃদয়খেলার সবচেয়ে ভালো ডক্যুমেন্টেশন তার গান, সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত দলিলায়ন তার সৃজিত সুরগুলো, সঞ্জীবাবয়ব সবচেয়ে সুন্দর ধরা পড়েছে তার স্বরচিত অথবা স্বনির্বাচিত সংগ্রহের লিরিকে। কেবলই নিজের লিরিকে সুর দিয়ে গেয়ে যাওয়ার কোনো ধনুর্ভঙ্গ পণ সঞ্জীবের ছিল না, লিখিয়ে নিয়েছেন তিনি একের-পর-এক লিরিক তৎকালীন বাংলাদেশের উঠতি ও প্রায়-আনকা কবিদেরে দিয়ে; এবং সেইসব লিরিকে সুর পরানোর পর হয়ে উঠেছে সেসব অবিসংবাদিত সঞ্জীবীয়। কবির পুনরাগমন ঘটেছে বহুদিন পর, বাংলাদেশের বাংলা গানে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে কবিতার। এখানে উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক নয় হয়তো, কবিতাচিত্রকল্পসম্পন্ন কথাবস্তু সুরারোপন এক জিনিশ, আর লব্ধপ্রতিষ্ঠ কোনো কবিতায় সুরারোপন সম্পূর্ণ অন্য। ঝুঁকিবহ বেশি দ্বিতীয়টা। বাংলা গানে এই দুই কাজই বিস্তর হয়েছে বারবার। সফল হয়েছেন অনেকে এ-কাজে, কেউ-বা ব্যর্থ। গণসংগীতে এমন উদাহরণ প্রচুর, যেখানে কবিতায় সুরারোপন হয়েছে সরাসরি ও সাক্সেসফ্যুলি, যেমন প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানবাদ্য — ফরাসী কবি জাক প্রেভের থেকে শুরু করে বাংলার বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং নীরেন্দ্র-শক্তি কিংবা চাইনিজ ও আফ্রিক্যান লোককবিতায় এমনকি কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো সুর পরিয়ে গেয়েছেন দুর্দান্ত। কবীর সুমন করেছেন সফল বেশকিছু কবিতার গানরূপ, শহীদ কাদরী ছাড়াও এমনকি বিভূতিভূষণের নিসর্গপ্রধান গদ্যরচনাতেও সুমন দুর্ধর্ষ সুর পরিয়ে দেখিয়েছেন, সুমনের নিজের লেখা গানগুলো তো ওজনে-আঙ্গিকে কবিতাই বলা বাহুল্য। অত সফল না-হলেও অনেক জীবনানন্দকবিতায় সুর পরিয়েছেন বাংলাদেশের অজিত রায়। এছাড়া অন্যের সুরারোপনে লোপামুদ্রা মিত্র ও নিজের সুরসৃজনে মৌসুমী ভৌমিক প্রমুখ অনেকেই এ-কাজে কৃতিত্ব দেখায়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের ব্যান্ডগানেও অনেক নজির পাওয়া যাবে এ-ধারা কাজের, যেমন শামসুর রাহমান ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় স্মরণীয় সুর ও সংগীত যোজনা করে দেখিয়েছেন জেমস্। রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান ও আরও কারো-কারো কবিতা বাংলাদেশের ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানরা গানের পোশাকে বেশ সুখদভাবেই হাজির করেছেন শ্রোতার সামনে। এক্ষণে সঞ্জীবের অন্তত দুটো কাজের উল্লেখ অত্যাবশ্যক। তখনও-তরুণ সাজ্জাদ শরিফের একটা পাঠক-পরিচিত কবিতায় সুর দিয়েছিলেন সঞ্জীব, শরিফের বহু-বিলম্বে-বেরোনো অভিষেক কবিতাপুস্তক ছুরিচিকিৎসায় যে-কবিতাটা জায়গা করে নিয়েছে পরে, সেই বইয়ের নামকবিতাটাই গান হয়েছে, এইটা গান হবার আগ পর্যন্ত কল্পনা করাও দুরূহ ছিল যে এমন টেক্সট রূপান্তর করা আদৌ সম্ভব সুরে — এহেন দুর্ধর্ষ সুরে; তেমনি জাফর আহমদ রাশেদের যজ্ঞযাত্রাকালে  কবিতাবই থেকে একটা কবিতা প্লাক করে গান বানায়েছিলেন সঞ্জীব। দুটোই অভাবিত ও অনবদ্য কাজ। মূল কবিতাটা অবিকল রেখে, কোনোপ্রকার শব্দ জুড়িয়া না-দিয়া বা পঙক্তিবিকলন না-ঘটিয়ে, এহেন সফল সুরারোপন উদাহৃত হইবার মতো ঘটনা। তাছাড়া কামরুজ্জামান কামু ও টোকন ঠাকুর সরাসরি গীতিপঙক্তি রচেছেন এবং সঞ্জীব সুর ও সংগীতায়ন করেছেন ঈর্ষণীয় ঔজ্জ্বল্য, যথাযথ স্নিগ্ধতা ও নন্দনশোভা বজায় রেখে। এই সমস্তকিছুই শিল্পী সঞ্জীবের সুরমনীষার প্রামাণ্য নজির। শুধু কব্জির জোর প্রদর্শনেই কম্ম সারা — না, সঞ্জীব অমন কম্মকার নন; উল্টাপাল্টা বাদ্যযোজনা বা প্রাচ্য-প্রতীচ্য সংমিশ্রণ প্রভৃতি দেখানোপনার ধার তাকে দেখা যায় নাই ধারতে। এ-ই তো, সঞ্জীব, আর নীল লাল রূপালি নীরব ।

১১.
সঞ্জীবগীত দুর্দান্ত গানগুলোর অধিকাংশ স্বরচিত, একাংশ অন্য কবিতাকার কাউকে দিয়ে লেখানো এবং বেশকিছু রয়েছে যৌথ রচনাও। “পাতালের মেয়ে সূর্য চেনে না / আঁধার তাহার ভাই / প্রজাপতি বলে বুকে নাও তারে / আলোয় তারে সাজাই / … / কে তবে জ্বালায় ছায়ার শিখাটি / কার মুখ চেয়ে থাকো / আজও ডানাভাঙা একটি শালিখ / হৃদয়ের দাবি রাখো” — কোমলা বিষাদে মেদুর সুরেলা গানটার এক-জায়গায় যেয়ে পাওয়া যায় এহেন কল্কে : “কে হায় বসিয়া অঙ্গ ভরিয়া / গোধূলির মায়া মাখো” ইত্যাদি — ছিপছিপে এই লিরিকের গীতটুকু মনে হয় লিখেছিলেন কামরুজ্জামান কামু, সুর ও গায়ন সঞ্জীব চৌধুরীর। বলার দরকার ছিল না যদিও, তবে সঞ্জীব নিজে যেহেতু সত্যিকারের একজন ভালো স্যংরাইটার ও সিঙ্গার, কাজেই এইক্ষেত্রে সঞ্জীবের লিরিক্সই সঞ্জীবের ক্রেডিটে প্রকাশ থাকা ভালো। যারা গান লেখেন না,  শুধু গলায় তোলেন, তাদের ক্ষেত্রে গীতিকারনামের জায়গায় প্রেজেন্টরের নাম থাকলে তেমন কোনো অশুদ্ধ হয় না ভারতভূখণ্ড। সঞ্জীবের অন্যান্য গানেরই মতো এই গানটাও আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল সেইসময়, এখনও সমান প্রিয়, খুব সঙ্গ দিয়েছে একসময়, এখনও দেয়, এবং আমাদের পরবর্তী জেনারেশনেও সঞ্জীবগানের সুরসংক্রমণ ও লিরিকনিহিত কবিতাগুণ গ্রাহ্য হয়েছে দেখতে পাই। কিন্তু গোড়াতে এই কথাটা বলে নেয়া দরকার ছিল যে, সঞ্জীবগানের কথা বা সুরের চেয়ে বরং তার গায়নশৈলী অধিকতর স্পর্শ করেছিল আমাদেরে, এলায়িত-মাতাল অথচ মগন-গহন মার্জিত পথ ধরে রেন্ডিশন বহুদিন বাদে বাংলাদেশের গানে — সেইফ সাইডে থাকার জন্য বলা যাক ‘পপ’ তথা পপুলার বাংলা গানে — ফিরেছে সঞ্জীব চৌধুরীর বদৌলতে। এমন আরও কয়েকটা গান শোনার স্মৃতি লিখিয়া যাওয়া যাইতেই পারে। যেমন সেই-যে একটা গান, যার মাঝখানে যেয়ে এমন এক স্তবক বক্ষ-মোচড়-দেয়া : “আমার বুক দেখাব তোকে / বুকে রয়েছে বিদ্যুৎ / কিছু করলি মনে? — ধুৎ! / আমি খেয়েছি স্বপ্নকে / … আমার বন্ধু ছিল আকাশ / কেন দ্বিধার চোখে তাকাস / আমি মেঘের ছোট ছেলে / কোলে আমাকে আজ পেলে” — এই গান শোনার সময় আমাদের অনেকেরই বয়স ছিল সাতাশ, মনে পড়বে, এবং অনেকেই আমরা কারো-না-কারো সনে মিতা পাতাবার তরে ছিলাম জীবনপণ উদগ্রীব। সেই সময়েই এ-গান : “আমার বয়স হলো সাতাশ / আমার সঙ্গে মিতা পাতাস / তোর দু-হাত চেপে ধরি / চাই এটুকু মাত্তরই” — গীতটুকুর রচয়িতা আনিসুল হক, খুব সম্ভবত। অথবা আরেকটা গান, ওই বয়সে এবং এই বয়সেও সংক্রামক সমানভাবে : “মেয়ে, তুমি ওভাবে তাকালে কেন / এমন মেয়ে কী করে বানালে ঈশ্বর, বুঝি না / আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ / আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল চাঁদ / আমার চোখ গেল — ধরেছে সুন্দর” — এই গানটার গীতিকার সন্দেহাতীতভাবেই সঞ্জীব, আর সুর তো বলা বাহুল্য। “কথা বলব না, আগের মতো কিছু নেই” — লিরিক সঞ্জীবেরই, ভীষণ মর্মদ্রাবী গীতিকা। ‘সাইমন অ্যান্ড গার্ফাঙ্কল’ থেকে সুরটা ধার-করা। আরেকটা গানের কথা পাড়া দরকার : “আমি তোমার জন্য কাব্য কুড়াই / তোমার জন্য গান / লিখি তোমার-আমার বানভাসানি / ভীষণ অভিমান / আমি বুকের মধ্যে জমা রাখি / হারানো সন্তান / তুমি না-জানো সন্ধান ওগো সাগরপাড়ের হাওয়া … কী আমাকে দিয়েছিলে বঙ্গোপসাগর / কী আমাকে দিয়েছিলে কক্সেসবাজার / কী আমাকে দিয়েছিলে নোনা জলহাওয়া / আমার সন্তান সে-তো তোমার কাছে পাওয়া” — বাপ্পা গেয়েছিলেন গানটা, দারুণ বসেছিল গলাটা তার এই গানের সঙ্গে। এর দুর্দান্ত কবিতাশ্রয়ী লিরিকটাও, যদ্দুর মনে পড়ে, সঞ্জীবেরই। কিংবা বাজি  গানটা, বাপ্পার কণ্ঠসম্পদের সুন্দর ও সুসমঞ্জস ব্যবহার হয়েছে এই গানেও, সঞ্জীবেরই লিরিক এবং দলছুটের একটি হিউজ-হিট নাম্বার। সমুদ্রানুষঙ্গ নিয়ে একটা গান সঞ্জীবের গলায় চির-অমর : “চোখটা এত পোড়ায় কেন? — ও পোড়া চোখ, সমুদ্রে যাও / সমুদ্র কী তোমার ছেলে? — আদর দিয়ে চোখে মাখাও … বুক জুড়ে এই বেজান শহর — হা হা শূন্য আকাশ কাঁপাও / আকাশ ঘিরে শঙ্খচিলের শরীর-চেরা কান্না থামাও … আমি তোমার কান্না কুড়াই, কান্না উড়াই, কান্না তাপাই / কান্নাপানি পান করে যাই — এমন মাতাল কান্না লিখি” — ইত্যাদি গীতিকথার সেই গান ভোলা যায়? সঞ্জীব ছাড়া আরও যারা দলছুটঅ্যালবামগুলোতে অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে শেখ রানা বা গিয়াস আহমেদ প্রমুখ কয়েকটা নাম মনে পড়ছে। “কোথাও বাঁশি বাজছিল / হাওয়ারা খুব হাসছিল / আমার ছিল বন্ধ কপাট / অন্ধ চোখে রাত ছিল” — রিটেন বাই গিয়াস আহমেদ, বা রানার দুইটা লিরিক্স তো খুবই ভালো হয়েছিল, যথা — গাছ  শীর্ষক একটা, আরেকটা “আমি ফিরে পেতে চাই / সেই বৃষ্টিভেজা সুর / আমি ফিরে পেতে চাই / সাত সুখের সমুদ্দুর” — দারুণ হার্মোনাইজেশন হয়েছিল সঞ্জীব-বাপ্পা যুগলবন্দী এই গানটার।

১২.
সংগীত সম্পর্কে বাক্য রচনা করতে বসে এতদবিষয়ে লেখার এখতিয়ার আছে কি না, খাস্ করে এই নিবন্ধকারের, তা বটে ভাববার মতো ব্যাপার। সর্বোতভাবেই এর উত্তর হবে নেতিবোধক; না, এখতিয়ার নাই। কণ্ঠে কিংবা কিছু-একটা যন্ত্রে সাতসুর অনুশীলনের সিলসিলা যার নাই, সংগীত বিষয়ে লেখা তার সাজে না — এমন একটা কথা কোথাও পড়িয়াছিনু, সম্ভবত প্রমথ চৌধুরীর কোনো রচনায়। যেমন কবিতালোচনা সম্পর্কেও বলা হয়ে থাকে একই কিসিমের একটা কথা, সেইটে এ-ই যে, কবিতাসংশ্রবহীন লোকের পক্ষে কবিতালোচনা গর্হিত। ইত্যাদি। কিন্তু তবু নিষ্কাব্য কোবিদ ও নিঃসংগীত গানাবাজানালোচক দুনিয়ায় বিরাজিছে। সেই সাহসে এবং উপরন্তু এই রচনা আদৌ সংগীত বিষয়ক নয় বরং সংগীতশ্রবণ ও সংগীতস্মৃতিরোমন্থন বিষয়ক বিধায় এহেন গল্পচ্ছলে সেকেলে সংগীতশ্রবণমুগ্ধতা বিনিময়ের অবতারণ। শুধুই স্মৃতিচারণ ও স্মৃতিলিপ্যান্তরণ। অন্যকিছু, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বা পাণ্ডিত্য, নয়। সেইসব এমন জিনিশ, অভিজ্ঞতা-জ্ঞান-পাণ্ডিত্য প্রভৃতি, বেরিয়ে আসবেই থাকলে। এ-নিবন্ধকের সেসব জিনিশের জবর ঘাটতি, কিন্তু দুঃখও অল্পই সেজন্যে। একটাবার না-হয় ভেবে দেখুন আপনি নিজেই যে, একদিন, এই তো মাত্র সেদিন, এই গান ছিল আপনার-আমার আমাদের দিনযাপনে ভুবনাচ্ছাদিত প্রায়। এতদিন ভুলেই ছিলেন আপনি। ক্যাসেটযুগের ঘটনা তো, বছরখানেক আগে আপনার বাসা হইতে জঞ্জাল ভেবে সহস্রাধিক ফিতার ক্যাসেট ও ক্যাসেটখাপ বস্তাবন্দী করিয়া ভাঙারির কাছে বেচে দেয়া হয়েছে। এই নিয়া বাসায় একটানা হুজ্জত করেছেন আপনি, দুঃখে ও আক্ষেপে, কেননা আপনি বহুদিন ধরেই প্ল্যানপ্রোগ্র্যাম করছিলেন সমস্ত ক্যাসেটখাপ কোলের ওপর নিয়া বসিয়া একটা স্মৃতিকথা লিখবেন, শিরোনামও মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন : অ্যা মেমোয়ার অফ বাংলাব্যান্ডমিউজিক  বা কাছাকাছি কিছু। বিধি বাম। যখন লিখবেন বলে স্থির বসতে চেয়ে ক্যাসেটখোঁজে নেমেছেন, এবং কোইন্সিডেন্টালি দলছুটের অ্যালবামগুলো নিয়াই পয়লা আসন নিতে চেয়েছিলেন সে-রাতে, পূর্ণিমা ছিল কি না মনে নাই, বাসার মালিক-মালকিন মানুষজন বজ্রপাতসদৃশ সেই দুঃসংবাদ ঘোষণা করলেন আপনার হার্টের বারোটা বাজায়ে দিয়ে। এবং আপনি-আমি এমন একটা বয়স পার হচ্ছি যখন কিনা বাসায় স্রেফ পাঁচ-ছয়ঘণ্টা ছাড়া আমরা প্রায় নন-এক্সিস্টেন্ট পুরা বাসার মানুষদের কাছে। অ্যানিওয়ে। আসলে ভুলটা হয়েছিল যেটা যে ক্যাসেটযুগ অবসিত হবার পরে আপনি তাদেরে কোনো নির্দেশনা দেন নাই, আর যেহেতু ক্যাসেটপ্লেয়ার যন্ত্রটাই মার্কেটাউট, কাজেই তারা কমনসেন্স দিয়া ভাবিয়া নিয়াছেন যে এই জঞ্জালগুলো কোনো ইনসানের দরকার হবার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। অথচ দেখুন, এই তো ২০০৫ পর্যন্তও ক্যাসেটপ্লেয়ারে গান শুনেছি আমরা, এই কয়টা মাত্র বছরে একটা এতকালের কম্প্যানিয়ন ভুলে যেতে পেরেছে মানুষ এক লহমায়! সে-যাকগে। প্ল্যানটা আজও পরিত্যাগ করেন নাই। দ্বিতীয় কোনো উৎস খুঁজছেন হন্যে হয়ে, যেখানে আশি-নব্বইয়ের দশকের ব্যান্ডগানের অ্যালবামগুলোর খাপ ও কভার দেখার মওকা পাওয়া যাবে।

১৩.
বাংলায় একটা আজব জিনিশ লক্ষ করা যাবে, বিশেষত গানে, কেবল গানেই নয় এমনকি কবিতায়ও। আধুনিক বাংলা গান — এই এক কিসিম, এক স্বর্ণপ্রস্তরঘট, কবেকার পাড়াগাঁর বাংলা থেকে এতাবধি সিটি-হয়ে-ওঠা বাংলায়ও এই কিসিম নিয়া বাহাস করার লোক কম নেই সিঙ্গার থেকে শুরু করে লিস্নার ও অন্যান্য সর্বজনসাধারণ পর্যন্ত। অথচ ফোক আর উপমহাদৈশিক মার্গসংগীতের বাইরে তো সমস্তকিছুই আধুনিক বলিয়া গণ্য হইবার কথা — কাণ্ডজ্ঞান খর্চে এইটুকু চট করে বুঝে ফেলা যায়। কিংবা জারি-সারি-বাউল-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি ইত্যাদি নগরানুষঙ্গবিহীন গানধারাগুলোকে আলাপের সুবিধার্থে ফোক ঘরানায় রেখে কথা বলার ঔদার্যটুকু যদি দেখানো যায় তাহলে বাকি-সবকিছুই নিশ্চয় মডার্ন বলে গণনায় নেয়া যায়। একটা ব্যাপার খুবই মজার যে, একটা সময় পর্যন্ত এখানকার — এপার-ওপার দ্বিপার বাংলার — বাংলা আধুনিক গান বলতে কেবল নজরুলপ্রভাবী ও নজরুল-পরবর্তী কথিত স্বর্ণযুগীয় বাংলাগানের চাঁদফুলপ্রণয়কীর্তন সম্বলিত ব্যাপারস্যাপার বোঝানো হতো, অল্প পরে এসে মান্না-হেমন্ত-হৈমন্তী প্রমুখ কণ্ঠশিল্পীদের ধারানুসৃতি, নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের আধুনিক গান বলতেই ছিল দুই কুমারের নাসিক্য উচ্চারণ ও সুরের প্রভাবে গড়ে-ওঠা আবহ ও সংগীতায়োজনের কারবার। বলা বাহুল্য, দুই কুমার বলতে এখানে বেইসিক্যালি হিন্দি-বলিউডি ফিল্মিগানায় একচেটিয়া সাফল্য-পাওয়া কিশোর কুমার এবং কুমার শানু মনে রাখা হয়েছে। এ-ব্যাপারে আরও উল্লেখ্য যে আধুনিক বাংলা গানে এমনতর ভজকট পরিমাণে অনেক ও ধরনে বিচিত্র। তৎকালীন তরুণ তপন চৌধুরী ছিলেন সোলস  ব্যান্ডের অন্যতম ভোক্যাল। তপন সোলসে যেমনধারা গাইতেন, সোলো গাইতেন একেবারেই ভিন্নধারা। শানু-তরিকার নাসিকা ব্যাপকভাবে কাজে লাগায়ে একক সংকলনে তপন যেমনটা গাইতেন উহা আধুনিক বাংলা গান বলিয়া অ্যাড্রেসড্ হইত। অন্তত রেকর্ডকোম্প্যানিগুলো বাজারে মাল ছাড়ার সময় তেমনধারা আধুনিক তকমা লাগায়ে দিত। সমগোত্রীয় অনুকারদিগের একদঙ্গল নামাবলি আওড়ানোর দরকার নাই, জাম্পকাট দিয়ে এক-দুইটা নাম দেখাইলেই ক্লিয়ার মনে পড়বে : যেমন — শুভ্র দেব, শাকিলা জাফর, সামিনা চৌধুরী, বেবী নাজনীন প্রমুখের নাচাগানা আধুনিক; পরবর্তীদের মধ্যে খালিদ হাসান মিলু, মনির খান, আলম আরা মিনু, আসিফ আকবর প্রমুখ পার্ফোর্মারবৃন্দ বাংলাশ্রোতার নিকট আধুনিক বলিয়া আদরণীয়। সমুজদার যারা, বাংলা ও হিন্দুস্তানি মিউজিকের তরফদারি করে বেড়ান যে-একটা ভাবভঙ্গিসর্বস্ব আশ্রাফ ক্লাস, তারা আরও উদ্ভট। মনে করেন উনারা যে এই দেশে একাধটু আধুনিক গান গাইতে পেরেছেন এক-ও-অনন্য নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী! ইয়া মাবুদ! পরিস্থিতি — পিক থেকে রুট অব্দি — এ-ই তো। তকমা-লাগানেওয়ালাদের একলার দোষ নয় সর্বাংশে — জেনারালাইজেশনের আশঙ্কা সত্ত্বেও কথাগুলো এই টোনে বলাটা আলবৎ দণ্ডযোগ্য হবেনাকো। তকমা লাগাবার কাজ, লেবেলিঙের দায়, একা রেকর্ডকোম্প্যানির না তপন-বেবী প্রমুখদিগের না আমাদের আধুনিকতা তথা মডার্নিটি নিয়া আদিখ্যেতার — কন্সেপচ্যুয়াল ক্ল্যারিটির ঘাটতি — দায় কার, এইসব নিয়া বাতচিতের জায়গা এইটা না। আমাদের কবিতারাজ্যেও কৌতুককর এমন উপাদান অদ্যাবধি নির্মূল হয়েছে — এমনটা আদ্যোপান্ত স্বীকার করা যাবে না। আজও উত্তরাধুনিক আর আধুনিক নামের দুই বেতো ঘোড়ার রোয়াব লোকালয়ে শোনা যায় স্তিমিত গলায় হলেও। আধুনিকবাদের তিরিশি ধ্যানধারণাশাসিত আমাদের কবিতাকারবার, কাজেই, অনাকাঙ্ক্ষিতও নয় এতদাচরণ। সঞ্জীব চৌধুরী ঠিক এমনতর বদখত পটে ও প্রেক্ষায় নিয়েছেন করে তার নিজের পথঘাট। পথের নিশানা পেয়ে বাংলাদেশের তরুণতর গাইয়ে-গানবাঁধিয়েরা লাভবান হয়েছেন সন্দেহ নেই।

১৪.
সঞ্জীবের গানবাদ্য সহজ ও স্বচ্ছ স্বরগ্রামের হলেও, লক্ষ করা যাবে, সহজিয়া চারণকবিতা আদৌ নয়। সেখানে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে এসে মিশেছে সচেতন নির্মাণপ্রয়াস। সহুজে চারণকীর্তনিয়া পদকারদের গানে যেসব অনুষঙ্গ সচরাচর দৃষ্ট, পুনরাবৃত্তির যেমন ঝোঁক বাউল তথা বাউলোচিত অন্যান্য সংগীতঘরানায় সুলভ, থিম্যাটিক রিপিটেশন সুলভ ওইধারা গানের সুরে ও শরীরে, সঞ্জীবের নির্মাণপ্রয়াস যেন ওইসমস্ত বুঝেশুনেই নিশানা খুঁজে নিয়েছে। যে-একটা ব্যাপার এইখানে বলা দরকার, সঞ্জীবের সুরযোজনার বিশেষ একটি দিক, ‘সঞ্জীবীয় সুর’ বলে একটু আগে এইটেকেই ইন্ট্রোডিউস করা হচ্ছিল। লক্ষ করা যাবে যে এই ভূখণ্ডে, এই বাংলায়, বিশেষভাবে এই বাংলাদেশে, দেশজ অনুষঙ্গ ও সুর গানে লগ্নি করার মানে একমেবাদ্বিতীয়ম বাউল-কীর্তনাঙ্গিক ঘুরেফিরে অ্যাপ্লাই করা। ভাবখানা হামেশা এমন যে এর বাইরে দেশজ কোনোকিছুই ঠিক নিখাদ দেশীয় বস্তু নয়কো। অতএব দেশীয় সুরের গরিমা গানের গলেতে ঝোলাতে চাও তো পরিমাণমতো লবণ-গুড়ের মিশ্রণ বানাও, তথা বানাও ধুমিয়ে কীর্তনভাঙা বা বাউলনবিশি মনোরমণীয় মনোটোনাসনেস্। যথেষ্ট সাংস্কৃতিক হতে চাও, যথেষ্ট জাতে উঠতে চাও, তো ওই জিনিশ ধুমধাড়াক্কা বানায়ে যাও। অথচ এতদঞ্চলের জীবনপুরাণে, এই বাংলাদেশের নিত্য যাপন ও জনপদে, কীর্তন সেইভাবে নেই এখন বর্তমানে। এককালে, হাজার বছর আগের এতদঞ্চলে, এই কীর্তন নিশ্চয়ই ছিল। অনুপস্থিত বলা যাবে না তা-বলে, কীর্তন উপস্থিত নিশ্চয়ই নিতিকার হাওয়াবাতাসে, কেবল পুরনো বোলচালের বাইরে বেরোনো আজিকার কীর্তন স্বভাবতই পরিবর্তিত। বরং অন্যভাবে এখন এর উপস্থিতি নিরীক্ষ্য হতে পারে। দেখা যাবে রোজকার আমাদের বসতভবনদ্বারে দোরঘণ্টি বাজিয়ে ভিখ-মাগতে-আসা মানুষটার গলায় যেই সুর লতানো, সেইটি কীর্তন নয়, কিন্তু আবার কীর্তনের অনাত্মীয়ও নয়, অনেকটা পারস্য-আরবীয় টিউনস্কেপের আবছা আদল ওইসব সুরে লক্ষ করা যায়। এবং শুধু-যে অ্যারাবিক তা-ও তো নয়, সেসব ভিখিরিবৃত্তির সুরে উপস্থিত উপমহাদেশও, যদি মনে রাখি যে কেবল হিন্দুস্তানই নয় গোটা উপমহাদেশ। তপোবন ছিল যখন অঞ্চলটি, কিংবা তপোবনের অপভ্রংশ, মাধুকরীতে বেরোত লোকে গলায় কীর্তন ঝুলিয়ে। সেইসময়ও কিন্তু বৈষ্ণব ও অবৈষ্ণব বিচিত্র ধারার গান বা ফকিরি ধারার গানচর্চাও বহাল ছিল, উপস্রোতাকারে হলেও ছিল সেসব। অথচ ডমিন্যান্ট অদ্যাবধি কীর্তন-বাউল সুরঘরানাই। বিশালাংশ লোকসমাজ, মূলত কীর্তনের আদি সমুজদার তথা গাওগেরামের দেহাতি মানুষজন, পরিবর্তিত পটপ্রেক্ষায় এখন তারা আজকে যে-গানটা গুনগুনায় সেইটা মারিফতি-মুর্শিদি-কাওয়ালি-কীর্তনী ইত্যাদি মিশিয়ে এক আলাদা তারানা আলগ সুর। সঞ্জীব চৌধুরী ঠিক এই জায়গাটা ক্যাপ্চার করতে চেয়েছেন মনে হয়। পেরেছেনও, অনেকাংশে। এ-ই, ইন-শর্ট, সঞ্জীবীয় সুর। হাজার বছরের রক্তের শাসনে সমকালের রক্তবিন্দুগুলো অস্বীকার করতে চাননি সঞ্জীব চৌধুরী। কিংবা ঐতিহ্যের বায়বীয়তা নয়, সঞ্জীবকে পথ দেখিয়েছে তার জীবনারম্ভের আটপৌরে সুরস্মৃতিগুলো। অন্য একটা ব্যাপারও মনে হয় যে, এতদঞ্চলে কথিত আধুনিক তাবৎ গানমহাজনেরা স্টার্টপয়েন্ট ধরেছেন মহামহিম রবীন্দ্রনাথকে, সঞ্জীব শুরুবিন্দু ধরে নিয়েছেন নজরুলকে। এ-ও সঞ্জীবের স্বকীয় গানভাবনার আরেক মৌলিকতাবাহক পতাকা হিশেবে ধর্তব্য। “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে / নাচিছে ঘূর্ণি বায় / জলতরঙ্গের ঝিলমিল ঝিলমিল / ঢেউ তুলে সে যায়” — কাহার্বা তালে অ্যারাবিয়ান টিউনের ছায়ানুসারে এই গানটি, কিংবা নাত্ পর্যায়ের নজরুলগানগুলোর সুর যথা “তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে” বা “ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়” ইত্যাদি সুরের আবছায়া সঞ্জীবের সুরশরীরে দেখা যায় দীপ্ত সৌকর্যে ব্যবহৃত হতে। এসব সম্ভব হয়েছে কেননা সঞ্জীব শৈশব থেকেই ভিতরদেশে প্রিপেয়ার হচ্ছিলেন ভবিষ্যতের স্বপ্নবাজির জন্য, সুরজুয়াড়ি সঞ্জীব চৌধুরী কানে-মনে-ধ্যানে ছিলেন আগাগোড়া গানগ্রস্ত। মনে হয়েছে এইসব, নানান সময়ে, সঞ্জীবের সুর শুনতে শুনতে।

১৫.
এইখানেই বিষয়টা হাল্কা চালে একবার বলে নেয়া আবশ্যক বোধ’য় যে, এখানকার তথা এই বাংলাদেশের অক্ষরদক্ষতাসম্পন্ন মধ্যবিত্তদের অনুশীলিত গানে-গীতে এর মাটিনিসর্গস্ফূরিত সাউন্ডস্কেপ বরাবর উপেক্ষিত হয়েছে। এইটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রত্যেকটা আলাদা ভূমিখণ্ড-জনগোষ্ঠীর যেমন রয়েছে আলগ ল্যান্ডস্কেপ, তেমনি রয়েছে প্রত্যেকের আলগ-আলগ সাউন্ডস্কেপ। প্রয়োগক্ষেত্রে দেখা যাবে এই জিনিশগুলো হরদম অনুমোদনের আবডালে রয়ে যেতে, রেখে দেন আবডালে প্রয়োগকর্তারাই, এবং যে-কারণে বদ্ধমূল একপ্রকার প্রথানুবর্তনের ভেতর দিয়া বাংলাদেশের বাংলা গান খণ্ডিত-খঞ্জ-নুলো ও রক্তাল্প হয়েই বিরাজ করছে ডে-আফটার-ডে। যেমন এখানকার সাহিত্যকর্মকাণ্ডগুলো তথা খাস-অর্থে এর কবিতা ভারতবঙ্গীয় বাংলা কবিতারই অনুবর্তী হয়ে দিনগুজরান করছে সেই তিরিশ থেকে অলমোস্ট অদ্যাবধি। কিন্তু ক্রমে এখানকার ন্যাচারাল ও কাল্চারাল নোশনগুলো, নগরসংশ্লিষ্ট অথবা গ্রামজ লোকমোটিফগুলো, উত্তরোত্তর ভিন্ন ও সংহত হয়ে এসেছে। এতদসত্ত্বেও শিল্পে-সাহিত্যে, বিশেষত গানে-সুরে, এই দিকটি ইন-দ্যাট-সেন্স এক্সপ্লোর করা হয় নাই। তিনশ বছর আগের পত্তনিকৃত নগর কলকাতা বাংলা সাহিত্য ও গানধারাগুলো ডমিন্যান্টলি এক্সপ্লোয়েট করেছে। এমনকি নিত্যকৃত্যাদি পালনের ক্ষেত্রে, যেমন কৃষ্টিবিভূতিঋদ্ধ বিষয়াদি কি দিবস উদযাপনের বেলায়, এমনতর কাল্চারাল হেজেমোনি দৃষ্টিগোচর হবে। এসবের হোতা কিন্তু নগুরে লিটারেইট মধ্যবিত্তরাই। কবীর সুমনের একটি লিরিকে এইধাঁচা সাংস্কৃতিক আধিপত্যওয়ালা আততিটুকু ফুটে বেরিয়েছে এভাবে : “মাতৃদেবী সংস্কৃতি, আম্মা তুমি মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান। / স্বামীজিরা সংস্কৃতি, মৌলানারা মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান। / উপনিষদ সংস্কৃতি, কোরান হলো মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব শান্তিমিছিলে হাঁটতে যান। / জল বলাটা সংস্কৃতি, পানি বললেই মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান। / চাটুজ্জেটা সংস্কৃতি, কবীর সুমন মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান। / ঘোমটা তুমি সংস্কৃতি, বোরখা তুমি মুসলমান, / সংস্কৃতির ধারকরা সব কুরুক্ষেত্রে হাঁটতে যান। / এমনিতে যারা দিব্যি বলেন বাঙালি  আর মুসলমান, / অমনি তারা গম্ভীর মুখে কুরুক্ষেত্রে হাঁটতে যান।” মোদ্দা কথাটা হলো, বাংলা গানে এখনও প্রজাপতির দুইটা পাখার একটেকে দেখেছি, একটে এখনও অবলোকন বাকি। লাইনের লোকেদের মধ্যে একটা ধারণা চালু রয়েছে যেন প্রজাপতির অপর পক্ষখানি সৃজনশৌর্যশালী নয় তেমনভাবে। এবং আমরাও আমাদের বুদ্ধি-কল্পনা-হৃদয়বত্তার জাড্যহেতু ওই-কিসিম (অপ)অবধারণাগুলো পুষ্ট করে চলেছি, মদত যুগিয়ে চলেছি, গান দিয়া প্রাণ দিয়া হাসিতামাশা দিয়া। ফাইজলামির ভরা-কটাল সময়ে বেঁচে থেকে সঞ্জীব তার কাজ দিয়ে এইখানে একটা ভালো পথনিশান রেখে গেছেন আমাদের জন্য।

১৬.
‘নজরুলের পর থেকে বাংলা গানের নানা বিভাজন ও প্রকরণগত সংক্রামের প্রসঙ্গ’ টেনে স্বতঃপ্রণোদিত গানানুসন্ধিৎসু সুধীর চক্রবর্তী আধুনিক বাংলা গানের আনুপূর্বিক খনন-বিবেচনের পর একে ‘স্ববিরোধের শিল্প’ বলছেন তার ‘বাংলা গানের সন্ধানে’ বইয়ের ‘স্ববিরোধের শিল্প : আধুনিক বাংলা গান’ শিরোনামক ব্যাপ্ত-পরিসর প্রবন্ধে। কেন স্ববিরোধ, কোথায় স্ববিরোধ, কোন মাত্রার স্ববিরোধ? সবিস্তার সুধীর চক্রবর্তী দীর্ঘ প্রবন্ধের অনুচ্ছেদগুলোতে সেই মীমাংসা খুঁজেছেন। সংক্ষেপে ব্যাপারটার সারাংশ কতকটা এমন : “বাংলা গানের নিয়ামক বা প্রেরণা এখন এক ভ্রান্ত বা দ্বিধাচালিত কনজ্যুমার প্যাটার্ন । সেই অলক্ষ জগতের অনুজ্ঞায় গীতিকার কেবল গান লেখেন, সুর দেন সাধারণত আরেকজন। এবারে অ্যারেঞ্জার  গানটিকে যন্ত্রবাদ্যের নানা কৃৎকৌশলে সাজান, তারপরে সেটি রেকর্ডবদ্ধ করেন পারফরমার । এই সব বিভাজন থেকে নানা সংকটের আর স্ববিরোধের জন্ম। যার একটা বড় দ্বান্দ্বিকতা চিরায়তের সঙ্গে লোকায়তকে মেলাবার প্রশ্নে; আরেকটি হলো দেশী গানের গায়নপরম্পরার সঙ্গে বিদেশী গায়নধারার জটিল বুননের সমস্যায়। আরেকটি বড় দ্বিধা রয়েছে গানের বিষয় নিয়ে এবং যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহারের সঙ্গতি প্রসঙ্গে। এই সূত্রে প্রশ্ন ওঠে, বাঙালির আধুনিক কালের চিত্রশিল্প, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রতিতুলনায় সদ্যতন কালের গান কতখানি আধুনিক উচ্চারণে সমৃদ্ধ?” উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর, সকলেই স্বীকার করবেন, গরিমা করবার মতো সদর্থবহ নয়। একটা ব্যাপারে কেবল সংক্ষেপে এখানে বলে রাখা যাক যে এই বই, সুধীর চক্রবর্তীর এই বই, বেরিয়েছে ১৩৯৭ বঙ্গাব্দে, খ্রিস্টাব্দগণনায় তা প্রায় ১৯৯১ বা ১৯৯২ হবে। এই সময়েই কিংবা এর বছর-খানেকের মধ্যেই বাংলা গানের ভুবনডাঙায় এসে হাজির হবেন সুমন ও তৎপথানুসারী অনেকে একসঙ্গে, এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গানের আধুনিকতাপ্রাসঙ্গিক বৈপরীত্য-বিরোধগুলো অন্তর্হিত না-হলেও অনেকটাই রিডিউসড/মিনিমাইজড হয়ে আসবে, নিদেনপক্ষে বাংলা গানের চাঁদ-ফুল-জোছনারাজি নিছক গজদন্তমিনারবাসী শিল্পীর আকাশকুসুম অর্বাচীন অবকল্পনার বাইরে বেরোনোর জোর কোশেশ লক্ষ করা যাবে, সবিস্ময়ে। এই সময়পর্বে আবির্ভূত গানকারিগরেরা চেষ্টা করেছেন অর্কেস্ট্রা-কন্ডাক্টিং মায়েস্ত্রোর ন্যায় একলা-হাতে, যেনবা ব্যান্ডমাস্টারের ব্যাটন নাচিয়ে, নিজের সৃজনের কথাবয়ন-সুরযোজন-সংগীতায়োজন-গায়ন-পরিবেশন সহ সম্পূর্ণাবয়ব পরিকল্পনা আগাগোড়া নিজে সমাধা করতে। এহেন প্রয়াসের পূর্বনজির নেই, এমন নয়; রবীন্দ্রনাথ-নজরুল তথা পঞ্চকবির গানমূর্ছনায় সুধীর চক্রবর্তী কর্তৃক উত্থাপনকৃত অভিযোগের স্ববিরোধ বহুলাংশেই নিরুপস্থিত। অবশ্য ওই সময়টি নিয়ে সেখানে অভিযোগ ওঠানো হয়নি, হয়েছে এদের পরবর্তীকালখণ্ডটি নিয়ে। এইটা সত্যি যে পরবর্তী পর্যায়ে একটা ধারাবাহিক দীর্ঘকাল প্রোক্ত স্ববিরোধের প’ড়ো জমি উর্বরা থাকতে দেখা যাবে। এক-দুইবার ব্যতিক্রমও গোচরে আসবে এ-সময়টায়; ব্যতিক্রমগুলোর মধ্যে হেমাঙ্গ-সলিল-ভুপেন-মান্না প্রমুখ চট করে স্মরণার্হ। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ পর্যায়ের ব্যান্ডসংগীতে এই কায়দার স্ববিরোধাচার ছিল — চট করে এমন অভিযোগ তোলা যাবে না। ব্যান্ডের গানসৃজন সর্বদা সমবায়ী শিল্পতৎপরতা হিশেবে একটা আম্ব্রেলা-প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এসেছে দেখা যাবে। এর পরবর্তীকালে অবশ্য, নতুন সহস্রাব্দে এসে, প্রাযুক্তিক সুবিধাবর্ধনের ফল অথবা কুফল হিশেবে তেমনতর স্ববিরোধকাণ্ড সংঘটিত হয়ে চলেছে কি না, তা ভাববার অবকাশ রাখে। কেননা এইকালে এসে দেখা যাবে যে ব্যান্ডের গানগুলো পার্ট-বাই-পার্ট কম্পোজ করা হচ্ছে — এইখানে ভয়েস নিয়ে তেপান্তর পেরিয়ে যেয়ে মিউজিকট্র্যাক রেকর্ড করানো ও মুম্বইয়ের কোনো স্টুডিয়োতে সাউন্ডমিক্সিং-মাস্টারিং, কিংবা ভাইস-ভার্সা, মুম্বই থেকে ট্র্যাক করিয়ে এনে এখানে গিটারটা ওখানে ফ্ল্যুট ও সবশেষে সিঙ্গারের নিজের অ্যাপার্টমেন্টের অ্যায়ার্টাইট স্টুডিওতে বসে এডিটিং-মিক্সিং-মাস্টারিং ও সর্বান্তিম হলেও সর্ববড় কম্ম হলো মুঠোফোনকোম্প্যানির পশ্চাদ্ধাবন। ফলে আধুনিক বাংলা গানের শনৈ শনৈ উন্নতি ঠেকায় কার বাপের সাধ্যি! কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে এতদকারণে সুধীর চক্রবর্তী কথিত স্ববিরোধ সহনাতীত হয়ে উঠছে, অথবা সহনীয় রইছে, এই নিয়া বারান্তরে ভাবা যাবে খন। সঞ্জীব চৌধুরী, ইনফোর্মেশন আকারে এটুকু শুধু উল্লেখ থাক, বাংলা ব্যান্ডসংগীতে এহেন স্ববিরোধাশঙ্কা উদয়ের আগের কালেই গিয়েছেন গেয়ে সেরে। এর কিছুকাল অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশের গানে বেনোজলঢেউ উঠবে হাবিব ওয়াহিদের বাণিজ্যসফলতার পথানুসরণে বালাম-ফুয়াদ প্রমুখ একদঙ্গল পার্ফোর্মারের টেক্নো গলায় স্পেশ্যাল ইফেক্ট দিয়া আর্টিফিশিয়্যাল-স্যুপার্সনিক সুরচর্যার হুল্লোড়ক্রীড়া। তারপরও বলতে হবে যে এ-সময়েও অর্ণব এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, উজ্জ্বল উদ্ধার, প্রদীপ্ত সংগীতপ্রতিভার চিহ্ন অর্ণবের গানজীবনে অনায়াসদৃষ্ট।

১৭.
বিচ্ছিন্নভাবে ভালো লিরিকের গান ব্যান্ডগুলো করেছে বটে তাদের শীর্ষকাল নব্বইয়ের দশকটায়, এইটে চেপে যাবার দরকার দেখি না। তারপর সঞ্জীব তথা দলছুট  এলে বেগবান হয় ব্যাপারটা, বাংলাদেশের গানে এই দল ও সঞ্জীব গোড়া থেকে শেষতক একটা কন্সিস্টেন্সি গিয়েছে রেখে। এর ফলে অব্যবহিত পরবর্তীকালে শুরু-করা তরুণতর গাইয়েরা প্রাণীত হয়েছেন উন্নত কথাগাত্র খুঁজে নিয়ে সুর সৃজনে। একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, আমরা অনেকেই বলি কিংবা কহেন আমাদের মুরুব্বিরা, গান নাকি এখন শোনার বিষয় নয় বরং স্রেফ দেখার বিষয় হয়ে গেছে। এক-ধরনের হতাশা থেকেই নির্গলিত কথাগুলো; এবং এহেন বিবৃতি-যে একেবারেই অসত্য তা-ও নয়। সমকাল-তাচ্ছিল্য-করা একদল আভিজাত্যগর্বী ও অহেতু অহঙ্কারে আঁইঢাঁই-করা ব্যক্তি-ভোক্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, আমাদের মতো একেবারেই অতি-সাধারণ শ্রোতা যারা যে-কোনো ধরন স্বরের আভাস পাওয়া মাত্র সহজাত স্বাভাবিকতায় উৎকর্ণ হই, বাজারে নানান বোতলে বিকিকিনিরত কথিত আধুনিক বাংলাগান আমাদের কান ও প্রাণ পীড়িত করে। কিন্তু এর ভিন্ন চিত্রও আছে; যত ক্ষীণতোয়াই হোক, সুস্থস্বচ্ছ একটা সংগীতস্রোত সমান্তরালে বয়ে চলেছে বটে। শোনার মতো গান গাইছে এই সময়ের কিছু তরুণ। প্রচারমাধ্যম এদের অতটা সামনে আনে না বা আনতে চায় না বা আনতে পারে না নানা কারণে। এ-রকম কয়েকজন মেধাবী মেজাজের গানওয়ালাকে নিয়ে একটি সাপ্তাহিকপত্রিকা আয়োজন করেছিল একটা আড্ডার, বছর-কয়েক আগে। সেই আড্ডার মুদ্রিত রূপ পড়ে অনেকটাই উদ্বেলিত হওয়া গিয়েছিল। উদ্বেলিত, কেননা ওদের ভাবনাভাবনির সঙ্গে মিলে গেছিল আমারও অনেকদিনের হতাশাঘৃণামিশ্রিত অপ্রকাশিত ভাবনারাশি। প্রায়ই ভাবি যে, বাংলা কবিতা থেকে দুই হাতে ঋণ নিয়ে আসছিল এতকালের আধুনিক বাংলাগান, আজকাল দেখি পরিস্থিতি উল্টে যাওয়ার উপক্রম! দেখি ভাবনায়-বাণীতে, উপমায়-উৎপ্রেক্ষায়, প্রকরণে-প্রেজেন্টেশনে বাংলাগান যেন এগিয়ে যেতে লেগেছে কবিতার তুলনায়। অপরিপক্ব কবিতে, অত্যধিক অপরিপক্ব কবিতায় সয়লাব হয়ে আছে আমাদের বাংলাসাহিত্য। তেন পরিস্থিতি থেকে সহসা পরিত্রাণ মিলবে বলে মনে হচ্ছিল না। এ-রকম হতাশার মুহূর্তে যথার্থ আশাঝিলিক পাওয়া যায় এইসব তরুণ গাইয়ের কাজে। এদের গান লেখা, সুর দেয়া, পূর্ববর্তী গানওয়ালাদের অর্বাচীনতা নিয়ে এদের স্পষ্ট বিরক্তি ও বীতশ্রদ্ধতা, সুরের জগতে সৃষ্ট নৈরাজ্য ও অসুরের স্বৈর অধিষ্ঠান, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইতরামি ইত্যাদি নিয়ে এদের খোলাখুলি-ব্যক্ত কথাগুলো অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে, এরা অনেকদিন ধরে বিষয়টা নিয়ে, বিদ্যমান অচলায়তন নিয়ে ভেবে আসছিল। কারো সহায়তাহীন এরা নিজেরা নিজেদের পথ করে নিচ্ছে, নিতে চাইছে। কেউ কেউ দেখলাম এতটাই একলষেঁড়ে যে, এমনকি মৌখিক দিঙনির্দেশনা নিতেও নারাজ কোনো অগ্রজের দুয়ারে যেয়ে। তাদের প্রত্যেকের বক্তব্যের মোদ্দা কথাটা হলো : যথেষ্ট হয়েছে; এইবার ওই যথেষ্টতা থেকে শ্রোতা-সমুজদারদেরে বের করে নিয়ে আসার কোশেশ করা যাক। তো, জিয়া কৃষ্ণকলি সজীব তুহিন শিবু সুমন — এই ছ-জনকে নিয়ে ‘গানের মানুষ’ শিরোনামে আড্ডা-আয়োজনটি পড়ে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেলিত হওয়ার কারণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করবার মতো উদ্দীপনা আপাতত বোধ করছি না। অনুকূল উদ্দীপনা এলে, নিশ্চয়, পরে কখনো কোনো-একসময় বিস্তারে যাওয়া যাবে। আপাতত এই ছয় তরুণের পরিচয় সংক্ষেপে টুকে রাখা যাক এখানে। এদের মধ্যে দু-জন, কৃষ্ণকলি ও সজীব, সোলো পার্ফর্মার; বাকি কয়জন ব্যান্ড কন্সেপ্টের সংগীতকর্মী : নিজে গীত বাঁধেন, সুর দেন, নিজেরাই কণ্ঠে তুলে নেন নিজেদের রচনাটি। তুহিন ও জিয়া ‘শিরোনামহীন’ ব্যান্ডের সক্রিয় দুই সদস্য এবং সুমন ও শিবু ‘মেঘদল’ ব্যান্ডের। মেঘদল-এর ডেব্যু ‘দ্রোহের মন্ত্রে ভালোবাসা’ নামে একটি অ্যালবাম দিয়ে, এরপর ‘শহরবন্দি’, শিরোনামহীন-এর পাঁচটা স্টুডিয়োঅ্যালবাম এ-যাবৎ যথা — ‘জাহাজী’, ‘ইচ্ছেঘুড়ি’, ‘বন্ধ জানালা’, ‘শিরোনামহীনের রবীন্দ্রনাথ’ এবং বেরিয়েছে সেল্ফ-টাইট্যল্ড একটা অ্যালবাম। অন্যদিকে কৃষ্ণকলি-র ‘সূর্যে বাঁধি বাসা’, সজীব-এর ‘বাড়ি কোথায় বলো’। ইত্যাদি। এই কয়-বছরে এদের কাজ অনেক বেড়েছে, উভয়ত সংখ্যায় ও গুণমানে। প্রতিটি গীতি-সংকলনের প্রচ্ছদ দেখেই বোঝা যাবে এদের শিল্পবোধ। এরা প্রত্যেকেই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাদের এক্সপেরিয়েন্স বলেছেন, বলেছেন তাদের আপন উদ্যোগ ইত্যাদি নিয়ে। জোর পাওয়া যায় ঠিক এইখানটাতেই। কারো দ্বারস্থ না-হয়ে তারা নিজের খর্চায় নিজের ভালোটুকু নিয়ে হাজির হয়েছেন বাংলাগানের দীর্ঘ মিছিলের সামনাসারিতে। তারা বলেছেন তাদের স্ট্রাগলটার কথা। বলেছেন বাজার-অস্বীকার-করে বাজারে জায়গা করে নেয়ার দৃঢ়তার কথা, আত্মবিশ্বাসের কথা। জোর পাই এখানেই। আশা আছে, চারপাশের বেলেল্লা বাজার থেকে মুখ ফেরাবেই কিছু মানুষ। নইলে তো গানঘড়িটা থামিয়া যাইত এতদিনে। অ্যানিওয়ে। এই গানের মানুষ ক-জনের কথার/আলাপনের টুকরো অংশ এখানে টুকে রাখি, যাতে অনেকদিন পরেও বুঝতে পারি কোন সূত্রে কোথায় হয়েছিল এদের সঙ্গে আমার ভাবনার মিল। … “প্রেম-ভালোবাসার গান প্রচুর হয়েছে। আরো দরকার আছে। আজীবন লাইলী-মজনুর দরকার আছে। তবে তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে-বাস্তবের মুখোমুখি হচ্ছি, যে-যুদ্ধ করছি সেখানে যদি কম্ফোর্টেবল জোনটা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে কিন্তু আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ব। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে গানটা একটা স্বপ্ন। ভিন্ন ভিন্ন আইডোলজি নিয়ে আমরা চলছি। যে-ছেলে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বাবা দুধের গ্লাসের নিচে দুটো পাঁচশ টাকার নোট রেখে গেছে — তার জীবন, তার মিউজিক, তার অ্যাঙ্গার এক-রকম; আমরা যারা বাংলাকে ভালোবেসে, শহরকে ভালোবেসে ফাইট দিয়ে গান করছি তাদেরটা বেশি জোরালো। আমাদের গানের তীব্রতা আরেক রকম।” — তুহিন/শিরোনামহীন । … “৭১-এর পর থেকে লিরিকের যে চর্চা হয়েছে তার মধ্যে কাব্যময়তার অভাব ছিল। বিশেষ করে আমাদের ব্যান্ডসংগীতের ক্ষেত্রে দেখেছি। এর বিশেষ কারণ ছিল — আমাদের যারা কবি-সাহিত্যিক ছিলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের গানলেখকদের কোনো যোগসূত্রতা ছিল না। ফলে একটা অ্যামেচার ধারার সূত্রপাত হয়েছে। যেখানে, কে কি ভাবছে তা ভেবে দেখার দরকার নেই। আগে সাহিত্যচর্চা ভালো ছিল, কিন্তু যারা গান করছে কিংবা লিখছে তাদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব ছিল। কবি-সাহিত্যিকদের একটা সোসাইটি, আবার যারা গান করছে ব্যান্ড করছে তারা যেন একা, প্রায় অ্যালিয়েন! এদের মধ্যে রেষারেষিটা স্থূলভাবে হলেও টের পাওয়া যেত। যেমন আমরা দেখেছি, আইয়ুব বাচ্চুর গানে সেই কাব্যময়তা ছিল না। আবার এদিকে মাইলস-এর লিরিকে দেখেছি, জ্বালা-জ্বালা অন্তরে…” — শিবু/মেঘদল । … “এখানে প্রোমোটারদের একটা সমস্যা আছে — কে কাকে প্রোমোট করবে, কেন করবে, কীভাবে করবে — মিডিয়া আরেকটা সমস্যা — তারা এলিট ফ্যামিলি, হাই-সোসাইটির ছেলেমেয়েদের সহজে সুযোগ করে দেয়। এটা-যে অপব্যবহার করছে, ব্যাপারটা তা না; আসলে ওদের সঙ্গে একটা সহজ যোগাযোগ থাকে — কারোর বাবা সংবাদপত্রের মালিক, আবার কারোর মা সেখানকার লেখক, আবার কারো চাচা বড় কোম্প্যানির এমডি … সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায় যে, আমার চাচা আমার ফুফু আমার খালা দিয়েই হয়ে যাচ্ছে। ওই ওয়েতে আমাদের দেশে সবকিছু দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।” — কৃষ্ণকলি। … “আমার গান আমি গাইব। আমার নিজস্ব শক্তি থেকে গাইব। আমি যদি নন্দনতাত্ত্বিক বিচারের জায়গাটা থেকে বলি তাহলে বলব, তখনকার আযম খানের সালেকা-মালেকা গানটা কিছুই হয়নি। এর চাইতেও ভালো লিরিক তখন ছিল, কিন্তু প্রচার পায়নি। … এখানে ক্লোজআপওয়ানটাই আমাদের হাইট।” — শিবু। … “সব জায়গায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অথবা শিল্প-আন্দোলনে কবি-সাহিত্যিক-মিউজিশিয়ান — সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটা ঘটে। কিন্তু আমাদের এখানে নাটক, চলচ্চিত্র, আর্ট ও সংগীত — চারটা চার লাইনে আছে। একত্রে কখনো ম্যুভ করা হয়নি।” — জিয়া। … এবং এইভাবে আরো অনেক কথা বলেছেন এই তরুণ তুখোড়েরা। তাদের কথায় প্রকাশ পেয়েছে তাদের দ্রোহ, তাদের স্বপ্ন, তাদের কমিটমেন্ট, তাদের কমনসেন্স, তাদের সংগীতক্ষমতা। আর উল্লিখিত এই আলাপনের পরে এরা প্রত্যেকেই ইতোমধ্যে তাদের ক্যারিয়ারের গোটা একটা দশক পার করে এসেছেন, বাজারগ্রাহ্য হয়েছেন ইত্যবসরে, সেই আগের দ্রোহদগ্ধ সঙ্কল্পনার জায়গাটা ভাটা-পড়ে-যাওয়াটা কাজেই অস্বাভাবিকও নয়। এখন অব্দি এরা কাজ করে চলেছেন নিজেদের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে। এই সময়েই আরও কয়েকজন অবতরণ করেছেন গানের অ্যারোড্রামে, এদের মধ্যে সৃজনী-তাকদ বিবেচনায় শায়ান চৌধুরী অর্ণব সর্বাগ্রগণ্য।

১৮.
প্রেমের গানই, ভিতরগত বিচারে, লিখে ও সুর করে ও গেয়ে গেছেন সঞ্জীব। নিহিতার্থে নিঃসীম একা-ব্যক্তির প্রেম ও পরাজয়ের গাথা, ভাঙন ও আপোস ও তবুও সংশপ্তক চৈতন্য, সংবেদন ও সংরাগের গানই ছিল সঞ্জীবের গলায়। এর বাইরে কিছু অবশিষ্ট রয়েছে কি না — মানবজন্মে প্রেমের চেয়ে বড় ও সুরভিত কোনো পারিজাত রহিয়াছে কি না — আইজ্ঞা, আছে অবশ্য। প্রণয়পয়োধির সাধ্যি নাই শীতল করিবারে সেইসব অপ্রণয়াগ্নিকাণ্ড। পোলিটিক্স ও অন্যান্য দৈত্যদানো, গণগর্জন ও তন্ত্রাচার, মরমিচৈতন্য ও মন্ময়-তন্ময়-চিন্ময়তার চাষাবাদ, অধিবাস্তব-বোধিবাস্তব-ধরাবাস্তব-অধরাবাস্তব, ওষ্ঠ ও অঙ্গসৌষ্টব, অনাত্মবোধ ও অহমোদ্বোধন প্রভৃতি বিচিত্র বহুবিধ বিষয়ব্যাপার সংগীতান্তর্ভূতির বাইরে নিশ্চয় নয়। একটা ভালো কথাচিত্র অথবা ভালো সুরারোপিত সংগীত শ্রবণসময়ে, ভাগ্যিস, এসবের কিছুই পড়ে না মনে। প্রেমের গানে, স্রেফ একক ও নগ্ননির্জনের গানে, যেই জিনিশটা থাকে সেইটের ডাকনাম অবগাহন, সর্বসত্তানিমগ্ন হয়ে নিঃশর্ত অবগাহনের আহ্বান জানায় প্রেমগান। সঞ্জীবে এই নির্জন অবগাহন, অনাপত্তি-নিরুদ্বেগ অবগাহন, অন্তর্মহলায় ব্যাকুল অবগাহনের উপাদান শ্রোতাসাধারণ লভেছিল মনে হয়। এবং হঠাৎ-প্রাপ্তি ছিল না এসবের কিছুই, বিচ্ছিন্নভাবে একবার পেয়ে ফের যেই-লাউ-সেই-কদু প্রস্থাননাট্য নয়, একটিও নয় পড়ে-পাওয়া-চোদ্দআনা আয়াসবিহীন কাজ। সঞ্জীবের সুর অনবচ্ছিন্নভাবে একটা ট্র্যাক বজায় রেখে গেছে সবসময়। দেড়-দুই ব্রিলিয়ান্ট কম্পোজিশনের পর বিলো-অ্যাভারেজ রচনা সঞ্জীব করেননি, গিমিক-গিটকিরির আশ্রয় নেননি, কিংবা হামদ্-নাত্ রচিবার ডাক পেয়েই টিভিমিউজিক্যালের প্যাকেজ-স্লট ভরাতেও দৌড় দেননি। দিলে পরে এই নিবন্ধ পয়্দানো হতো না আজ। তবে বেশ বাজারসদাই নিশ্চয় হতো সঞ্জীবের, পসার হতো অনেক উদ্দাম ও রকিং, আরেকটু সুনিশ্চিত হতো পিকক টু সাকুরা পাব্-হইতে-পাবান্তর বার্-হইতে-বারান্তর ক্রলিং। সুরের জন্যই শিভ্যাস্ রিগ্যাল, জনি ওয়াকার, ব্ল্যাক লেইব্যল, রয়্যাল স্যাল্যুট। সুরের জন্যই জিন্ অথবা ভোডকা যা-ই হোক, বাট লিটল মৌর বিটার, প্লিজ! “প্রভু, আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও”! ও গডেস্! মে আই হ্যাভ অ্যা মার্টিনি? ইফ য়্যু’য়ার কনভিনিয়েন্ট টু, মেইক ইট ভেরি ড্রাই, হানি! ওয়েল, ইফ নট অ্যাভেইলেবল, দ্যেন অ’রাইট, ক্যুড য়্যু প্লিজ গেট মি অ্যা ব্লাডি মেরি? চিয়ার্স, ফর আওয়ার এভার্গ্রিনার ম্যাইডেন্স, থ্রি চিয়ার্স ফর ইটার্নাল বাংলা গান অ্যান্ড অল দি ইমোর্টাল মিউজিশিয়্যান্স! নোপ্, নট উইথ সোডা, অন দ্য বক্স, প্লিজ! মোদ্দা কথাটা হলো, দোটানা — চাকরি ও একইসঙ্গে গানাবাজানা — সাহিত্য-শিল্প-ছবিআঁকা বা সিনেমাবানানো ও সুরনির্মাণ — সঞ্জীবের মতন কারুবাসনাদীপ্ত সুরস্রষ্টা শিল্পীকে একেক পলকে একশোটি ইনফার্নোযন্ত্রণার ভিতর নিক্ষিপ্ত করে, ডোবায়, আবার ভাসায়। হায়, একরত্তি এই মানবজনমে, এহেন দোটানা! অ্যাজ্-অ্যা-রেজাল্ট পঞ্চাশপূর্ব প্রস্থান। ফ্যুল্-টাইম প্রোফেশন হিশেবে মিউজিক করে যেতে পারলে, যেমন সঞ্জীবের অভিন্নহৃদয় ব্যান্ডমেইট বাপ্পা পারছেন, এমন সাততাড়াতাড়ি বিদায়দৃশ্য হয়তো দেখতে হতো না আমাদেরে। এই সমস্তই নিছক অনুমান, অবিশ্যি। কিন্তু কথাটা হলো, ফ্যুলটাইমারের মিউজিক কতদূর পর্যন্ত পুষ্টহৃষ্ট হতো, কতটুকু অটুট রইত স্ট্যান্ডার্ড, এতদব্যাপারে হলফ করে কিছুই-কিন্তু বলা যায় না। তা, এই নিশানায় শিল্পগত তরিতম ঘটলেও শিল্পীর আয়ুক্ষয় কিছু কম দ্রুতিতে হতো বলিয়াই বিশ্বাস হয়।

১৯.
যদিও দলছুট  গোড়া থেকে শেষোব্দি নির্জন এককের গানই গিয়েছে গেয়ে, যেমন বলা হচ্ছিল নিঃসীম একা-মানুষের গান ও ব্যক্তির বিবিক্তি ব্যঞ্জিত হয়েছে দলছুটগানগুলোতে, বেশকিছু দলছুটগানে কেমন-যেন সম্মেলক গানের আমেজও দুর্লক্ষ নয়। সেসব যদিও সম্মেলক গান নয় সে-অর্থে, ডুয়েট তথা দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া গান বস্তুত, এফেক্টের দিক থেকে যেন সম্মেলক গানেরই বাতাবরণ তৈরি করেছে শ্রোতার শ্রবণকুহরে। যেমন ‘চল বুবাইজান’ গানটা, বা ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষাসংগীত’ গানটা, প্যারোডির মতো মনে হলেও শোনার পর বোঝা যায় এগুলো রঙ্গসংগীত নয়। এমন দুয়েকটা গান দলছুটের ঝুলি থেকে বেরিয়েছে আগে-পরে — যেমন, “ভরদুপুরে তিন কুকুরে / খাচ্ছে কেমন দূর্বাঘাস / কারো কারো মনে যেমন / বারোমাসই ভাদ্রমাস” গানটা, বা তাদের অন্তিম অ্যালবামে ধৃত অন্তিম পৃষ্ঠের অন্তিম গানটা — ‘মাছশিকারী’ শিরোনামক গানটার কথা বলা হচ্ছে — এগুলো রম্যলীলাচূর্ণ মনে করার সুযোগ নেই, বরং বক্তব্য-শ্লেষ-বিদ্রুপ-বক্রোক্তি বিচারে এরা আগুপিছু অব্যর্থ দ্যোতনাভিসারী। কিন্তু দুটো গানের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যাক এইখানে, যেগুলো জনসমাদর লভেছে প্রচুর, তৎসত্ত্বেও দলছুটের প্রেজেন্টেশন হিশেবে এগুলো অত উৎরিয়েছে বলা যাবে না। গানদ্বয় সিলেটের গানজীবী শাহ আবদুল করিমের রচনা, যথাক্রমে — ‘গাড়ি চলে না চলে না’ ও ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে / কেমন দেখা যায় / ঝিলিমিল ঝিলিমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়’ — এই দুইটা গান মধ্যবিত্তবলয়ের ড্রয়িংরুম-প্রেজেন্টেবল করে রেন্ডিশনের ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার ফোক-বেইজড মেধাবী গানদল ‘দোহার’ বরঞ্চ অধিক সুষমাসাফল্যের দাবিদার দলছুটের চেয়ে। এরপরও বলতে হবে যে ‘দলছুট’ মন্দ করে নাই কিছু, তবে দোহার-অতিক্রমী গায়নও হয় নাই অবশ্য।

২০.
কান্নার রঙ ও জোছনার ছায়া ছুঁয়ে সেই-যে গানটা : “আমি তোমাকেই বলে দেবো / কী-যে একা দীর্ঘ রাত / আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে / আমি তোমাকেই বলে দেবো / সেই ভুলে-ভরা গল্প / কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরোজায়” — এই গানের গীতল ও অস্ফুট মেলাঙ্কোলিয়া, এর কোমল টেক্সট্যুয়াল প্রেজেন্টেশন, শব্দান্তর্গত অভিভাবদ্যোতনা, এবং এর লিরিক্যাল ইন্টেন্সিটি ইত্যাদি মিলিয়ে এইটে এক অনবদ্য কম্পোজিশন। মুখপাতের লাইনগুলো শুনিবামাত্তর মনে উঁকি মারে সেই বিপুল বাঙালি-পাঠকাদৃত কবিতা : হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি আমি পৃথিবীর পথে … ! এই গান স্মরণ না-করে আমরা, বিগত দুঃখদীর্ণ শতকে আবির্ভূত পেটরোগা পাগল প্রেমিকেরা, এই ঝিলিমিলি মিথ্যে-সত্যি-মেশানো মরজগৎ ছেড়ে যেতে পারব বলে মনে হয় না। “আমি কাউকে বলিনি সে-নাম / কেউ জানে না, না-জানে আড়াল” … আচ্ছা, না-বলি, ঠিক আছে। “তবে এ-ই হোক, তীরে জাগুক প্লাবন / দিন হোক লাবণ্য, হৃদয়ে শ্রাবণ” … যত-না কান্না থাকুক ব্যক্তিবিদীর্ণ ঘন ও গহন, দিন হোক দুনিয়ার লাবণ্যান্বিত। হোক তবে, তা-ই হোক, তথাস্তু।

 

‘সঞ্জীবিত সংগীতাঢ্য’ পুনর্প্রকাশের পাদটীকা
‘লাল জীপের ডায়েরি’ পত্রিকায় এই গদ্যটা ২০১৪ সেপ্টেম্বরে ছাপা হয়েছিল। পত্রিকাটা আজ বছর-দুই হলো সঞ্চালন বন্ধ। সঞ্চালকমণ্ডলীর মধ্যে একজন বিজয় আহমেদ এবং অন্যজন অর্পণ দেব অত্যন্ত যত্ন করে এই সাইটের লেখাজোখা আপ্লোড করতেন। লেখানির্বাচন ও গ্র্যাফিক প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি বিবেচনায় ২০১১-২০১৫ পর্যন্ত সঞ্চালনকালে লালজীপ তরুণ পড়িয়েলিখিয়েদের মধ্যে একটা আস্থা ও ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পেরেছিল। স্বল্পায়ু পত্রিকাটা কারো কারো স্মৃতিতে এখনও বহাল থাকতে পারে। এই নিবন্ধটা লালজীপসঞ্চালকদ্বয়ের হাতবাহিত হয়ে বেশকিছু পাঠকের দুয়ারে যেতে পেরেছিল। রচনাটা পুনর্প্রকাশের আগে এর পূর্বপ্রকাশস্থানের আধিকারিকরা সানন্দ সম্মতি দিয়েছেন বলিয়া বাধিত রইলাম। — নিবন্ধকার।

… …

COMMENTS

error: