করিমস্মৃতি, করিমকথা || সুমনকুমার দাশ

করিমস্মৃতি, করিমকথা || সুমনকুমার দাশ

SHARE:

তাঁর কথা মনে পড়লেই একটা দৃশ্য খুব চোখে ভাসে। তিনি হাত তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কালনী নদীর কূলে, যতক্ষণ পর্যন্ত অতিথির চেহারা অস্পষ্ট না-হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। কোনও আগন্তুক তাঁর বাড়িতে এলে বিদায়লগ্নে এমনই আতিথেয়তা পেতেন। এমন বিদায়-সম্ভাষণ যেন তাঁর চারিত্রিক রীতিতেই পরিণত হয়েছিল। এত অমায়িক, এত মার্জিত, এত উদারপন্থী মানুষের উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায়। কেবল কি তা-ই? তাঁর মতো সৎ ও নির্লোভ মানুষের সংখ্যাও তো খুব বেশি নয়! ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর মহাপ্রয়াণ হয়েছিল। দেখতে-দেখতে কীভাবেই যেন শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণের নয়টি বছর কেটে গেল। অথচ করিমবিহীন এত বছর তাঁর শূন্যতা কখনোই অনুভূত হয়নি। কারণ তাঁর গানগুলো তো এখন আমাদের জীবনযাপনেরই অংশ হয়ে পড়েছে। প্রিয় এই বাউলের সমগ্র সৃষ্টির কোনো-না-কোনো অংশ তো এখন বিশ্বের প্রায় সব বাংলাভাষীর কাছেই পৌঁছে গেছে! রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ-লালন-হাসনের পরে বোধহয় সর্বাধিক উচ্চারিত নামটি তাঁরই।

দুই
শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) গান লিখেছেন সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশ। সেসব গানে তিনি নিজেই সুর দিয়েছেন, গেয়েছেন। এর বাইরে চণ্ডীদাস, দ্বিজদাস, লালন, রাধারমণ, হাসন রাজা, রশিদউদ্দিনের লেখা কিছু কিছু গানও গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠের মায়াবী জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকতেন উজান-ভাটির শ্রোতারা। করিমের চলে যাওয়ার নয় বছর পর যখন তাঁর গানের রেকর্ডিং শুনি, মনে হয় — এমন শিল্পী আর জন্মাবে তো এই বাংলায়? আহা! তাঁর কণ্ঠের সে-কী টান! —  “তুমি যদি আমায় কান্দাও, তোমার কান্দন পরে রে”। সেই একই গান যখন হালআমলের শিল্পীদের কণ্ঠে শুনি তখন কেমন যেন একঘেয়ে আর বেখাপ্পা লাগে, মূল সুরের বিচ্যুতি পীড়া দেয়। গানের সঙ্গে হৃদয়ের আর্তির যে সুর বেঁধেছিলেন করিম, সেটা এখন আর অন্যদের কাছ থেকে খুব-একটা পাচ্ছি কই?

তিন
করিম যখন গান গাইতে মঞ্চে উঠতেন, তখন থেমে যেত শ্রোতাদের সব কোলাহল। হাওরাঞ্চলে তাঁর গানে মুগ্ধ শ্রোতারা কাটিয়ে দিতেন আস্ত রাত। করিমও কম যেতেন না। আজ এখানে তো কাল ওখানে — বছরের বারোমাস গানই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। উকিল মুনশি, জালাল উদ্দীন খাঁ, কামাল উদ্দিন, দুর্বিন শাহ — এঁরা ছিলেন তাঁর গানের আসরের প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। একটা সময় ছিল, চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশক — যখন করিম ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রামেগঞ্জে তাঁর একতারা-বেহালা নিয়ে, মাজারে-আখড়ায় তৃষ্ণার্ত সংগীতানুরাগীদের নিজের কণ্ঠের মাধুর্যে পিপাসা মিটিয়েছেন। এরপরের সময়টুকু করিম অনেকটাই নাগরিক গানের আসরে সময় দিয়েছেন বেশি। ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম কিংবা এক-দুইবার যুক্তরাজ্য-ভারত সফরের সুবাদে নাগরিক মহলেও পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন তাঁর গানের দর্শন। তাঁর লেখা গানের বাণী ও সুরে মাত হয়ে গিয়েছিলেন প্রথাগত শিক্ষিত নাগরিকেরা।

চার
শাহ আবদুল করিম নানা ধরনের গান লিখেছেন, মূলত বাউলসংগীতই তাঁর রচনাসমগ্রের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে। এর বাইরে বিচ্ছেদী, সারি, গণসংগীত এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের গানও তিনি রচনা করেছেন। করিমের গানের পঠনপাঠনও হচ্ছে বেশ। তবে ভুলভাল পাঠ এবং ভুল গায়নও কিন্তু কম হচ্ছে না। যেখানে করিমের গানের শুদ্ধরূপ তাঁর রচনাসমগ্রতেই পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে এমন ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ অবাক বিস্ময়ে আমরা লক্ষ করি, সরকারিভাবে প্রকাশিত খোদ পাঠ্যপুস্তকেই তাঁর গানের অর্থের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বিখ্যাত ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। সেখানে ভণিতা অংশের ‘দীনহীন’ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে, — “ধর্মপথের দিশাহীন। সহায়-সম্বলহীন।” প্রকৃতপক্ষে করিম এই ‘দীনহীন’ শব্দটি গানে ব্যবহার করেছেন ‘গরিব/দরিদ্র’ অর্থে। এই যদি হয় সরকারি উদ্যোগে করিমের রচনার ভুল ব্যাখ্যা, তাহলে বাকিদের আর কী দোষ দেওয়া যায়?

পাঁচ
শাহ আবদুল করিম বাউলসাধনা-সংক্রান্ত অসংখ্য গান রচনা করেছেন এবং পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে মানুষকে উজ্জীবিত করতে উদ্দীপনামূলক গণসংগীতও লিখেছেন। তাই তাঁর গান হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশ-কাল-সমাজ-সভ্যতার এক অমূল্য সাংস্কৃতিক চিহ্নায়ক। আর এ-কারণেই করিমের গানে বারবার আমাদের আশ্রয় নিতেই হবে। জয়তু শাহ আবদুল করিম!

… … 

COMMENTS

error: