রোড টু রেভোল্যুশন

রোড টু রেভোল্যুশন

SHARE:

Wherever death may surprise us, let it be welcome, provided that if our battle cry may have reached some receptive ear and another hand may be extended to wield our weapons.

নিজের কবরফলকে এপিটাফ হিশেবে রাখবার জন্যে চে লিখেছিলেন এপিগ্র্যাফের কথাগুলা। আমাদের ল্যান্ডেও অনেক প্রাচীন ও নবীন বীর এসেছেন সময়ের বিভিন্ন মোড়ে, চে এবং তার দেশকালের কিছু মহান ছাড়া আর-কেউ এদেশের জনমনে তেমন ইম্প্যাক্ট রাখতে পারেন নাই। ইভেন চে এবং অন্যান্য ফরেন বিপ্লবী ছাড়া দেশি বিপ্লবী যারা কিনা মাও-চে-লেনিনের সিলেবাসেই বিপ্লবযাপন করেছেন আগাগোড়া, তারাও অত প্রভাব রাখতে পারেন নাই জনমনে। দেশি জিনিশে আমাদের আস্থা বরাবরই কম, দেশি প্রোডাক্টগুলায় ভেজাল থাকার শতকরা হার অনেক হাই, ইদানীং তো দেশি বীরের ব্র্যান্ড আওয়ামীলীগ ছাড়া মার্কেটে আর-কোনো প্রোডাক্টই নাই।

কী অদ্ভুত আয়রনি, দ্যাখো, দুনিয়ার দুঁদে বিপ্লবীদেরকে পুঁজি কীভাবে আনখকুন্তল আত্মসাৎ করে নিয়েছে! এর্নেস্তো চে গেবারা, আহা! মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করতে করতে একসময় একটা আইকন হয়ে ওঠেন তিনি, হিরো হয়ে ওঠেন দুনিয়ার সর্বত্র। সম্ভবত সর্বশেষ এই একজন, তাঁর পরে এখনও ওইরকম সর্বজনপ্রিয়তা আর-কেউ অর্জন করে উঠতে পারেননি, যিনি শেষপর্যন্ত পক্ষে থেকে যেতে পেরেছেন মানুষের। বলিভিয়ার গহীন জঙ্গলে লড়াইরত অবস্থায় মারাত্মক জখম হওয়া থামতে-না-জানা এই সিংহটিকে কোনোপ্রকার মানবিক মমতা না-দেখিয়ে মেরে ফেলে যারা, তারাই আজ মিডিয়ায় মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে মাতম তোলে বছর-বছর মায়াকান্নার! এর্নেস্তোর মুখসম্বলিত টিশার্ট-পোস্টার-মগ-কফিকাপ-বই-সিনেমা সেল করে এখন বিশ্বব্যাপী বিজনেস-বাণিজ্য হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। পুঁজির কী আগ্রাসী দাপট! জীবিত বিপ্লবীকে তারা জ্যান্ত কবর দেয়, মৃত বিপ্লবীকে নিয়া ফাঁদে একচেটে বিনিয়োগের সর্বাংশ মুনাফার বিশাল ব্যবসা! আর এদিকে, দ্যাখো, সমাজতন্ত্রের নামে কিছু লোক বেশ ভালো করেটরে খাচ্ছে সেই কোন আদিকাল থেকে! বেশ ভালো ফান্ডটান্ড বাগাচ্ছে এয়োরোপাম্রিকার ডোনারদের পটিয়ে! যেমন আমাদের দেশের জীবিত মশা-মারার কম্যুনিস্ট মঞ্জুরুল আহসান খান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ রোজ সেমিনারে কেকপেস্ট্রিপাবদাগলদা সাবড়াচ্ছেন, রাজপথে ফেস্টুন নিয়ে দেড়-দুইমিনিটের ফোটোসেশন ও ডেমন্সট্রেশন করছেন, অধুনা চাল্লু টিভিমিডিয়ায় নিউজে-টকশোতে দেড়মিনিটের মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য আর আধাঘণ্টার চাপানউতোর অ্যানালিসিস করছেন — বিপ্লব দীর্ঘজীবী হচ্ছে। এই লোকগুলো নির্বাচনে দাঁড়ালে পেরোতে পারে না আপনগ্রামের গণ্ডিটাও, লোকে এমনকি এদের আত্মীয়স্বজনও এদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, মেহনতি খেটে-খাওয়া মানুষ শ্রমিকমজুরকৃষক এদের চেনে না, তবু এরা প্রলেতারিয়েতের নাম ভাঙিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালায় আর মোটা মার্জিনের মুনাফা বাগায়। এর বাইরে একদল জীব রয়েছে, যারা সুশীল সমাজ, যারা সিভিল সোসাইটি, যারা নন-স্টেইট অ্যাক্টর্স, যারা আগায়-পাছায়-চিকনগোড়ায়-চেয়ারে-টেবিলতলে সর্বত্র বিরাজে, এদেরই এক অধুনা-হৃতগৌরব ফ.র. মাহমুদ হাসান — আমাদের স্টুডেন্টলাইফে একটা নাপিতগিরি বিষয়ক তর্ক উঠেছিল পত্রিকান্তরে, তখন এই উন্নয়নবিদ খুব কায়দা মারতেন আর রঙিলা রসিক বাইদাবাবু হিশেবে খুব মশহুর হয়েছিলেন, আমরা বদরুদ্দিন উমরের সংস্কৃতি র নিয়মিত গ্রাহকেরা কালারফুল মুখবাজ উন্নয়নবিদটিকে আমোদ করে ডাকতাম ফর্মা হাসান, সুশীলতর্কে বেশুমার আংরেজি লজিক বিস্তারের শেষে উনি প্রস্তাব করলেন সুশীল সমাজকে ডাকা হোক সিভিল সমাজ ! এই আমাদের এঁরা, সাংস্কৃতিক দো-আঁশলারা। সুশীল শব্দের আভিধানিক একটা অর্থ নাপিত, তাই ওই শিক্ষিত সাহেবসুবোর তেহেন পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রোপোজাল! যা-হোক, আমরা খুব আমোদঋদ্ধ হয়েছিলাম ফর্মা মামুর ওই পিডেন্ট্রিক প্রস্তাবনায়। এই আমাদের অপরূপ সোনার চান পিৎলা ঘুঘু বিদ্বানশিক্ষানেরা! তা, কারা ওই বিশেষ অভিজাত  সমাজ? সংক্ষেপে, যারা কোনো-এক সুদূর অতীতকালে ফ্যাশনেবল কম্যুনিস্ট পোলিটিক্স করতেন এবং পটপরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘কম্যুনিজম ভুল ছিল’ বলে বিজ্ঞ অভিমত প্রচার করেছেন — স্রেফ এই যোগ্যতায়, এই ক্যাপিট্যালের দাসানুদাস কোলাবোরেটর বনবার যোগ্যতায়, এঁরা রাতারাতি বৃহৎ বৃহৎ সুমহৎ সব প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানপুরোহিত হয়ে দেখা দিয়েছেন বাংলার উঁইপোকায়-খাওয়া আকাশে। বিপ্লব ভোগে উঠেছে, একটু একটু উন্নতি নিশ্চিতকরণ হয়েছে, স্থিতাবস্থা জারি থেকেছে। এর কোনো উপসংহার আপাতত টানবার উপায় নাই।

কিন্তু উপসংহার না-টানতে পারি, একটা কবিতা তো টাঙাতে পারি এর্নেস্তো চে-র জন্মদিনের শামিয়ানা হিশেবে! এন্টি ইউএস সিন্ড্রোম   শিরোনামের সেই কবিতাটির পুরো শরীর ছেড়ে শেষাংশটুকু উচ্চারণ করছি শুধু, জয়দেব বসু অদ্ভুত অসহায় আবেগে এটি লিখে রেখে গেছেন তাঁর জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইশতেহার ও অন্যান্য   কবিতাগ্রন্থে। দেখা যায়, কবিতাটিতে, একজন স্নায়ুরোগগ্রস্ত তরুণ তথা কবি নিজে একের-পর-এক প্রলাপের মতো সত্যমর্মান্তিক বকে চলেছেন ডাক্তারের সঙ্গে এবং সবশেষে এইভাবে ক্যাথার্সিস খুঁজে নিচ্ছেন কবি নিজে কিংবা নিচ্ছি বিমোক্ষণ খুঁজে আমরা তাঁর কবিতার পাঠকেরা :

…হ্যাঁ, জানি আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি ডাক্তার, কিন্তু আপনি ফিরে যান, আমাকে একা থাকতে দিন, আমার ভালো লাগছে ফাঁকা হয়ে যেতে, তর্কবিতর্কহীন বিবেকদংশনহীন একদম শূন্য হয়ে যেতে…এই পবিত্র এপিডেমিক — এরই চুমুতে-লালায়-কামড়ে আমি হয়ে উঠছি উন্মাদ, আপনি যান ডাক্তার, আর আপনার কোনো দরকার নেই, ক’টা দিন পরেই আমি পুরোপুরি ভারসাম্য হারাবো, কিন্তু তার আগেই জোগাড় করে নিতে পারব একটা অন্তত ছুরি…হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি একজন প্রায়োন্মাদ পাসপোর্ট বানাতে পারে না, তাছাড়া ইসলামেও আমার বিশ্বাস নেই, তাই বাগদাদ পৌঁছবার সৌভাগ্য হয়তো হয়ে উঠবে না, তবু এই শহরে আমারই মতো অসংখ্য প্রায়োন্মাদের ভিড়ে মুখ লুকিয়ে আমি পৌঁছে যেতে পারব মার্কিন দূতাবাসের সামনে, নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে পারব একটি নিষ্পাপ শ্বেতাঙ্গ দম্পতির জন্য, তারপর…তরুণ মার্কিনটির কণ্ঠায় ঠেকানো ছুরিটা সরিয়ে আনার আগেই, তার ফ্যাকাশে-মেরে-যাওয়া স্ত্রীর নীল চোখের দিকে চেয়ে বলব : ‘এর্নেস্তো  চে…আমাদের এর্নেস্তোরও এমনই একটা বউ ছিল মাদাম…ভয় পাবেন না, তার মতো অবস্থা কখনোই আপনার হবে না, কেননা শেষ পর্যন্ত আমরা মানুষ…অসহায়ভাবে মানুষ…যা আপনার প্রেসিডেন্ট নন…লিঙ্কনের পর থেকে যা আপনাদের প্রেসিডেন্টরা কখনো ছিলেন না… থুঃ…!’


বিপ্লব কি সম্ভব আজকের এই একগতিতে-এগিয়ে-চলা পৃথিবীতে? এই কথাটা ভাবছিলাম বসে বসে নির্বিপ্লব চুপচাপ, জানুয়ারিনিঃশেষিত অপরাহ্নে, এই কথাটা ভাবছিলাম যখন শীতের রোমাঞ্চকর পাতাঝরা প্রায় শেষের দিকে এসে ঠেকেছে। এখন কথা হলো, বিপ্লব সংঘটিবার জন্য ভাবনা আদৌ জরুরি কি না। মার্ক্সের মশহুর সেই বাক্যে এর উত্তর হুড়মুড়িয়ে এসে যাবে জানি, বিপ্লব নিয়া ভাবনাচিন্তনা বহুত হইসে মাগার বেফায়দা, দরকার বিপ্লবটা ঘটায়ে ফেলা। তা, বাক্য অমৃত। বটে। এই বাক্য আদ্বিজচণ্ডালে শিরোধার্য ধরে একটা আর-বাক্যও উচ্চারি নিকট-সাম্প্রতিকের পকেট হইতে। প্রাগুক্ত অমৃতবচনের রিভার্স এইটা, ইর্শাদ করছেন স্লাভো জিজেক, বিপ্লবের নামে লাফালাফি বহুত হয়েছে ইয়ার, এইবার একটা জায়গায় জুৎ মতন বসে একটু ভাবো। কথাটা ফুৎকারে উড়াইবার নয় মনে হয়। কেবল খটকাটা এইখানেই যে, ঢের ভাবনাভাবনি নিষ্পন্ন হইলে পরে কি কালাশ্নিকভ হস্তে লইয়া নামিব জঙ্গের ময়দানে? নাকি পেসিফিস্ট ম্যুভ — শান্তিপূর্ণ আন্দোলন — চালাইয়াই চলিব? ম্যুভমেন্ট কেমন করে শান্তিপূর্ণ হয়, এইটা থিয়োরিটিক্যালি কিংবা প্র্যাক্টিক্যালি কিভাবেই-বা প্যসিবল, টিল টুডে কেউ বলিয়া যাইল না আমারে। একটা-কিছু করতে এমনকি বলতে গেলেও তো অঙ্গসঞ্চালনা তথা হাত-মুখ-মাথা আন্দোলিতকরণ জরুর। একটু মুখের রেখাটা না-পাল্টিয়ে কে কবে ও কোথায় কিছু বলতে বা করতে পেরেছে? এইটা আমাদের দেশে এনজিওমগাদের এক মহান উদ্ভাবনকম্ম, ওরা পারে, এয়ার-ক্যুলার কামরায় বসে ওরা দুনিয়া জিনিতে পারে। এরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দিয়া আমের আঁটির ভেঁপু বাজাইয়া আমাদিগেরে সুখেশান্তিতে স্বাস্থ্যবান রাখিয়াছে স্মরণাতীতকাল ধরে। এদের নিয়া আলাপ করতে বেশ একটু খর্চাপাতি আছে। সেইটা আমার পক্ষে এই মুহূর্তে নামুনকিন, ওয়ার্ল্ডব্যাংক বা আইএমএফ যদি-না সাহায্যের হাত প্রসারিত করিয়া দেয়। অ্যানিওয়ে, এইখানে প্যারা ভাঙি একটা।

ভাবছিলাম ‘বিপ্লব’ শব্দটা নিয়ে, যে-শব্দে অনেকেরই ইদানীং অ্যালার্জি হয় দেখতে পাই। ঠিক সকলের নয়, কেউ-কেউ বলার মতন অত অল্পসংখ্যকও নয় তারা, যাদের কথা বলছি তারা অনেকেই। অনেকেরই অ্যালার্জি হয় দেখিবারে পাই আজিকালি। ‘বিপ্লব’ শব্দোচ্চার বহুদিন ধরেই একধরনের ট্যাবু শব্দাচরণের মতো ওদের নিকট। ওরা কারা? আহিস্তা, ইয়ার-ও-মেরে, আহিস্তা। আসলে অ্যালার্জিও নয়, এরচেয়ে বলা ভালো ভয় পায় তারা, ‘বিপ্লব’ শব্দটা সন্তর্পণে এড়ায়ে যেয়ে অ্যাপ্লাই করে তারা আলতো কোনো বিকল্প শব্দ। ধরা যাক, কোনো রিপোর্ট বা কোনো অভিভাষণে এমন স্থলে এদের মুখে আমরা শুনি — চেঞ্জ, পরিবর্তন, বদল, রূপান্তর ইত্যাদি শব্দফুলঝুরি। কিন্তু ভুলেও বিপ্লব উচ্চারণযোগ্য মনে হয় না তাদের কাছে। এইটা শাব্দিক একপ্রকার প্রেজুডিস বৈকি, এবং এর পেছনের কিছু কারণ অনুমান করা খুব বেশি শক্ত হবে না মনে হয়। এরা পেশাগতভাবেও সমগোত্রীয়, মোস্টলি হোমোলোগাস। ‘তারা’ সর্বনামে যাদের কথা বলা হচ্ছে এখানে, ‘তারা’ তারাই, যারা সমাজ চালায়, কিংবা ট্রুলি স্পিকিং ঠিক চালায় না আসলে, এরা নানাবিধ কৌশলে সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের গ্রিপে রেখে দেয়। নিজেদের মর্জিমতো সমাজের চলন ও চাল দেখতে চায় তারা, ব্যত্যয় দেখতে চায় না। আমাদের এখানে সমাজের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি-প্রগতি-নির্গতি-দুর্গতি ইত্যাদির জন্য মৎস্যজননীর ছিঁচকান্না জুড়ে বসে ব্যবসা করে বেইসিক্যালি দুইটা ক্লাস : নাম্বার ওয়ান, পেশাদার পোলিটিশিয়্যান এবং নাম্বার দুই, প্রোফেশ্ন্যাল এনজিওউদযোগপতি। বোথ দ্য ক্লাসেস পরস্পরের স্বার্থসম্পূরণকারী এবং ধর্মত উভয়েই নির্ভিন্ন ও এক। এরা ঘুণাক্ষরেও তাদের বক্তিমায়-লেখাজোখায়-ইঙ্গিতিশারায় বিপ্লব শব্দ কথার-বার্তা হিশেবেও উচ্চারণ করে না। কারণটা কি, জিগাইলে তো জবাব আমার জানা নাই। কিঞ্চিৎ আন্দাজ করতে পারি, কিংবা আন্দাজের এফোর্ট। অ্যানিওয়ে, এইটা আপাতত যবনিকা। বাদে একসময় ফের বলেঙ্গে।


চে নামের উচ্চারণ নিয়াও কত উতর-চাপান যে আছে আমাদের দেশে! কেউ বলে গেবারা, কেউ গুয়েভারা, কেউ এর্নেস্তো বলে, কেউ আর্নেস্তো। উচ্চারণবিভ্রাট নিয়া আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তেমন ইন্টেনশন থেকে যে কেউ কিছু করে, এমন সন্দেহ করতে একটু নারাজি আমি। যেমন ধরুন, ম্যারাডোনা আর মারাদোনা — দুইটাই কিন্তু প্রয়োগ করতে আমার হাত কাঁপবে না, সেইটা ধ্বনিসৌসাম্যগত গরজে, কিন্তু মারাদোনা উচ্চারিতেই বেশি প্রেফার করব এমনিতে। এইটা জানি যে, আংরেজি আর ফ্রেঞ্চ অথবা আর্হেন্তিনীয় উচ্চারণে কোমলতা আর কঠিনতার জায়গাগুলো বর্ণমালা বাংলার অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণ ধ্বনি দিয়া আনা যাবেও না সর্বত্র। তবে যেগুলো যায়, যেমন অ্যাকাডেমিয়া বা আকাদেমিয়া ইত্যাদি, সেগুলো উচ্চারণের ব্যাপারে একজন উচ্চারণকারীর ব্যক্তিক বিবেচনাও তো ধর্তব্য। তবে এর্নেস্তো উপজীব্য করে বানানো যে-কয়টি সিনেমা আমি দেখেছি — মোটরসাইকেল ডায়ারিস  থেকে শুরু করে অন্তত চারটে আরও — সবখানেই উচ্চারণ গেবারা বলেই কানে পশেছে আমার। কিন্তু আমার কানও তো ভুল করতে পারে। অ্যানিওয়ে, বেনিসিয়ো দেল তোরো লোকটাকে বেজায় চে গেবারা মনে হয় আমার, এইটা আবিষ্কার করার পর আমি ওর যে-কটা ধুমধাড়াক্কা ম্যুভি পেয়েছি সব দেখে ফেলেছিলাম মনে আছে। দেল তোরো সত্যি খুব ভালো অভিনেতা। আহা! তারও তো বয়স হয়ে গেল দেখতে দেখতে। এবং হ্যাঁ, দুইদিকের বাংলা কবিরাই তো মনে হয় মোস্টলি গুয়েভারাই চালিয়েছেন, ইনক্লুডিং বহুলাবৃত্ত সুনীল। কুল্লু মাফি। কিন্তু উচ্চারণ-তরিতমের বড়-একটা কারণ মনে হয় ইংরেজিঝোঁকা যাপন আমাদিগের। এইটা আমার আন্দাজ। তবে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা আকাদেমি আর আমাদের বাংলা এ(অ্যা)কাডেমি(মী)  এই আন্দাজের পক্ষে অনেক রসদ এগিয়ে দেয় আমাদিগেরে। সুমনজি এইটা খুব ভালোভাবে করেছেন উনার গানে এবং গানের বাইরেও অন্যান্য লিরিকে, অ্যালবাম ইত্যাদি স্টুডিয়োরেকর্ডগুলা ছাড়াও অনেক নতুন গান রয়েছে ওঁর সাইটে, সেখানে চেকীর্তনগাথা আছে একাধিকই। শ্রী সুমন তো গুয়াতেমালার দিকে কাজের সুবাদে লাতিনো ল্যান্ড ও সাউন্ডস্কেপের ওপর বেহতর দখল রাখেন বলেই মনে হয়।


মানেটা তো খুবই সিম্পল, বিপ্লব শব্দটার মানে, অ্যাট-লিস্ট কপাল কুঁচকাবার মতন কিছু তো নাই। বিশেষ ধরনের প্লব, অধিক কঠিন বাংলায় বলতে যদি যাই, বিশেষ ধরনের লাফ। শুনিবামাত্র ওরা লাফিয়ে উঠে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে বলবে, ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে একপ্রকার অ্যারিস্টোক্রেইসি মিশিয়ে চিবিয়ে-চিবিয়ে ভেংচি কেটে ও অন্যান্য সুলভ অঙ্গভঙ্গি সমেত, বলবে তারা : “লাফানো-ঝাঁপানো তো বাপু শাখামৃগের কাজ, লম্ফঝম্ফ স্রেফ বানরবৃত্তি বৈ অন্যকিছু তো নয়, সেক্ষেত্রে বিপ্লব গ্লোরিফাই করার কিছু নাই তো। অতএব বিপ্লবীদের ইতিহাস নিয়া মহাশয় চার্লস্ ডারউইন তার বিবর্তনতত্ত্ব তথা থিয়োরি অফ ইভোল্যুশন বয়ান করে রেখে গিয়েছেন। ওই বিবর্তনতত্ত্বে একটা পার্ট তথা আবশ্যক কন্ডিশন হলো ‘যোগ্যতমের টিকিয়া থাকা’ বা ‘সার্ভাইবল ফর দি ফিটেস্ট’ অনুজ্ঞাটি। বিপ্লব নামের কায়কারবারে যারা আস্থা রাখে, কাজেই, তারা সমাজ-পরিবর্তনের যোগ্য কেউ নয়। তেমন কম্পিটেন্ট নয় তারা। সমাজ তো পরিবর্তন করতে পারি আমরাই, ইন ট্রু সেন্স সমাজের রূপান্তর তো সংঘটাইতে পারি শুধু আমরা, যারা দোলনা হইতে কব্বর পর্যন্ত বরফনির্জন ঘরে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের কিনার ধরে গোল হয়ে বসে সংলাপ-বৈঠক-ডায়ালগ-দরকষাকষি-নিগোসিয়েশন অনন্ত রজনীদিবা চালায়া যাবার দক্ষতা রাখি।” বিলকুল সহি বাৎ, বটে, তাহাদের দক্ষতাদাপটেই তো দুনিয়া রাউন্ড চলছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে এ-ও সঙ্গত হবে বলা যে, তেনাদের কথিত দক্ষতাদাপটেই দুনিয়ার এহেন হাল অধুনা। আগে যতটা সহজ ও স্বচ্ছ গোচরায়ত ছিল শ্রেণি ডিটেক্ট করা, তা যেমন শ্রেণিই হোক, ধন অথবা জনভিত্তিক যেমন শ্রেণিই হোক, সনাক্তকরণ সম্ভব ও সহজ ছিল; দিনে দিনে তেনাদের দক্ষতাদাপটে ব্যাপারটা ঘোলাটে থেকে ঘোলাটেতর হয়ে গিয়েছে। এই কিছুদিন আগেও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রেণিটাই ছিল বৃহদাংশ, দুনিয়া তো উল্টায়া গিয়াছে, এখন উৎপাদনকর্মের সঙ্গে একেবারেই বিচ্ছিন্ন লোকজন সংখ্যায় এবং দৌরাত্ম্যে এত বেশি বাড়িয়া গিয়াছে যে এদের সনে পেরে ওঠা সাংঘাতিক বলশালীর পক্ষেও অসাধ্যপ্রায়। এবং যারা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি কিংবা খানিক ঘুরিয়ে একভাবে-না-আরভাবে জড়িত, তারা ওই মধ্যস্বত্বভোগী বিবিধ স্তরান্তরের ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা একেবারে। এই ফড়িয়া মধ্যস্বত্বভোগী পরধনপোদ্দার ফাটকা ক্লাসটাকে মদত দিয়ে চলেছে যে বিশেষ একটা ব্যবস্থাকাঠামো, ওইটারই সংঘটিত রূপ বলা যাইতে পারে দেশে-বিদেশে ডেভেল্যপমেন্ট পার্টনার্স সমর্থনপুষ্ট ভংচং ভলান্টারি ব্যবসাপাতি। ইহকালে এই স্থিতাবস্থা থেকে, এই পেশাদারি পিরিতিশাসিত গরিবি-হটানো সদরাজনীতি থেকে, এই কাঁঠালআঁঠা জটাজাল থেকে, বেরোনোর পথঘাট সহসা দেখা না-গেলেও, পথ বেরোবে না ভাবা বাড়াবাড়ি সিনিকের পক্ষেও সম্ভব নয় বলে সন্দেহ করি। কিন্তু খুব হা-মুখ অপ্টিমিস্ট হইবারও কোনো গ্রাউন্ড হাজির নাই আপাতত। অলমিতি বিস্তরেণ, সমুখে সুন্দর আগামীকাল  গানটা রুনা লায়লাজির মুখ থেকে বড়জোর শোনা যাইতে পারে।


বিপ্লব শব্দটা-যে একেবারেই অচল হয়ে গিয়েছে বা উচ্চারিত হয় না তা নয়। এহেন কতিপয় শব্দ উচ্চারণে সতর্কতা প্রধানত সামাজিক-সমাবেশন তথা সোশ্যাল মোবিলাইজেশন টাইপের কর্মকাণ্ডে, যেখানে কি না এর দরকার ছিল সর্বাগ্রে। সমাজক্ষেত্রে চেঞ্জ বলি কি রূপান্তর বলি বা পরিবর্তন, বদল বলি কিংবা পাল্টায়ন, সমস্তই কিন্তু সমাজের স্বভাবনিয়মেই নিয়ত সংঘটিত হয়ে চলে। ব্যাপারটা আদতেই ব্যক্তিভূমিকা নিরপেক্ষ। অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইটা খাটে, ন্যাচারাল ইভোল্যুশন তো অসত্য বলার জো নাই। আমি-আপনি না-চাইলেও, মন্দ হোক অথবা ভালো, সমাজের পরিবর্তন সর্বদা ও সর্বত্র প্রবহমান। অকর্মা আমি কিংবা কামকর্মের ঢেঁকি আপনি-তিনি কিচ্ছুটি না-করিলেও সূর্যোদয় থেমে তো থাকবে না, বা আতাগাছের কল্পিত পাতায় লেজঝোলা পাখি ফিঙে হোক বা তোতা এসে ক্যাচরম্যাচর বন্ধ করবে না। তাহলে কেন ও কখন ও কোথায় বিপ্লব শব্দোদয় হয়! এইটা লাখটাকার প্রশ্ন হলে তার উত্তরও তো প্রস্তুত আছে। এই পরিবর্তন, স্বভাবসিদ্ধ পরিবর্তন বা এই রূপান্তর, যখন প্রাক্কলিত সময় বা ক্যাল্কুলেটেড তথা কাম্য কালের আগেই সংঘটিত হয়ে যায়, এইটা তখন পরিবর্তন নয় এমনি-এমনি, ঠিক এইটাকেই তখন আমরা বলি বিপ্লব। স্বভাবগতিতে যে-বদল নিত্য ঘটে চলেছে, সেইটা বড়জোর পরিবর্তন, সেইটা বেশি-থেকে-বেশি ঋতুপঞ্জিকার পাতা উল্টে যাওয়া। স্বাভাবিক সমস্ত পরিবর্তন একটা পর্যায়ে যেয়ে পৌনপুনিক হয়ে পড়ে, একপ্রকার বদ্ধাবস্থা তৈরি করে ফেলে, এইটেকেই আমরা স্ট্যাটাস-ক্যু বলে জানি, কিংবা বলি স্থিতাবস্থা। স্ট্যাটাস-ক্যু পরিস্থিতিতেই বিচ্ছু-বান্দর-বনগোরুরা লাই পেয়ে এন্তার উঁচায় উঠে চড়ে বসে। এমন সময়ে অনুমানের চাইতে কয়েক ধাপ বেশি এগিয়ে যাওয়ার ঘটনাই বিপ্লব। সোজাসাপ্টা এ-ই বিপ্লব। বিপ্লব মানে মুক্তি, লিবার্টি, ইত্যাদি সাধারণ্যে প্রচলিত অভিমত। কথাটা ভুলও নয় আদৌ, সঙ্গে মনে রাখা দরকার অবশ্য কোনো মুক্তিই চিরস্থায়ী নয়। যেমন দুনিয়ার কোনো শৃঙ্খলই নয় চিরকেলে, কোনো সোহাগ-শাসন নয় শাশ্বত। মুক্তি চিরকালই আপাত মুক্তি। আজ যা মুক্তি, কালকেই তাতে দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে, এবং দম রুদ্ধ হয়ে আসা জীবিত প্রাণের লক্ষণ বটে, মৃতের শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার বালাই নাই। মৃত বলেই-না আমরা আপত্তি করি বিপ্লবে। এবং আমাদের সামগ্র্য বুদ্ধিকাণ্ড-সভ্যতা-সাক্ষরতা-সাহিত্যসংস্কৃতিশিল্প মৃত্যুমুখাপেক্ষী, বিপ্লব চায় না, মানে কেঁচোভদ্র হইতে চায় কিন্তু বাঁচতে চায় না। আঁচ অল্প রেখে আগুন ধরানো চুলা, তাতে একটা রান্না স্বাভাবিকের সমান সময় নেবে সমাধা হইতে। এখন আপনি যদি দিনভর অপেক্ষা না-করে সকাল হবার আগেই চান সকালের জলখাবার, তো তা-ও সম্ভব। নিভন্ত চুল্লিতে একটু আগুন দেয়ার শিক্ষাটা আজ আর কোনো বিদ্যালয় দেয় না বটে, কেননা আগুনশিখা আজকালকার উনোনে দেখা যায় না, আগুন অদৃশ্য রেখে স্রেফ তাপ দিয়া রান্না নিষ্পন্ন করা আমরা শিখে গেছি। পৃথিবীতে কিসিম-কিসিম বিদ্যা-ব্যবসা-বাণিজ্যের তো এ-ই দিনরাতের কাজ — মানুষের অভিজ্ঞতা আর তার হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার সারবত্তা হইতে আগুনের ব্যবহারস্মৃতি মুছে ফেলা, আগুনজন্ম ভুলিয়ে দেয়ার ব্যবসাই মিশন আমাদের সবার ও সমস্ত প্রতিষ্ঠানের। নইলে এমন তো হবার কথা না যে, একটা মামুলি বিজ্ঞানসৌত্রিক ক্ষুদ্র আবিষ্কার বা উদ্ভাবনে উৎফুল্ল হয়ে চেঁচাই আমরা ‘প্রযুক্তিবিপ্লব’ বলে, কেবল ভয় ক্রিয়াশীল দ্যাখো সমাজবিপ্লবে! প্রযুক্তিবিপ্লব বললেও সমাজবিপ্লব ঘুণাক্ষরে একটিবার বলি না আমরা, তাতে একটি রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে বৈকি, কিন্তু ঝুঁকি এড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ হলেও বলদেরে এইটা মানায়, কেননা বলদকরণ তথা নিবীর্যকরণকালে বুদ্ধিকোষ তো অপসারণ করা হয় না, ষাঁড়ের মর্দামি নিয়ন্ত্রণে রাখিতে গেলে তার অণ্ড অপসারণ জরুর। বোঝা যাচ্ছে কিছু, মহোদয়বৃন্দ! ক্রমশ অনুবোধনীয়।


তবে এখন তো চে নিয়া মাহমুদুজ্জামান বাবু ছাড়া আর কাউরে গান গাইতে দেখি না নয়াভাবে। কেননা চে নিয়া ব্যাপক গান ও অন্যান্য কথাসাহিত্য হয়েছে। মাহমুদুজ্জামান বাবু অবশ্য অত খোঁজপাত্তা রাখেন কি না, বা তার গানের একমাত্র মদতদাতা বিপ্লবী পত্রিকাপ্রতিষ্ঠান যারা বাবু আর মুসা ইব্রাহীমের মতো প্রোডাক্টগুলার সৌল-ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাজেন্ট, আমরা ওইদিকে যেতে চাইব না। মাহমুদুজ্জামান বাবু অবশ্য প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের একটা গান গেয়ে দেশবাসীর কাছে নিজের শিল্পীসত্তা হাজির করেছেন সত্যিই। কিন্তু মুসা আদৌ হিমালয় জয় করেছেন কি না, আমরা তা জানি না। বাবুর নাম বললেই লোকে একটা গানই বোঝে, ‘আমি বাংলায় গান গাই’, এইখানেই বাবুর শিল্পীক্যারিয়ারের আগাপাশতলা আন্দাজ করা যায়।

চের মৃত্যু অপরাধী করে রেখেছিল সুনীল গাঙ্গুলিকে সেই তার তরুণ বয়স থেকে বুড়া বয়সে কবি মরার আগ অব্দি। নিজে মনে হয় হাজারবার এই জিনিশটা আবৃত্তি করেছেন সুনীল উনার দীর্ঘ সফল জীবনে। অপরাধ নিয়াই চিতায় চেপেছেন, তবু খুনিদের লগে কুটুম্বিতা ছাড়েন নাই। মানি মানি মানি, স্যুয়িটার দ্যান হানি। বাংলার কবিদের ক্ষমতালিপ্সা আর অর্থলোভ তো অত বড় কিছুর জন্য না, খানিক চর্ব্যচোষ্য আর বোতল ও বনিতা। আর একটা বাড়ি। নিজেদের একটা বাড়ি। ফলে চের খুনিদের লগে একটা আশ্নাই রাখা ছাড়া উপায়ও তো নাই বোধহয়। লিখে পয়সাপাতি করবার মতো কবিতা বানাইতে পারে আর কয়জন? ফলে একটা অবলম্বন তো লাগেই নিরীহ কবিদিগের। আর তাছাড়া চের মৃত্যু নিয়া নাকিকান্নায় নিত্যনতুন চে ও উনার অনুসারী/অননুসারী নিহতদের নিয়া নতুন করে কিছু লিখে বিপদেও পড়তে হয় না, বিবেকের কাছেও ক্লিয়ার থাকা যায়। ভালো চলে নাটকটা।

ছাত্রলীগ কি চে চেনে? বা, খাতির-তোয়াজ করে চে বা মাও প্রমুখেরে? সুনীলের, বা সুনীলের অনুকারী বিবিধ তরুণ কবিদের, চেগাথা পাঠ করে? মাহমুদুজ্জামান বাবুর বক্তৃতাকান্না শোনে? এই ব্যাপারে তেমন বেশি কিছুই জানা যায় নাই।

লেখা : জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

COMMENTS

error: