যারা আমার গুরু || রূপম ইসলাম

যারা আমার গুরু || রূপম ইসলাম

একজন নয়, একের অধিক এবং অনেকেই আমার গুরু। আমার ওপর যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তিনি হচ্ছেন আমার মা — যিনি আমাকে আমার জীবনদর্শন খুঁজে পেতে প্রেরণা যুগিয়েছেন। সাংস্কৃতিক সমস্ত ব্যাপারে উৎসাহী ও তৎপর আমার মা ছিলেন পেশায় শিক্ষক। নৃত্য ও সংগীতে বেজায় আগ্রহ ছিল তার, নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চনাটক এবং করেছেন বৃন্দগান পরিচালনা। মায়ের তদারকিতে আমার সাংগীতিক জীবন শুরু হলেও অচিরে আমি ‘বাণীচক্র’ গ্রুপে জয়েন করি এবং এই ‘বাণীচক্র’ গ্রুপে সক্রিয় হয়েই শিল্পীজীবনের সূচনা হয় আমার। বাণীচক্রে যোগ দেয়াটা মাইলস্টোন বলা যেতে পারে আমার ক্ষেত্রে। এইখানে থাকাকালীনই আমি আমার গুরু রবীন মুখোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নেয়ার সুযোগটা পাই। শীর্ষস্পর্শের স্বাদ ও উত্তেজনাটা আমি জীবনে এক্সপেরিয়েন্স করেছি পয়লা বাণীচক্রে যোগ দিয়ে। এর পরবর্তীকালে পেশাগত জীবনে যেয়ে এই বাণীচক্রে-পাওয়া শিক্ষাটা আমার কাজে লেগেছে; ব্যাপারটা হচ্ছে, যা-ই করো ভাই, শীর্ষে যেতে হবে — এই শিক্ষাটা বাণীচক্র থেকেই নিয়েছি আমি।

এরপরে, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে, বাংলাদেশী ব্যান্ড ‘ফিডব্যাক’–এর ‘জোয়ার’ অ্যালবামটা বাজারে আসে (অ্যালবামটা ইন্ডিয়া থেকেই রিলিজ্ হয়েছিল, ‘এইচএমভি’ ব্যানারে)। সেই পয়লাবারই জীবনে ‘ব্যান্ড’ শব্দটার সঙ্গে চেনাজানা আমার। ফিডব্যাকের সেই ‘জোয়ার’ অ্যালবামের মাধ্যমেই ব্যান্ড কন্সেপ্টটা আমার গোচরে আসে। এবং বুঝতে পারি যে ফিডব্যাকের গানগুলো আমাদেরই রোজকার চলাফেরার নিত্যযাপনের কথা বলতে চাইছে সাংগীতিক উপস্থাপনার ভিতর দিয়ে; এবং গোটা ব্যাপারটা আগাপাশতলা সমকালীন, কন্টেম্পোরারি। ফিডব্যাকের স্যংরাইটার এবং লিড-ভোক্যালিস্ট মাকসুদুল হক সেই প্রথম শ্রবণেই আমার মনে এবং মগজে একটা অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছিলেন। মাকসুদকে মান্য করি আমার পেশাগত সংগীতজীবনের গুরু হিশেবে। ম্যাকের (মাকসুদুল হকের ডাকনাম) গান শোনার পরে, ম্যাকের গানে স্পৃষ্ট হয়ে, আমি বাংলায় গান লিখতে শুরু করি।

কবীর সুমন আসেন এর বেশ পরে। তার গানে আমি এতটাই তাড়িত হই যে নিজের লেখা প্রথমদিককার শ’-খানেক গীতরচনা আমি ছিঁড়ে ফেলে দিই খাতা থেকে, যে-গানগুলোকে সুমনের গানের সঙ্গে মেলাতে যেয়ে দেখি নিতান্ত পানসে এবং যাচ্ছেতাই ম্রিয়মাণ। কবীর সুমন শোনার পরে একদম নতুন প্রেরণা পাই এবং রচনার ঢং বদলাই; একদম নতুনভাবে আবার লিখতে শুরু করি।

জীবনে আরেকজনের প্রভাব আমাকে স্বীকার করতেই হবে, তিনি গৌতম চট্টোপাধ্যায়। তিনি আমার গানবাজনা ভালোবাসতেন, আমাকে ডাকতেন “বাংলা রকের নীলচোখা বালক” বলে। গৌতমদা আমাকে চুল লম্বা করতে এবং দাড়ি রাখতে বলেছিলেন, দাড়ি-চুল আমার মিউজিকের সঙ্গে খুব মানাবে বলেছিলেন।

আমার আরেক গুরুর নাম শুভাশিস নাথ। তিনি আমায় ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের তালিম দিয়েছিলেন এবং প্রোফেশন্যাল সিঙ্গার হবার ব্যাপারে সহায়তা করেছেন।

সবশেষে যার নাম নিচ্ছি তিনি আমার আরেক গুরু, সবার শেষে নাম নিচ্ছি মানে এ নয় যে তিনি শেষসারির, উদয়ভানু ভট্টাচার্য তার নাম। প্রোফেসর উদয়ভানুর কাছে আমার অশেষ ঋণ। কলেজদিনগুলোতে এই শিক্ষকমশাই তার আশ্চর্য কুশলী বিদ্যাসঞ্চারের প্রক্রিয়া দিয়ে একেবারে হরণ করে নিয়েছিলেন আমাদের মন।

 

‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ থেকে লেখাটা গানপার ট্র্যান্সল্যাশন ডেস্কে অনূদিত

রূপম ইসলাম
Latest posts by রূপম ইসলাম (see all)

COMMENTS

error: