ব্যান্ডসাংগীতিক হাওয়ায় শ্বাসবাহী দিনগুলো || জাহেদ আহমদ

ব্যান্ডসাংগীতিক হাওয়ায় শ্বাসবাহী দিনগুলো || জাহেদ আহমদ

রণজিৎ দাশ, ইন্ডিয়ান-বাংলা সাহিত্যে এক মৌলিক কবিস্বর, পশ্চিমবঙ্গে মুক্তির দশক হিশেবে খ্যাত গত শতকের সত্তরের গোড়ায় লেখালেখিজগতে আবির্ভাব তার, ‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন, কবিতাটা পাওয়া যায় ‘সময়, সবুজ ডাইনি’ শীর্ষক বইয়ের আওতায়; বিউটিফ্যুল একটা হরর অ্যাটমোস্ফিয়ার, স্যুরিয়্যাল বাতাবহ, কবিতাটাতে আগাগোড়া টানটান থাকতে দেখা যায়। “আমার গায়ের মানুষগন্ধে একটা রাক্ষসী একবার খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। আমি বুঝতে পারিনি, রাক্ষসী ছিল তোর মায়ের ছদ্মবেশে। সে অনেক দিন আগের কথা। তখনো তোকে আমরা কাশবনে কুড়িয়ে পাইনি। দিনটা ছিল শ্রাবণের, অল্প অল্প বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া আর মেঘের ডাক। এমন দিনে মঠ-মন্দিরের সাধুরাও ছটফট করেন, রাত্রি হলে প্যাঁচার গলায় অন্ধকারকে ডাকেন।” — কবিতাটা স্টার্ট করে এইভাবে। এর পরের স্তবকে যেয়ে, দ্যাখো, এহেন শুরুটা : “আমি রাজার বাড়ির কাঠ কেটে রাণীর বাগানের ঘাসনিড়ানি দিয়ে ঘেমে-নেয়ে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরেছি, দেখি দরোজায় এলোচুলে সে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তো ভেবেছি, তোর মা। … তখন আমার দারুণ সন্দেহ হয়। … আমার আর ধন্দ থাকে না যে এ তোর মায়ের ছদ্মবেশে এক মায়াবিনী রাক্ষসী। … থর থর করে কাঁপতে থাকে আমার শরীর, ঝড়ের মুখে পোড়োবাড়ির মতো। … বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়, যেন শয়তানের শিস। তেপান্তরের অন্ধকারে লণ্ঠনের মতো কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে যেতে থাকে আমার হুঁশ। তারই মধ্যে আচমকা মনে পড়ে, তোর মা কোথায়? রাক্ষসী তাকে গুণ করে কোথায় কি ভাবে লুকিয়ে রেখেছে? ঘরের কোণে যে অচেনা বেড়ালটা ভীরু চোখে তাকিয়ে আছে, সে-ই কি তোর মা? দেয়ালে যে-টিকটিকিটা গোমড়ামুখে আমাদের দেখছে, সে-ই কি তোর মা? খাটের নিচে যে আচারের শিশিটা পড়ে আছে, সে-ই কি তোর মা? … এসব ভাবি আর টের পাই, তেপান্তরের সমস্ত আঁধার এসে ঢুকছে আমার শরীরে, আমি হয়ে উঠছি এক কালো বাইসনের সওয়ার।” — এইভাবে ন্যারেটিভটা আগায়, একদম গল্পচ্ছলে, কেচ্ছাকাহিনির আদল সত্ত্বেও কবিতাটা আশ্চর্য রহস্যালোকিত। কবিতায় রূপকনির্মাণ, বলা যায় একপ্রকার ফিলোসোফিক্যাল মেটাফোর বা মেটাফোরিক্যাল ফিলোসোফি সৃজনে এই কবি ভীষণ সুদক্ষ। রণজিৎ দাশের পাঠকসংখ্যা বাংলাদেশের ভেতরে তেমন প্রশংসাব্যঞ্জক বেশি না-হলেও কবিদের মধ্যে রণজিতানুসারী তথা তার ফলোয়ার প্রচুর। বুঝিয়া হোক বা না-বুঝিয়া রণজিৎপ্রভাব তরুণ বাংলাদেশী কবিতায় বলা যাবে না যে দুর্নিরীক্ষ্য। গড়-পাঠকের মধ্যে কেন রণজিৎপাঠক কম, এই জিজ্ঞাসার উত্তরও তো জানা। ঠাকুর-কাজী-জীবন — এই ত্রিরত্নের বাইরে বেসরকারি-সরকারি কবিতাপাঠক অন্যান্য বিশেষ কাউকে চেনে না বা চায়ও না চিনতে। হ্যাবিচ্যুয়েটেড মনুষ্যপ্রজাতির এই এক জড়পদার্থ দশা। বার হতে কমই চায় তারা অভ্যস্ততা থেকে। নেপথ্যে আরও অনেক কারণ, প্রোমো-প্রোপ্যাগ্যান্ডা ইত্যাদি, রয়েছে ত্রিরত্নের মোনোপোলি বিজনেস বহাল থাকার। সেসব অন্যত্র আলোচ্য। কবিতাটা শেষাংশে যেয়ে যে-রূপ পরিগ্রহ করতে চেয়েছে, সেখান থেকে একটু উদ্ধৃত করা যাচ্ছে এখানে : “এবং তারপর, আমার শাদা পরিচ্ছন্ন হাড়গোড় সে নিঃসন্দেহে লুকিয়ে রাখবে সেই বৃষ্টির ফোঁটা জমে-থাকা রঙিন কচুঝোপের তলায়। আর, অনেক অনেক বছর পর, তোর মতো কোনো বালক ফড়িং ধরতে এসে সেই ঝোপের তলায় খুঁজে পাবে তার বাবার হাড়গোড়। বাড়ি ফিরে গিয়ে ঠাকুমার কাছে গল্প শুনবে, তার বাবাকে কিভাবে এক রাক্ষসীতে খেয়েছে।” কে খেয়েছে ছেলেটির বাবাকে — কে খেয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত তোমাকে-আমাকে-আপনাকে-তাকে — কে এই রাক্ষসী? — সময়, সবুজ ডাইনি! পৃথিবীর উপকণ্ঠে থাকে সে, নাবিকের হাড় দিয়ে সন্ধ্যার উঠোনে সে ভাঙা জাহাজের ছবি আঁকে; এবং এ-ছবি ডিঙিয়ে যারা ঘরে ফেরে, তারাই সময়ডাইনির অনন্ত ক্রোধের লক্ষ্য, প্রধান শিকার; এ-ই কি সবটুকু খোল্লামখুল্লা লীলা তার, মদিরা মায়াবিনীর? — না, আরও আছে, এর বিপরীত বিহারও রয়েছে বটে। যারা ওই ছবি, ভাঙা জাহাজের ছবি, উল্কি দিয়ে এঁকে নেয় বুকে এবং ফেরে না ঘরে, তাদের মৃত্যুকে লোকগাথা দিয়ে সে ঢেকে দ্যায় ভোরবেলা, শান্ত উপকূলে; এবং নিজেও ঘুমিয়ে থাকে সেইখানে সারাদিন রৌদ্রে, এলোচুলে। এ-ই তো, সময়মিউজ, এ-ই হলো রণজিৎম্যাজিক।

সবুজ এই করুণ ডাঙায় আমাদের তিষ্টোতে দ্যায় না সে, এই ডাইনি, এই মায়াবিনী। কিন্তু, তৎসত্ত্বেও, সবুজ এই ডাইনি এই নিঠুরা মায়াবিনীই আমাদের আজন্ম প্রেম ও কাম নিবেদনের আরাধ্য দেবী। ইহারই কানে, এই সোনার পিত্তলমূর্তির শ্রবণিন্দ্রীয়ে, অনেক কবিতা লিখে একতোড়া গান গেয়ে চলে যায় ঢের ঢের যুবকের যুবতীর দল যুগে যুগে। একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে, একবার বেদনার পানে ফের, সন্তানের মুখটি ধরে একটি চুমু খেতে চায় বিদায়ের আগে। এই শক্তি, এই জীবন, এই বিনয়, এই মাহমুদ, এই রাহমান, এই আবুল হাসান, এইসব অবোধ উন্মাদের দল! এইসব মাতাল ঋত্বিক কাঙালের দল! জয়দেব-নবারুণের দল! মোদ্দা কথাটা হলো গিয়ে এ-ই যে, ছেলেকে রূপকথা বলা। আমার আত্মজাকে আমি বলিয়া যাই আমার সময়ের রূপকথা। আমার আত্মজ পুত্রসন্তানকে আমি শুনায়ে যাই আমার প্রেম ও প্রাণগাথা। আমার মেয়েকে, আমার ছেলেকে, রূপকথা বলে যাবার জন্যই কি আমি ও আমরা বেঁচে আছি না? তাহাদের কানে ও মনে একটু হলেও ছোপ লাগায়ে যেতে চাই আমাদের সময়ের রঙের। যে-সময়টা আমাদেরে আন্দোলিত করেছিল, কখনো সময়টাকেও কয়েক-মুহূর্ত আন্দোলিত করতে পেরেছিলাম আমরা, এইসব গল্প বলিয়া যাই আশ্লেষার রাক্ষসীবেলায় সমুদ্যত দৈব-দুর্বিপাকে আমাদেরই উত্তরপ্রজন্মের কাছে।

এ-ই তো। সবকিছুই, তিল থেকে তাল পর্যন্ত, হে আমারই-ছাই-থেকে-জন্মানো পাখি, তোমার জন্য সুরক্ষিত, তোমারই প্রতি এ আমার নৈবেদ্য, তোমাকে ডেডিকেইটেড আমার দিবারাতিনিঃশ্বাস ও রক্তস্বেদবিন্দুগুলো। ‘মন কী যে চায় বলো / যারে দেখি লাগে ভালো / মন সে-তো বাঁধা পড়ে না / কী জানি কেন জানি না’ — এই গান ও ‘ডিফ্রেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের অন্যান্য গানগুলো, ভোক্যাল্ মেজবাহ — এইসব গানবাজনা আমাদের উঠতি দিনের শক্তি ও নিঃসহায় কিশোরবেলার প্রেম, আমাদের সময়ের অনেকেরই শিশা, এনার্জি ড্রিঙ্ক। তখনও গোঁফ ছাঁটা হয় নাই, তিড়িংবিড়িং বাছুরবয়স পেরোচ্ছিলাম তখন, অল্পকিছুদিনের মধ্যেই পাড়ার থেকে অনেক দূরের একটা সেলুনে যেয়ে কেমন লজ্জা-দ্বিধা আর ঠিক-হচ্ছে-কি-হচ্ছে-না টাইপের দোদুল ভয়মিশ্রিত মনে ছেঁটে আসব গোঁফ। দুম করে বড় হয়ে উঠব, এবং কত-যে ছ্যাঁকা খাব বড় হয়ে! এবং আরও বেশি বেশি শুনতে শুরু করব উইনিং-এর গান, ডিজিটাল   নামের একটা ব্যান্ডের গান — ‘সূচনা কোথায় আছো, কেমন আছো জানি না’ … আর ‘শোনো ও-বকুল মল্লিকা হাস্নুহেনা’ নামে এই ব্যান্ডের দুইটা গান চিরসবুজ, শুনে দেখতে পারো কোনো অনলাইন উৎসে যেয়ে — এছাড়া সোলস্   ও ফিডব্যাক  তো ছিলই, ছিল ফজলের নোভা, কিন্তু এলআরবি  বা জেমসের ফিলিংস্   তখনো সম্ভবত গড়ে ওঠে নাই। কিংবা বাচ্চু-জেমস্ তখনও বাংলাদেশের মিউজিকে আজকের মতো ফর্মিড্যাবল চরিত্র হয়ে ওঠেন নাই, ভিড়ের ভেতর থেকেই গ্লিটার করছেন মাঝেমধ্যে, ভিড়ের ভেতরেই উঁকি দিয়ে একাধবার তাদের মুখের ঔজ্জ্বল্য ও সুরোচ্ছ্বাস দেখাচ্ছেন আমাদেরে। এমন অজস্র ব্যান্ডগ্রুপ তো ছিল তখন, যারা ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসাচাহিদা মেটাতে যেয়ে জন্ম নিয়েছে এবং বাণিজ্যাভিপ্রায় কিয়দংশে মেটায়েছেও।

অজস্র দল গড়ে উঠছিল তখন গানের, পাড়ায় পাড়ায়, রাজধানী এবং গোটা দেশের সমস্ত মফস্বল শহর ও শহরতলিগুলোতে। বেশিদিন হয়তো কন্টিনিয়্যু করে নাই তারা কেউই, করতে পারে নাই, কিন্তু শুরুর প্রণোদনাটুকু তো ছিল যথেষ্ট খাঁটি ও স্বতঃস্ফূর্ত। হুজুগ তো একটা থাকেই, তা-সত্ত্বেও, সেজন্যে এই মিউজিক্যাল স্ফূর্তিটা খাটো করে দেখা যাবে না কোনোমতেই। বিশেষত উইন্টারে ম্যারাপ বেঁধে শিশিরপড়া গাছতলের ইশকুলময়দানে রাতজোড়া ব্যান্ডের ড্রামবিট ভরিয়ে রাখত শহরতলির পাড়া-মহল্লাগুলো। ভুলভাল বিট, উল্টাপাল্টা গিটারকর্ডিং, ভোক্যাল্ বেসুরো ও ডিহার্মোনাইজড। হলেও-বা, তাতে কি, গানে-বাজনায় দরদ আর উন্মাতাল দশার মূল্যও তো কম না। ‘শ্রাবণের মেঘগুলি জড়ো হলো আকাশে’ কিংবা ‘ফিরিয়ে দাও আমার প্রেম’ অথবা ‘লেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে এ কী মাতনদোলা’ — মাইক্রোফোনে এইসব গানের ধুন অপটু গলায় ও বাদ্যিযন্ত্রে বেজে ওঠা মাত্র রঙিন হয়ে উঠত রক্ত আমাদের সেই-এককালে। এই রঙিনতা আরব্য রজনীর গল্পকেও পরাভূত করবে, একটু যদি বিন্যস্তভাবে একটু গোছায়ে বলতে পারতাম তোমাকে!

সেইসময় গানের দল ছিল অনেক ঠিকই, কিন্তু অডিয়োঅ্যালবাম সক্কলের ছিল না। যারা নামজাদা ব্যান্ড, ধরো সোলস্ বা মাইলস্ বা ফিলিংস্ বা ফিডব্যাক, তাদের অ্যালবাম বেরোত বছর-কয়েকের একেকটা গ্যাপ নিয়ে। এর মধ্যে আবার একটা অলিখিত-অঘোষিত ক্ল্যাসিফিক্যাশন করে নিতাম আমরা শ্রোতারা ব্যান্ডগুলোর মধ্যে : এ ক্যাটাগোরি, বি ক্যাটাগোরি, সি ক্যাটাগোরি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত কন্টিনিয়্যু করেছে যারা, আজও কোনো-না-কোনোভাবে এক্সিস্ট করছে যারা, তাদেরে তুমি শীর্ষসারি ধরেই নিতে পারো। তবে এই বিচার সবসময় ঠিক ও নির্ভুল না-ও হতে পারে। একটা উদাহরণ দেই। ধরো, অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শীর্ষসারির একটা ব্যান্ড ছিল ‘চাইম’। ফোক-সফ্টরক কম্পোজিশনে বেশ করছিল দলটা, গ্রামেগঞ্জেও সমাদৃত হচ্ছিল ওদের কোনো-কোনো কম্পোজিশন। আশিকুজ্জামান টুলু ব্যান্ডের হাল ধরে রেখেছিলেন, মূল ভোক্যাল্ ছিলেন খালিদ। ‘জয় জগানন্দ’ এবং ‘কালো মাইয়া’ চাইমের হিউজ হিট গানের মধ্যে দুইটা। গ্রুপের অন্তর্কোন্দলে চাইম ভেঙে যায়। খালিদ চাইম  লিড্ করতে থাকেন এবং টুলু বেরিয়ে যেয়ে ফর্ম করেন আর্ক । সেইটা আরেক হিস্ট্রি ক্রিয়েট করে। আর্ক । ‘একাকী’, ‘সুইটি’, ‘গুরু’ প্রভৃতি গান দিয়া হাসানকে বাংলা গানে ফিচার করেন টুলু এবং পয়লা দানেই কিস্তি মাত করে দেন। আর্কের বিজয়রথ শুরু হয় এবং বহুদিন রাজ কায়েম থাকে টুলু রোজগারার্থে প্রবাসী হবার আগ পর্যন্ত। খুঁড়িয়ে হেঁটে একসময় ভীষণ সফল ব্যান্ড চাইম  থেমে যায়। এই ইতিহাস অনেক ব্যান্ডেরই ক্ষেত্রে সত্য। ‘নোভা’ অসম্ভব সুন্দর ও শক্তিসামর্থ্যওয়ালা ব্যান্ড একটা, ফজল মাহমুদ নোভার মেইন ভোক্যাল্ ও কন্ডাক্টর, অজ্ঞাত কোনো কারণে গান থেকে অকালে নেপথ্যচারী। পিঙ্ক ফ্লয়েড  ছিল নোভার আইডল সম্ভবত, ফলে এদের লিরিকে এবং বাদনে এমনকি অ্যালবামপ্রচ্ছদে পর্যন্ত ফ্লয়েডপ্রেরণার ছাপ অগোচর নয়। ‘সিম্ফনি’, ‘অবসকিউর’, ‘তীর্থক’ প্রভৃতি ব্যান্ডের কথা উল্লেখ করতেই হবে এ-প্রসঙ্গে। এরা ভালো ও সম্ভাবনা-উজ্জ্বল ব্যান্ড ছিল। ‘অরবিট’ নামে একটা ব্যান্ড ছিল, পলাশ ছিলেন এই ব্যান্ডের ভোক্যাল্ যিনি পরে সোলো ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন এবং উল্টাপাল্টা বাজনায়-গানে বাজারে বছরভর মুখ দেখায়ে চলেন জগাখিচুড়ি একটার-পর-একটা অ্যালবামকাভারে, এই ব্যান্ডের একটা গান ছিল ‘লাল শাড়ি’ টাইটেলে যা কি-না দারুণ শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল সেইসময়। একটা ব্যান্ড ছিল ‘ইভস্’, পরে এইটা ভেঙে দুই টুকরা হয়, নতুন টুকরার নাম হয় ‘নিউ ইভস্’, দুইটাতেই শ্রোতার আকর্ষণ ছিলেন মেলোডি টিউনের ভোক্যাল্ নাসির। ‘বন্যেরা বনে রয়, তুমি এ-বুকে / তুমি সুখী হবে আমারই সুখে’ কিংবা আরেকটা গান ‘কান পেতে শোনো এই বুকেরই মাঝে / কী যে এক তোলপাড় যেন টর্নেডো’ প্রভৃতি ইভসের হিট নাম্বারগুলোর মধ্যে স্মরণযোগ্য। জনপ্রিয় ও মঞ্চসফল ভালো ব্যান্ড ছিল ‘প্রোমিথিউস’, এর ভোক্যাল্ বিপ্লব, এখনও শারীরিকভাবে এই ব্যান্ডটা গায়-বাজায় নেচেকুঁদে দেখতে পাই, কিন্তু সাংগীতিকভাবে এর মরণ হয়েছে একদশকেরও অধিককাল আগে। এই দলটা এখন বানর-নাচিয়ে হিশেবেই মশহুর, বান্দরেও নাচে না অর্থেই বিখ্যাতি এর। মনি জামান লিড্-ভোক্যাল্ ছিলেন সিম্ফনি  ব্যান্ডের। ‘বলো বলো তোমরাই বলো / জীবন কি এই একটাই / যদি তা-ই / তবে বারেবারে কেন / তারে পেয়েও হারাই’ ইত্যাদি লিরিকের গানটার কথা মনে পড়ে, তেমনি ‘দলমত নির্বিশেষে’ এদের আরেকটা ভালো কথাঋদ্ধ গান। ‘তীর্থক’ ব্যান্ডের গানগুলোও স্মরণ করব। চমৎকার সব গানের মধ্যে ‘দুয়ারী’, ‘পালকি’, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার সেই ‘ভালো আছি ভালো থেকো / আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য উজ্জ্বল পরিবেশনা এই দলের। ‘মমতায় চেয়ে-থাকা সেই চোখ নেই / তুমি আছো আমি আছি আছে সকলেই’ … কিংবা ‘ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী / জীবনখেলায় হারাইলাম সবই / বুকে জমাট-বাঁধা অভিমান / কী নিঠুর এই নিয়তির বিধান’ — দুইটা দারুণ জনপ্রিয় গান অবসকিউরের। তাছাড়া ‘মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায় / ভেবে নেব আজ তুমি চাঁদ দেখোনি’ ইত্যাদি হিউজ হিট গানে ব্যান্ডটির ঝুলি পূর্ণ। ‘নোভা’ ব্যান্ডটার উল্লেখ না-করলেই নয়; নানা কারণেই এই ব্যান্ডটার কথা বারবার আসবে ঘুরেফিরে বাংলাদেশের রকসিনে। এই ব্যান্ডের ভোক্যাল্ ফজল মাহমুদ বাংলাদেশের ব্যান্ডহিস্ট্রিতে মেধাবী মিউজিশিয়্যানদের মধ্যে একজন। নোভার অ্যালবামগুলো সব-কয়টাই যেমন শ্রোতাগ্রাহ্য হতো, কম্পোজিশনের পার্ফেকশন তথা গানের লিরিক্যাল ইন্টেন্সিটি এবং মেলোডি উভয়ত সুন্দর ও সুপরিমিত হতো, ফ্লো-স্পিড ও ট্যাম্প্যু বজায় থাকত গানের শরীর ভরে এবং সমগ্র পরিবেশনায়। পিঙ্ক ফ্লয়েড  প্রভাব সত্ত্বেও স্বকীয় ঔজ্জ্বল্যে ব্যান্ডটা ভাস্বর আজও। ‘স্কুল-পলাতক মেয়ে’, ‘নভোচারী’, ‘আয় মেঘ আয়’, ‘শৈশব’ প্রভৃতি গান এই ব্যান্ডের সৃজনক্যারিয়ারে একেকটা ব্রাইট স্টার।

আরও কত কত ব্যান্ড ছিল! রুটিরোজগারের খোঁজে কিংবা আরও কোনো রুধিরের অন্তর্গত চাপে এরা গানের বাজনার মধু ও আগুন হল্কানো জগৎ থেকে এখন অন্তর্হিত। স্বদেশেই দিনানুদৈনিক উদয়াস্ত ব্যস্ততায় কিংবা অনেককাল বিদেশে কাটায়ে এদের কেউ কেউ সম্প্রতি গানবাজনায় ফিরতে চাইছেন। অবসকিউরের টিপু, ডিফ্রেন্ট টাচের মেজবা, সিম্ফনির মনি জামান এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি টিভিমিউজিক্যাল প্রোগ্র্যামে এদের পরিবেশনা দেখে মায়া হলো খুব। সময় চলে গেছে ঢের দূরে এগিয়ে এককালের এই মিউজিশিয়্যানদেরে পেছনে ফেলে। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, রেওয়াজহীনতা, তাছাড়া বয়স সবকিছু মিলিয়ে ব্যাপারটায় কেবল কিছু মায়াই রহিয়া গিয়াছে, মিউজিকটা থাকে নাই। কিন্তু মন্দ নয়, অন্তত আমাদের জন্যে, একটু অভাবজনিত আফসোস ও দুঃখ হলেও আমাদের ফেলে-আসা সময়টাকে বেশ উদযাপন করা যাচ্ছে দীর্ঘ অদর্শনের পরে এদেরকে ফিরে দেখতে পেয়ে। এদের এই ভাঙাচোরা প্রায় বার্ধক্যন্যূব্জ স্বরের রূপটাই কিন্তু সবটুকু নয়, মনে রেখো, এদেরও সময় ছিল সেই কোনো-এককালে।

‘এমন একটা সময় ছিল / মায়াবী রাত নিঝুম ছিল / তখন আকাশে ছিল তারা / চাঁদের আলোর ফোয়ারা’ — এইটা একটা ক্লাস-ওয়ান গান, আর্ক   ব্যান্ডের ডেব্যু ‘তাজমহল’ অ্যালবামে অ্যাভেইলেবল, পঞ্চম এই গানটা অ্যারেইঞ্জ করেছিলেন এবং গেয়েওছিলেন খুব সুন্দর। পঞ্চম আমাদের গ্রেইট মাহমুদুন্নবীতনয় হবার কারণে ভেবেছিলাম বাংলা গানে এসে তিনি চাল্লুবাংলায় যাকে বলে একেবারে ফাটিয়ে দেবেন, পঞ্চমের দুই সহোদরা সামিনা-ফাহমিদা তখন যার যার ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে বিরাজ করছিলেন, প্রোমিজিং হওয়া সত্ত্বেও পঞ্চম তা পারেন নাই। কিছুদিন সোলসের সঙ্গে, কিছুদিন আশিকুজ্জামান টুলু ও আর্ক,  শেষে নিজের একটা ব্যান্ড গড়েন এবং ততদিনে পঞ্চম সম্পর্কে আমাদের যাবতীয় আগ্রহের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে গেছে। অ্যানিওয়ে। এই গানটা, ‘এমন একটা সময় ছিল’ গানটা, দারুণ করেছিলেন পঞ্চম এবং এইটাই মনে হয় ক্যারিয়ারে তার সেরা কাজ। অথবা ‘পাগল মন’ গানটাও উল্লেখের যোগ্য।

হঠাৎ-হঠাৎ মনে পড়ে গানটা, গানগুলো, মনে পড়ে সেই ব্যান্ডদিনগুলি, ইয়াদ হয় এমন একটা সময় আমাদেরও ছিল বটে। মায়াবী রাত, নিঝুমতা, তারাছাপা আকাশ, চন্দ্রফোয়ারা। আগে ছিল, ‘বত্তমানে’ নাই? না, বত্তমানে  নাই। কিংবা আছে হয়তো, বত্তমানে  আছে সবই, রবীন্দ্রবিবৃত দিনের আলোর গভীরে। সেই স্টারপ্রিন্ট স্কাই, সেই স্টারি নাইট, ফিরিয়ে দেবে একদিন কোনো-একটা চান্দ্র ড্রাগন এসে। এইধারা যাই ভেবে। অ্যানিওয়ে। এই ‘চান্দ্র ড্রাগন’ কয়েনেজ অবশ্য অকালে-প্রয়াত তথা আত্মহন্তা কবি শামীম কবীরের। ‘তোমাকে যে কথা বলা হবে / তার সব নিয়ে গ্যাছে চান্দ্র ড্রাগনেরা’ — শামীম কবিতা স্টার্ট করেছেন এই জোড়পঙক্তি দিয়ে। কবিতার নাম ‘১৯ এপ্রিল’, কবির জন্মদিন এইটে; এই জন্মতারিখ নিয়ে একাধিক লিখেছেন তিনি কবিতা, আর সোমবার, কবি যেন অবসেসড ছিলেন নিজের জন্মবারটি নিয়েও; কবির জন্মবার সোম। কবিতাটা দীর্ঘ; সূচনা লাইনদ্বয়ের পরবর্তী তিনলাইনের স্ট্যাঞ্জা : ‘চান্দ্র ড্রাগনেরা ভালো ভদ্র সদাচারী / কেবল তোমার জন্য কথা আনতে গিয়ে / ড্রাগনের শ্বাসে পুড়ে শক্ত হলো ঘাড়’ — এরপর অনেক স্তবক পেরিয়ে যেয়ে এইমতো : ‘ঊনিশে এপ্রিল ছিল সোমবার — বেলা সাড়ে দশ / অতি একটি সাধারণ জন্ম হলো … ইত্যাদি পঙক্তির পাবে দেখা। চান্দ্র ড্রাগন, অতএব, শামীম কবীরের কয়েনেজ ইহাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। তা সেইটা যারই হোক, কাজে লাগা আর কাজে লাগানো নিয়া কথা, কাজে লাগলেই হলো। অ্যাক্নোলেজ করলে কি আর না-করলেই কি, কিচ্ছু বোঝাবুঝির বেইল নাই লোকের। খুঁটিয়ে-পড়া হার্মাদ পাঠকের সংখ্যা আশাব্যঞ্জকভাবে কমছে। ভাগ্যিস! তো, বলছিলাম, শামীম কবীরের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে আরেকজনের কথা, কবি তিনি, অনন্য রায়। নিজেকে অবশ্য কবি হিশেবে ভাবতেন না তিনি, নিজের ব্যাপারে তার স্বঘোষণাটা দারুণ কৌতূহলোর্দ্রেকী : ‘শাস্ত্রবিরোধী চিত্রবর্ণগন্ধময় প্রবন্ধকার’ মনে করতেন তিনি নিজেকে। ডেভিলিশ এলিম্যান্টস্ এস্তেমাল করে বাংলা কবিতাকে এই দুইজনেই ভিন্নদ্যোতনায় কীর্তিত করেছেন; ব্যোদলেয়্যরের দোজখসঞ্জাত ক্লেদ-ক্লিন্নতার বাইরে যেয়ে এদের কবিতা আলাদা আওয়াজে গেঁথে আছে ধরিত্রীগ্রন্থের টাইমলাইনে। এরা টাইম পেয়েছেন অতীব অল্প, শরীরী আয়ুর দিক থেকে, করে গেছেন অভাবিত অনেক তবুও। ‘প্রথিতযশা প্রৌঢ় হওয়ার চেয়ে অপমানিত বালক হওয়াই শ্রেয় মনে করেছিলেন যিনি, যাঁর কাছে প্রজ্ঞা আর-কিছুই নয়, দৃশ্য এবং দ্রষ্টার মধ্যে একটি হাইফেন’ — অনন্য রায় রেখে গেছেন ‘আলোর অপেরা’, ‘দৃষ্টি অনুভূতি ইত্যাকার প্রবাহ’ প্রভৃতি নিঃশ্বাসকল্পগুলো।

তো, শোনো, গল্পটা আরেকটু বলি। ডিফ্রেন্ট টাচের সব গান, সব, মুখস্থ ছিল একসময়। ছ্যাঁকা ভুলে গেছি, কিন্তু গান ভুলি নাই। ‘শ্রাবণের মেঘগুলি জড়ো হলো আকাশে / অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণী ঝরায়ে’, কিংবা ধরো ‘দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বেলে খুঁজেছি তোমায় / ফেলে-আসা সব স্মৃতি মনে পড়ে যায়’ — এই দুই গান তো ওই সময়ের ভদ্র-সদাচারীদের মুখে এবং সিটিবাজানো ছোকরাদের শিসাগ্রে লেগে রইত। কলেজফাংশানে বা জ্যাম তথা জাস্ট-অ্যা-মিনিট ইনস্ট্রুমেন্ট ও ভোক্যালাইজেশনের প্র্যাক্টিসপ্যাডে এই দুই গান ছিল অনুশীলকদের ফেব্রিট লিস্টে। এখনকার, তোমাদের সময়ের, জ্যামিং জমে ওঠে সম্ভবত ‘আর্টসেল’ দিয়া, তাই না? বা, আংরেজি কোনো হেভিমেটাল ব্যান্ড হয়তো-বা। আমাদের জ্যামিংগুলোতে কমন আইটেম ছিল ‘ডিফ্রেন্ট টাচ’। অ্যানিওয়ে। এই ব্যান্ডেরই একটা গান তো তখন খুব হিংস্র প্রতিশোধের গলায় গাইতাম : ‘পাপের স্রোতে ভেসে চলেছ কোথায় তুমি কোনোদিন ক্ষমা পাবে না / জীবনের সব সাধ করেছ পূরণ তুমি কখনো কি মনে পড়ে না / এসো এসো ফিরে সুখী নীড়ে পাপের মোহনা ছেড়ে / এ-সময় আর পাবে না’ … ইত্যাদি কথায় মিষ্টি ঝিরিঝিরি মেজবার গলায় একটানা দ্রুতলয়ে-গেয়ে-যাওয়া লিরিক। ‘অগ্নিগিরির মতো জ্বলবে অনল তুমি সে-অনলে ঠাঁই পাবে না / জীবনের বিষনিঃশ্বাসের ছোবল থেকে কখনো রেহাই পাবে না’ ইত্যাদি দ্বিতীয় স্তবকে যেয়ে পাবো। তুমি তো শুনবে না পুরোটা আমার গলায়, অতএব, খুঁজে নিও মেজবাকেই। আফসোস, আল্লা আমারে গানের গলা দেন নাই, তাই অডিয়েন্স পাইলাম না। আহা রে! সে-যাক। তুমি ডিফ্রেন্ট টাচের গান শুনছ, ভেবে দেখো, শুনছ তোমার জন্মপূর্বাব্দের গান, ভাবা যায়! হ্যাপি লিসেনিং!

কিন্তু ওই-যে বললাম, খুব হিংস্র প্রতিশোধের গলায় গাইতাম ‘পাপের মোহনা’ গানটা — কারণ কী? কিছু না আসলে, ছেলেবেলার অভিমান কোনো-এক সহপাঠিণীর উপরে, একেবারে মনগড়া ব্যাপার। রোম্যান্তিকতা, থোড়া-সা। তা, তখন তো বুঝতাম না বাস্তব-অবাস্তব। লজ্জা নাই বলতে, তবু খুবই পার্সোন্যাল রেফ্রেন্স তো, এইসব বরং না-বলি। কিন্তু বলতে কী কিছু বাকি রাখলাম! অট্টহাস্য কোরো বরং দেয়াল ফাটিয়ে। এখন, যে-কথা বলছিলাম, অনেক পরে যেয়ে বুঝতে পেরেছি যে, এই গানটা আসলে নেশাবিরোধী একটা যুবা-উদ্বুদ্ধকরণমূলক গান। তখন এই ব্যাপারটা ছিল খুব, প্রচলিত, প্রত্যেকটা ব্যান্ডের অ্যালবামেই একটা কমন নাম্বার থাকত নেশা থেকে যুবসমাজকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে লেখা ও গাওয়া গান। আজকাল যেমন এনজিওমার্কা সমাজ-সচেতনতার প্রচারণাগান, তা না কিন্তু। ওই গানগুলো একইসঙ্গে প্রেমেরও গান হয়ে উঠত। প্রতিশোধেরও। সুন্দর শস্ত্র দিয়ে অসুন্দরের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ। অথবা অভিমানী প্রেমিকের গানে গানে ছ্যাঁকাভুলানিয়া কায়্কসরত, স্যুইসাইডপ্রবণ উথালপাথাল মনটারে একটু বশে রাখা। তা, নেশার কথা হচ্ছিল, নেশাবিরোধী আহ্বানমূলক গান, অথবা পতন থেকে প্রেমে ফেরার প্রার্থনা। তখন এসবের খুব দরকার ছিল। তখন মানে সেই সময়টাতে, সেই আশির দশকে। আমরা ব্যাপারটা ক্যাচ করতে শুরু করেছি নব্বইয়ের গোড়ার দিকে। এই সময়টা, নাইন্টিজের গোড়ার সময়টা থেকে গোটা নাইন্টিজ জোড়া, বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত বুইড়ামহলে বিতর্ক ও ছোকরামহলে সৃষ্টিশীর্ষ উন্মাদনা জাগায়ে একেবারে পিকস্পর্শা। ম্যারাডোনাক্রেজ চলছিল তখন, কোকেন-মারিজুয়ানা এইগুলো ছিল, উপরিতলে দেখলে ব্যাপারটা তা-ই। কিন্তু ওই দশকেই ভূগোলদুনিয়ার শক্তপোক্ত পরিসরগুলো ঠাঁইনাড়া হচ্ছে তলে তলে, এর অভিঘাত সর্বত্র পড়ছে একই মাত্রায়, সমাজতান্ত্রিক রাজ্যগুলো পরাজিত ও ভূপাতিত হতে চলেছে অচিরেই, কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে অবাধ পণ্যায়নের এক অনিঃশেষ সর্বাগ্রাসী প্রক্রিয়া, যাকে আমরা ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ নামে ডেকে উঠব শিগগির, বদরুদ্দিন উমর সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকার আমরা তখন নিয়মিত পাঠক, সেই পত্রিকাতেই বিশ্বায়ন নিয়া লেখাপত্র পড়ি নিয়মিত, ‘নতুন পাঠ’ নামে একটা পত্রিকা আনু মুহাম্মদরা বার করবেন ও আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ব, অথবা তার আগের লেখকশিবিরের ‘তৃণমূল’, যদিও স্টুডেন্টফ্রন্ট ও ইউনিয়ন-করা ক্লাসপাঠীদের মুখে আমরা ছিলাম ‘সাম্রাজ্যবাদের চর’, ছিলাম আমরা ‘ভোগবাদের দালাল’, অথচ টিউশনি করে সে-সময় ফেনা বাইরাচ্ছিল মুখ দিয়া, মাইকেল প্যারেন্টি জীবনে প্রথমবারের মতো ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকাতেই নিয়মিত পারছিলাম পড়তে, লেখা বাহুল্য যে অনুবাদে, এবং মুখে বোল ফুটছিল আধো-আধো। অচিরে টের পাবো নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের দাপট ও দম্ভ, জনপরিমণ্ডল তথা পাব্লিক স্ফেয়ারগুলোতে এইসব তখনও টপিক হয়ে ওঠে নাই অত, অব্যবহিত পূর্বে গর্বাশেভ ও তার মহাতামাশার পেরেস্ত্রৈকা সাঙ্গ, উপসাগরীয় যুদ্ধবাণিজ্য শুরু, দুনিয়ার প্রায় সমস্ত দেশে একচেটিয়া সামরিক স্বৈরনায়কদের শাসন, আর্মসডিলার মার্সিনারি আর ওয়ারলর্ডদের গ্রিপের অসহ গিঁট, এবং এই সবকিছুর রাহুগ্রাস থেকে আমরাও বাঁচাতে পারিনি নিজেদেরে, আমাদেরেও হুমু লেফটেন্যান্ট অধ্যায় বিকট ও বিভীষিকাবহ রুদ্ধশ্বাস করে রেখেছিল পুরো একদশক, ফলে হতাশাব্যাপ্ততা আর চারদিকে সহজলভ্য পরিত্রাণের ন্যায় এক্সপেরিমেন্টাল বিবিধ নেশার ছড়াছড়ি।

এইসবের একটা ভালো উপস্থিতি, যথেষ্ট প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ভঙ্গিসমেত, মিলবে তখনকার ব্যান্ডগানেও। নাটকে-সাহিত্যেও, যদিও বঙ্গসাহিত্যে, লেখাপত্রে, সেই প্রেজেন্স পরিমাণ ও মাত্রা-তাৎপর্যগত দিক থেকে ভিন্নতর ছিল বটে গানের তুলনায়। অ্যানিওয়ে। মিউমিউ-করা সাহিত্যই বাংলারাজ্যে প্রোডিউস হয় বেশি। কিন্তু আমাদের সময়ের তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে এসব ব্যাপারে একটা প্রতিরোধী ভাবনা ও ভাব ছিল বলেই তো কমার্শিয়্যাল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এর একটা উপযোগ ও উৎপাদন-উদ্যোগ হাজির ছিল — এইটাও সত্য। অনেক পরে এসব ভেবে বের করেছি। ওই সময় তো অত বুঝতে পারতাম না, খালি নিজের একটা মন-কেমন-করা কারবারের নিষ্কৃতি চাইতাম গানের কাছে, পেয়েছিও প্রভূত। তো, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যান্ডগানে বেশ উল্লেখযোগ্য শক্তিসামর্থ্য নিয়েই রিফ্লেক্টেড হতে দেখা গেছে সে-সময়। যেমন সবচেয়ে শিল্পসফল এক্ষেত্রে ফিডব্যাক,  এখন পর্যন্ত, অথবা ওয়ারফেইজ  ।  অবশ্য তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু মোটিফ সব দলের গানেই ফুটে উঠত। পুরনো ও সফল ব্যান্ডগুলোর মধ্যে পোলিটিক্যালি স্ট্রং ভোয়েস ও লিরিকের গান করত এমন কিছু ব্যান্ডের মধ্যে মেনশন করা যায় এলোমেলোভাবে : নোভাচাইমড্রিমল্যান্ডএলআরবিওয়ারফেইজ   এবং সর্বোপরি ফিডব্যাক  ।  এরা-যে তাই বলে একেবারে মিশন্যারি কায়দায় পোলিটিক্যাল গান করার দল ছিল, তা নয়। প্রেমের গানই গাইত মুখ্যত, যদিও অ্যাপোলিটিক্যাল বলতে যা বোঝায় তা-ও নয় তারা। তাদের গানগুলো শুনে যে-কেউ ধরতে পারবে সেই ইন্টেনশন, অবশ্য লিরিকের ইন্টেন্সিটি ইত্যাদি বিচার-বিবেচনা আমরা আপাতত করতে বসছি না। আমি বলতে চাইছি, প্রেম ও প্রতিবাদ তখন হাত-ধরাধরি ছিল অনেকদিন। সেই আমাদের সময়ে। যেমন ছিলাম আমরাও, প্রতিবাদে-প্রেমে এমনকি বিষাদে এবং গজলে ও গানে। কেবল প্রমোদের মেলায়, কেবলই ফাইজলামি কিংবা জ্ঞানের গোসাঁইগিরি, কেবলই কবিতাফ্যাশনের কুতুবশাহি ছিল না আমাদিগের নসিবে। এবং কমেন্টে কম্ব্যাটিং অ্যাগেইন্সট্ দেশকালসমাজসভ্যতা, নাঢ়াই ছাড়াই জিতিয়া যাইবার হাউশের স্টারট্রেক ওয়ারিয়র্স, যুগপৎ স্লিপিং অ্যান্ড কোয়ারেলিং উইথ দ্য এনিমি, আমাদের কালে এমনধারা আব্দার সেইভাবে প্রেজেন্ট ছিল না। ভাগ্যিস, অত একবগ্গা ছিল না আন্তর্জালহীন অন্তরতম ঘনতরঙ্গ সময়টা আমাদের।

কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পোন্সিবিলিটির এই জামানায় কীভাবে বোঝাই তোমারে যে সেই-সময়ের ব্যান্ডগ্রুপগুলো কতটা সোচ্চার ও অগ্রণী ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তব্যবোধের জায়গা থেকে! এই গল্প অন্যদিন করা যাবে। এখন বরং সংক্ষেপে এটুকু বলেই বিশ্রামে যাই যে সেকেলে ব্যান্ডগানের লিরিক্স লক্ষ করলে দেখবে নব্বইয়ের গণম্যুভমেন্ট, গোটা আশি-দশকজুড়ে স্বৈরাচার ও দমনপীড়ন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ সমস্তই এসেছে। সবাই ঠিক ভালো লিরিক্স ডিল করতে না-পারলেও সব্বাই সমান সচেতনতা থেকে ব্যাপারগুলো নিজেদের গানসৃজনকালে মনে রেখেছে। ফিডব্যাক, ওয়ারফেইজ, এলআরবি, রেনেসাঁ  ব্যান্ডগুলো খুবই ভালো করেছে এক্ষেত্রে। অন্যদের এফোর্টগুলোও অবজ্ঞা করবার নয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। এরশাদপতনের জন্যে যে-আন্দোলন হয়েছিল, সেইটার একটা ভালো ডক্যুমেন্টেশন ব্যান্ডগান থেকে বের করা সম্ভব। অন্য কোনো গান থেকে, এই বাংলাদেশে, সেই উত্তাল সময় উপজীব্য করে লেখা একটা লাইনও তো বের করা যাবে না। ব্যান্ডগানেই এসেছে সেই সময়টা, আধুনিক টিভিশিল্পীদের ভদ্রসংস্কৃত গানে এইসব জায়গা পায় নাই। এমনকি অধুনা বিকৃত প্রোমিথিউস্  ব্যান্ডের একটা অ্যালবাম পাওয়া যাবে সেইসময়টাকে নিয়ে, যেখানে নূর হোসেন নিয়া গান তো রয়েছেই, বিপ্লবের কথা-ও-সুরে ‘শাবাস নূর হোসেন’ গানটি রিলিজ পায় ৯৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে একটা অ্যালবামে; যেখানে সেই দুর্ধর্ষ গানটাও আছে এরশাদবাহিনীর গুলিতে নিহত ডাক্তার মিলনকে নিয়ে : ওগো মা তুমি কেঁদো না / মিলনের রক্তে আমি / হঠিয়েছি স্বৈরাচারী / উড়িয়েছি স্বাধীনতার পতাকা। বা নব্বই-পরবর্তী নির্বাচিত গণতান্ত্রিক গোঁজামিল ও গোয়ার্তুমি নিয়াও ব্যান্ডগান নীরব ছিল বলা যাবে না। ওয়ারফেইজ  ভালো কাজ করেছে এই ফিল্ডে। এবং ফিডব্যাক,  উল্লেখ বাহুল্য, অভাবনীয় চুড়োস্পর্শী মিউজিক্যাল প্রোটেস্ট চালায়েছে ওই-সময়টায়। এবং ওই নব্য গণতান্ত্রিকতা নিয়ে, প্রেসফ্রিডম ভায়োলেশন নিয়ে, সেইসময়কার ইয়াংজেন অ্যাঙ্গার নিয়ে ফিডব্যাক  ও তার ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ অ্যালবামটা মাইলস্টোন। পরে ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে গেলেন মাকসুদ, গড়লেন ফের ব্যান্ড-কন্সেপ্টের ভেতরে থেকে ক্যারিয়ার নতুন করে, ‘ঢাকা ও মাকসুদ’ ব্যানারে ‘(অ)প্রাপ্ত বয়স্কের জন্য নিষিদ্ধ’ গোটা বাংলা গানের ইতিহাসে একটা দুর্ধর্ষ ঘটনা। কাজেই এ-নিয়ে অন্যত্র অন্য কোনো প্রহরে গল্প শোনানো যাবে তোমাকে, এখন নয়, এখন বরং গল্পশোনা ছেড়ে গানসৃজনের চেষ্টা করো তুমি, যে-গানে এই তিমিরাভিসারী চাপাতিবাজদের দাপট ও দৌরাত্ম্য দুরীভূত হয়। এ-ই তো সময় তোমার, প্রিয় হে, সবুজ ফল, উৎপলপঙক্তির ভবিষ্যপাঠক, আমার সারা না-হলেও তোমার তো শুরু হয়ে গেছে হে!

এবং যখন বলতে শুরু করবে তুমি, প্রিয় পুত্র অতিপ্রিয় কন্যা আমার, বাংলাদেশের অভ্যুদয়োত্তর অসংখ্য অর্জনের ভেতর প্রোজ্জ্বল অর্জন ব্যান্ডসংগীত নিয়ে যখন পূর্বাপর পর্যালোচনা আরম্ভ করবে তুমি, তারিফি কিংবা খারিজি ফর্মের আলোচনা যা-ই-হোক, যার যা প্রাপ্য তারে তা দিতে কভু কার্পণ্য কোরো না। সানুপুঙ্খ বর্ণনা দিও বেছে বেছে বিস্মৃতিবিবরবাসিত বস্তু ও ব্যক্তিবর্গের। সম্ভব হলে একদম গোড়া থেকে পত্তনি কোরো কথালাপন। পপ মিউজিকের যে-একটা সানন্দ সময় গিয়েছে, সে-হোক যতই ট্রিপ্লিং লিরিক্স অথবা ড্যান্সবিটের কম্পোজিশন, হেসে উড়িয়ে দিও না। হাসাহাসি দিয়া ইতিহাস হয় না মা-জননী, রিডিকিউল করে বেশিদূর আগানো যায় না বাপ আমার, কথায় কথায় মিমিক করার আদ্দত হয়ে গেলে প্রকৃত কথাপাখিটা আর নিকটে ঘেঁষে না। রিমেম্বার যে একদিন তোমার জনকেরও শৈশবকৈশোর ছিল প্রজাপতিনৃত্যস্পন্দিত। যত হতশ্রী মিউজিকই হোক, মনে রেখো, ওইটা তোমার আজকের ম্যাচিউর মিউজিকের ডানামেলা প্রাকযৌবনকাল। বয়ঃসন্ধিকালীন দোলাচল ব্যান্ডমিউজিকের। পপমিউজিকেরও স্বর্ণোজ্জ্বল ছোট্ট একটা এপিসোড রয়েছে আমাদের, গর্বের ও আদরের, অ্যাকোমোডেইট করে নিও ওই অধ্যায়টি নির্দ্বিধচিত্ত। ওইখান থেকেই এসেছে ব্যান্ডমিউজিকের দাঁড়াবার প্রেরণাটা। জিঙ্গা শিল্পীগোষ্ঠী, ফিরোজ সাঁই, পিলু মমতাজ, নাজমা জামান, ফেরদৌস ওয়াহিদ প্রমুখ সশ্রদ্ধ মনোযোগ পায় যেন তোমার প্রণীত ইতিহাসপাতায়। এবং আজম খান। দ্য মহান। ‘উচ্চারণ’, ওঙ্কার বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতস্ফূর্ত সময়ের, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে / জন্মেছিল একটি ছেলে / মা তার কাঁদে / ছেলেটি মরে গেছে / হায় রে হায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ … কিংবা ‘আলাল আর দুলাল’ … কিংবা ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা, ওরে ফুলবানু’ — ড্রাম-গিটার-কিবোর্ডের ঝঙ্কারে বাংলার জর্জ হ্যারিসন তখন তুঙ্গ। মনে রেখো, ও আমার কন্যা, বাছা আমার, বহু ব্যান্ডের বহু সোলো আর্টিস্টের কাজ তুমি ইউটিউবে পাবে না, আর্কাইভে প্রিজার্ভড হবার মতো অত অধিক সংখ্যক অত প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী কাজও হয়তো করে যেতে পারেন নাই তাদের অনেকেই, কিন্তু প্রণিপাত করে গেছেন তারা বাংলা আধুনিক গানেরই রূপচর্যায়। শেখ ইসতিয়াক, জানে আলম, ফকির আলমগীর প্রমুখ এবং আরও অসংখ্য গায়ক-বাদক-শিল্পী বাংলা ব্যান্ডসংগীতের পপসংগীতের বাংলা আধুনিক গানের যত্নে নিজেদের সেরা সময়টি বিনিয়োগ করেছেন। ‘ব্লু বার্ডস’ নামে একটা ব্যান্ড ছিল, গোটা-দুই অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছিল নব্বইয়ের মধ্যপাদে, মেয়েদের নিরঙ্কুশ অংশগ্রহণে ব্যান্ড, সমস্ত পার্ফোর্মার সমস্ত আর্টিস্টই ছিলেন মেয়ে, এই-মতো অসংখ্য উদ্যোগের হদিশ তোমাকে বের করতে হবে বিস্মৃতিবিবর খুঁড়ে। একটু শ্রম, অন্তরেচ্ছা খানিকটা, তোমাকে তো লগ্নি করতেই হবে এ-কাজে। কেবল সম্মার্জনী রিমার্কে, কেবল স্যুইপিং কমেন্টে, কেবল আখাম্বা আল-টপ্কানো মন্তব্যে বয়ে যেতে দিও না হে নিজেরে!

হ্যাপি আখান্দ পপ মিউজিকের অসম্ভব জনপ্রিয় আর্টিস্টদের মধ্যে একজন ছিলেন অকালে অন্তর্হিত হবার আগ পর্যন্ত। সম্ভবত আজও এই শিল্পীর অভাব ও আবেদন অস্বীকার করে না গানপ্রিয় মানুষেরা। আধুনিক বাংলা গানে এই এক শিল্পী মেলোডি দিয়ে ভেজাতে এসেছিলেন শহরের পিচঢালা রাস্তা থেকে শুরু করে মেঠো গ্রামপথ। একটা গানের গোধূলিমদির সুরাচ্ছন্ন বর্ণিলতা আবহমানের মতোই মনে হয় আমাদের কানে, এর তুল্য উদাহরণ গোটা বাংলা গানের গল্পগুচ্ছে একটাই, এবং সেইটা মান্না দে-র ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটা। হ্যাপির এভার্গ্রিন গানটার লিরিক্স সুরসমেত মনে পড়বে যে-কোনো অ্যালজেইম্যার প্যাশেন্টেরও, পয়লা লাইনটাই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে কাফি নিশ্চয়, দুই-তিনটা লাইন মুখপাতে এমন : ‘আবার এল-যে সন্ধ্যা / শুধু দু-জনে / চলো-না ঘুরে আসি / অজানাতে / যেখানে নদী এসে / মিশে গেছে।’ হ্যাপি ঠিক ব্যান্ড না-করলেও বাংলাদেশের ব্যান্ডরেনেসাঁর দিনগুলোতে এঁর ভূমিকা ও অবদান সর্বজনস্মরণীয়। মনে পড়ে, হ্যাপি অন্তর্ধানের পর ফিডব্যাক  অসাধারণ একটি ট্রিবিউট-স্যং করেছিল, সর্বকালের সর্বদেশের সর্বভাষার শ্রদ্ধাজ্ঞাপক গানগুলোর মধ্যে সেই ‘পালকি-১’ শিরোনামের গানটা প্রায়োরিটি সিলেকশন গণ্য হবে, গেয়েছিলেন মাকসুদ ক্রোধকান্না উজাড় করে এই গানটা : ‘তাকে বলে দাও / সেই মণিহার আজও খুলিনি / তাকে বলে দাও / তারই বিরহে কত বেদনা / সেই যাওয়া যে শেষ যাওয়া ছিল বুঝতে পারিনি / সে যে যায় / পালকি যায় / শুনি হুহুম্না / সে যে যায় হ্যাপি যায় / বহু দূরে’ — এই-রকমটাই ছিল হ্যাপিকে ডেডিকেইটেড সেই ট্রিবিউটগানটা। মাকসুদ গেয়েছিলেন ত্রিভুবন উথালিপাথালি ভীষণ অতিজাগতিক চিৎকারে চিরে দিয়ে আকাশ-বাতাস-জল-ও-বনস্থল। ওই টোন কলকাতা পাবে কই, কীভাবে এই টোন স্বপ্নের ভেতরে কল্পনাতেও শুনতে পারবে পশ্চিমবঙ্গ, কবীর সুমন এই টোনের মাহাত্ম্য ও মাজেজা কেমন করিয়া হৃদয়ঙ্গমিবেন! তো, বাংলা ব্যান্ডগানের ইতিবৃত্তে হ্যাপি যেমন অবশ্যস্মরণীয়, তেমনি হ্যাপির সহোদর এ-দেশের পোস্ট-ইন্ডিপেন্ডেন্স নবসৃজিত বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদায়ক অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মিস্ত্রী ও শিল্পী লাকি আখান্দ। ‘হ্যাপিটাচ’ লাকির ব্যান্ড, ‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না / ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না’ — এইটিফাইভের দিকে বেরোনো অত্যন্ত সমাদৃত একটা গান, সুরটা যদিও সত্তর দশকের দুনিয়াখ্যাত ফ্রেঞ্চ-ইউরো ডিস্কো গ্রুপ বিম্বো জেট-এর অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘এল বিম্বো’ থেকে হুবহু কপি করে নেয়া। লাকি ‘নীল মণিহার’ সহ অনেক গানের মিউজিক-ও-সুরপ্রণেতা। আধুনিক বাংলা গানে মেধাবী কম্পোজারদের মধ্যে একজন ইনি। বাংলা ব্যান্ডমিউজিকের ডেভেল্যপমেন্টে এই মিউজিশিয়্যানও অম্লান।

এই-যে এখন শুনছ তুমি তোমার জন্মপূর্বাব্দের গান, এটা জানতে পেরে এত ইমোশোন্যাল হয়ে এই নিবন্ধ ফেঁদে বসবার নানা কারণ রয়েছে। এর একটা কারণ হলো, শুনছ যে-গানগুলো তুমি, ডিফ্রেন্ট টাচের, সেগুলোর জন্ম হয়েছিল আমাকেই প্রেমে ফেলার জন্য, পতন থেকে বাঁচানোর জন্য, অমল-ধবল জীবন ও জয়শ্রী রাধিকাদের দর্শনদারি আরেকটু উন্নততর উপায়ে করার জন্য। তুমি যদি এখন গানগুলো শুনতে শুরু করো, আমার অভিমান ও বেদনাবয়সের গানগুলো, এবং সেগুলো তুমি যদি ক্রিটিক্যালি দেখেটেখে ধরো দুই-তিনটা গানও তোমার সংগ্রহে রেখে বাকিগুলো ছুঁড়িয়া দাও ফেলে, সেই ছুঁড়ে-ফেলাটাও হবে এই গানগুলোর জীবনের সেরা পাওয়া। কারণ সকলেই স্বীকৃতি চায়, জীবনে, চরিতার্থতা চায়। এই গানগুলো তো প্রতীক্ষায় ছিল তোমার, এতদিন। প্রতীক্ষায় ছিলাম আমি, দীর্ঘকাল, তোমার জন্যে, হে আমার বনবৃক্ষের অচেনা রাগিণী হাওয়া! আমরা তো ছিলাম এইসব গানের ক্রীড়নক, আমাদেরকে সাপ-খেলানো খেলিয়ে ছেড়েছে এরা, আমাদেরকে মেরে-ধরে এক্কেরে কাঞ্জিমৃত করে রেখেছিল এইসব গানেরা। আমাদেরকে দেখেই তো এইসব গানের জন্ম ও বিকাশ, আমরাও তেমনি এইসব গানের মন ও শরীর মাগতে মাগতে বড় হয়েছি। ফলে এদের সঙ্গে এত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলাম ও রয়েছি যে, এগুলো ল্যুকব্যাক করার মতো ক্রিটিকচোখ আমার নেই। নিজের সময়ের মধু, বিষ, ময়দা-আটাও আমার কাছে মহার্ঘ্য। তুমি, তোমরা, তাই ঠিকঠিক বলতে পারবে কেমন ছিল আমাদের সময়, কেমন পারিজাত অথবা ফুটো-পয়সা এই গানগুলো। তোমার প্রত্যাখ্যানই হবে এগুলোর, এই গানের, এই গরিলার ন্যায় আমার আজকের নিঃসুর-অথচ-সুরলোভাতুর জীবনের, শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ও যাবতীয় বক্ষবেদনার উপশম এবং সত্যিকার-অর্থে ফাইজলামির বাইরে যেয়ে একটাকিছু গভীর গরিমার অর্থে পাওয়া। তোমার প্রত্যাখ্যানের আশায় বেঁচে আছি, বসে আছি, হে আমার পোড়োবাড়ির চণ্ডাল পুত্র, ও আমার স্বপ্নে-পাওয়া চণ্ডালিনী কন্যা!

আরেকটা ব্যাপার। গপ্পো না-ফেঁদে সংক্ষেপে সারি। কতই-না লাঞ্ছিত ও প্রহৃত হতে হয়েছে এইসব গান শোনার অপরাধে একদিন আমাদেরকে! একদিন, হায়, সেই কবেকার কোন-সুদূরের একদিন! নিপীড়ক ছিলেন আমাদেরই পিতা-পিতৃব্য মুরুব্বিরা। তাদের প্রধান অভিযোগ ও আপত্তি ছিল এ-ই যে এইসব গান হলো ছাগলের গান! তাদের বিচারে হেমন্ত-ভূপেন-মান্নারাই মিউজিশিয়্যান, কবীর সুমনের জন্ম তখনও হয় নাই বলে বাঁচোয়া, তা হলে এখনকার মুরুব্বিদের মতো তখনকার মুরুব্বিরাও সবই অস্বীকার করতেন শুধু তাদের বড় সাধের কবীর সুমন ছাড়া, ব্যান্ডগান পাগলের প্রলাপ ইত্যাদি কথাবার্তা যারা রাতদিন বলতেন তাদেরেই আমরা জানতাম মুরুব্বি। কিন্তু মুরুব্বিরাও তো ভুল করেন, প্রমাণিত হলো। সত্যি বলতে কি, ইনডিড, মুরুব্বিরাই ভুল করেন, তরুণেরা ফুল ফোটায় সবসময়। এই কথাটাও মনে হলো তোমার ‘ডিফ্রেন্ট টাচ’ শ্রবণের খবর জেনে। এত বছরের পরে, এক নয় দুই নয় তিরিশ-পঁচিশ বছর বাদেও যখন দেখি আমাদের সময়ের গান শুনছে এই সময়ের তোমার মতো কেউ, নিজের সময় নিয়ে সুখ বোধ করি। পৃথিবীটা খারাপ ততটা নয় যতটা চারপাশে বলে বেড়ানো হয়, বেশ তো সুখের, তাই না? আর, মনে করে দ্যাখো, কয়েক বছর আগে টেলিভিশনচ্যানেলগুলোতে একের-পর-এক দন্তমাজন-গন্ধসাবান-শ্যাম্পুকোম্প্যানির স্পন্সর্শিপে ট্যালেন্ট-হান্ট প্রোগ্র্যামের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। মন্দের ভালো তখন একটা ব্যাপার প্রমাণ হয়েছিল এ-ই যে আমাদের কালের ব্যান্ডগুলো তথা ব্যান্ডগানগুলো মহাকালজয়ী হবার সম্ভাবনা (দুর্মুখেরা সম্ভাবনা   শব্দটার পরিবর্ত আশঙ্কা   পঠিবেন) বা সামর্থ্য অল্প হলেও ধরে ভেতরে-ভেতরে। কেমন করে? হ্যাঁ, বেশি সময় না-নিয়ে, এইটা খানিক বুঝাইয়া বলা অত শক্ত হবে না। মাইলস্-সোলস্-ফিডব্যাক-রেনেসাঁ-এলআরবি-ফিলিংস্-উইনিং-ওয়ারফেইজ-নগরবাউল-দলছুট প্রভৃতি ব্যান্ডের যে-কয়টা গান ওই-সমস্ত তরুণ ছেলেমেয়ে গেয়েছিল, অনুষ্ঠানের শর্তারোপিত ছক না-থাকলে এরা ব্যান্ডগানগুলোই একচেটিয়া গাইত বলিয়া আন্দাজ করি, ময়মুরুব্বিরাও ছন্দে-তালে দুলিয়াছিলেন লক্ষ করেছি, স্পৃষ্ট হয়েছেন নরনারী নির্বিশেষে সর্ববয়সশ্রেণির সবোধ-অবোধ শ্রোতৃবর্গ। সোলসের ‘কেন এই নিঃসঙ্গতা’, রেনেসাঁর ‘ভালো লাগে জোছনারাতে’, একই ব্যান্ডের ‘তুমি কি আজ বন্ধু যাবে আমার সাথে’, ফিডব্যাকের ‘মৌসুমী’ ও ‘জীবনজ্বালা’, দলছুটের ‘তুমি আমার বায়ান্ন তাস’ কিংবা ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’ প্রভৃতি গান নবপ্রজন্ম শ্রোতাশিল্পীগোষ্ঠীর কাছে মান্যতা পেয়েছে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে। এছাড়াও সঞ্জীব-বাপ্পা-পার্থ প্রমুখের সোলো অ্যালবামের গানও ওইসব প্রতিভামৃগয়ায় গেয়েছে ছেলেমেয়েরা, মাতায়েছে ছ্যা-ছ্যা-ধুর-ধুর তুচ্ছতাচ্ছিল্যশব্দে লাইফ-কাটানো বুড়াহাবড়াদেরেও। ওইসব গানের কোনোটা বাইশ-পঁচিশ অথবা তারও বেশি বছর পূর্বেকার, সর্বনিম্ন বয়সদূরত্বের গানটাও দশবছর-পুরনো! তো, কথাটা তাহলে এ-ই যে, গ্রহিষ্ণু হইতে না-পারলে এই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে অনাগত সমস্ত কালের কুতুব মুরুব্বিদিগেরেও। দুইযুগ পর্যন্ত একটা গান টিকিয়া যাইতে পারলেও-বা চাট্টেখানি কম কথা কি? বিলকুল না, বিলিভ ইট, মোটেও না। আমাদের গার্জিয়্যানতুল্য সমাজের লোকজন যদি কিছুটা লার্ন করে এই চিত্র দেখে।

এখন, কথা হলো, রূপকথা বলতে লেগে একটু কি ক্রিটিসাইজ করা যাবে না? বারণ তো নাই কোথাও, তবে একটু অপ্রাসঙ্গিকও ঠেকতে পারে বটে। একটুখানি নিগ্যাটিভ সাইড বলি তবে। একটা নমুনা হাতে নিয়ে কথা বলি। নীল জোছনা … নীল বেদনা … নীল কষ্ট … নীল শাড়ি — ইত্যাদি জিনিশপত্রে ব্যান্ডগান ঠাসা। বাত আদৌ অসত্য নয় বটে। এইটা ব্যামো বটে একটা, বাংলা গানে, ব্যান্ডগানে এইটা খেয়াল করে গেছি দীর্ঘদিন, এখনও বহাল কি না বা কতটুকু বহাল ফলো-আপ রাখা যায় নাই একটা সময়ের পরে থেকে। এখনকার ব্যান্ডগুলোর কাজ ওইভাবে দেখে যাবার সুযোগ তো আমার আর হয় না। মা রে, মেরি পুত্তার, বুড্ডা হো-গিয়া তেরি বাপ। তো, হোক-না তা যা-ই। বিচ্ছিন্নভাবে একটা-দুইটা ইতিউতি মওকা পেলে শোনা হয় অবশ্য কালেভদ্রে। ব্যান্ড নয়, এখন বরং সোলো পার্ফোর্ম্যান্সের ট্রেন্ড ও টেন্ডেন্সি বিরাজিছে বলেই মনে হয়েছে। কেউ কেউ ওয়ান্ডার্ফুলি ভালোও করছেন। কিন্তু ক্রনিক ব্যামোটা আগের মতোই ইরিটেইটিং রইলে তো মুশকিল আসানের আশা বিশেষ দেখি না। আগের মতোই কি না, তা তো বলতে পারব না, আর কি আসে যায় আগের মতো হলেই-বা! ব্যান্ডগানের লিরিক্স অনেক লিমিটেশন সত্ত্বেও গ্রহণীয় আমার কাছে, সেইটা নানা গ্রাউন্ড থেকে একপ্রকার সিদ্ধও করে নিতে পারি আমরা, কিন্তু কয়েকটা দৌর্বল্য অসহনীয়। এর মধ্যে একটা ব্যারাম এই নীলডিজিজ। ব্যান্ড ও ব্যান্ডের বাইরে বাংলাদেশী যাবতীয় গানে এই নীল কালারের অত্যাচার। বাংলাদেশের গানে দিন-রাত্রি-দুঃখ-রমণ-রৌদ্র-জ্যোৎস্না-ভালোবাসা-বিরহ-বেদনা-বাচালতা-বাঁশী নীলে নীলে সয়লাব। ধুলায় অন্ধকারের ন্যায় নীলে নীলান্ধ। তুমি নীলান্ধকারও বলতে পারো। অভিযোগ সর্বৈব সত্য। অন্য কোনো বর্ণ বাংলাদেশের বাংলা গানে, ব্যান্ড-ননব্যান্ড নির্বিশেষে, তেমন-একটা নাই। বিশেষণের দরকার পড়ল? — তো কুচ চিন্তা নাহি, নীল তো রয়েছে! এইটা গাদ্দাফির আমল থেকে চলছে, এখনও চলতে থাকাটা সাংঘাতিক শক্তির ব্যাপার বটে! একসময় এই-রকম আরও কয়েকটা ব্যাপার ছিল, একেকটা ফেইজ গিয়েছে একেকটা শব্দের হুজুগে মেতে। যেমন কয়েকটা, এক্সাম্পল দিতে যেয়ে, বলি : বিবাগী, ফেরারী, পাষাণী, উদাসী ইত্যাদি। বাংলা ব্যান্ডগানের সব মনই উদাসী, প্রেমিক মাত্রই বিবাগী, প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক যিনি কিনা কামিয়াবি হাসিলে ব্যর্থ ও ভগ্নমন তিনি অবধারিতভাবে ফেরারী, প্রেমিকা মাত্রই পাষাণী কিংবা ছলনাময়ী ইত্যাদি। ইয়া মহামারী! কিন্তু ওই সময়েই, ব্যান্ডগানের ওই স্বর্ণপর্বে, কিছু কিছু ব্যান্ড খুব সচেতন ছিল মনে হয় বিশেষণ ও সম্বোধন প্রয়োগের ক্ষেত্রে। জেমস/ফিলিংস  তো বটেই, ফিডব্যাক /মাকসুদ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এক্ষেত্রে, রেনেসাঁও। তবে নীল দিয়া ভালো কিছু গানও রাঙানো হয়েছে অবশ্য। ব্যান্ডগানের নীল আদৌ সমস্যা মনে হতো না যদি নীলরঙটা ঠিকঠাক ফুটে উঠত, ফুটিয়া ওঠে নাই বলেই বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হয়ে গিয়েছে, শুধুই একটা শব্দ হিশেবে তরকারির সুরুয়ায় আলুর মতন ভেসে থেকেছে নীল তথা যাবতীয় কমন শব্দপ্রয়োগগুলো। যদি হিট নাম্বারগুলোর উরাধুরা অনুকারকীর্তনে মেতে না-থেকে আক্কেল খাটাবার কোশেশ করতেন গাইয়ে-বাজিয়েরা, তাইলে হেন দুর্দশা হইত না বলিয়াই মনে হয়। অন্তত নীলশোভিত কিছু সুন্দর গান আমাদিগের মেমোরিতে অম্লান রইত। অনেক সুন্দর-সুন্দর বেশকিছু গান আমরা ওই নীলহুজুগে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এখন আর গাই না। এর ফলে বেশকিছু, সংখ্যায় যেমনই হোক তারা, ভালো গানের প্রতি ইনজাস্টিস্ হচ্ছে হয়তো। নীল মণিহার, নীল নয়না, নীল আঁচল, নীল শাড়ি, নীল বসন, নীল জোছনা, নীলাঞ্জনা প্রভৃতি শিরোনামে একটা করে ভালো গান বাংলা ব্যান্ডযুগে তথা গত শতকভুক্ত নব্বইয়ের দশকে হয়েছে বটে, এরপর হয়েছে এন্তার চর্বিতচর্বণ তথা ট্র্যাশ, ফলে আমরা আগ্রহ হারায়েছি নীলের ওপর থেকে, বলা বাহূল্য। মূলধারা বাজারের অন্তর্ভুক্ত নতুন দিনের শিরোনামহীন   বা মেঘদল  বা নেমেসিস  বা কৃষ্ণকলি এবং আলাদাভাবে উল্লেখ্য অর্ণব এইধারা শব্দচৈতন্যের রোগে গানবাজনাকে পর্যুদস্ত করে তোলেন কি না, বিশেষণ-সম্বোধনের বদখত বহুব্যবহারে জীর্ণ করে তোলেন কি না তাদের গানাবাজানা, আমি ঠিক অতটা নজর করে দেখি নাই। কিন্তু মনে হয়েছে এরা বেশ-একটা আলাদা গানের ল্যাঙ্গুয়েজ আনতে চেয়েছেন বা চাইছেন। কন্টিন্যুয়েশন রাখতে পেরেছেন কি না আই ডিডন্ট ফলো দেম আপ। কয়েক বছর আগে একজোড়া অ্যালবাম শুনেছিলাম অর্ণবের আয়োজনে, ঝালমুড়ি  ও , সেইখানে একডজনের মতো নতুন গাইয়ের লিরিকে খেয়াল করেছিলাম নতুন আবহ নির্মাণের একটা এফোর্ট। ওই জোড়া-অ্যালবামের কয়েকটা ভালো লিরিক্সের ভেতর একটা একদম গেঁথে আছে মেমোরিস্টিকে : ‘দালান বেয়ে জড়িয়ে উঠে লতা তরতরিয়ে ঢাকলো আকাশ-আলো / ঘুমের মধ্যে বনের গন্ধ পেলেম এখন আমার ঘুমিয়ে থাকাই ভালো’ — এ-ই ছিল শুরুটা গানের। সম্প্রতি শুনছি যে নজরুলযুগের পরে ফের কবিরা নাকি গানের লিরিক্স লিখছেন আলাদা ফর্ম হিশেবে কবিতার বাইরে, এইটা ভালো প্রবণতা বাংলাগানের জন্য, একইসঙ্গে কবিতার জন্য এইটা বিপদের কি না তা ভাববার অবকাশ দরকার। কাজেই বিপদ কাটবে, ফেরারী-বিবাগীর ন্যায় নীলের আপদ একসময় নিশ্চয় দূর হবে, এখন কবি ও মিউজিশিয়্যান যেহেতু একই জায়গায় আড্ডা দিচ্ছেন একসঙ্গে হাঁটছেন অতএব এমনটা আশা স্রেফ বদমায়েশী আশা না, নতুন বিপদ নতুন আপদ আসবে এবং সেইটা ইমিডিয়েটলি নোটিস্ করে জনসমক্ষে আনবার একটা চ্যানেল রেগ্যুলারাইজড থাকা চাই। অ্যানিওয়ে।

এই দিকগুলি নিয়া কাজকর্ম হওয়া আবশ্যক মনে করি। বিশেষত বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে সবকিছু মিলিয়েজুলিয়ে এমন কতিপয় ইউনিক ব্যাপার সংঘটিত হয়েছে, যেমন অভ্যস্ত গীতসৃজনের বাইরে যেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন সিন্ট্যাক্সিং, সম্বোধন ও বিশেষণ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অজস্র বোকাহাবা আচরণের পরেও উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কাজে হৃদি-ঝিল্কানো অনন্য রচনাদৃষ্টান্ত, সর্বোপরি বাংলাদেশের টোট্যাল ব্যান্ডগানে আবহমান বাংলা গানের অন্ত্যমিলাভ্যাসের বাইরে বেরিয়ে এসে অমিলান্তক ও অমিত্রাক্ষর গদ্যস্পন্দের ব্যবহারজনিত স্পর্ধা এবং সাফল্য, এই সমস্তকিছু নিয়া আলাপ তোলা দরকার, কুর্নিশ করা দরকার আমাদের পথিকৃৎ ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানদেরে। এমনও দেখা যাবে যে, এমনকি কবীর সুমনও অন্ত্যমিলাভ্যাস থেকে একটাবারের জন্যও বেরিয়ে আসতে পারেন নাই, তিনি নিশ্চয় ভাবতেও পারেন নাই যে হাজার বছরের গীতরচনার অন্ত্যমিলাত্মক টেন্ডেন্সি থেকে বেরিয়েও সম্ভব বাংলা গানসৃজন! যদিও কবীর সুমন শুরুর আগেই বাংলাদেশের ব্যান্ডগানের ব্রেইকাউট মাইলস্টোনগুলো ময়দানে হাজির হয়ে গিয়েছে। এইসব কথাবার্তা শুরু হলে পরে দেখা যাবে এখানকার ব্যান্ডগান অনেকানেক দুষ্কৃতির পরেও অনেককিছুতে ট্রেন্ডসেটারই ছিল। পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিশিল্পী কয়েকজন আমাদের কাছে নমস্য হলেও ব্যান্ড হিশেবে এক মহীনের ঘোড়াগুলি  ছাড়া আর-একটাও ধর্তব্য নয়। চন্দ্রবিন্দু  নিঃসন্দেহে মেধাদীপ্ত ব্যান্ড, কিন্তু ওই অন্ত্যমিল আর ছড়াগানের মাধ্যমে স্যাটায়ার ছাড়া মালসামান কই যা দিয়া তারে আলাদা অবলোকনের কেন্দ্রে নেয়া যায়? শেষমেশ অনেক ভালো গানেও চন্দ্রবিন্দু  প্যারোডি-ব্যাধিদুষ্ট। রইল বাকি রূপম ইসলাম। দেখবেন যে রূপমের গানে সেই ব্যঙ্গ ঘুরিয়াফিরিয়া যা কিনা নচিকেতাস্টাইলের, সেই আদ্দিকালিক রদ্দি অন্ত্যমিল, সেই কবীর সুমনের আদলতাড়িত সমাজচেতনা, আর রূপমের গানে ও গলায় ব্যক্তিত্ব পাবেন না আপনি, যদিও গলায় স্ট্রেন্থ অনেক, শুনতে যেয়ে মনে হয় যেন শুনছি এইটিজের ফিল্মি ক্যাবারে-ড্যান্সমিউজিক অথবা হালের আইটেম গানার কোনো মিউজিক সিক্যুয়েন্স। অনুপম রায়? লিরিক্স কয়েকটা খারাপ লেখেন নাই তিনি, সদ্যতন এই শিল্পী একজন নিয়মিত অনুশীলন-চালানো কবি ছিলেন কৌরব  গ্রুপে এ-কথাটা মনে রাখি, কিন্তু ওই অন্ত্যমিলমর্মরিত রোম্যান্তিক গীতিকাই তো শেষ-পর্যন্ত। মন্দ না। আমাদের ফিলিংস /নগরবাউলওয়ারফেইজফিডব্যাক   কিংবা পরবর্তী পর্যায়ের  আর্টসেলশিরোনামহীন  প্রভৃতির সঙ্গে তুলনীয় একটা ব্যান্ডও কি দেখেছি আমরা ওইদিকে? এবং আমাদের সর্বসাম্প্রতিক অর্ণবের সঙ্গে তুলনীয় মিউজিশিয়্যান? কবীর সুমন ও অঞ্জন দত্ত প্রমুখ কয়েকজন মুরুব্বি হিশেবে টেনে আনার ব্যাপারটা বাতিক ভেবে এবার থেকে একটু ভুলিয়া যাইলেই ভালো। নব্বইয়ের দশকে যে-তুঙ্গস্পর্শী ব্যান্ডমিউজিক বাংলাদেশ দেখিয়েছে, এর বিলয়ও ওই দশকের প্রান্তভাগে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন বাংলাগানের ভোর শুরু হয়েছে সুমনের গিটারবাহিত হয়ে সেই সন্ধিক্ষণেই। এইসব হিসাবকিতাব মেলানো দরকার মনে হয়। কেউই দেখি বিপুল সৃজনোল্লাসমুখরিত আমাদের ব্যান্ডগান নিয়া কথা বলে না, খালি সুমন-অঞ্জন-চন্দ্রবিন্দু জপনাম করে বেড়ায়, এমনকি ক্যাকটাস-পরশপাথর-ফসিলস্ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যরহিত ব্যান্ডেরও উল্লেখ করতে দেখি স্মিতপণ্ডিতমুখে কাউকে কাউকে, সেই গোত্রে এই নিবন্ধকারও পড়ে বটে। হেন গুনেগারি থেকে বেরোনোর সময় হয়েছে এবেলা সন্তানসন্ততিদের সম্মানপ্রশ্নের খাতিরে। একই মিথ মুখস্থ করা, স্ট্যাটাস্-ক্যু, কদ্দিন চলতে পারে এভাবে! এই নীরবতা ভাঙা আশু দরকার আমাদের নিজেদেরই বিকাশের স্বার্থে, এপার-ওপার দুইপার এবং দুনিয়ার সর্বপারাপারের বাংলা গানের দিশার স্বার্থে, একচেটিয়া খণ্ডিত সত্য তথা সাব্লাইম মিথ্যের মণ্ড প্রচারণা রোখার স্বার্থে। বাংলাগানের, বাংলাদেশের ব্যান্ডের, বাংলাদেশের ও বাংলাদেশের বাইরের বাংলা গানের, একটা ব্রেকথ্রু আসুক এইটা কায়মনোবাক্যে চাই। স্থিতাবস্থা কাটুক বাংলা গানের, বাংলা কথার, বাংলা সুরের, বাংলা কবিতার।

নীল নিয়া আখাম্বা রিডিকিউল করার পাশাপাশি এইটাও কবুল করা কর্তব্য হয় যে এন্তার ভালো গান হয়েছে এই ও অন্যান্য প্রোক্ত অ্যালার্জি বিশেষণশব্দ জুড়িয়া দিয়া। ‘রাতঘুম নেই আমার চোখে / আছি জেগে এই চন্দ্রালোকে / নীল জোছনায় / তুমি কোথায় … নীল বেদনা / ঘিরে রয়েছে আমায় / বোবা অশ্রুতে ভোঁতা হয়ে যায় চেতনা’ — এই গানটার কথা ভাবা যাইতে পারে। হ্যাঁ, এইটা ভালো কম্পোজিশন, আইয়ুব বাচ্চুর গুটিকয় সুকৃতির মধ্যে একটি হিশেবে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু ওই যে, এই নিবন্ধের প্রক্ষিপ্তপ্রায় প্রোক্ত প্যারাগ্রাফে যে-প্রোব্লেমটা নিয়া আলাপ হচ্ছিল, সেইটার উপাদানগুলোর প্রতুলতা থাকায় এইটার কথা আগের অনুচ্ছেদটায় বলা হয় নাই, বলতে ইয়াদ হয় নাই। কিন্তু ভালো গান এইটা, আমার মতে, অনেক গেয়েছি এককালে এবং এখনও মনে পড়ে এইটে। অ্যানিওয়ে। এখানে একটি জিনিশ আমার কাছে বেশি গুরুত্ববহ, পরে কখনো তুমি নিজে এই দিকটি নিয়া ভাবতে পারো। অন্ত্যমিলাভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা নেসেসারি কি না, এই প্রশ্নে একটু অ্যানালিটিক্যাল অ্যান্সার নেসেসারিলিই অভিপ্রেত। যদিও এখন অবকাশ থাকলেও ওই অ্যানালিসিস এখানে হাজির করছি না বা পারছি না করতে, অন্যত্র কখনো নিশ্চয় করে উঠতে পারব আমরা বাপ-পুত্তার মিলিয়া। খালি এইটুকু বলি যে, অন্ত্যমিল একটা শাসনপ্রণালি, অন্ত্যমিলের অনুশাসনে বাংলা গান গোড়া থেকে চূড়া অব্দি মোড়া, এহেন প্রথানুবর্তিত অন্ত্যমিলানুশাসন থেকে বাংলা গান একবার বেরিয়েছিল এবং উদাহরণীয়ভাবে সাক্সেসও দেখিয়েছিল, সেইটা ওই সময়ের বাংলাদেশের ব্যান্ডগান। অথচ বাংলা কবিতা অনেক আগে থেকেই অন্ত্যমিল-অধীনতা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং এর ফল নগদে ভোগ করেছি ও করে চলেছি আজও। অন্ত্যমিলাধীনতা কবিতাকে/গানকে ডানা মেলতে দেয় না, খানিকটা নয় বলা উচিত অধিকাংশটা আপোস করতে হয় ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে কথাবয়নকৌশলের কনভেনশন মান্য করতে যেয়ে। এইটা হাতের পাঁচ হিশেবে কবি/গীতিকারের করায়ত্ত থাকবে নিশ্চয়, কেবল এইটি নির্ভর হয়ে গেলেই বন্ধ্যা। এহেন প্রথা মানবার জায়গা থেকে যেদিন বাংলা কবিতা বেরিয়েছে, সেদিনই বস্তুত কবিতার নতুনতর মহাসাগরদেশাকাশগুলো এক্সপ্লোর করার সম্ভাবনা আমাদের হাতে এসেছে। এবং খোদ প্রথানুশীলিত ছন্দের/অন্ত্যমিলেরও ফ্যুল-পোটেনশিয়্যাল পেতে গেলে, ছন্দের উজ্জ্বল উদ্ধার দেখতে চাইলে, ছন্দোমুখাপেক্ষা কমানো দরকারি, অন্ত্যমিলনির্ভরতা তো অবশ্যই পরিত্যাজ্য। এইগুলো যেমন টেক্সট্যুয়্যাল রিলিফ আনে, তেমনি রিজিডিটিও তৈয়ার করে। একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার যে দীর্ঘদিনের আচরিত অভ্যাস থেকে বেরোনোর অর্থই প্রথমত মুক্তি, এবং মুক্তি মানেই তো নতুন দিগন্তোদ্ভাস, নিউ হোপ এবং হরাইজন। এইটা বাংলাদেশের ব্যান্ডগান দেখিয়েছিল বলেই মনে হয় আমার। বয়স যত বাড়ছে, তত আরও বেশি করে মনে হচ্ছে এই কথাগুলো। বড় দীর্ঘকাল আমরা কলকাতাকীর্তনে কাটায়েছি, নিজেদের আলোবাতাসগুলোর প্রশংসা না-করে মুখিয়ে থেকেছি ভিনদেশী মৌসুমবায়ুর পানে। হে ব্রুটাস, এ বড্ড পাপ হে! এখন কেউ একজন নিশ্চয় সেই আমাদের ব্যান্ডগানে অনুশীলিত অপরূপ অপসংস্কৃতির অবদান তুল্যমূল্যাঙ্কন সহ হাজির করবেন এই দোয়া করব।

‘অপরূপ অপসংস্কৃতি’ কয়েনেইজ করেছিলেন ফিডব্যাকের মাকসুদ, সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি বাংলা গানে শুরুর দিককার কলকাতাগ্রাসন নিয়া, আমাদের নিজেদের জিনিশগুলোকে খারাপ সাব্যস্তপূর্বক কলকাতার মালসামানকে মহাভালো আখ্যা দেবার মাইন্ডসেট নিয়া, আমাদের নাক কেটে বেচে দিয়ে নোলক খরিদের হিড়িক নিয়া, মাকসুদ অনেকদিন একটানা লিখেছেন এতদবিষয়ক কলাম ‘চলতিপত্র’-‘আনন্দভুবন’-‘প্রতিচিত্র’ ইত্যাদি সাময়িকপত্রে, পরে এইসবের কয়েকটা একত্র করে ‘আমি বাংলাদেশের দালাল বলছি’ শিরোনামে একটা বইও হয়েছিল দশককাল আগে, এর বর্ধিত কন্টেন্ট-কলেবর পুনর্প্রকাশও হয়েছে বেশ কয়েকবছর হলো, অ্যানিওয়ে। একটা-কোনো বছরের ঈদসংখ্যা আনন্দভুবন-এ বেরিয়েছিল মাকসুদুল হকের ‘এই আমাদের অপরূপ অপসংস্কৃতি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ রচনা, আজও জ্বলজ্বল করছে সেই রচনাপাঠের স্মৃতিবিমুগ্ধতা। ব্যান্ডগানকে তখন মুরুব্বিরা সব্বাই সমস্বরে ‘অপসংস্কৃতি’ বলত, এমনকি মিডিয়াবাজ শাস্ত্রপোকা মাকালেরাও, যদি জানতেই চাও। ছোট্ট করে বলি এখানে, দেখবে যে কবীর সুমন কথায়বার্তায় বাংলাগানের নতুন প্যারাডাইম নিয়ে বলতে যেয়ে কেবল তার নিজের গান ও নিজের নগরের দু-আধজনের নামোল্লেখ করেন। সুমনজি বাংলা গানে অতুলনীয় অবদান রেখেছেন কথাটা তো অনস্বীকার্য। নতুন বাংলা গানের ভোর এনেছেন কবীর সুমন, অতিরঞ্জন নয় একবর্ণও। তবে এই সমস্ত সত্যালাপের শেষে এখন আমার মনে হয় যে ব্যান্ডগান দিয়া বাংলায় গীতিসৃজন ও সংগীতায়োজনের ক্ষেত্রে যে-ব্যাপক কাজ হয়েছিল তা আগাগোড়া অভূতপূর্ব। মনে হয় যে এই দিকটা আমরা অবহেলে গেছি দীর্ঘকাল। কবীর সুমন ও কলকাতা কোম্প্যানি বাংলা গানে যে-ধারা গড়েছেন, সেই ধারার শীর্ষদেশ তো আমাদের ইতোমধ্যে দেখা সারা। আজকাল লক্ষ করে দেখবা তুমি যে এই ওয়েস্টবেঙ্গলীয়/কলকাতার অধুনা বাংলাগানে সুমনপন্থার চর্বিতচর্বণ হয়ে চলেছে বহুলভাবে এবং অবভিয়াসলি পীড়াদায়ক গোটা ব্যাপারটা। আর এক-দুই তো নয়, একাধারে অসংখ্য গানবাজনাকার সম্মিলিতভাবে সুমনের অনুসৃতি ঘটিয়েছেন এবং ঘটিয়ে চলেছেন। ওখানকার কবিতায় যেমন জয় গোস্বামীর ছায়ানুকারেরা প্রাইজ পেয়েটেয়ে কোনোমতে কায়ক্লেশে কবিতানুশীলনটা চালু রাখিয়া যাইছে। একটু বেশিই জেনারালাইজ করা হয়ে যাচ্ছে হয়তো। বলা বাহুল্য, সুমন একলাই নিজের প্রবর্তনাটাকে একদম পূর্ণ বিকশিত ও এতটাই ফুল্লপল্লবিত করে তুলেছেন যে সেখানে অমুক-তমুকের নিজের শিল্পীক্যারিয়ার গড়া ছাড়া বাংলা গানে তেমন কোনো নতুন সংযোজনের সুযোগ ছিলও না। এইসব বিবেচনা মাথায় রেখে যদি ভাবনাভাবনি চালানো যায় তো দেখা যাবে যে বাংলাদেশের ব্যান্ডগান অনেক নতুনের ইশারা-নিশানা সামনে এনেও কল্কে সেই-অর্থে পায় নাই স্রেফ আমাদের মাইন্ডসেটের কারণে। ব্যাপারটা মাঝপথে থেমে গেছে। এই থামার পেছনে দায়ী ফ্যাক্টরগুলো নিয়া আলাদা বাতচিত হতে পারে। সেইটা না-হয় অন্য কোনো সময়ের জন্য রইল তুলিয়া রাখা। আমার এই কথাগুলো শুধু মনগড়া আজগুবি মনে-হওয়াই নয়, নিছক আন্দাজপ্রসূত কথালাপ নয়, এইটা আজকাল অনেকটা প্রামাণ্য প্রকল্পের রূপ পরিগ্রহ করিবারে যেন বদ্ধপরিকর। মৌলা হায়াত যদি দেন তো কখনো জড়তা কাটায়ে এ-বাবতের স্বকীয় অনুসিদ্ধান্তগুলো তোমার সনে শেয়ার করা যাবে তোমার টিউটোরিয়ালের ফাঁকফোকরে, মামণি, মেরি বেটিয়া, ঠিক আছে? এবং তোমারই ন্যায় তিন-চার বা গোটা এগারা-বারা আর্শিনগরবাসীর নিকট ভবিষ্যতের কহতব্যগুলো গচ্ছিত রাখার বাসনা এইখানে যাই প্রকাশিয়া।

না, তুলনামূলক বিচারের কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না; আবার প্রচারণাকাজ এত জোরেশোরে এদ্দিন ধরে হয়েছে যে — আমরাই ব্যান্ডগান দূরছাই বলে এবং কলকাতাগান আ-মরি হরি হরি কী বিউটি কী বিউটি বলে সেই প্রচারণা চালায়েছি — কাজেই তুলনামূলকতার ভেতর দিয়ে যেয়ে একটা আগ-পিছ নির্ণয় ও প্রদর্শন দরকারও হতে পারে। সেইটা আমরা যখন কথা বলতে বসব, তখন ভঙ্গি ঠিক করে নেয়া যাবে। এখানে কেবল বলা যাক, সুমনগান প্রসঙ্গে যেসব দাবি — যেসব পায়োনিয়ারিং এফোর্ট এবং কন্ট্রিবিউশনের কথা/তথ্য — উত্থাপিত হতে দেখি, সেইগুলো ধরে ধরে ব্যান্ডমিউজিক ম্যুভমেন্টের নীরবে অপসংস্কৃতির অপবাদ সয়েও গোলাঘর ভরে শস্য সংগ্রহণের হিস্টোরিটুকু বিস্মৃতিবিলাসী/বিস্মৃতিমত্তা বাংলাদেশীদিগের মেমোরিতে ফেরানো যাবে এমন একটা আশা পোষণ করা যাক আপাতত। কীভাবে ফেরানো সম্ভবপর হবে? এক-দুইভাবে নয়, একডজনভাবে কমপক্ষে। একটামাত্র উদাহরণ টুকি সেই প্রকল্পিত-প্রস্তাবিত খসড়া থেকে। যেমন তুমি দেখবে এমন একটা দাবি সরব ও সচল এখানে যে কবীর সুমন বাংলা গানে ব্যালাড আঙ্গিকের নিরীক্ষা করেছেন ও সফলকাম হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে সুমনের ব্যালাডধর্মী গানের অনেক আগে থেকেই ফিডব্যাক   বা মাকসুদ ও ঢাকা  ব্যালাডফর্ম নিয়া কাজ করেছে সেই ‘জোয়ার’-‘মেলা’ প্রভৃতি অ্যালবামে এবং চূড়া ছুঁয়েছে ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ ও পরবর্তী পর্যায়ের ‘(অ)প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিষিদ্ধ’ বা ‘ওগো ভালোবাসা’ ইত্যাদি অ্যালবামে, তখনও কবীর সুমন সবেমাত্র বাজার জুড়ছেন। ওয়ারফেইজ   করেছে, এলআরবিও করেছে। জেমস্ করেছেন যুগপৎ সোলো পরিবেশনায় এবং ফিলিংস্/নগরবাউল  দিয়া। সাইদুস সালেহীন সুমন করেছেন তার অর্থহীন  ব্যান্ড দিয়া। বাংলা গানের প্রথানুবর্তী প্রকরণ তথা আস্থায়ী-সঞ্চারী ইত্যাদি কম্পার্টমেন্ট ছেড়ে বেরোনোর রাস্তা বাংলাদেশের ব্যান্ডগান সর্বাগ্রে দেখিয়েছে। এর বাইরেও অনেকানেক স্পর্ধা-সাহসিকতা আমাদের ব্যান্ডগান দেখিয়েছে। সেইসব অপরূপায়িত ঘটনা আমরা পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়া আসি নাই। উল্টা বাদ্য বাজায়েছি, উল্টা নামগানা গাহিয়াছি, মিছেমিছি। কিন্তু সাম্যের গান গাহিবার, যার যেইটা পাওনা তারে সেইটা বুঝাইয়া দিবার, সময় তো বহিয়া যায় নাই। বিলম্ব হইলেও প্রাপককে তার প্রাপ্য বুঝাইয়া দিয়া পাপক্ষালনের পথ খুঁজতে হবে হে! এইগুলি নিয়া বলতে হবে তো। পুত্র আমার, কন্যা অয়ি, তুইই তো বলবি। নিজেদের ভুলভালগুলো, বদমায়েশিগুলো, তোর পূর্বজের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো, লুকায়ে না-রেখে বরঞ্চ যথাসাধ্য স-মমত্ব বলতে হবে। ব্যান্ডের বদমায়েশিও লুকায়ে যেয়ে লাভ নাই। কিন্তু, আইজ্ঞা, কবীর সুমন নমস্য ব্যক্তি। কিন্তু ইতিহাস যখন বলবে তুমি, কিপ ইট অলোয়েজ ইন য়্যুর মাইন্ড, একদিকের কথা বলবা আর অন্য একটা দিক বেমালুম চেপে যাবা, তা তো হয় না। নব্বইয়ের দশকের কলকাতা ছিল হিন্দি ফিল্মিগানার বাংলা রিমেকের মোচ্ছব, কুমার শানু আর বাবুল সুপ্রিয় আর সনু নিগমের মেলোড্রামাগান ও কোঁকানিকীর্তন দিয়া সয়লাব। বাংলাদেশ ছিল ওইসময়ে বাংলা গানে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে উন্মাতাল। শুধুই ব্যান্ডমিউজিক আর দুর্ধর্ষ সব পরীক্ষানিরীক্ষা দ্বারা সরগরম। এইটা স্বাজাত্যবোধ নয়, দেশাত্মবোধ বা জাতীয়তাবাদজাত আবেগ নয়, এইটা ফ্যাক্ট, এইটাই মিনিম্যাল স্টেইটমেন্ট এক্ষেত্রে। হতে পারে যে কবীর সুমন ওই সময়ের বাংলাদেশজ ব্যান্ডগান খুব-একটা শোনেন নাই, কিংবা শুনলেও সুমনের গানবোধ সেইসব ব্যান্ডগানকর্ম অনুমোদন করে না। কিন্তু বেমালুম চেপে যাওয়ার সঙ্গে আরও কিছু ব্যাপারও তো জড়ানো। তোমাদের জেনারেশনে, হে আমার দরাজ-হস্ত পুত্র হে সুনেত্র কন্যা, এইসব একচক্ষু-হরিণপনা আশা করি ভাত-বার্গার পাবে না। আপাতত এইটুকুই। তিলে তিলে ঢের দেনা জমেছে আমাদের, জবর দেরি হয়ে গিয়েছে। অ্যাট-লিস্ট সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না-পারলেও সেই ব্যাপক সৃজনসুফলা গানের সময়টাকে অ্যাক্নোলেজ করা আশু কর্তব্য। তোমার ও তোমাদের সময়ের মহোদয়বৃন্দের গানমজমা সানন্দ হউক।

তো, কথা যেইটা, বাংলাদেশের ব্যান্ডমিউজিক তখন সত্যি একটা ভালো সময় এনেছিল তরুণতর শ্রোতাদের মধ্যে। এন্তার নকলি হয়েছে, এন্তার হরবোলাগিরি, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে একটা ফাটাফাটি সৃজনোল্লাসভরা টাইম ছিল সেইটা। আনকোরা গানদলগুলোও পূর্ণ উদ্যম নিয়ে একটা-দুইটা গান টিউন করছিল নিয়মিত। গড়ে ওঠে এই সময়েই মিউজিক্যাল দলগুলোর সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম বামবা,  বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস্ অ্যাসোসিয়েশন, কার্যক্রম ও দায়বোধের দিক থেকে বামবা   তখন পূর্ণ সক্রিয়, বাংলাদেশের ব্যান্ডগান ধারাটাকে নিবারণ পণ্ডিতদিগের নানাবিধ বারণ ও ভূতুড়ে সাংস্কৃতিক জপস্তোত্রীয় তৎপরতা হইতে সুরক্ষা-প্রতিরক্ষা প্রোভাইডপূর্বক একটি নির্দিষ্ট দূর অবধি এনে সড়কে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এই পাটাতনের ভূমিকা স্মর্তব্য, যদিও শুরুর দিককার জোটবদ্ধ গুটিকয় ইমিডিয়েট সমস্যা সাময়িকভাবে সেটল-ডাউন করা ছাড়া বামবা   ব্যান্ডমিউজিকটাকে ফিলোসোফিক্যাল কোনো শেইপ-আপ দিতে পারে নাই, ফিন্যানশিয়্যালি কিছু প্রতিষ্ঠানগত সমর্থন আদায় করা ছাড়া সার্বিকভাবে বাজার ও বিপণন ব্যবস্থাটায় তেমন অভিঘাত ফেলতে পারে নাই। কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডগ্রুপ স্পন্সর পাবার ক্ষেত্রে একটা সুবিধা পায় নিশ্চয়। এইটাই, এর সঙ্গে রিলেটেড আরও সমস্ত কারণাদি, বামবাকে একটা অক্রিয় জোট করে তোলে অচিরে, সেইসঙ্গে বামবার আদি অর্গ্যানাইজারদেরে বানিয়ে তোলে বাবুরাম-সাপুড়ে একেকজন। অর্জনের মধ্যে এইটাই যে, বামবা   গঠনের পর সম্মিলিত ম্যুভের ফলে একের-পর-এক বেশকিছু বড়সড় উন্মুক্ত কন্সার্ট উপর্যুপরি আয়োজিত হওয়া। যার ফলে ব্যান্ডশ্রোতাগোষ্ঠী পয়্লাবারের মতন ভিজিবল হয়। এদ্দিন লোকে ক্যাসেট খরিদ করিয়া বাড়িঘরের ভেতর বিবিক্ত-বিচ্ছিন্নভাবে শুনত, ফলে বেহদ্দ বকমবকমসর্বস্ব বোদ্ধারা ঠাহর করতে পারতেন না আদতে ব্যান্ডগানের তালে তারুণ্যের পাল্স স্পন্দিত হয় কি না, বা হইলেও কতটুকু হয়, এইসব ওজন করিয়া দেখার চাক্ষুষ নজির তৈয়ার হয় বামবাকন্সার্টগুলোর সুবাদে। সেইসব কন্সার্ট, ওপেন-এয়ার বা মিলনায়তনাভ্যন্তর যেখানে যে-ফর্মেই হোক, যেখানেই হোক যথা রাজধানী কিংবা জেলাশহরে, প্রতিষ্ঠানবেপারিদের সজাগ করে তোলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীটাকে ব্যবসায়ের প্ল্যানের ভেতর সংস্থান-সঙ্কুলান করে নিতে। এবং হয়ও তাই। নিরখিলে দেখা যাবে যে, এই সময়েই ধীরে ধীরে বামবাকন্সার্ট অনুষ্ঠানের নিউজকাভারেজ জাতীয় দৈনিকগুলোর ফ্রন্টপেজে সচিত্র মর্যাদা পেতে। ক্যাসেট মার্কেটিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্প্যানিগুলোর নিউজ ও ফিচার ছাপা হতে শুরু করে বেশ ফলাও করে। উইক্লি টপচার্ট, অ্যালবাম বিক্রিবাট্টার খবর, ঢালিউড-বলিউড-হলিউড প্রমীলাদের প্রতিকৃতি প্রকাশে এন্টার্টেইনমেন্ট সাপ্লিমেন্টগুলোর অত্যাগ্রহে একটা ভাটা লাগে এই সময়ে এসে, ব্যান্ডভোক্যালদেরে গুরুত্ব দিয়া কাভার করার নিমিত্তে ম্যাগাজিনে-নিউজপেপারে ফোটোশ্যুট একটি রেগুলার আইটেম হয়ে ওঠে, জেমস্-হাসান-মাকসুদ-বাচ্চু-সঞ্জীব-শাফিন প্রমুখের মুখচ্ছবি-জীবনযাপন-শখাহ্লাদ প্রতি-হপ্তায় কোনো-না-কোনো পত্রিকার পাতার খোরাক হতো পূর্ণায়তন। ‘অপসংস্কৃতি’ অপবাদে খ্যাত গানবাজনা এইভাবে মূলধারা জনপদে মান্যতা লাভ করতে থাকে। এবং চুল্লির মোটামুটি অনির্বাণ আগুনটা, এতাবধি দিয়া-আসা ব্যান্ডগানের ফাইট, আস্তে আস্তে স্তিমিত হইতে থাকে এই সময়েই। নিতান্তই মাটির মনে হয় — যেমন সৈয়দ হকের কবিতায় এ-পঙক্তিটি — একবার পাইবার পর, ঘটনা কতকটা তা-ই ঘটে বলিয়া মনে হয়। এতদিন প্রতিষ্ঠা-স্বীকৃতি ইত্যাদি অর্জনের যে-স্ট্রাগল, যে-লড়াই, পাইবামাত্র উহা কাজে লাগানোর পরিবর্তে ব্যান্ডলিডারদিগের বগল ব্যস্ত হয়ে ওঠে বাজিবার তরে। সে এক ইতিহাস। কথা হলো, গানের বাণী বা লিরিক্যাল স্ট্রেন্থ ইত্যাদি বিবেচনায় ব্যান্ডমিউজিকের অর্জন খুব সমৃদ্ধ, এমনটা বাতচিত বেশি বেশি হয়ে যাবে। কিন্তু সদিচ্ছাটা অনুপস্থিত ছিল এমন বলা যাবে না। কয়েকটা মাইলফলক এফোর্ট লক্ষণীয় সর্বৈব বিচারসালিশির পর। সবই স্তিমিত হয়ে যায়, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে, ভেস্তে যায় ধীরে ধীরে। এরপরবর্তী মিউজিক যতটা-না ব্যান্ডবাহিত, অনেকাধিক সোলো তথা ব্যক্তিক উদযোগজাত। বাংলাদেশের বাংলা আধুনিক গানের — অবশ্য ব্যান্ডমিউজিক ব্যাপারটা বাংলাদেশের গানের স্বল্পপরিসর উঠানে এখনো মডার্ন তথা আধুনিক আখ্যা পাইবার পরিবর্তে পপগান ডাকনাম নিয়াই চলিছে — রিসেন্ট ট্রেন্ডটা ব্যান্ড এফোর্টের বাইরে বেরিয়ে এককের সৃজন-নির্মাণ-পরিবেশন। মন্দ হচ্ছে না তা-ও। পশ্চিমবঙ্গে এখন বরং ব্যান্ডের রোয়াব দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবেই যায় দেখা, আমাদের এখানে যেইটা ছিল নব্বইয়ের জাবদাখাতার উজ্জ্বলতর প্রাপ্তি। আমাদের এখানে এখন এককের উত্থান, সুমন ও তার সারথীরা যা নব্বইয়ের গোড়ায় দেখিয়ে সেরেছেন। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। যদিও এই নিবন্ধানুচ্ছেদে ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখানো হয় নাই, পরের কোনো প্যারাগ্রাফে কিংবা পৃথকতর নিবন্ধে এইটা খানিকটা ভাবার ও ভাবানোর প্রয়াস নিতে দেখা যাইতে পারে। তখন বুঝসমুজ করা যাবে যে এই গোটা ব্যাপারটা আমাদের দিক থেকে পজিটিভ পালাবদল বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় কি না। না, আমাদের থেকে ব্যান্ডমিউজিক ঘরানাটা পশ্চিমবঙ্গ অনেক পরে রপ্ত করলেও ভ্রুণাবস্থা তারা দ্রুত কাটায়ে সেরেছে। ‘চন্দ্রবিন্দু’ বা রূপম ইসলামের ব্যান্ড বা রূপঙ্কর প্রমুখ ছাড়াও কয়েকটা ব্যান্ড আমাদের শ্রবণতালিকায় নিশ্চয় নিয়মিত তা-ও-তো অনেকদিন হয়ে গেল। আমাদের অবস্থাটা কেমন, উত্তরণ কোথায় কিংবা আদৌ কোথাও উত্তরিত হয়েছি কি হই নাই, প্যারাডিম শিফ্টিং বলিয়া আমরা এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিবরণ অভিহিত করব নাকি অন্য কোনোভাবে একে অরিয়েন্ট করে নেব, ভাবা যাবে নিজের মতো করে। সুমন ও তার সতীর্থ-সারথীদের নিয়া বলবার ফাঁকফোকরে একটু রতি-উস্কানিমূলক আত্মজৈবনিকী একজনও যদি শুরু করে, আমার মতন বার্ধক্যধূসর প্রজন্মের কেউ ভলান্টিয়ার করে যদি ব্যাপারটা, আমাদের নাতিপুতিদের লাগিয়া ঠাম্মা-ঠাকুর্দার ঝুলি কিছুটা রসদঋদ্ধ হবার সুযোগ তৈয়ার হয়। আশায় বসতি তথা আশু প্রকাশ্য।

‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় — বিচ্ছেদ নয় / চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন-ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী / চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে / আমার না-থাকা জুড়ে।’ — এই রুদ্ররচিত কবিতাটা আর ফিডব্যাকের ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ তো অবিচ্ছেদ্য। ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এইটা আবৃত্তি করেছিলেন ওই অ্যালবামের ‘পালকি’ গানটার সঙ্গে। ‘এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে / দেহের মাপের মাটির ঘরে শুতে হবে’ ইত্যাদি ছিল মুখড়া সেই গানের। শম্ভু মিত্র ছাড়া এই একজনের আবৃত্তি তখন মন্দ লাগত না তাদের নাট্যন্যাকামিবিহীন যথাস্বাভাবিক পড়ার গুণে। সেই সময়টায় তো বাংলার দেশে এবং বাংলার বিদেশে গাদাগুচ্ছের লোক রোজ বিকেলে একটা করে আবৃত্তির ক্যাসেট বের করছিল। মজা করে হেঁকে বলতাম আমরা, আমাদের আড্ডা-ইয়ার্কিবিলোড়িত সন্ধ্যাগুলোতে, — দোস্ত, ‘বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা আমায় বলেছিল’ অথবা ওই ‘বাসন্তী এখন ডাকাত স্বামীর ঘরে চার সন্তানের জননী হয়েছে’ এই দুইটার একটা এট্টু সুরেলা কইরা আবৃত্তি করো তো দেহি! তয়, ইয়ার, সর্দিটা এট্টু বাড়ায়া দিও কইলাম! সর্দি ছাড়া হার্ড করা যায় না আবৃত্তি, মিউজিকের কাম করে কবিতা-আবৃত্তিতে এই সর্দি, জিনিশটা খারাপ না কিন্তু! কড়া কৈরা সর্দি মাইরা কবিতাটা কৈরো কইলাম, কিপ্পন্ন কৈরো না। তাতে কাজ হইত অবশ্য, সর্দিসন্ধ্যা জমিয়া উঠিত, যথাযোগ্য ওয়াহ্-ওয়াহ্ ক্যায়া-বাত প্রভৃতি সমুজদারি হাস্যহর্ষ সমেত। কখনো কেউ কেউ, কোনো কোনো বন্ধু, বৈকালিক ডেটিংকালীন উদ্ভূত অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা-হেতু কবিতাপাঠকালীন সহসা পূর্ববিজ্ঞপ্তিহীন অতি সিরিয়াস হয়ে গেলে একটা ক্যাঁচাল-যে একেবারেই বাঁধত না তা নয়। সেইটা সামলাতে একটা আলাদা ম্যাকানিজম নিতে হইত বটে। অ্যানিওয়ে। সেইসময় বিএ ফেল করে লোকে প্রাইভেটে দেদারসে এমবিএ করছিল, গজিয়ে উঠছিল মোড়ের কিনারে কিনারে একেকটা আজব কিসিম পাড়াবিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি নামে, যেখানে কেতাদুরস্ত বস্ত্র ও বিজলিবাত্তি দেখতে দেখতে আমরা আমাদের সারাদিনের ষণ্ডামি সেরে ডেরায় ফেরাকালে সান্ধ্য চা-চুরট চাবাইতাম চারজনপ্রতি একটাই হিস্যা ভাগ করে, এই বিদ্যালয়গুলো ক্রমে ভুবন-মশহুর বাংলাভোলানো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপলাভ করিল। পথ যত বন্ধুরই হউক, উস্তাদ, আগে বাঢ়ো! নিধিরাম, সুধাকান্তজীবনী এবে ভুলিয়াই যাও! মঞ্জুরি কমিশনগুলা আছে কেন, বসে বসে লেবেঞ্চুশ চুষিবার জইন্য! ওরা পাড়ায় পাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বসাইবার বন্দোবস্ত মঞ্জুর করিব নয়তো কি টিউবয়েলের ঠিকাদারি করিব! বলাবলি করতাম আমরা, তখন, এইসমস্ত। অন্যদিকে গ্রুপথিয়েটারে বা বিটিভি-অডিশনে ডাব্বা মেরে কেউ কেউ বাপের বিজনেসবাকশো হইতে পয়সা সরিয়ে ক্যাসেট বের করত আবৃত্তির। গরিবঘরোয়ারা বার করত লিটলম্যাগ অভিন্ন তরিকা এস্তেমালকরতঃ! উদীচী  তো তখনও সর্বস্তরে সাংস্কৃতিকভাবে বেশ ভিজিবল্ ছিল, ওরা আবৃত্তির কোর্স বছরভর চালাইত দেখতাম। তবে এরা ছাড়াও তখন গণ্ডায় গণ্ডায় আবৃত্তির সংগঠন গড়িয়া উঠছিল, কোর্স ডিজাইন ও ইমপ্লিমেন্ট করছিল তারা, গাহকও পাচ্ছিল নিশ্চয়। এবং তখন জাতীয় কবিতা পরিষদ  জিনিশটার কাঁচা ক্রেজ তো ছিলই দেশমুলুক জুড়িয়া, গাদাগাদি লিস্টিভুক্ত কবি কিক-বক্সিং বাগিয়ে মাইক্রোফোনে যেয়ে একটা আপনরচিত কবিতার একাংশ পড়তে-না-পড়তেই মালীর ঘাড়ে এসে মহিষের নিঃশ্বাস ফেলিত অপরাপর বিভিন্ন গ্রেড ও অসম বড়ে-ছোটে এইজের কবি। ঠিক একই কায়দার ছিল গড়ে-ওঠা আবৃত্তি-সংগঠনগুলো। কোর্স পার্টিসিপেটর ও গ্র্যাজুয়েটদের একটা আলাদা ম্যানারিজম, বোলচালভঙ্গিও, অচিরে নোটিস্ করা যাইত। একভাগে গজাইত শ্মশ্রু ও উহাদের পরিধেয় হইত পাঞ্জাবি অ্যান্ড্ অবভিয়াসলি শ্রীনিকেতনী কাঁধঝোলা, আর অন্যভাগে রবীন্দ্রোপন্যাস হইতে উঠিয়া-আসা সাজপোশাক ও তদসঙ্গে গ্রহতারারবি-সদৃশ মোটাগাট্টা টিপ। অনেক ভালো ভালো কবিতাও দেখেছি আবৃত্তিকারদের নাসিক্য বলাৎকারে কেমন করে অকালে সর্দিগ্রস্ত হয়ে বেঘোরে পড়ে থাকতে, দেখেছি কবিতার কলেরা ও অন্যান্য বারোটা বাজাতে আবৃত্তিকারেরা কেমন অসামান্য অবদান রেখেছে! সেই সময়টায় এইসব ঘটেছিল। ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ ঘটেছিল। ইত্যাদি। মন্দ ছিল না সময়টা। যা-ই হোক। তবে কেবল বঙ্গাব্দই তো নয়, ফিডব্যাকের প্রত্যেকটা অ্যালবামই ছিল মাইলফলক, অবশ্যধর্তব্য ব্যান্ডমিউজিকে ফিডব্যাক  একটা ভালো ও উদাহরণীয় ঘটনাপ্রপঞ্চ, হোক সেইটা ‘জোয়ার’ অথবা ‘মেলা’ বা ‘বাউলিয়ানা’ বা সেই আব্দুর রহমান বয়াতির সঙ্গে একজুটি সিঙ্গেল্স ‘দেহঘড়ি’, ফিডব্যাক নানানভাবেই সেই সময়টাকে আন্দোলিত করে গেছে। এই আওয়াজ তো ফিডব্যাকই দিয়াছিল : ‘ধন্যবাদ ভালো দিয়া গেলেন’;  উঠেছিল হাঁকিয়া তারুণ্যের এই অন্তর্জ্বালা : ‘আর এরপরও কেউ যদি চাপাবাজি করেন / ঢাকার ছেলেরা চিৎকার করে বলেন — / ধন্যবাদ, ভালো দিয়া গেলেন / ধন্যবাদ ভালোই দিয়া গেলেন’ … এইসব ডিটোনেটর সাপ্লাই দিয়েছে সেই-সময় আমাদেরে এই ব্যান্ড। সময়টাকে এনকোড করে যাবার কাজটা ফিডব্যাক  ব্যাপক সফলতার সঙ্গে সেরে গেছে, এবং করেছে কম্পোজিশনের শিল্পশর্ত ক্ষুণ্ন না-করেই। ফিডব্যাকের লিগ্যাসি তো অনেক পুরনো, অনেক লম্বা, মাকসুদের আগে যিনি ভোক্যাল্ ছিলেন এবং ভালো লাগত গলা-গায়কী যার, তার নাম যদ্দুর ইয়াদ হয় ছিল রোমেল, রোম্যান্টিক লিরিক্সই ছিল তখন ফিডব্যাকের তুরুপের তাস। ম্যাক এসে যে-একটা বাড়তি তাস দেখালেন, সেইটাই হয়ে উঠল ফিডব্যাকের এবং গোটা ব্যান্ডসংগীতের গরিমার একটা জায়গা। আগেও ফিডব্যাক  পোলিটিক্যাল কনশাস্নেস্ থেকে গান করেছে, সলিডারিটি এক্সপ্রেসের জায়গা থেকে গেয়েছে, বঙ্গাব্দতে এসে ব্যাপারটা দানা বাঁধল এবং ব্যান্ড উন্নীত হলো অন্য উচ্চতায়। এরপরে একটা ফোক-ফিউশনবেইজড অ্যালবাম করে ম্যাক ফিডব্যাক  থেকে বেরিয়ে গেলেন, ফিডব্যাক  আবার ফিরে গেল ‘বন্ধুর খোঁজে জোছনায়’ প্রভৃতি প্রেমরোম্যান্সমূলক লিরিক্সের দ্বারে, ম্যাক গড়লেন ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ এবং ‘…নিষিদ্ধ’ ও ‘ওগো ভালোবাসা’ নামে একজোড়া অ্যালবাম করলেন নিজের ধারার স্ট্রং কন্টিন্যুয়েশন রেখে। যেমন করলেন গরিমা গানের দল  ব্যানারে ‘মাআরেফাতের পতাকা’ অ্যালবাম। সেসব অন্য ইতিহাস, অন্যত্র কখনো বলা যাবে। যেইটা বলার তা এ-ই যে, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ বা আরও যদি কোনো সমধর্মী ব্যান্ড থেকে থাকে, ফিডব্যাকের সঙ্গে এসব কারোরই তুলনা চলে না। বাংলা গানে, কবীর সুমন মাথায় রেখেও বলা যায় এই কথাটা, লিরিক্সের পোলিটিক্যাল স্ট্রেন্থ বিবেচনায় নিলে, ডাইরেক্টনেস্/বোল্ডনেস্ যদি লিরিক্সের কোয়ালিটি হিশেবে মেনে নিতে কারো আপত্তি না-থাকে, ফিডব্যাক  অনুপম ও অতুলনীয়। সময়কে এনকোড করেছে এরা শিল্পসফলভাবে সরাসরি; কিংবা আন্দোলিত একটা সময়েই ফিডব্যাকের উত্থান-আবির্ভাব-বিকাশ যেভাবেই বলি না কেন। সময়টাই হয়তো আন্দোলিত করেছে তাদেরে, এবং তারা তাদের পথ করে নিয়েছে সেই সময়্দুয়ার-পেরোনো সদররাস্তায়। ম্যাক তথা ফিডব্যাক  নিয়ে, জেমস তথা ফিলিংস্/নগরবাউল  নিয়ে, পৃথক পরিসর ও আয়োজনে আলাপ জুড়তে হবে তোমার সঙ্গে। এইসব ইঙ্গিত বিধৃত রয়েছে ব্যান্ডগানে, বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে, রেনেসাঁ-ফিডব্যাক-ওয়ারফেইজের মিউজিকে, এলআরবি-ফিলিংস-নগরবাউলের গানে। এই ইশারাগুলি ডিকোড করে দেখাতে হবে তোমাকে, হে পুত্র, হে কন্যা আমার!

এ-ই তো, এইভাবে, এই ইতিহাস তোমাকেই বলে যাওয়া যায়। একটু একটু করে, ভেঙে ভেঙে, তোমার তন্দ্রা ও পূর্ণজাগৃতির মাঝখানে। “এতদিন কে আমার — আমাদের — কবিতা পড়েছে? ব্যারনের টুপি পরা পাটের দালালরা? শামলা আঁটা সর্দার পোড়োরা? নির্বোধ, লালাসক্ত ঝাণ্ডাকবিরা? হপ্তা খাওয়া পুলিশ, বেহায়া সমাজসেবী, পাঁশনে আঁটা মাস্তান, তেলাক্ত আমলারা? কারা আমাদের পিছে এতদিন ব্যান্ড বাজিয়েছে? উত্তরপুরুষের কানে কারা আমাদের নামে গোছা-গোছা গপ্পো মেরেছে? লুব্ধ মাস্টাররা? গুণ্ডা সম্পাদকরা? খুনীরা? ভয় পেতে ও পাওয়াতে যারা রক্তহীন হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত? বেশ্যারা? আ, অঁরিয়েৎ, উনিশ শতক শেষ, হাড়কাটা গলি থেকে এখন ফোটে না আর বিষাদকুসুম।” — জয়দেব বসু বলে গেছেন তোমার কানে এই কথাগুলো, তুমি যেন শুনতে পাও তাই, তোমারই জন্যে লিপিবদ্ধ ও প্রণয়নোর্ধ্ব সমস্ত ইতিহাস, আমি বাহক মাত্র। তোমারই কানে তুলে দেবার জন্যে এই ডাক আমারে গছায়ে গেছে ২০১২-ফেব্রুয়ারিতে-স্পেসশিপে-চেপে-গ্রহান্তরী সেই জয়দেব পাগলা : “জাগো হাওয়া, জাগো পৌষ-ফাগুনের আঁধি, জাগো ব্যাসল্ট-ঝড়ের বন্যা, জাগো ঋক্, জাগো সাম্, জাগো আশা ও ডানার ঢেউ, এই এপিটাফ ও অবেলিস্কের শহরে জাগো ঘাস, জাগো নিশানেরা, জাগো মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছার স্রোত, নাভি থেকে শব্দকে তুলে আনতে জাগো। আশা ও নিরাশার মধ্যে কেঁপে উঠছে এই দেশ। ভয়ে কাঁপছে, আকাঙ্ক্ষায় কাঁপছে, তার স্নায়ু ও রক্তের মধ্যে কথা বলো। জাগো মোহররমের দুলদুল, রক্তাক্ত ঘাড় তুলে আকাশে বিদ্ধ করো হ্রেষা ও নিঃশ্বাস। জাগো লাভা, নিশ্চিহ্ন করে দাও সাবেকী শিল্পের স্মৃতি, মীনাবাজারের ঠাটবাট। বৃশ্চিক রাশির নিচে যে-মানুষ শুয়ে আছে ভাষাহীন, কপর্দকহীন, তাকে দাও রূপকথা, তাকে দাও যথার্থ মনীষা। জাগো ভবিষ্যৎ। জাগো, নতুন কবিরা।”

আমাদের দেশে, এই নির্জল-অগ্নিজ্যান্ত মানুষের দেশে, এই নিরস্ত্র-অসহায় লেখক-কোপানোর দেশে, বেডরুমে সেইফ্টি দিতে অস্বীকারকরণের আশ্চর্য ঘোষকের এই সরকারবাহাদুরির দেশে, এই বার্বিকিউ-নগরীর দেশে, সেই ছেলে কবে হবে — হবে সেই মেয়ে কবে — যে এই ইতিহাস রচিবে ডেভিড টাউনসেন্ডের ন্যায়? এই দেশে ব্যান্ডসংগীতের সংশপ্তক সংগ্রাম ও শস্যোত্তোলনের ইতিহাস কবে লেখা হবে? হে সাম্প্রতিক যুবা, ফেবুকমেন্টে সোশ্যাল রেস্পোন্সিবিলিটি সেরে দিলখুশ দুনিয়াজয়ী রেভোল্যুশনারি হে চঞ্চলমতি বন্ধু, এই ইতিহাস তুমি মিলিয়ে না-দিলে কে মেলাবে? ডেভিড টাউনসেন্ড সিক্সটিজের অ্যামেরিকায় রক্-ন্-রল্ রেনেসাঁসের ডক্যুমেন্টারি লিখেছেন ‘চেইঞ্জিং দ্য ওয়ার্ল্ড : রক্-ন্-রল্ কাল্চার অ্যান্ড আইডিয়োলোজি’ শিরোনামক বইটির পেটের ভেতরে অনবদ্য ব্যাখ্যা-স্মৃতিবিধৃত ভাষিক বুননে, যেখানে গ্রেইট বব ডিলান সহ গোটা রকজাগৃতি নিয়া ভাষ্য ও বয়ান সহজবোধ্য স্বরে পেয়ে যায় পাঠক। চঞ্চল যুবা, সাম্প্রতিক হট্টগোলের ভট্ট-আচার্য, ভাবো। তুমিই লিখবে, হে আমার আত্মজা ও আকাশচূড়া গাছের ন্যায় ঢ্যাঙা-লম্বা ছেলে, আমাদের গরিমার গানদিনগুলি নিয়া গলা খুলে কথা বলার প্রিপারেশন গ্রহণ করো তুমি।


পোস্টস্ক্রিপ্ট  : এই নিবন্ধপত্রের উদ্দীষ্ট ও প্রথম শ্রোতা বা যারে বলে টার্গেট অডিয়্যান্স নিবন্ধকারের আত্মজতুল্য, বস্তুতপক্ষে এই নিবন্ধকের কলিগের পুত্রসন্তান, কোনো-এক অসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, ডিফ্রেন্ট টাচের গান শুনতে শুনতে একটি চির্কুট লিখে শেয়ার করেছিল সে আকাশের ঠিকানায়, ফেসবুকে। সেই চির্কুট পড়ে এই নিবন্ধ, কলিগের তথা আমাদেরই বংশধারার এক টর্চবেয়ারার উত্তরাধিকারীকে অ্যাড্রেস করে। এইখানে বর্ণিত সুরগুলো গানগুলো আমিও শুনি না কতদিন! ইন-ফ্যাক্ট, ২০০৬ অক্টোবর থেকে সেই-অর্থে গান শোনা হয় না আর। অক্টোবর মনে রাখতে পেরেছি কারণ ওইবছর ওইমাসে আমাদের স্কুলফ্রেন্ড রূপক মারা যায়। একদম অকস্মাৎ। কোনো পূর্ববিজ্ঞপ্তি না-দিয়া। আমার যদ্দুর মনে পড়ে রূপকের প্রস্থানের পর ক্যাসেট/সিডি খরিদ করে গান শোনা হয় নাই আর। যা-হোক। মরেছে ফুরিয়েছে। ল্যাঠা গিয়াছে চুকিয়াবুকিয়া। ‘যা গেছে তা যাক’। সলিল চৌধুরীর সুর ও গান। এখন গান শোনা হয় ওই খবরকাগজের নিউজহেডিং চোখ বোলানোর মতো করে। আজকাল প্রায়ই মনে হয়, ফেরা আর হবে না আমাদের সুরে, ভেসে যাবে আদরের নৌকো, চলে যাবে স্টেশন ছেড়ে এ-জন্মের রেলগাড়িরা, হায়, শোনা আর হবেনাকো চন্দ্রবিন্দুর গান … ‘বন্ধু তোমায় এ-গান শোনাব বিকেলবেলায় / আরেকবার যদি তোমাদের দলে নাও খেলায়’ … কিন্তু গান শুনতে না-পারার কম্পেন্সেশন/কন্সোলেশন হিশেবে মেমোরিচারণের পরিমাণ ও মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। আমি বলছি আমার লাইফের কথা। ভাবনার বিষয় যেইটা হচ্ছে যে এই স্মৃতিরোমন্থন ভালো না মন্দ। প্রথমত, পুরাকালে তথা আমাদের প্রপিতামাতামহের আমলে হাতের কব্জি ডুবায়ে দুধভাত খাওয়া হতো কি হতো না তা জানি না, তবে ব্যাপারটা গালগল্প হয়ে উঠেছে তখন থেকেই যখন কিনা আমাদের গেরস্তালিতে গোশালা হাপিশ হয়ে গিয়েছে, আমাদের ডোমেস্টিক লাইফ থেকে যখন গোয়ালঘর অনুপস্থিত হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুধভাতের গল্পগুজব প্রমাণ করে বৈকি যে আমরা জাতিগতভাবে দুধভাত পছন্দ করি। অ্যাফোর্ড করতে পারি না এখন আর, সেইটা আলাদা কথা। গানের বেলাতেও তো তা-ই। জীবনযাত্রা ইত্যাদি বিবিধ হ্যাপায় এখন গান ওইভাবে শোনা হয় না, হবেও না আগের মতো করে। মেমোরি দিয়া, কাজেই, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। অল্পবিস্তর রোমন্থনের ক্ষিদেতেষ্টা মানুষের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য। বল্গাহারা হলে পরে সেইটা আশঙ্কার। আমার অবস্থা আশঙ্কাজনক। অতিরিক্ত রোমন্থনপ্রবণতা প্রমাণ করে যে রোমন্থনকারী জীবদ্দশার উপান্তে এসে ঠেকেছে। সে বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু অতীতের বিবরে এই বেঁচে থাকা ন্যাক্কারজনক ভারি। সভ্যতাগতির জন্য আদৌ যা ভালো খবর নয়কো। সবাই যদি এইধারা রোমন্থনরাক্ষস হয়ে ওঠে, তাইলে তো সমূহ আপদ। আশার কথা এ-ই যে হেন আপদগোত্রীয় লোক এখনও অল্পসংখ্যক। সবাই ডেইলি-নিউজপেপারের সমকালকেলেঙ্কারী নির্মাণে ব্যস্ত ও ব্রতী। কিন্তু সে-যা-হোক, বছর-কয়েক আগে দেশে যখন প্রথম এফএম রেডিও চালু হয়েছিল, গান শোনার হ্যাবিট ফিরবে মনে করে বেশ আশান্বিত হয়েছিলাম। গুড়ে বালি। তিন-চারমাস আপিশযাত্রাপথে যেতে-ফিরতে কানে সেলফোনের লতা লাগায়ে বেশ প্রচুরসংখ্যক গান শোনাও হয়েছিল, পরে সেইটা আর কন্টিনিয়্যু করা যায় নাই। কিন্তু তখন বুঝতে পেরেছিলাম বেশ যে একটা আলাদা আওয়াজ তৈরি হতেছে বাংলাদেশের গানে। এমনিতে আমি মনে করি পিছিয়ে পড়েছি গান-অভিজ্ঞতার দিক থেকে একদশক কম-সে-কম। গত দশবছরে যেসব ব্যান্ড এসেছে বাংলায়, এমনকি যারা ভালো করছে মর্মে নামডাক শুনেছি লোকমুখে, একটাও তো শোনা হয় নাই। কৃষ্ণকলি আর অর্ণব বা ধরো ‘জলের গান’ বা সায়ানের গান বা ওয়াকিল আহমেদ বাদ দিলে এই গোটা দশকের ভেতর থেকে সেভাবে কারোর গানই আদ্যোপান্ত শোনা হয়েছে আমার এমনটা দাবি কোনোভাবেই করতে পারব না। খানিকটা ‘শিরোনামহীন’, খানিকটা ‘মেঘদল’, খুব বেশি কিছু না। আমি নিশ্চিত যে এইসময়ে এন্তার বিচিত্র সংগীতসৃজন হয়েছে। কাজেই পিছিয়ে যে পড়েছি এতে কোনো সন্দেহ নাই এবং এহেন পশ্চাৎপদত্ব অপূরণীয়। অথচ একটা সময় পর্যন্ত বাংলার ক্যাসেটদোকানে ব্যান্ড-হিন্দিফিল্মি-ইংরিজি-রবীন্দ্রমিউজিক যা-কিছু সুলভ ছিল তা-কিছু সমস্তই আমাদের কান না-ছুঁয়ে ব্ল্যাকহোলে যেতে পারে নাই, এইটা দাবি করলে তো কমই দাবি করা হবে, তাই না? কাজেই স্মৃতি তুমি বেদনার মার্কা জিন্দিগি জিনে-কে লিয়ে এইসব ছাইভস্মধূলি-সিকিআধুলি নিবন্ধনোটের চোটপাট ছাড়া আর-কিইবা ক্ষ্যামতা আছে আমার করার! তবে আজকাল মনে হয় যে এইটাও মন্দ হয় না যদি ঠিকঠাক নিজের সময়ের গানগল্পগুলো টুকে রেখে যাওয়া যায় পৃথিবীর বৃষ্টিবিমূঢ় অঞ্চলের একটা-কোনো কর্নারে। এতে প্রোফিট হবে নিজেরই, জগতের কুচ পরোয়া নেহি, নিজে একটু রসেবশে থেকে ঠাকুর রামকৃষ্ণের প্রার্থনাবাক্যের মর্ম অনুধাবন করে বিদেয় হওয়া যাবে। ঠাকুর তো ছিলেন কালীসাধক। তার ভক্ত-আশেকানদিগেরে নানাবিধ দোয়া শিখাইতেন দিবারাত্র, অমৃতবচন দিতেন দারুণ সমস্ত গল্পকথাচ্ছলে, একদা আশেকানদের প্রাসঙ্গিক এক সওয়ালের জবাবে রামকৃষ্ণ উবাচ, নিজের জন্য তিনি কালীনিকটে একটাই এবং একমেবাদ্বিতীয়ম প্রার্থনাবাক্য জপ করেন সারাবেলা : রাখিস মা রসেবশে! সেইটাই। রসেবশে থাকা। গান শুনে হোক অথবা গান না-শুনে স্রেফ গানরোমন্থনে। রসেবশে থাকা নিয়াই তো কথা। তা, রসেবশে থাকো, মা, এই দোয়া করিনু। যতটা-যা পারো রসেবশে বেঁচেবত্তে থাকো বাবা! মারামারি-ক্লিকবাজির বীর হইবার মুরদ তো আল্লা আমরারে দেন নাই দুনিয়ায়। কিন্তু একটা লাভ হয়তো হতেও পারে, সেইটা এ-ই যে, ধরো আমাদের নাতনি বা তার ইয়ারদোস্তরা মিলে যে-একটা ব্যান্ডট্রুপ বানাবে, সেইখানে কম্পোজিশনের সময় এইসব তোমার-আমার গানশ্রবণস্মৃতি দিয়া তারা খানিকটা প্রাচীনকালীন সুরের মন্তাজ পেতে পারে। আমার সময়ের গান নিয়ে মেমোরিচারণ যতই পার্সোন্যাল হোক, শেষপর্যন্ত সেইটা তো ওই সময়েরই নিসর্গজলবায়ু অপটু হাতে হলেও ধরে রাখবে। ওই সময়টার জনরুচি-রাজনীতি-সংস্কৃতি হ্যানত্যান নানাকিছু। খুব ভুল কিছু, সন্দেহ হয়, বকে গেলাম না তো? অলমিতি বিস্তরেণ।

এই লেখাটা ‘লাল জীপের ডায়েরী’ শীর্ষক একটা কাগজের (অনলাইন) গানসংখ্যায় আপ্লোড হয়েছিল ২০১৫ মার্চে। এই দ্বিতীয় সংস্কার প্রকাশকালে লালজীপ সঞ্চালক বিজয় আহমেদ ও অর্পণ দেব উভয়ের কাছেই ঋণস্বীকার করতে পেরে ভালো লাগছে। লেখক  

… …

COMMENTS

error: