একপেশে লেখকের নির্বাচিত প্রবন্ধ

একপেশে লেখকের নির্বাচিত প্রবন্ধ

SHARE:

দুইজন বন্ধুর মধ্যে কথা হচ্ছিল হুমায়ুন আজাদের লেখাপত্রের সঙ্গে আমাদের বেড়ে-ওঠার দিনগুলি নিয়া। ঢাকায় ২০১৬ জুলাইয়ের প্রথম দিনে হোলি-আর্টিস্যান বেকারিতে মিলিট্যান্ট অ্যাটাক এবং জঙ্গিকৃপাণে নৃশংসভাবে মানুষখুনের বিভীষিকাময় রাতে এই আলাপের সূত্রপাত হয়। এরও একযুগ আগে এই ইসলামি জঙ্গিদের চাপাতিকোপ চোয়ালে নিয়া আজাদকে নিহত হতে হয়। আজাদ আক্রমণকবলিত হন ২০০৪ ফেব্রুয়ারিতে এবং এরই কন্সিক্যুয়েন্স হিশেবে জার্মানিতে তিনি মৃত্যুপতিত হন কয়েকমাসের মধ্যেই।

‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ শীর্ষক ডক্টর আজাদের একটা বই আছে, ঢাকার আগামী প্রকাশনী থেকে বইটা পাব্লিশ হয়েছিল ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে, সেইখান থেকে একটি নিবন্ধ পড়তে যেয়েই আলাপের শুরু। সম্ভবত রুগ্ন জনগোষ্ঠী হিশেবে বাঙালির উদ্ধাররহিত ভবিতব্য নিয়া আজাদীয় ঢঙে বিস্তর বিশেষণঠাসা শ্বাসরুদ্ধ বাক্যসংগঠনের সেই রচনাটা আমরা পড়ে যেতেছিলাম। পড়ার মধ্যিপথে রিডিংলিস্নারদের রিমার্কস্ থেকে একটা শব্দ কমন্ নিয়ে এই রিভিয়্যুটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হতেছি। কিন্তু তার আগে থ্যাঙ্কস্ জানাই শব্দটা জুগিয়ে দেবার জন্যে, থ্যাঙ্কস্ জানাই সেই বন্ধুদেরে; হ্যাঁ, ‘একপেশে’, এই লেখাটা তো বটেই ইভেন্ ডক্টর আজাদের আজীবনের লেখাপত্রগুলোকে এই একপেশেপনার জন্যই বিস্তর ধারালো হওয়া সত্ত্বেও আজ আর বিশেষ কাজে লাগানো যায় না।

ন্যাক্কারজনক ঢাকা অ্যাটাকের পর থেকে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাইছিলাম যেন কিছুই না-লিখে বেদনার দিনগুলা পার করা যায়। এমনিতে লেখালেখি ব্যাপারটা বাংলাদেশে কোনোদিনই ঠিক মানুষের কাছে গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে পারে নাই। ইদানীং তো লেখা মানেই হচ্ছে বেতমিজি, বিদূষকগিরি, বিমিশ্র ধড়িবাজি আর ফাইজলামি ফিচলামি। বিচি ফাটাইবার বীভৎস উল্লাসকল্পনাই আজকের বাংলাদেশের লেখালেখি। ইগো স্যাটিস্ফাই করা আর অপরের মুখ নিভিয়ে দেবার ইউফোরিয়া খালি। রিক্যাপ করে দেখতে পাই যে হুমায়ুন আজাদের মধ্যে এই টেন্ডেন্সিগুলি ছিল পুরামাত্রায়। আজাদ ব্লগ বা ফেবু সভ্যতার ধুন্দুমার দেখে যেতে পারেন নাই। ইগোসেন্ট্রিক লেখালেখির গোলে হরিবল অবস্থা দেখে যেতে পারলে আজাদ নিশ্চয় খামোশ হয়ে রিয়্যালাইজ করতে পারতেন গলতিটা কোথায় হয়েছে।

অ্যানিওয়ে। একটা ট্র্যানজিশনের ভিতর দিয়া যাচ্ছি আমরা, যাচ্ছে আমাদের আধখেঁচড়া সোসাইটি, হামেশা বলতে ও শুনতে থাকি এই কিসিমের কথামালা। আমি রিসেন্ট ফেনোমেনা মাথায় রেখেই ইতিউতি খুঁজে দেখতে লেগেছিলাম আমাদের পূর্বজেরা ব্যাপারগুলা আঁচ করেছিলেন কি না, অ্যাড্রেস্ করেছিলেন কি না, তাদের রাডারে ব্যাপারগুলা আগে থেকে ধরা পড়েছিল কি না। খান-কতেক বই তো মুজতবা আলীর দেশে সকলের ঘরের শোকেসেই থাকে এবং আমিও সকলের থেকে আলাদা নই বিধায় বেশ-কয়েকখানা বই ইন্টেনশন্ জাগ্রত রেখে রিভাইজ্ দিয়ে ফেললাম ওই কয়েকদিনে। আবুল ফজল, আব্দুল ওদুদ, মোতাহার হোসেন — এই তিনের কয়েকটা চ্যাপ্টারের অংশবিশেষ দেখতে লেগেছিলাম, পথিমধ্যে বেশ কয়েকলাইন আহমদ শরীফ আর বদরুদ্দীন উমর দেখে সেরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কয়েকটা আর্টিক্যল্ আদ্যোপান্ত পড়ে যেতে পারলাম; এদের প্রত্যেকেরই নির্বাচিত প্রবন্ধের একটা করে সংকলন ঘরের কুলুঙ্গিতে আছে দেখতে পাই। সবশেষে পাশাপাশি খুলে পড়ছিলাম হুমায়ুন আজাদ আর আহমদ ছফা; সাপ-নেউল সম্পর্কের দুই তীর্থযাত্রীকে এখন আমরা পাশাপাশি বসিয়ে রেখে দিতে পারি কী অবলীলায়, একটানা কয়েক ঘণ্টা, ভাবুন মজাটা! আমি জীবিত মানুষের সঙ্গে মৃত মানুষের পার্থক্য এ-ই দেখতে পাই যে, মৃতদের হিংসাবিদ্বেষ থাকে না। আর জীবিত মানেই হচ্ছে দ্বেষবিদ্বেষের বক্ষিলা একেকটা।

তা, বাংলার যেসব স্টলোয়ার্ট লেখকের নাম উল্লেখ করলাম উপরে, এরা প্রত্যেকেই ঘটনানিরপেক্ষ বিবেচনায় ভেবেছেন ব্যাপারটা, বাংলা সাংস্কৃতিক গতিধারা নিয়া ভাবিত হয়েছেন ফিরে ফিরেই, রিসেন্ট ফেনোমেনাগুলো থেকে যে-একটা কালচারাল শকের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা তা নিয়াই আবর্তিত হয়েছে তাদের লেখাধারা, যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে এই লেখকেরা নিরন্তর নানাপ্রকার হেজিমোনি নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন রক্তজারিত রচনা একেকটা। আঁচ করেছেন অগ্নিকাণ্ড, অশনি সংকেত দিয়েছেন, ঘটনালগ্ন করে না-বললে হয়তো আমরা আদৌ বুঝতে পারি না বা খেয়াল করি না তাদের অবদানগুলা।

আজাদের রচনা একদেশদর্শী, একপেশে, কিন্তু একটা বেদনাজাত ক্রোধ ক্রিয়াশীল থাকায় লেখাগুলো ‘অপ্রিয়’ হলেও ‘সত্য’ স্বীকার করতে বাধ্য হই আমরা। আজাদ সবসময় শক্তিশালী অণুবীক্ষণযন্ত্রের তলায় রেখে দেখেছেন খালিচোখে-দেখা-যায়-না এমন তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাগুলো। গালিভার্স ট্র্যাভেল্সে যেমন দেখা যায় এক রূপসীর গালে গজানো ব্রনটাকে স্রেফ বর্ণনাভঙ্গি দিয়া অতিকায় দেখানো হয়, আজাদের রচনাটেক্নিকটিও অনেকটা তা-ই। বিশেষণ প্রয়োগের মাধ্যমে একটা লেখা আদৌ শক্তপোক্ত যে হয় না বরঞ্চ উল্টোটি, আজাদের রচনা সাক্ষ্যটা দেয়। অ্যানালিটিক্যাল লেখাপত্র লিখতে যেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন আজাদ শোচনীয়ভাবে। এবং অতিশয়োক্তি, অতিরঞ্জন, অতিকথন, এক্সেজারেশনের আখড়া আজাদের একেকটা রচনা।

আজাদ যে প্রভাবিত করেছেন বাংলাদেশের তৎকালীন তরুণতর লিখিয়েদেরে, এর প্রমাণ পাওয়া যায় নাইন্টিসের প্রাবন্ধিকদের মধ্যে। অ্যানালিসিস নাই, অ্যানালিসিসের রাস্তাঘাটও উনাদের শেখা হয় নাই বিতর্কপ্রসূ হুমায়ুন আজাদের লেখাপত্রপ্রভাবিত হতে যেয়ে। ফেসবুক আর ব্লগের জমানায় টেন্ডেন্সিটা আরও অতিকায় আকার ধারণ করেছে। আজকালকার লেখাগুলো, অন্তত গত বছর-দশের লেখালেখিট্রেন্ড নিবিড়ভাবে খেয়াল করে চলেছি বিশেষ বীক্ষণে, অনলাইন তথা আমরা যাদেরে নেটিজেন্ বলি ইহারা আজাদেরই ন্যায় ধারালো অথচ একদেশদর্শী একপেশে লেখায় বাংলা-আরব-আফগান তামা করে দিতেছেন। মূল্যবান পর্যবেক্ষণগুলো শুধু বলনভঙ্গির কারণে পেশযোগ্য হচ্ছে না মানুষের প্রয়োজনে। লেখাগুলো হয়ে উঠছে একেকটা ঘটনা সংঘটনের ইমিডিয়েট রিয়্যাকশন্। প্রতিক্রিয়াশীলতা আজকের দিনের লেখাপত্রে একেবারেই ভিন্ন ও নতুন চেহারায় দেখা দিতেছে এবং আমাদেরই লিখিত মহা সমস্ত ঘটনাবিবরণীগুলোতে! সেসব রচনায় লেখকের অহং তৃপ্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে, এবং লকলকিয়ে লেখকদের অহংজিহ্বা বাড়ছে, লেখা মানুষের কথা ভাবছে না বা মানুষের কাছে যাচ্ছে না বা মানুষের বেদনায় ব্যথিতের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না।

আজাদের এই নির্বাচিত রচনাগোছায়, এবং উনার অন্যান্য অনেক রচনায়, বিস্তর ‘অপ্রিয় অথচ সত্য’ সত্ত্বেও পাঠক হিশেবে আমাদের অহং আহত হয়। এইটা ইম্পোর্ট্যান্ট ব্যাপার যে, লেলিহান ইগো/অহঙের বল্গা টানা আবশ্যক হলেও, একটা লেভেল পর্যন্ত মনুষ্য ইগো/অহং বাঁচিয়ে রাখতে হয়, আদারোয়াইজ্ মানুষধারণা আমূল ধসে যায়, মানুষ কেঁচোকেন্নো হয়ে যায়। এই জিনিশটাই হচ্ছে এখন গোলেমালে লেখাগুলোতে। এগুলো ছোট কম্যুনিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইছে বলে বাঁচোয়া। লাখ-কয়েকের মতো অনলাইন রিডার ছাড়া আর-কেউ তথা কামার-কুমার তাঁতি-জেলে কিষাণ-মজুর আমাদের লেখাপত্র পুঁছে না বলেই রক্ষে। এই কোটি-কোটি নিহত-অহং ঢোঁড়াসাপের ফোঁসফোঁস শব্দেই তো আরশ ভেঙে পড়বার কথা আমাদের সরকার-সুশীল-দুঃশীল সক্কলের মাথায়!

‘লেখা’ জিনিশটা আদৌ ‘যুক্তিবিদ্যা’ নয় কিংবা ‘আবেগভাণ্ড’ নয়, ‘লেখা’ নয় লড়কে-লেঙ্গে চেঙ্গিশ খান, ‘লেখা’ ব্যাপারটা কাজ করে এবং ঘটিত হয় আলাদা তরিকায়; এই জিনিশটা আমার ন্যায় নওজোয়ান ভুঁইফোঁড় লেখককে কে বোঝায়? এখন সবাই যেন তক্কে তক্কে থাকি আমরা একটাকিছু ঘটনা ঘটার অপেক্ষায়, যেই ঘটল অমনি ‘বলেছিলাম না, এদের গর্ভ ও ঔরস দুনোটাই বিনষ্ট চোদ্দশবর্ষ ধরিয়া এবং এরা শ্যাম্পুছাড়া গায়ে-মাখা সাবানে মাথা ধোয়’ ইত্যাদি বিচিত্র কথায় ডিভ্যাল্যুয়েইট করি তোপের-মুখে-পড়া একেকটি জনগোষ্ঠীকে! এইভাবে কে যে কোন সুরাসুর আর স্বর্গনরক রচিতে নেমেছি, ইয়া হরি, নিরীশ্বর/ঈশ্বর দুইজনের একজন নিশ্চয় জানে। অ্যানিওয়ে, এইসব ভাবছিলাম হুমায়ুন আজাদের স্বনির্বাচিত কতিপয় লেখা আরেকবার ফিরে পড়তে যেয়ে এবং আমাদের লেখাপত্রে নিহিত প্রোব্লেমগুলো শনাক্ত করার কিছু পথঘাট সাফ করছিলাম। ডক্টর আজাদের লেখা থেকে একেকটি দীর্ঘায়ত উৎকলন কম্পোজ্ করার সশ্রম দায়টা কাঁধে নিতে পারলে এখনকার বেশিরভাগ লেখকদেরই চর্বিতচর্বণ রচনা পাঠের তক্লিফ সইতে হয় না। খালি যদি রোগ সনাক্তকরণ আর রোগী ও ডাক্তারবদ্যিগুলারে কষে গাইল পাড়ার নামই হয় লেখা, তাইলে আজাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট লেখা আর কেউ অদ্যাবধি লিখতে পারে নাই। কিন্তু লেখা তো তা না, তা হবার কথা না।

আর এই-যে ‘একপেশে’ ব্যাপারটা আপনারা ধরতে পেরে থাকেন যদি, যদিও ‘অপ্রিয়’ ও ‘সত্য’ ও ‘নিজেদের নিয়ে ভাববার, আত্মপরিশুদ্ধির দিকে ধাবিত হওয়ার একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে’ লেখাগুলি, স্বীকার করছি আমরা; তাইলেই বুঝবেন যে আজাদের রচনা অ্যাট-লিস্ট কোথায় এবং কতটা কাজে লাগানো যায়। আমি ‘নিগ্যাটিভ ক্রিটিক’ অধিকতর মূল্যবান মনে করি ‘পোজিটিভ’ আলোচনার চেয়ে, সেক্ষেত্রে সেই ‘নিগ্যাটিভিটি’ যেন ‘পরিশুদ্ধির দিকে ধাবিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা’ ধারণ করে, যেমন বলেছেন আমার ওই বন্ধুদ্বয়; এবং এই ‘আকাঙ্ক্ষা’ আমি আজ আর কোথাও দেখি না। দায়হীন ধুন্দুমার ইগো স্যাটিস্ফাই করতেই ব্যস্ত আমরা, যারা লিখছি তারা; আর কে না লিখছে এই বর্তমান ‘অঘটনঘটনপটু’ বাংলায়? নিজেদের নানাবিধ ক্ষোভ, ভেস্টেড ইন্টারেস্ট, ব্যক্তিগত বঞ্চনা আর অবদমন চরিতার্থ করতে ব্যাপৃত রয়েছি লিখনকর্ম দিয়া। কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলেই সে তার নিজের পাঁচমিনিট পূর্বেকার পঁচিশলাইন স্ট্যাটাস্ আপডেট পড়ে শোনায়, যেখানে ডিস্কোভারি চ্যানেলের বিজ্ঞান পাওয়া যায়, নিউজপোর্টালের রটিত সমাজব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যে এবং যা মিসিং সে ওই মুহুর্মুহু স্ট্যাটাসব্রডকাস্টার এবং তা তার নিজের কাণ্ডজ্ঞানবাহী বিবেচনা। কাজেই, ঘটনাজাত রচনা নয়, রক্তজাত রচনার জন্য, রক্তের ভিতর থেকে জন্মানো রচনার জন্য অপেক্ষা করছি আমরা, যেখানে ব্লেইম্ গেইম্ নয়, স্লেজিং নয়, থাকবে সুস্থিরে ‘লেখার স্বধর্ম’ (জীবনানন্দ বলেছিলেন রচনার নিজস্ব ধর্মের কথাটা) বজায় রেখে এগোনো খনন-বিশ্লেষণ। ওই-ধরনের লেখায় আমাদের ভাণ্ডার ভরপুর না-হলেও পরম্পরা আছে এবং মোটেও অনুল্লেখের নয় সেই বুনিয়াদ, সুপ্রিয় পাঠক-লেখক ভাইবইনবন্ধুরা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সারথী হিশেবে এই সিলসিলা আমার চেয়ে বেশি জানবেন এবং বলতেও পারবেন আপনারাই।

নিঃসন্দেহে, বাঙালির জয়গাথা গাহি আমরা, হাজারটা গালিগালাজের পরেও, যব্ তক্ সুরাজ্ চাঁদ্ রাহেগা / বাংলা সাহিত্য রাজ কারেগা … আপনাদেরে অশেষ ‘মুবারকবাদ’ জানাইতেই হয় আমারে এইখানে এই মাইক্রোফোনে ‘দুটো কথা’ বলবার সুযোগ করে দেবার জন্যে! 🙂 (বি.দ্র. / ডক্টর আজাদের রচনাগুলায় যতবার বাঙালি শব্দটা আছে, সেইসব স্থলে ‘মুসলমান’ শব্দটা প্রতিস্থাপন করে যদি পড়ে দেখি আমরা, তার ফলে যে-আজব অবস্থা তৈয়ার হয়, সেই উদ্ভট উটের গ্রীবা-বাড়ানো অপকাণ্ড করে চলেছি আমরা শয়ে শয়ে; এই ব্যাপারটা আরও সময় গেলে, একগোছা কাণ্ডাকাণ্ডের গড়-মধ্যক-প্রচুরক নিয়ে, কেউ অবশ্যই দেখাইতে ব্রতী হবে; এছাড়া মানুষের সহজ ও সহসা পরিত্রাণ নাই দেখতে পাই।)

কিন্তু হুমায়ুন আজাদের রচনাশৈলী ইদানীং সর্বত্র অনুসৃত হচ্ছে দেখতে পাই। ক্রিটিক বলতে এখনকার বাচ্চাকাচ্চারা আজাদের কলামধর্মী নিবন্ধগুলারেই নিজেদের অজান্তে ফলো করে যায় দেখি। বিনোদনের ভূমিকাটা পালন করে এইসব মননশীল লেবাসে মোড়ানো রচনা, আদৌ মনন খুব অল্পই নিযুক্ত হয়েছে আজাদের প্রাবন্ধিক গদ্যরচনাদিতে। বাংলাদেশের নিয়তি অত্যন্ত আনফর্চুনেইট এই অর্থে যে এখানে এমনিতেই স্থিরচিত্ত পণ্ডিত নাই, যে-দুয়েকজনের মধ্যে সেই হিম্মত ছিল হয়ে ওঠার তারাও কলামিস্ট হিশেবে ভেসে গেছেন গড্ডালিকায়। আজাদের যে-প্রবন্ধগুলা আমাদেরে মেদুর করে তোলে, সেইগুলা কাব্যিক সত্যে ভরা; ‘আমার পাখিরা’ বা ‘আমার ইন্দ্রিয়গুলো’ প্রভৃতি অটোবায়োগ্র্যাফিক স্কেচেস্ পড়ে দেখা যাক এই সূত্রে। কিংবা ‘ধর্ম’ ইত্যাদি দীর্ঘায়ত রচনা। তা, আজকের উন্মুক্ত নলেজ সোর্স এবং রিসোর্সের দুনিয়ায় বার্ট্রান্ড রাসেলের স্কেপ্টিক এ্যসেইজ বা সংশয়ী রচনাবলি তো পড়ে দেখতে পারে যে-কেউ, অথবা তার ক্রিশ্চিয়ানিটি নিয়া লেখাপত্র। ফলে এইগুলাও মৌলিক মূলোৎপাটনকারী নিবন্ধপ্রবন্ধ তো নয়।

কাজী নজরুল ইসলাম শুধুই গলির মোড়ে ঢিল ছুঁড়ে দৌড়ে পালানো এক বালক, বলেছিলেন ডক্টর আজাদ। নজরুলের সফলতা-নিষ্ফলতা তলায়ে দেখি নাই অবশ্য। ডক্টর আজাদ আমাদের সময়ের হিরো বলেই হয়তো উনার কোনো সিনেমাই মিস্ করি নাই দেখতে, কেবল ‘বাক্যতত্ত্ব’ ইত্যাদি কয়েকটা ভাষাবিজ্ঞানধর্মী বই ব্যতীত। উনি নিজে কিন্তু উনার ‘মননশীল’ রচনাপত্তরে সেই ঢিলছোঁড়া বালকটাই। কোথাও ফোকাসড কোনো রচনা নাই তার কালেকশনে, বেবাক কিছুই ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি। কিন্তু বিনোদিত করেছিল প্রকাশকালে, আমাদেরে, এখন আর করে না, এখন সেসব রচনা বেশিরভাগই আউটডেটেড বোধহয়। কিন্তু পড়তে মন্দ লাগে না। বাক্যিক বিশেষ সংগঠন, বিশেষণের উপর্যুপরি স্থাপন, স্বকীয় নির্মিতি ইত্যাদি কারণে এখনও হুমায়ুন আজাদ মাঝেমধ্যে পড়ার টেবিলে মেলে বসা যায়। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ বইটাতে আজাদের প্রবন্ধশৈলীর নজির-নিদর্শন অ্যাট-অ্যা-গ্ল্যান্স পেয়ে যাওয়া যায়। বিশদেই। লিখেছেন তো উনি কবিতা, ছড়া, এমনকি উপন্যাসও। তবে উনার কিশোরসাহিত্য হচ্ছে এই সমস্তকিছুরই শীর্ষে। হুমায়ুন আজাদের কিশোরসাহিত্যের সামনে নতজানু বসে থাকা যায় আজও, অনেকদিন পরেও থাকা যাবে বোধহয়।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… … 

COMMENTS

Posari IT Solution
error: