রকঝঞ্ঝা, সাউন্ডঝামেলা, স্টেইজ-স্কার্সিটি ও সাবকালচারের সুখদুঃখ

রকঝঞ্ঝা, সাউন্ডঝামেলা, স্টেইজ-স্কার্সিটি ও সাবকালচারের সুখদুঃখ

মোটমাট আটটা ব্যান্ড পার্ফোর্ম করবে একাদশ রকঝড়ের আসরে, সিলেটে, সামাজিক সংযোগমাধ্যমে এই খবর নজরে এসেছিল হপ্তাদুই আগেই। ইভেন্ট-পেইজ্ খোলা হয়েছিল, যথা সাম্প্রতিক রীতি, গ্যয়িং দিয়াছিলাম গোচরীভূত হওয়া মাত্রই। গিয়াছি, নির্দিষ্ট তারিখের দিনে, কিন্তু গানটা আর শোনা হলো কই? ছিল আশা মনে বড় শুনিয়া ধন্য হব নয়া জামানার গানবাদ্য, রক্ অ্যারাউন্ড দ্য দৈনন্দিন ছক ঘটনাটা আল্টিমেইটলি সংঘটিবার সুবর্ণ সুযোগ এদ্দিনে এয়েচে ভেবেছিনু, গুড়ে বালিই পড়ল। পূরণ হয় নাই আশা। আহা! প্যারাগ্র্যাফান্তরে যেয়ে দেখি বিস্তারিত।

‘রকস্টর্ম’ শীর্ষনামে এই মিউজিক্যাল আয়োজনের এটি ছিল এগারোতম মঞ্চহাজিরা। ভাবা যায়! একেবারেই লোক্যালি ফর্মড এবং গ্রুমড কিছু গ্রুপ এই হিংসাবাহিত অসুর পরাক্রমের কালে সুরের শোহরৎ করছে, এইটা আশাজাগানিয়া। তা, সুরের তো অভাবও নাই টিভি-ইউটিউবে; যেইটার অভাব সেইটা হচ্ছে সময়ের সুর ধরার কলাকারবার। সবাই মিষ্টি-পেস্ট্রি-রসমালাইয়ের পিছে পিছে হেঁদিয়ে ছুটছে। নেস্ক্যাফে-বেইস্মেন্ট আর কোকস্টুডিয়োপাকিস্তানে দেওয়াইল্লা ফানাফিল্লা। আরেকটু প্রোগ্রেসের দাবিদার যারা, তারা হয় আদ্দিকালিক কাস্তেহাতুড়ির গণসংগীত না-হয় কবীর সুমনের কবি-কবি চেহারাসুরতের অন্ত্যমিলজীর্ণ অধুনাকাব্যিপনা মারাইতে ব্যস্ত। রবীন্দ্র-নজরুল আর স্বর্ণযুগের পুষ্পবৃক্ষবিহঙ্গচন্দ্রপন্থীরা তো অলটাইম বিস্কুট অথবা আবহমানের বলসাবান। অবস্থা এমনই, কিংবা খারাপ নয় এত, কিংবা ভালোও তো নয়কো।

Rockstorm Vol - 11
খবরটা আগের বছরও পাই নাই যে একনাগাড়ে একদশক ধরে এই শ্রীহট্টধামে সমকালের হল্লাবোলের গানবাদ্যও হতেছে নিত্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যভরা গানাবাজানার সমান্তরালে। এইবারই পয়লা টের পাই যে জেলাশাহরিক এই মৃদু মফস্বলে বেশ রক্-অ্যা-রল্যা প্র্যাক্টিস্ জারি আছে আজো। বলা বাঞ্ছনীয় অব্যাহতভাবেই আছে। ব্যাহত হয় নাই মিউজিক্যাল আন্ডারগ্রাউন্ড অনুশীলনী। নিবন্ধকারের যৌবনক্রান্তির লগ্নে এসে এমনটা ধারণা ক্রমশ বদ্ধমূল হতেছিল যে নাইন্টিজের বাংলাদেশে পাড়ায়-মহল্লায় ব্যান্ডসংগীতের শামিয়ানাতলে যেমনটা তারুণ্যজোয়ার ছিল, বর্তমানে সেই ধারা নাই কিংবা থাকলেও অতি ক্ষীণস্রোতা। আশঙ্কা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে; সেজন্যে নিবন্ধকার নাখোশ বলা তো যাচ্ছেই না বরঞ্চ উল্টো। দুঃখ অন্য জায়গায়, সেইটাই বলতে বসা। কাহিনিটা যারপরনাই দুঃখের। পড়তে বসুন টিশ্যুপেপার অথবা হ্যান্ডকার্চিফ হস্তে নিয়া।

তার আগে বলা যাক, পূর্বঘোষিত আটটা ব্যান্ডের মধ্যে এই নিবন্ধকারের শোনা হয়েছে সাকুল্যে তিনটার গানাবাজানা। বা, আদৌ শোনা হয়েছে বলা যাবে কি? বিশেষত শব্দযান্ত্রিক গোলযোগ ও প্রেক্ষাকামরার অব্যবস্থাপনায় ঠিক শোনা হয় নাই মিউজিকটা। তা, দেখা হয়েছে বটে। এক্সপেরিয়েন্স তো অবশ্যই। কোয়ায়েট অ্যান এক্সপেরিয়েন্স। মন্দ হয় নাই। সিয়িং ইজ্ বিলিভিং। অতএব গানবাজনা হয় নাই, থিয়োরিটিক্যালি এমন কথা বলবার সুযোগটা আদৌ থাকছে না। আজ্ঞে, দেখেছি তো, হয়েছে বেজায় মেটাল হ্যেভি রক্ গানবাজনা!

লাস্টের দিককার পরপর তিনটা ব্যান্ডের পার্ফোর্ম্যান্স অভিজ্ঞতার অন্তর্ভূত হয়েছে যেহেতু, অনিবার্য অসুবিধার কারণে বেলাবেলি ভেন্যুতে যেয়ে আসনপিড়ি বসা যেহেতু সম্ভব হয় নাই, কথা কাজেই তিনটা ব্যান্ড ঘিরিয়া চালানো হচ্ছে। এবং বাকিটা আন্দাজে বলা; হাইপোথেসিস্ ছাড়া বাস্তবে কি ডিস্কাশন সম্ভব? তো, যে-তিনটা ব্যান্ডের পরিবেশনা চাক্ষুষ/কর্ণগোচর হয়েছে সেগুলো যথাক্রমে ‘ঐরাবত’, ‘স্বাপ্নিক’ এবং ‘মেটাকর্ন’। বলি তবে এখন, শ্রবণ/দর্শন কেমন হলো।

সন্ধ্যার পরে, বাদ-মাগ্রেব, স্টেজে এসে ‘ঐরাবত’ শুরু করল টুংটাং গিটারিং। অব্যবহিত পরে ব্যান্ডের ভোক্যাল্ হলেন মঞ্চে অবতীর্ণ। শ্রোতাবান্ধবদেরে অ্যাড্রেস্ করে বাংলায় এবং আনআইডেন্টিফায়েড কোনো-এক দেশ ও জাতির ভাষায় (আংরেজ ভাষা বলিয়াই ঠাহর হচ্ছিল হঠাৎসঠাৎ) বেশকিছু নসিহত করলেন। অস্পষ্ট শব্দাবহে একনাগাড়ে একজোড়া গান গাইলেন, গানদ্বয় আংরেজি বলিয়াই বিশ্বাস হচ্ছিল শ্রবণকালে, যদিও কথাভাগ বোঝা সাধ্যির বাইরে। এই লিরিক্স ক্লিয়ার কানে না-পশার কারণ যদি নিছক শ্রোতার ভাষিক দক্ষতার ঘাটতি হিশেবে দেখা হয়, ন্যায্য হবে না। বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর ন্যায় ইংলিশে কের্দানি শো-আপ করাটার ইনফিরিয়োরিটি এতদূর পর্যন্ত এই জেনারেশনে এসেও লিঙ্গার করছে দেখে অবাক হতে হলো। ঐরাবতের পরের নাম্বারদ্বয় বাংলায়, তাদের নিজেদেরই বলিয়া জানাইলেন ভোক্যাল্, দেখলাম যে এরা বাংলাটা সামলায় আংরেজির চেয়ে ভালো। তবু কেন ‘হাই ফোক্স’ হেঁকে হেন অনাবশ্যক বোকাহাঁদা মাস্তানি? কিন্ডার গার্টেনে এরা ভালোই ইংলিশ লার্ন করেছে এইটা আন্দাজ করা যায় এদের স্থানকালপাত্র বুঝে নিজেরে অ্যাডপ্ট করে নিতে না-পারার প্রান্তিক অযোগ্যতা দেখে। ঐরাবত অরিজিন্যালের মধ্যে একটা ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’, ‘ভিজে মাটি’ অন্যটা। নামটা ঠাহর করা গেলেও কথাভাগ বোঝা যায়নি যথাপূর্ববৎ। তবে স্বীকার করতেই হবে এই দলের কম্পোজিশনসেন্স সুন্দর চমৎকার। যদিও ‘ভিজে মাটি’ রেন্ডিশনপ্রাক্কালে গায়েন নিজে বললেন এইটা ‘ঝাকানাকা নাচের’ গান, অত গুরুত্ববহ কম্পোজিশন না, অথচ এইটাই ঐরাবতের সংগীতসেন্স ও সৃজনকুশলতা ভালো ফুটিয়েছে। একগাল হাসির উপলক্ষ হয়েছেন শিল্পীটি ভিজে মাটির ট্র্যান্সল্যাশন ‘ওয়েট স্যয়েল্’ উল্লেখ করে; এক আইটি সল্যুশন ফার্মের জনৈক সুদর্শন শ্রোতা বক্ষ্যমাণ নিবন্ধকারের পাশের আসনে বসা ছিলেন, ঐরাবতের হস্তিনী ইংলিশের বহর দেখে ফোড়ন কাটেন, “মনে হচ্ছে এরা নায়ক মান্না আর কাজী মারুফের মাচো ইমেজের ম্যুভি দেখে ডেভেল্যপড হয়েছে। এই ইংলিশ তো ঢালিউডি ইংলিশ ভাই!” কিন্তু হবে, লেগে থাকলে, এইটা বলতেও ভোলেন না আইটি প্রোফেশন্যাল লিস্নার ভাইটি।

দ্বিতীয় দল হিশেবে দেখা হলো ‘স্বাপ্নিক’ পরিবেশনা। তারা ইউ-টু ব্যান্ডের একটা নাম্বার কাভার করে। এইভাবে কি ইংলিশ গানাবাজানায় বউনি দিয়া আজকালকার অল্পবয়সী শিল্পীরা নিজেদের গানগাইবার কম্পিটেন্সি প্রমাণ করে? এর পরে কিন্তু ঠিকই নিজেদের দুইটা গান পরপর গেয়ে স্টেজ ছাড়ে তারা। গানদ্বয়ের কথা না-বোঝা গেলেও অনুমানে বাদ্যযোজনা কানে টেনে মনে হলো দলটার ভাবসাব তো মন্দ না। ‘যত বেশি দুঃখ দাও’ আর ‘ফেলে-আসা কবিতা’ লাইনসম্বলিত দুইটা গানের স্মৃতি কিছু ধূসর হয়ে গেলেও পুরো মরে নাই। কিন্তু লম্বাডাম্বা গায়কের মাইক্রোফোন হস্তে লইয়া খামাখা স্মার্ট অতিচাঞ্চল্য কি দিয়েছে হেন মূল্যবান মেস্যেজ্ উপহার আমাদিগেরে, এইটা জাতি কোনোদিনই জিজ্ঞেশ করবে না।

সাধারণ সোহবত অনুযায়ী নিশীথের শেষ শিল্পীটিকে ধরে নেয়া হয় ক্রেইজ্ হিশেবে। ‘মেটাকর্ন’ কি সিলেটের রকসিনে ক্রেইজ্ ফিলহাল? “জোশ, ব্যস্, মেটাল, মেটাল” … সমুখসারি থেকে হেডব্যাঙ্গিঙের সঙ্গে সঙ্গে এইধারা আওয়াজের ছররা আসছিল উড়ে পেছনসারিতে, উড়ে এসে পড়ছিল বক্ষ্যমাণ নিবন্ধকারের কর্ণে। শেখ মুজিবের সেভেন্থ মার্চ স্পিচ পাঞ্চ করা হয়েছে একটা কম্পোজিশনে, এইটা কি নিজেদের রচনা তাদের? বোঝা দুরূহ। তবে মেটালগায়কের মাথাচুলদোলানো দেখে ভেবে নিতে হবে যে এই শিল্পী মেটাল কলাকার। সাংঘাতিক দেশাত্মবোধ উনাদের। “জ্বালো জ্বালো / আগুন জ্বালো” প্রকম্পনিনাদে টের পাই উনারা বিদ্রোহী। কিন্তু নতশিরে বেঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে ঘেমে নেয়ে গেয়ে গেলেন যা, “আমি তোমার মাঝে দেখি / আহা আমার বাংলাদেশ” পঙক্তিটা ছাড়া আর-কিছু বোঝার কুদরত নাই। বঙ্গবন্ধু নিয়াই কি ছিল গানটা? আন্দাজ করি তা-ই। কিন্তু উনাদের বোধহয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনী রিডিং দিবার সময় এসেছে এইবার। শুধু মেটাকর্নেরই নয়, বাংলার তাবৎ মেটালিয়াদের। কে এই মাইকেল ডাট? উনি বাংলার আদি মেটাল মিউজিশিয়্যান। প্রচুর ইংরিজি লিখেটিখে শেষে অল্প গুটিকয় বাংলা লিখে কপোতাক্ষতীরে দেহ থুয়েছেন। কাজেই, মিস্টিক হোন কিংবা মেটাল, ইংরিজি গেয়ে হেনরিয়েটা বা রেবেকা কাউরেই ইদানীং পটানো সহজ হচ্ছে না। আর গাইবেনই যদি ইংরিজি, তবে মেঘনা-যমুনা-সুরমা রাখিয়াই ইংরিজি নিজে বানাইয়া নেন। নিজের যা আছে তা যদি ইংরিজিতে নিয়া আদ্বিজচণ্ডালে দেখাইতে না পারলেন দুনিয়াদেশজোড়া, তাইলে কিয়ের তলের সৃজনশীল আপনি? ইউটিউব শুনতে দেন বরং, আপনে যে-মেটাল মারাইলেন সেই মেটালের মূল-কাণ্ড-পল্লব আমরা তো ওইখানে পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু, তবু, ছাইড়েন না গানটা।

সাউন্ডের ঝামেলায় আস্ত অনুষ্ঠানটা ছিল হ-য-ব-র-ল। হারাম একফোঁটা আওয়াজ বুঝবার কুদরত ছিল না। সাউন্ডের ওভার্ল্যাপ অসহনীয় পর্যায়েই ছিল আগাগোড়া। ইন্সট্রুমেন্টের ডিস্টিঙ্কট ফিচার্স ডিটেক্ট করা আদৌ সম্ভবই ছিল না কারো পক্ষে। যে-তিনটা ব্যান্ডের কাজ দেখেছি, ক্লিয়ার বোঝা গেছে তাদের প্রত্যেকেরই কব্জিতে জোর আছে, প্রত্যেকেরই হাতযশ অনুমান করা গেছে। বেজেছে তিনটা করে গিটার প্রত্যেক গ্রুপে, ড্রামস, এবং একটার সঙ্গে কিবোর্ডস। শুধু সাউন্ডটা আলাদা করা যায় নাই। রকের সঙ্গে নয়েজের একটা যোগসাজশ সবসময় আছে। এইখানে প্ল্যানড নয়েজ তৈয়ার করতে পারেন নাই শিল্পীরা। আগডুমবাগডুম হয়েছে সারাক্ষণ, ঘোড়াডুম দিয়া সমাপয়েৎ।

শোনা হয় নাই গান, এই আক্ষেপটা তো আছেই, কিছু জিনিশ ভাবা হয়েছে এবং তা গানকেন্দ্রী কিছু সোশ্যাল সার্কাজমিক টাল্টিবাল্টি নিয়া, শুনতে যেয়ে ভাবতে পারাটা তো অভিপ্রেতই। ইন দ্যাট কন্সিডারেশন ‘রকস্টর্ম’ অসফল হয়েছে বলা যাচ্ছে না। ব্যর্থ হয় না মানুষের সাংস্কৃতিক কোনো প্রচেষ্টাই। নিবন্ধের ব্যাপ্তি অধিক না বাড়িয়ে সেই-সমস্ত ভাবাভাবি তিন-চারটে পয়েন্টে দেগে রেখে এ-যাত্রা থামতে চাইব।

প্রথমত, পাব্লিক প্রোগ্রামে অ্যাপিয়ার করবার আগে একটা ব্যাপার তো মাথায় রাখা দরকার যে এখানে ইয়ারদোস্তদের বাইরে দুই-চাইরজন গানশ্রোতা অ্যাটেন্ড করতে পারে। সেক্ষেত্রে সার্বিক ব্যবস্থাপনায়, সেইটা সাউন্ড থেকে শুরু করে অ্যাড্রেসিং দ্য অডিয়েন্স কোন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার হবে এইসব ব্যাপারে, একটা প্ল্যান থাকা আবশ্যক। যতই বলি ইউজি, বলি আন্ডারগ্রাউন্ড, নিরীক্ষামূলক কাজ পাব্লিক ডোমেইনে আনবার সময় একটা প্ল্যান সকলেরই থাকতে হয়। না-হলে শ্রোতা হারাতে হয়। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা নিশ্চয় কেউ বলবেন না যে কে কইসে আম্নেরে আইতে আমগো ডোভারলেইন মিউজিক কনফারেন্সে? মাগ্না গান হুনসইন, ওইটাই ত্তো অনেক।

দ্বিতীয়ত, মঞ্চে গাইতেই হবে এমন কথা নাই কোথাও অবধারিত। তবে স্টেজে গাইবার সময় কারা আছে সামনে, সেই সম্পর্কে একটা আইডিয়া থাকতে হয় শিল্পীর। অবশ্য এই অনুষ্ঠানে আয়োজক, দর্শক, শিল্পী, শ্রোতা তাবতেই ছিলেন সমগোত্রীয়। মেটাল মিউজিক করেন সবাই, টিশার্টে বিভিন্ন বিদেশী শিল্পীর পোর্ট্রেইট সম্বলিত স্লোগ্যান দেখে এই প্রতীতি জন্মেছে। এছাড়া গাইবার আগে-পরে স্পেসফাঁকে শিল্পীরা সামনে-বসা বিলো-টোয়েন্টিফাইভ সব্বাইকে ‘রকস্টার’ সম্বোধিতে শোনা গেল কয়েকবার। আশঙ্কাটা হচ্ছে, এমন অগোছালো শব্দযোজনার আয়োজনে শিল্পীদের বন্ধুগোত্রের বাইরেকার একজন শ্রোতাও যদি হাজির থাকে, সেই সবেধন নীলমণি শ্রোতাটা সামনের বছর আসবে মনে করার কারণ চট করে দেখানো সম্ভব হবে না।

তৃতীয়ত, সিলেট মিউজিক্যাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন তথা এসএমবিএ এই ইনিশিয়েটিভের উদ্গাতা, যার সঙ্গে ন্যাশন্যাল বামবা  যুক্ত রয়েছে ফেবুপত্রে গেলে দেখা যাবে। এখন, গোটা একটা অ্যাসোসিয়েশনের যদি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এত দুর্বল হয় তাইলে আর তো বলবার নাই কিছু। অন্তত সাউন্ড নিয়ন্ত্রণের একটা ব্যবস্থাপক নাই শিল্পীদিগের টিশার্টসর্বস্ব সুবিশাল সমাজে? লক্ষণে বোঝা যায় রিপ্লাই হবে না-বোধক। সক্কলেই শিল্পী। সক্কলেই হিলবাবা হেডব্যাঙ্গিঙের মরা। তাইলে বামবা  আসলে করে কি? সিলেটের অ্যাসোসিয়েশন যদি অ্যাসোসিয়েইটেড উইথ বামবা হয় তাইলে বামবা দায়িত্ব নিয়েছিল কোনো অ্যাস্পেক্টে? প্রশ্নটা ইনডিড করা দরকার বামবার অস্তিত্ব নিয়া? বামবা কি বাঁচিয়া আছে দুনিয়ায়? থাকলে এরা সারাদিন করেটা কি?

কাভার ভার্শন গাইবার এই হিড়িক নিয়া চাইর-পাঁচটা পয়েন্ট মাথায় এসেছিল হট্টগোলযোগে বসে থেকে। এখন সব মনে পড়ছে না। খালি বলি যে, এই কিছুকাল আগেও দেশজ গ্রুপগুলোর প্যপুলার/গ্রেইট নাম্বার কাভার করত নয়া ব্যান্ডগুলো তাদের ইমার্জ করবার টাইমে স্টেজে, এক-দুইটা ইংরেজি ফাঁকফোকরে। এখন উল্টে গেল গোটা ব্যাপারটা; খারাপ বা ভালো বলছি না, ভাবছি এর পেছনে কি কি কারণ থাকতে পারে, এবং কন্সিক্যুয়েন্সেস সম্পর্কে একটা আন্দাজ করতে কেউ কি আগায়ে আসবেন না?

কালচারের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হচ্ছে তরুণদের কর্মকাণ্ড। সবসময় সবকালে এই জিনিশ দেখে আসা হচ্ছে। এই সময়ে এসে একটা আলাদা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে যে তরুণেরা এস্ট্যাব্লিশড কালচারের তোয়াক্কা না-করে হাঁটছে। গুরুজনদের লাগতেসে না কামে। এইটা সাংঘাতিক শক্তির দিক। এই প্রিভিলেজ নিয়া একালের তারুণ্য অভাবিত সব সাংস্কৃতিক উদ্দীপনার কাজ করতে পারে। এইখানেই বিপদের জায়গাটা আসে যে, একটা চিকন দাগের সমন্বয় না-থাকলে শিল্পসাহিত্য ভেস্তে যায়। কালচারে শেষবিচারে কিছুই নতুন নয়, কেবল নতুন বলিয়া আন্দু ভ্রম হয়, এমনকি আজকের তরুণের সাধের মেটালও নয় ‘আনিলাম ধরণীতে’ ঘোষণা দিবার মতন মাল। এই জিনিশ যে বেশি আগে বুঝবে সে বেশি আগে মেইনস্ট্রিমের খোরাক হবে। এখন বললেই তো হবে না যে মুই মেইনস্ট্রিম হমু না, মুই চিরদিন অফস্ট্রিম রমু। নো, উপায় নাই গোলাম হোসেন! মৃত্যুই নির্বাণ। মেইনস্ট্রিমই নিরীক্ষার রেজাল্ট।

শুধু বর্ণিত তিনটা ব্যান্ডই নয়, জুম্মাবারের বিকাল থেকে রাত এগারো অব্দি মোটমাট আট ব্যান্ডের মধ্যে আরও তালিকাভুক্ত ছিল ‘সালফিউরিক অ্যাসিড’, ‘স্পার্টান্স’, ‘অ্যাসেন্ডেন্সি’, ‘রূপক’, ‘সৌল অফ থর্ন্স’ এবং পূর্বোক্ত তিনটা। আস্ত শহরে অ্যাট-লিস্ট ছয়-সাতটা পাব্লিক ভেন্যু আছে পেটমোটা, তারুণ্যের উদীপিত মুহূর্ত উদযাপনে কেউ সঙ্গী হয় না বুড়াহাবড়া রাবীন্দ্রিক-নজরুলিকেরা লগে না থাকলে। এই গিভেন কন্টেক্সটে রকস্টর্ম অনুষ্ঠানটা এইবার হয়েছে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের শহিদ সোলেমান হ্যলে। স্যাল্যুট জানাতে হয় কেমুসাস কর্তৃপক্ষকে এই ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে শরিক হবার জন্যে।

এবং, জোক্স অ্যাপার্ট, নিশ্চয় আমরা আগামীর রকঝড়ের কবলে পড়ে আরও সুখী হব। নিশ্চয় যাব, যদি হায়াতে কুলায়। নিশ্চয় সামনের বছর এইবারকার সিলি মিস্টেইকগুলো হবে না। বাংলাদেশের রক যেন হয় বাংলাদেশেরই রক, অন্য দেশের নয়েজ নয়, একদম লোক্যাল নয়েজটাকে নন্দনটাকে আমি যেন আমার রকে আমার মেটালে আমার প্রগ্রেসিভে পাই। ইউরোপ-আম্রিকা নিয়া আমার কাম নাই।

রিভিয়্যু প্রণয়নকারী : মিল্টন মৃধা   

COMMENTS

error: