সুরমাপারের বিস্মৃতপ্রায় এক শঙ্খচিল || শামস শামীম

সুরমাপারের বিস্মৃতপ্রায় এক শঙ্খচিল || শামস শামীম

“হবিগঞ্জের জালালি কইতর সুনামগঞ্জের কোড়া / সুরমা নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম ওড়া / শূন্যে দিলাম ওড়া রে ভাই যাইতে চান্দের চর / ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কইলকাত্তার উপর / তোমরা আমায় চিনোনি …” — শৈশবে এই গানটি কার কণ্ঠে শুনেছিলাম মনে নেই। গান শোনার সেই দাগ এখনো হৃৎপিণ্ডে লেগে আছে, যেন খাজুরাহো দেয়ালের চিরন্তন রেখা। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের যাতনা জাতিকে শেকড়রচ্যুত করে কিভাবে ফালা ফালা করে দিয়েছিল সেই আখ্যান মূর্ত হয়েছিল এই গীতে। নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস (Hemango Biswas) সেই যাতনার চিরন্তন এক বেদনাগাথা রচনা করেছিলেন। গণগান, গণনাট্যে প্রগতিমুখিন সংস্কৃতির তুফান তুলেছিলেন তিনি মাটিজাত মানস থেকে। উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মৌলবাদ, আধিপত্যবাদ ও পূঁজিবাদকে শাশ্বত দ্রোহী সুরের ঝঙ্কারে। প্রকৃতার্থে কৃষক-মজুর তথা নিম্নবর্গীয় বঞ্চিত লোকজনই ছিল তাঁর গানঘরের অতিআপন প্রতিবেশী। তাই তো সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে আসামের এক নিভৃত পল্লীতেই নীরবে সংগীতসাধনা করে সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদদের সাহস জুগিয়েছেন। পোশাকী বিপ্লব বা প্রগতি নয়, তাঁর প্রকৃত চেতনাই এই চাষাভূষা মানুষদের আপন করে নিয়েছিল।

হাওর-ভাটির সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও সহজ সরল গ্রামীণ জীবন নিয়ে বোনা কলজে-ছেঁড়া এই গানখানার গায়েন সম্পর্কে তখন কিছুই জানতাম না। হৃদয়ে টুকে রাখা “হাওরের পানি নাই রে হেথায় / নাই রে তাজা মাছ, বিলের বুকে ডানা-মেলা / নাই রে হিজল গাছ” … অথবা ‘সুনামগঞ্জের কোড়া’ … এসব শুনে স্থায়ীভাবে মনে একটা ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান হবার পর জানলাম এই গানের মহান শিল্পী উপমহাদেশের গণসংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রবর্তী সৈনিক হেমাঙ্গ বিশ্বাস; — আমাদেরই স্বজন। হবিগঞ্জের মিরাশিতে তাঁর বাড়ি। বাস্তুভিটা হারিয়ে ছিটকে পড়েছিলেন বাবুদের কইলকাত্তায়। চেনা গ্রামদেশহারা এই মানুষটি পরবর্তীকালে বিশ্বনাগরিক হয়ে সেই জায়গা থেকেই তার চিরন্তন যাতনাকে অনুধাবন করেছিলেন। আমৃত্যু মানুষের মুক্তির গান গেয়েই তিনি অমর হয়েছেন।

জমিদারনন্দন হয়েও তিনি ছিলেন চিরতরে মাটিগন্ধী মহান মানুষ। সুরমা উপত্যকার সর্বহারা শ্রেণির মন্ত্রণাদাতা এই মানুষটি আজ এই অঞ্চলে অনেকটা বিস্মৃতপ্রায়। দায় স্বীকারের তেমন উদ্যোগও কাউকে নিতে দেখা যায় না। বরং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আদর্শ থেকে বিচ্যুত প্রগতির দাবিদার গণসংগঠন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এখন ক্ষমতাঘনিষ্ঠদের ছত্রধর হয়েই বাহ্বা কুড়াতে চায়।

যতদূর জানা যায়, ১৯৮১ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে মনীষী বদরুদ্দিন উমর ও ড. আহমদ শরীফের উদ্যোগে ঢাকায় ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। মৃত্যুর আগে এটাই ছিল তাঁর দেশ থেকে যৎসামান্য প্রাপ্তি! কিন্তু তাঁর জন্মাঞ্চল বৃহত্তর সিলেটবাসী তাঁকে যোগ্য সম্মান দেয়নি আজতক। এখন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নগরে কদাচিৎ তাঁর সংগীত পরিবেশন করে থাকে। কিন্তু তৃণমূল মানুষের ব্যথাবেদনা আর লড়াইয়ের গাথাকার শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান আজকাল আর গ্রামেগঞ্জে গাওয়া হয় না; গণসংগীতের জাগরণ, ঝঙ্কার আজ আর পৌঁছাচ্ছে না তাঁর স্বপ্নের গ্রামে। যদিও আমরা জানি গ্রামের কৃষক-মজুরই ছিল তাঁর শ্রোতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত বাবুয়ানির বদলে মাটিজাত গ্রামের মানুষের কাছেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন গানে ও সুরে। ছিলেন তাদের হৃদয়ের গহীনের মানুষ। তার সুর ও কথা এই মানুষদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।

Albums of Hemango Biswas 1

শুধু এই গানটিই নয়, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দেশ ও মানুষ নিয়ে বোনা অন্যান্য গানের কথাও উত্তেজনা-উদ্দীপনা ও দ্রোহের বারুদে ঠাসা। ধনুকছিলার মতো সটান হতে শেখায় মেরুদণ্ড-বাঁকা-হয়ে-যাওয়া গণমানুষকে। শোষকের মসনদ কাঁপানো, নিম্নবর্গীয় জাগরণের এই দূতের কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা সুরধ্বনি মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হিশেবে ঘুম ভাঙাত অচেতন মানুষের। গণসংগীতে এখনো তিনি দৃষ্টান্তের চিরন্তন এক সাহসী স্মারক হয়ে আছেন। সাহস ও সংকল্পে এখনো অনুকরণীয়। আবাল্যের গণমানুষের শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা গানে ও সুরের ঝঙ্কারে গোটা সুরমা উপত্যকায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এতে সংক্রমিত হয়েছিল শোষিত-দলিত মানুষেরা। লোকবোদ্ধারা স্বীকার করেন, এই অঞ্চলের লোকাচারকে হৃদয় থেকে ধারণ করেছিলেন তিনি গানে ও সুরের ভিন্নতায়। মরমি লোকসংগীত থেকে উপাদান নিয়ে নিয়ে তিনি নবজাগরণের ছবি আঁকতেন গানে ও তাঁর সুরে। তাঁর সৃষ্টি আমৃত্যু সেটাই বলে। লোকায়ত মরমি সুর তাঁর গানের এক চিরন্তন দ্রোহী বাঁশি।

কংগ্রেসনেতাদের সঙ্গে ইংরেজদের মধুর সম্পর্ক নিয়ে তিনি ‘মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য’ লিখেছিলেন অত্যন্ত তীর্যকভাবে। পথেঘাটে তখন এই গানটা গাওয়া হতো। কংগ্রেস আমলে এ-কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় টিভি-রেডিওতে প্রায় নিষিদ্ধ ছিলেন। গবেষকরা বলেন, মার্কসীয় তত্ত্বপ্রবন্ধের মতো কঠিন দিকে না-গিয়ে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। বৃটিশ ভারতে গণনাট্য সংঠনের প্রধান সংগঠক ও শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে বিত্তের মোহে পায়নি কখনো। তাই তো জমিদারনন্দন হয়েও তাঁকে অবহেলায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে, শেষ-বয়সে, নিজেদের আদর্শের তথাকথিত মানুষগুলোও দূরে সরে গিয়েছিল।

সংগীতবোদ্ধারা বলে থাকেন, বাঙলার চিরায়ত সম্পদ লোকধারাই তাঁর গণসংগীতের প্রধান উপজীব্য। মরমি সুরে যেন তিনি ধার দিয়েছিলেন ভিন্নতর ভাবে। কথা টান টান, কিন্তু সুরটা যেন চেনা। হাজার বছরের লোকায়ত সেই সুর হৃদয় হরণ করে মানুষকে জাগরণের পথ দেখায়।

এই মহান গণমানুষের শিল্পী ১৯১২ সালের ১৪ জানুয়ারি বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার মিরাশিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি বাংলার লোকায়ত ধারার গণসংগীতকে এক মর্যাদার আসনে রেখে গেছেন। এখনো শ্রেণিবৈষম্যনিষ্পেষিত অধিকারহারা, সর্বহারা শ্রেণির লোকজন তাঁর গানকে প্রেরণার উৎস হিশেবে মানে। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর গণসংগীত উদ্দীপ্ত করেছে বাঙালিকে; বিশেষ-করে গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে তিনি সেখানেও সংগীতকে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা খুব কম গণসংগীতশিল্পীই পেরেছেন।

তাঁর ভাষ্যমতে, “স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই মোহনায় গণসঙ্গীতের জন্ম।” তিনি এই দেশের লৌকিক ধারায় তাঁর গানকে শানালেও একইসঙ্গে সর্বহারা ও বঞ্চিত প্রশ্নে ছিলেন বৈশ্বিক। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী স্মৃতিচারণে কমরেড হেনা দাস বলেছিলেন, “একজন কমিউনিস্ট হিশেবে হেমাঙ্গদা একদিকে যেমন জনজীবনের সাথে গভীরভাবে একাত্ম ছিলেন, তেমনি জনগণের মুক্তিসংগ্রাম ও তার লক্ষ্য সম্পর্কেও ছিলেন পরিপূর্ণ সচেতন। তাই তার গানের মর্মবস্তু হয়েছে জনগণের দুঃখকষ্টবেদনা এবং তাদের বলিষ্ট সংগ্রামের হতিয়ার। তার গানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মর্মান্তিক কষ্ট  ও হাহাকার, ফুটে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী দানবের ভয়ঙ্কর রূপ, চিত্রিত হয়েছে পুঁজিপতি-জমিদার-মহাজন-কালোবাজারি-মুনাফাখোরদের নিষ্ঠুর শোষণের চিত্র।”

Collected Hemango Biswas

ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান বাংলার মাঠঘাট কৃষকের ঘরে ঘরে পৌঁছে অধিকার-আদায় প্রশ্নে তাদের সচেতন করেছে। এই অঞ্চলের কৃষকআন্দোলন সহ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর গান ছিল প্রেরণার উৎস। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও এসব গানের ভূমিকা গৌণ নয়।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছাত্রাবস্থায়ই লাল পতাকার শিবিরে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাঁর ধারালো লোকায়ত কাব্যসংগীতে মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করেছেন মানুষকে। বিভিন্ন সময়ে গণমানুষের পক্ষে দাঁড়ানোয় একাধিকবার কারাবরণও করেন। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের কারণে তিনি টানা তিনবছর কারাভোগ করেন। নির্যাতিত হন কারাগারে।

১৯৩৮-৩৯ সালে তিনি দেবব্রত বিশ্বাস, বিনয় রায় ও নিরঞ্জন সেনের সঙ্গে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ গঠন করেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রচেষ্টায় সিলেটে ১৯৪৩ সালে ‘সিলেট গণনাট্য সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। “তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান / কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী …” — এই গানটা ব্যাপক সাড়া ফেলে। মুক্তিকামী মানুষ ও বিপ্লবীদের জপমন্ত্র হয়ে ওঠে তাঁর গান। গানের পাশাপাশি ষাটের দশকে তিনি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। নাটক-সিনেমায় সংগীত পরিচালনার কাজও করেন। কলোনিয়্যাল সময়ে চিন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। চিনা ভাষায়ও তিনি গান লিখেছেন। চিনের বিপ্লবী নেতা মাও-সে-তুঙকে নিয়ে তাঁর “আরো বসন্ত বহু বসন্ত তোমান নামে আসুক / তুমি তো সূর্য অস্তবিহীন চির জাগরুক” গানটি এখনো হৃদয়ে নাড়া দেয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস জীবনভর বিপ্লবের সোয়াপাখি উড়িয়েছেন। জাগরণের গানে মাতিয়েছেন চেতনহারাদের। কৃষক, মজুর ও অধিকারহারা মানুষকে মন্ত্রণা দিয়ে গেছেন নিজের বান্ধা সুর ও কথায়।

‘ম্যাস্ সিঙ্গার্স’ নামের দল গঠন করে জীবনের শেষবেলায় গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে মানুষকে সচেতন করতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সংগীতরচনাগুলো হলো, — ‘আমি যে দেখেছি সেই দেশ’, ‘সেলাম চাচা’, ‘শঙ্খচিলের গান’, ‘মশাল জ্বালো’ ইত্যাদি।

বৈশ্বিক শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামকে তিনি এঁকেছেন গানের ভাষায়। তিনি আমেরিকার রেললাইনশ্রমিক, হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ, ৪৬-এর নৌবিদ্রোহ, দুর্ভিক্ষ নিয়েও সংগীত রচনা করে মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর হিরোশিমার উপর লেখা সংগীত “সূদূর সমুদ্দুর প্রশান্তের বুকে / হিরোশিমা দ্বীপের আমি শঙ্খচিল / আমার দু-ডানায় ঢেউয়ের দোলা / আমার দুচোখে নীল শুধু নীল” …

বাংলা গণসংগীতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এক অগ্রপথিক ও শক্তিশালী নাম। গণসংগীত আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে জনগণের সংগ্রামী প্রত্যয়কে কালোত্তীর্ণ সুরের মাধ্যমে তিনি গণসংগীতকে সত্যিকার অর্থে গণসংগীত করে তুলেছিলেন। লোকায়ত সুর ধার করে এ-ধারার সংগীতে নতুনধারার জন্ম দিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তাঁর প্রতিবাদী গণমানুষের গান এখনো শিরায়-রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাংলার মাটি-আলো-হাওয়া থেকে রসদ সংগ্রহকারী এই গণসংগীতমহাজন এখনো নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে রেখেছেন।

আমরা তাঁকে কতটা ধারণ করি, কিংবা তাঁর কথা আদৌ কতটুকু মনে রাখি!

… … 

COMMENTS

error: