নির্বাচিত গল্প

নির্বাচিত গল্প

SHARE:

কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের ‘নির্বাচিত গল্প’ ২০১৭ বইমেলায় প্রকাশিত হয়। বিগত দশক-দুই ধরে লেখা আখ্যানভাগ থেকে বাছাই-করা পঁয়তিরিশটি গল্প বেছে নিয়ে অ্যান্থোলোজিটি নির্মিত হয়েছে। এরই মধ্যে বইটি নিশ্চয় তার পাঠকের দুয়ারে গেছে এবং লভেছে সমাদরও।

সংকলনটি নির্বাচিত ও পরিকল্পিত হয়েছে লেখকেরই অনুমোদন নিয়ে সম্পাদিত হয়ে। এটি সম্পাদনা করেছেন খালেদ উদ-দীন। সম্পাদকের পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের ছাপ বহন করছে বইটির সুন্দর অঙ্গবিন্যাস ও মুদ্রণপারিপাট্য। কবি ও ‘বুনন’ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিশেবে খালেদ উদ-দীন লিখনজগতে পরিচিত। প্রকাশিত সম্পাদনাকাজটিতেও যত্ন ও  সৌকর্যের স্বাক্ষর তিনি রাখতে পেরেছেন।

উল্লেখ্য, নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান ছোটগল্পকার এবং উপন্যাসিক হিশেবে পাঠকাদৃত। রচয়িতার উপন্যাসগুলোর মধ্যে আলোচিত ও উল্লেখযোগ্য যথাক্রমে ‘বয়ন’ ও ‘পালাটিয়া’। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাপড়ি রহমান একাধারে লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক। প্রকাশিত গল্পবইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’, ‘হলুদ মেয়ের সীমান্ত’, ‘অষ্টরম্ভা’, ‘ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি’, ‘মৃদু মানুষের মোশন পিকচার’, ‘মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ’, ‘শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প’ প্রভৃতি। উপন্যাসসমূহের মধ্যে ‘পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ’ এবং ‘মহুয়া পাখির পালক’ পাঠকের সমাদর লাভ করেছে গত দুই দশকের সীমায়।  রয়েছে লেখকের নির্বাচিত গল্পের একটি ইংরেজি অনুবাদ ‘Lilies, Lanterns, Lullabies’ ‘ছাড়াও বিভিন্ন যৌথ ও একক সম্পাদনাকাজ; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো : ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প / নব্বইয়ের দশক’ (এককভাবে সম্পাদিত), ‘গাঁথাগল্প’ (যৌথ সম্পাদনা), ‘লেখকের কথা’ (যৌথ সম্পাদনা), ‘অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প’ (যৌথ সম্পাদনা), ‘Women Writing from Bengal’ (যৌথ সম্পাদনা) ইত্যাদি। গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে ‘ভাষাশহীদ আবুল বরকত’ শিরোনামে। এছাড়াও ২০১৬ বইমেলায় বেরিয়েছে লেখকের আত্মজীবনভিত্তিক অনবদ্য আখ্যানকথা ‘মায়াপারাবার’।

২০১৭ বইমেলায় বেরোনো ‘নির্বাচিত গল্প’ বইটি লেখকের সাতটি পৃথক গল্পগ্রন্থের থেকে চয়িত ৩৫টি গল্পের সম্মিলন। এই বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে লেখকের একক গল্পগ্রন্থগুলোর দুষ্প্রাপ্যতা খানিকটা হলেও দূরীভূত হতে পারল বলা যায়। দীর্ঘ দুই দশকের পরিসরে ছেপে বেরোনো বইগুলো পুনর্মুদ্রণের অভাবে পাঠকের প্রাপ্যতার বাইরেই ছিল এতদিন। বর্তমান সংকলন সেই অভাব পূরণ করতে অনেকাংশেই সফল হবে এইটা আশা করা যায়।

নির্বাচিত গল্প সংকলনটার ব্যাপারে একটা কথা শুধু বলা যায় যে, এই ধরনের বই কলেবরে যত ছোট হয় ততই তা পাঠকবান্ধব হতে পারে বেশি। পৃষ্ঠাসংখ্যার দিক থেকে, গল্পসংখ্যার দিক থেকে, এবং সর্বোপরি রিটেইল প্রাইসের দিক থেকে যত কম হয় ততই তা পাঠকের কাছে সুবিধার ঠেকে। এই সিলেক্টেড গল্পসংকলনের ভিতরে নেয়া হয়েছে ৩৫টা গল্প, এখন যদি এইভাবে দেখি যে এই গল্পকারের সাতখানা গল্পগ্রন্থ জুড়ে এ-যাবৎ গল্প রয়েছে অন-অ্যান-অ্যাভারেইজ ৭/৮টা ক্যাল্কুলেশনে মোট ৪৯ থেকে ৫৬। এখন, এইখানে, নির্বাচিত হয়েছে ৩৫টা। পার্সেন্টেজের হিসাবকিতাব সেরে দেখা যাবে যে এইটা সিলেকশন না হয়ে কমপ্লিট কালেকশন হয়ে উঠেছে। লেখকের ফ্যানবেইসের কথা মাথায় রেখে এইটা ঠিকই আছে হয়তো, তবে একজন নতুন পাঠক যখন হাই-হ্যালো করতে চাইবে লেখকের  সঙ্গে (লেখার সঙ্গে, অবশ্যই) তখন সে খুঁজবে অ্যাব্রিজড একটা ভার্শন সেই লেখকের এবং সংকলিত গুটিকয় লেখা পাঠের পরে সে সিদ্ধান্ত নেবে একই লেখকের এই ধারার অন্য গল্পগুলো সে পড়বে কি না। বাংলাদেশের লেখকদের নির্বাচিত কবিতা, নির্বাচিত গল্প, নির্বাচিত উপন্যাস, নির্বাচিত প্রবন্ধ প্রভৃতি কিসিমের বইগুলা আসলে একেকটা গন্ধমাদন পর্বত। অথচ হওয়ার কথা বিশল্যকরণী। না-হলে বইনামে নির্বাচিত বিশেষণ কেন?

কথা বাড়ানো যায়, কিন্তু কথা বাড়াইবার জায়গা এইটা না। তারপরও দুই-তিনআনা বাক্য অধিক কহতব্য। ধরা যাক একজন লেখক তার প্রাইম টাইমে ১০০ গল্প লিখে সেই গল্পগুলা থেকে নির্বাচিতা বানাইতে মনস্থির করলেন। এইটা কি সম্ভব যে একজন লেখকের প্রত্যেকটা গল্পই আলাদা, অনন্য, একের সঙ্গে অন্যের কোনো মিল নাই? লেখকের তো লেখাগুলোর সঙ্গে একটা অপত্য স্নেহ বা বাৎসল্যের সম্পর্ক থাকতেই পারে এবং থাকে। এডিটরের কাজ হচ্ছে এই সিলেকশনের কাজটা ক্যাটাগ্যরিক্যালি ইন্ডিকেটর দিয়ে করা এবং ভূমিকায় সেই বাছাইপ্রোসেস ডক্যুমেন্টেড করিয়া রাখা। আলোচ্য গ্রন্থে এডিটিঙের এই দিকগুলা মিসিং। সম্পাদক সোজা রাস্তা ধরেছেন। গোটা গন্ধমাদন উঠিয়ে এনেছেন, যদিও পৌরাণিক সেই গল্পটা আমরা জানি যে তাকে বলা হয়েছিল শুধু বিশল্যকরণী বিরিখের পাতাটাই নিয়া আসতে। অ্যানিওয়ে। এনেই যখন ফেলা হয়েছে, গন্দমাদনের অরণ্যে বিশল্যকরণী ছাড়াও অজস্র বনস্পতি গাছগাছড়া রয়েছে। ফ্রেশ এবং স্যুদিং আবহ। তবে কথা এইটাই যে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সম্পাদনার নামে যা হয়েছে তা আসলে রেস্পোন্সিবিলিটিহীন নির্বাচন কমিশনের কারবারই বেশিরভাগ। ষোলো কোটির মধ্যে ষোলো কোটিই শাসকেরে ভোট দিয়া দেয় এবং দিয়াই যায় তিন টার্ম চাইর টার্ম ধরে।

এই বইটি প্রকাশ করেছে ‘চৈতন্য প্রকাশন’। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী চারু পিন্টু। প্রায় সাড়ে-তিনশো পৃষ্ঠার বইটির গায়ে মূল্য ধার্য রয়েছে সাড়ে-চারশো টাকা।

  • নির্বাচিত গল্প ।। লেখক পাপড়ি রহমান ।। পরিকল্পন, সংকলন ও সম্পাদন : খালেদ উদ-দীন ।। প্রচ্ছদ : চারু পিন্টু ।। প্রকাশক : চৈতন্য প্রকাশন ।। মূল্য : ৪৫০ টাকা ।। প্রকাশকাল : অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ ঢাকা

প্রতিবেদন / সুবর্ণ বাগচী

… …

COMMENTS

error: