হিমের হাওয়ায় ব্যাকুল রোদন

হিমের হাওয়ায় ব্যাকুল রোদন

রবীন্দ্রনাথ কি শীত পছন্দ করতেন না? আমি ঠিক জানি না, মানে জিগ্যেশ করা হয়নি কোনোদিনই তাকে বা তার কোনো অফিসিয়্যাল্ প্রোমোটারকে, বাট সিম্স টু বি যে তেমন পছন্দ বোধহয় ঠাকুর করতেন না শীত বেচারীকে। এমন হতেই পারে। এইটা আলাদা ফাইন্ডিংস্ হিশেবে ফোকাস্ করার কিছু হয়তো না। তাই বলে একডজন গানেই শীত কাভার করিয়া ঠাকুর পার পেয়ে যাবেন? না-মামুর চেয়ে কানামামু তরিকায় এই ধরি শিশির না-ছুঁই নিউমোনিয়া টাইপের নমো-নমো ডক্যু তৈয়ারির দিকে না-গেলেও ক্ষতি কিছু হতো বলে মনে হয় না। আর তার বর্ষা ও বসন্তপ্রীতির কথা কে না জানে, সেক্ষেত্রে শীতের দিকে দৃষ্টি দেয়া তার হয়ে ওঠে নাই সেভাবে। ন্যাচারালি তিনি বর্ষার প্রতিই লয়্যাল্ থাকতে চেয়েছেন আগাগোড়া। আর রোম্যান্টিসিজমের আওতাধীন অন্য দশ-পঁচিশ কবির মতো উনার মধ্যেও বসন্তপ্রণয় জাগ্রত থাকবে এতে আশ্চর্যের কিছু নাই।

গীতবিতানে প্রকৃতিপর্বের অধ্যায়ে পৃথক ছয়ঋতুর গান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বর্ষাগান সংখ্যায় বেশি সবচেয়ে, সেকন্ড পজিশনে স্প্রিং। শীতের স্তোত্র সংখ্যায় সাকুল্যে তেরো/চোদ্দ হবে, বেশি নয়, কমও হতে পারে। হেমন্ত আর শরতের ভাগা দুইটা মিলিয়ে আরও কয়েকটা বাড়ানো হয়তো প্রস্তাব করবেন কেউ, তবে সেক্ষেত্রে বর্ষার বা বসন্তের সংখ্যাও তো উঁচা হবে ব্যাপক। কাজেই এই নিয়মে পুনঃসম্পাদনা আদৌ দরকার নাই।

‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে’, ‘শিউলি-ফোটা ফুরোল যেই ফুরোল শীতের বনে’, ‘এল যে শীতের বেলা বরষ-পরে’, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়’, ‘শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে’ ইত্যাদি ছাড়া আরও গুটিকয় গান আছে বটে। এর মধ্যে ‘একি মায়া, লুকাও মায়া জীর্ণ শীতের সাজে’ গানটাও রয়েছে, যেখানে এমন পঙক্তিটা পাওয়া যায় ‘হিমের হাওয়ায় গগন-ভরা ব্যাকুল রোদন বাজে’ ইত্যাদি।

‘বিচিত্র’ এবং ‘গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য’ বা ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’, কিংবা ‘আনুষ্ঠানিক’ শীর্ষক আরেকটা ভাগ, ‘পুজা ও প্রার্থনা’ নামে একটা ভাগা, বা ‘রবিচ্ছায়া’ আরেকটা, ‘জাতীয় সংগীত’ নামে একটা ভাগ আছে, যেমন আছে ‘স্বদেশ’ নামে একটা ভাগ, এই বিভাগগুলোতেও খুঁজলে আরও দুইচাইরটা শীতের লিরিক মিলবে না তা বলছি না। বাকি পাঁচ ঋতুর ফোল্ডার স্ট্যান্ডার্ড আয়তনের হলেও শীতের লিরিকের ফোল্ডার অতি ক্ষীণ, দশ-বারোর বেশি গান সেই ফোল্ডারে নাই, বলবার কথা এইটাই।

শীতের সন্তান সন্দেহাতীতভাবেই জীবনানন্দ দাশ। শীতের সন্তান? শীতের বরপুত্র? হোয়াই, শীতের স্বামী/ফিয়াসেঁ বলা যাবে না? যাবে না কেন, যাবে। লেবেলের গায়ে লেখা দেখে তো আর কেউ ওয়াইন খায় না। কাজেই কী-বা হায় আসে যায় লেবেলের অভিধায়? শীতপতি/শীতনাথ/শীতযোনিসম্ভূত ইত্যাদি যা-ই বলুন, জীবনানন্দেই শীতের দেখা পাবেন আপনি। জীবনের শীতবিতান অবশ্য রবি-অপারেটরের গীতবিতান নয়, লিরিক্সের সঙ্গে স্বরলিপি ফিক্সড্ নাই। শীতশিল্পীরা কাজেই ইচ্ছেমতো ব্ল্যুজ্ টিউনে এইটা গাইবার মওকা পাচ্ছেন। স্বর্গত অজিত রায়ের ন্যায় কীর্তন-ভাটিয়ালি বানাইতেই হবে, নেসেসারিলি নট।

তবে এইটা মনে হয় একবার খুঁজে দেখা যেতে পারে যে, বেচারা ঠাকুর সত্যিই শীতভীতু/শীতসন্ত্রস্ত ছিলেন কি না। আন্দাজে কথা বলার চেয়ে তখন বেশ গবেষকডাঁট নিয়া আলাপ-ঝালা চালানো যাবে। কেবল এই আন্দাজটুকু, রবি ছিলেন শীতবীতশ্রদ্ধ এই আন্দাজটুকু, বলবার ইজাজত আমায় দিন, মালকিন! মনে হয়, ঠাকুর যেভাবে বেসম্ভব গরমেও জোব্বাজাব্বা গায়ে চাপায়ে হাঁটতেন, তিনি শীতসন্ত্রস্তই ছিলেন। ঠাণ্ডা-লাগার ধাত ছিল উনার, সম্ভবত। যৌবনে এক-দুইবার দেখেছি উনারে ফ্যাশন্যাবল্ দুইয়েকটা পাঞ্জাবিকিসিম কুর্তা পরিধান করতে, তা-ও তো লং স্কার্ট, এরপর তিরিশ হতে-না-হতেই বিবেকানন্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়া ঠাকুরের ঋষিফ্যাশন্ মার্কেটে চলে আসে। বিবেকের অবশ্য গরমসহিষ্ণু গেরুয়া ম্যাটেরিয়্যাল্ দিয়া বানানো, রবিরটা দেখেই শীত পালায়। ঠাকুরের আলখাল্লার থানকাপড় অত্যন্ত পুরু, মোটা, পৌষমাঘের শেয়ালও হুক্কাহুয়া থামিয়ে তব্দা মেরে থাকবে এমন মোটা।

ঠাকুর কি গ্রীষ্মেও কুসুমোষ্ণ জলে সিনান সারতেন? খোঁজ নিতে হবে।

লেখা / জাহেদ আহমদ

… …

গানপার

COMMENTS

error: