কবিগুরুর সিলেটভ্রমণের শতবর্ষ উদযাপন : উপভোগ ও ভোগান্তির সংক্ষিপ্ত কাহন || মলয় বৈদ্য

কবিগুরুর সিলেটভ্রমণের শতবর্ষ উদযাপন : উপভোগ ও ভোগান্তির সংক্ষিপ্ত কাহন || মলয় বৈদ্য

SHARE:

শতবর্ষ আগে, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটভ্রমণে এসেছিলেন। শতবর্ষ পরে, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে, সেই মাহেন্দ্র ভ্রমণ স্মরণে জেলাশহরের নানান জায়গায় নানান ভেন্যুতে নানাবিধ অনুষ্ঠান আয়োজনপ্রস্তুতির উদযোগ-তোড়জোড় চলছিল বছরের শুরু থেকে। একনাগাড়ে চারদিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠান। অথচ কোথাও স্পষ্ট কোনো অনুষ্ঠানপঞ্জি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। ফাইন্যাল কাউন্ট ডাউন হয়ে গেলেও কমিটিমেম্বার্স ছাড়া আর কেউ বোধহয় ক্লিয়ার বুঝতে পারেন নাই কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে। অগত্যা আমাদের মতো কমনার্স আর কি করতে পারে, কমন কয়েকটা ভেন্যুর সামনে গিয়া দাঁড়ানো ছাড়া? পার্ষদবর্গ গলদঘর্ম পর্ষদবাজি নিয়া, আমরা কাঙালের মতো দুইটা নাচ-গান আর সুর-স্বর দেখতে চাই শুনতে চাই। কিন্তু গরিবের জন্য ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু তো নাই এই দেশে।

এরই মধ্যে ০৫ নভেম্বর ২০১৯ সিলেট কিনব্রিজসংলগ্ন উন্মুক্ত সড়কে গুরুজির জবরজং রঙমাখানো বোল্ডার পাত্থরের বেদির উপরে ন্যাস্ত নকল প্রতিকৃতির উন্মোচন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে গেল। প্রতিকৃতিটা স্থাপিত হয়েছে পুলের তলার নারকীয় অন্ধকার চিপায়। এইটা আনফেয়ার হয়েছে অনেক দিক থেকে। একে হচ্ছে যে এইটা সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত পোর্ট্রেইট যার উল্লেখ নকলনবিশ এই শিল্পকর্মকুষ্মাণ্ড কোথাও করেন নাই, আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে এর গ্র্যাফিক সেন্স অত্যন্ত ধ্বজভঙ্গ ও দুর্বল। রঙ বা বর্ণজ্ঞানে একেবারে ল্যাবগ্যাবে এই নির্মাণমিস্তিরি বা কামলা সাহেবটি নিশ্চয় কোনো সরকারি কেরানি হবেন, অথবা স্থানীয় কোনো কম্পিউটার গ্র্যাফিক্সের দোকানদার। সত্যজিৎ রায়ের ছবিচুরি হলেও ঐতিহাসিক একটা কাজের সঙ্গে দোকানদার বা আপিশার বাবু জড়িত রইলেন, সুখের বলতে এইটুকু। পকেটে দুইটা নোটেরও আমদানি হলো। অথচ শ্রদ্ধাজ্ঞাপক স্মরণফলকে একটাকিছু অরিজিন্যাল আর্টওয়ার্ক বা প্রতিকৃতিম্যুরাল রাখবার সুযোগ ছিল। মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একজন শিল্পীও জোগাড় করা গেল না যাকে দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় গরিবি অ্যাভোয়েড করা যেত? অন্য দেশের একজন শিল্পীর আইকোনিক আইডেন্টিক্যাল ইমেইজ দিয়া রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কাজ সম্পন্ন করা আন্তর্জাতিক যে-কোনো পরিমণ্ডলে মুচকি হাসির খোরাক দেবে, এ-ব্যাপারে আমি অন্তত নিঃসন্দেহ। সত্যজিৎ রায়ের ফ্যামিলির অনুমতি নেয়া হয়েছে কি না, তা বলেন নাই মহামহিম কর্তৃপক্ষ। সন্দীপ রায় মামলা না ঠুকলেই হলো।

অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের মধ্যে আমাদের শ্রদ্ধেয় সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও মাননীয় নগরমেয়র জনাব আরিফুল হক উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ঘোষণা এল ৭ ও ৮ নভেম্বর সিলেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান হবে, সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, সবাইকে আমন্ত্রণ জানান হলো। মনস্থ করলাম দুইদিন অনুষ্ঠান উপভোগ করব, কর্মস্থলের সাপ্তাহিক ছুটিদিনের সঙ্গে ব্যাপারটা খাপে-খাপ মিলেও গেল। সঙ্গীসাথিদেরও দাওয়াত দিলাম, একসাথে প্রোগ্রাম উপভোগ করব বলে। সিটিমেয়র আর সাবেক সংসদসদস্য মহোদয়দের উপস্থিতিতে নেমন্তন্ন জানানো হয়েছে নগরবাসী সকলকে, কাজেই শতবর্ষ স্মরণোৎসব উদযাপন কমিটিমেম্বারদের কেউ পরিচিত না থাকলেও অনুষ্ঠান উপভোগ থেকে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না।

তারপর এই বৃহস্পতিবার দিনাতিক্রান্ত সন্ধ্যায় আগেভাগে কাজ সেরে অনুষ্ঠানস্থলে গেলাম। ঢুকতে গেলে আয়োজক কর্তৃপক্ষ পাসকার্ড চাইলেন। আমি তাদের বললাম, “ভাই, আমরা তো পাসের কথা জানি না এবং কোন দোকানে পাসকার্ড বিক্রি হয় তাও জানি না, আমাদের জানানো হয়নি।” রিপ্লাই দিতে গিয়ে তারা বললেন, “এখন আর পাসকার্ড নেই। শেষ হয়ে গেছে।” এখন উপায়? আমাকে দ্বিতীয় গেটে যেতে বললেন, গ্যালারিতে, গাঁটছাড়াদের জন্যে যেটি বরাদ্দ। গেলাম। দেখি এখানে আমি এবং প্রহরারত কজন পুলিশ ছাড়া আর কেউ নাই। আর এটা তো ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা না যা গ্যালারি থেকে উপভোগ করা যায়। কালচার তো হচ্ছে একটা ভাইব্রেশন। এইটা, ভাইবটা, গাদাগাদি ভিড়ের ভিতরে থেকেই নিতে হয়। এত দূরের গ্যালারিতে বসে জায়ান্ট স্ক্রিনে অনুষ্ঠান দেখব যদি তবে বাসায় বসে চিনিছাড়া আদাচায়ের সঙ্গে টেলিভিশন গলাধঃকরণ করলেই পারতাম দৈনন্দিনের মতো। কর্তৃপক্ষ উপদেশটুকু প্রচার করলেই পারতেন যে টেলিভিশনে সংস্কৃতি দেখুন, সরাসরি রবীন্দ্রনাথ সর্বসাধারণের জন্য নয়, তবে তো এই বিড়ম্বনায় আমারে আজকে পড়তে হতো না।

তাছাড়া ফুটবল, ক্রিকেট, রকমিউজিক বা ফোকের কন্সার্ট ইত্যাদিতে টিকেট কেটে এন্ট্রান্সের সিস্টেম থাকলে কর্তৃপক্ষ অনেক আগে থেকে নানান প্রচারমাধ্যমে যথাযথভাবে জানিয়ে দেন প্রবেশপত্র সংগ্রহের বা খরিদের স্থান, ক্ষণ, দামদস্তুর ও অন্যান্য বৃত্তান্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেটভিজিট শতবর্ষ স্মরণোৎসব পর্ষদের পরাক্রমশালী পার্ষদবর্গ এইখানে ব্যর্থতা আর দায়িত্ববিবেচনাহীনতার যেই ইতিহাস রচনা করলেন, তা আমি শতবর্ষ পরেও ভুলব না।

আবার আরেকদিকে ভেবে দেখলে বলা যায় যে ব্যতিব্যস্ত পর্ষদ কর্তৃপক্ষ স্ব স্ব পর্ষদ নিয়ে এতই বিজি ছিলেন, আমার মতো বিপুলায়তন সিলেটবাসীর অংশগ্রহণ নিয়া ভাবতে বসার বা প্ল্যান কষার ফুরসত পান নাই তিনারা। আমাদের মতো কমন মানুষ যাদের সংস্কৃতিপৃথিবীর কর্ণধার-সেবায়েতদের সঙ্গে হ্যালোসম্পর্কটা নাই, কিংবা তাদের মধ্যে কেউ আমাদের ভাইবিরাদর বা আর-কোনো প্রণয়সূত্রে সম্পর্কিত না, আমাদের পক্ষে পাস ছাড়া স্টেডিয়ামের ঘাসে পা রাখা খালি মুশকিলেরই নয় বরং নামুনকিন। কর্তৃপক্ষ আমাদেরে নিয়া ভাবে না, আমরা কর্তৃপক্ষের কেউ না। তারা ব্যস্ত তাদের কর্তৃপক্ষগিরি নিয়া। চারিদিকে এত অব্যবস্থা আর আনাড়িপনা নিয়া তারা ভাববেন কখন? সত্যিমিথ্যা জানি না, ঠাকুরের সিলেটভ্রমণ শতবর্ষ স্মরণোৎসব উদযাপনের জন্য গত কয়েক মাস ধরে নাকি খালি কমিটিই গঠন হয়েছে আর বাচ্চাতোষ হাউকাউ হয়েছে। কে একজন তো কারারুদ্ধ খালেদা জিয়াকে এনে প্রধান অতিথির আসনে বসাতে চেয়েছে, এবং এইটা নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক হাসিঠাট্টার যোগান দিয়েছে ডেইলি নিউজ লোক্যালগুলার বদৌলতে। এছাড়া বাকি সবাই চেয়েছে শেখ হাসিনাকে। শেষমেশ এই দুইজনের কেউই আসছেন না জানা গেছে।

এরা আসলে এইগুলা নিয়াই বিজি ছিল। সত্যি সত্যি বিজনেস তো আসলে এইগুলাই। রবীন্দ্রনাথ তো উসিলা মাত্র। রদ্দিমাল একটাকিছু হলেই হয়, বিজনেসের জন্যে স্রেফ একটা উসিলাই লাগে। রেস্ট অফ দি থিংস্ এদের হাতে মুড়ির মোয়া। আবারও বলি, সত্যিমিথ্যা জানি না, ঠাকুরের সিলেটভ্রমণ শতবর্ষ স্মরণোৎসব উদযাপনের জন্য নাকি শতকমিটি হয়েছে? এইটা আমি শুনেছি, কিন্তু মনে হয় একটু অতিরঞ্জিত। তবে শতশত মেম্বারের কমিটি হয়েছে, এতে ডাউট রাখি না।

আসলে, একটু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, এখানেও কমিটিওয়ালারা রবীন্দ্রনাথকে অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই গণ্ডিবদ্ধ করে রাখল; কর্তৃপক্ষমনস্ক সংস্কৃতিসেবক ষণ্ডাপাণ্ডাদের হাতে পড়ে গুরুদেবের এহেন দুর্গতি ও দুর্দশা, যা আমার চিরদিনের চেনা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বড়ই বেমানান। একইসাথে আমাদের মতো আমপাব্লিকের সাথে প্রতারণাও করা হলো কি না, বিবেচকরা ভেবে দেখবেন। আজি হতে আরও শতবর্ষ পরের বিবেচকদের কাছে এই বিচারের ভার রেখে গেলাম।

… …

গানপার

মননাশ্রয়ী বিনোদনের সৃজনসম্ভার।
গানপার

COMMENTS

error: