১৯৭১ : চোরের গাঁওয়ের অশ্রুত আখ্যান

১৯৭১ : চোরের গাঁওয়ের অশ্রুত আখ্যান

বইয়ের শিরোনামে একটা পাঠকপ্রলোভক দ্যোতনা আভাসিত হলেও বইয়ের কন্টেন্ট ও কথনস্টাইল স্বচ্ছ অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ। জনপদভিত্তিক বিশাল বাংলার স্থানিক ইতিহাস যারা জানেন বা জানতে চান যারা তাদেরে এই বই পয়লা সাক্ষাতেই চুম্বকের মতো টানবে, সসম্ভ্রম সমীহ ও সমাদর কুড়াবে এই বই বিষয়গত বৈভবের কারণেই, স্রেফ শিরোনামের সুবাদেই ইতিহাসসন্ধিৎসু পাঠক বইটার দিকে ধাবিত হবেন। অচিরেই টের পাবেন যে এর আখ্যানভাগে একছিঁটেও গুলগপ্পো গরহাজির, চমক দিয়া পাঠক টানা বা বানানো চটকদারিতায় লেখাটাকে ট্রেন্ডি করে তোলা থেকে বিরত রইতে লেখক একদম অনাপোস, সোজাসাপ্টা ফ্যাক্টফাইন্ডিং বই বলতে যেমনটা হওয়ার কথা এইটা তা-ই।

কিন্তু বইটির ভিতরে যেতে যেতে দেখব কথা চালানো হয়েছে এখানে একেবারে নির্ভার ভঙ্গিতে এবং ভারিক্কী লিখনশৈলী ঈর্ষণীয়ভাবে এড়িয়ে, যেন কথাসাহিত্যেরই কিছু প্রণোদনা আর শিল্পকৌশল আখ্যানবিন্যাসকালে লেখক লগ্নি করেছেন এইখানে। এর ফলে জনযুদ্ধের চৈতন্য ও জলহাওয়া অনুধাবনে আগ্রহী বিভিন্ন চিন্তায়তনিক পাঠকের কাছে এই বই নির্ঝঞ্ঝাট পাঠবান্ধব ও অনুপুঙ্খ অবলোকনের উপলক্ষ্যরূপে হাজির। ফিকশন এবং ননফিকশনের মায়াধাঁধায় এই বইয়ের আখ্যান আদতে না-আখ্যান/ননফিকশন হলেও গবেষক ও সমাজমনস্ক সাধারণ পাঠক সকলেরেই নিখোঁজ একটা আত্মপরিচয় ফিরিয়া পাবার চাবি আরেকবার হাতে তুলে দেয়। কে না জানে যে লাইফ জিনিশটা লার্জার এবং স্ট্রেইঞ্জার দ্যান ফিকশন।

হাওরনৈসর্গিক সুনামগঞ্জ জনপদের যে-একটি বিশেষ অংশের মানুষ এই বইয়ের বাস্তব, ক্ষুণ্ণিবৃত্তির তাগিদে এবং জীবনধারণকেন্দ্রী বৃত্তিনির্বাচনে স্বেচ্ছাচয়িত আউট-ল্য যারা, গরিমার সেই একাত্তরে যে-ভূমিকা তারা রেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে, এই ইতিহাস দূরজেলাবাসী তো বটে এমনকি নিকটজেলার অধিবাসীদের কাছেও অশ্রুত। অবগুণ্ঠিত। চুপানো হয়েছে এমন আরও বহুকিছু, বলা বাহুল্য, জমিনের এবং জলের সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর বহুকিছু অনবগুণ্ঠিত হবার অপেক্ষায় এখনও। লুকাছাপাটা কার জন্য ও কেন, যোগসাজশ ও পশ্চাতের রাজনীতি নিয়া আলাপবিস্তার অল্পই হয়েছে এখনও। পঞ্চাশ বছর কেটে গেল শুধু রাজার হয়েই শিঙায় ফুঁক দিয়ে আর পাল্টাপাল্টি রাজরাজড়ার ইতিহাস কপ্চিয়ে।

এই বই ইতিহাসের একটা দায় মোচনের মতো। অশ্রুত কতিপয় কাহিনি ও কথক এই বইয়ের উপজীব্য। গুটিকয়ের ব্যক্তিক সন্ধানে এই বিশেষ গ্রামগুচ্ছের একাত্তরসংলগ্ন জনযুদ্ধকালীন লিপ্ততা ও তৎপরতা আবছা-আংশিক জানা থাকলেও সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা উপজেলার ‘চোরেরগাও’ বলিয়া চিহ্নিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশজন্মলগ্নী ইতিহাস বইটির মাধ্যমে পাঠকের অবলোকনকেন্দ্রে পেশ হচ্ছে এই পয়লা।

আশপাশের অঞ্চলগুলোতে এই পল্লিনিচয় এতদিন চোরেরগাও বলিয়া তামাশাঠাট্টা আর উপহাসাহাসির ব্যাপার হিশেবে খ্যাত/অবজ্ঞাত হয়ে এসেছে, সেইসঙ্গে একটা রাহসিক সত্যিমিথ্যার জাদুবাস্তবতাও বুঝি ঘিরে রেখেছিল পল্লিগুলোকে। এইভাবে ট্যাগিং দিয়া সিঙ্গল-আউট করার মাধ্যমে মেইনস্ট্রিম থেকে এতকাল ধরে এই হিজল-করচের গাছপালাবর্তী কম্যুনিটিটাকে যেন অচ্ছ্যুৎ করে রাখা হয়েছে। এ আরেক রাজনীতি, অবশ্য, বইটাতে সেসব অত বিস্তারে না-এলেও লড়াইয়ের অংশভাক হওয়া সত্ত্বেও অ্যাক্নোলেজমেন্ট থেকে বঞ্চিত এই মানুষদেরে একাত্তরকালীন পটভূমে রেখে যেটুকু অনুধ্যানী বিবেচনাবোধের পরিচয় এই বইয়ের পরিচ্ছেদান্তরে লেখক দেখিয়েছেন তাতে এটি নিম্নবর্গী ইতিহাসচর্চায় একটি শিরোধার্য বই হতে চলেছে।

একটা ব্যাপার তবু উল্লেখ করা যায় এখানে যে, এই বইয়ের আখ্যানভাগে যেসব মানুষ এসেছেন তাদের সঙ্গে এত ডক্যুমেন্টারিনিষ্ঠ কথাবার্তা না চালিয়ে একটু রক্তমাংশ-রগরগে থেকে লেখক পারতেন আলাপটা চালাইতে। সেক্ষেত্রে এতটা সাংবাদিকী নিষ্ঠা থাকত না হয়তো, তবে এর ভেতরকার মানুষগুলো অনেক বেশি জ্যান্ত ও মুখর হয়ে উঠবার সম্ভাবনা তাতে বাড়ত। ধরা যাক যে এই লোকালয়ের লোক-সকলেরে নিয়া পার্শ্ববর্তী লোকালয়গুলোতে চালু রঙ্গরসিকতা, তাচ্ছিল্য ও অস্পৃশ্য আচরণ, এখানকার মানুষদের আত্মীয়তাসূত্র ও লোকাচার ইত্যাদি বিশদে না-হলেও অল্পবিস্তর জেনে এগোলে এই ইতিহাসের সঙ্গে পাঠক অনেক বেশি লিপ্ত রইতে পারতেন। গবেষক-সমীক্ষকদের জন্যে এই বইটিতে ব্যাপক তথ্যোপাত্ত-মশলাপাত্তি নিশ্চয় রয়েছে এবং সেসব নিয়া আগামীর কোনো পরিসরে আলাদা কাজকর্মও হবে আশা করা যায়।

এই বইয়ের লেখক শামস শামীম পেশাগত দিক থেকে একজন সংবাদজীবী হলেও, বইয়ের লেখকতথ্যফ্ল্যাপ থেকে যেটুকু অবহিত হওয়া যায়, কবি হিশেবেও পরিচিতি রয়েছে। বেরিয়েছে কবিতাবই ইতোপূর্বে এবং সম্পাদিত কবিতাপত্রিকাও। সুতরাং পাঠকের দিক থেকে একটা আব্দার থাকতেই পারে এমন যে ইন-ফিউচার এই বইয়ের এডিশন হলে সেখানে এর আখ্যানভাগটা আরও রক্তমাংশবর্ণাঢ্য করে তোলার প্রয়াস লেখক নেবেন। আগে তো জলজ্যান্ত মানুষটাকে জানব আমি, বিত্ত নয় শুধু জানব তার চিত্তের খবর, বীরত্ব ও ত্যাগতিতিক্ষা আর ইতিহাসে তার অবদান ইত্যাদি জিনিশগুলা জানব তো গোটা মানুষটাকে জানবার একটা পার্ট হিশেবে। মানুষটা তো প্রথমত ও অন্তিমত মানুষই, ইতিহাসের প্যাঁচপয়জার তো নয়।

কিন্তু বইটা আপনাকে একটা দারুণ মওকা দিচ্ছে অশ্রুত গল্প শোনার। তবে সেই গল্পে কেঠো কথাবার্তা শুধু, প্রাণে তার কোন সুর গুনগুনায় সেই খবরটা নাই। ইতিহাসের ঘুলঘুলি ঘিরে চক্কর দিয়া আসবার আগে ফ্রেশ একটা বাতাসের যোগান দরকার ছিল বৈকি। নিশ্চয় নিষ্ঠাব্রতী ইতিহাসানুসন্ধিৎসুদের জন্যে এ-বই একটা আকর। প্রচুর তথ্যের সমারোহ হয়েছে এখানটায়। প্রায় সাড়ে-ছয় ফর্মার বইটা ছাপা হয়েছে ভালো কাগজে, এর বাঁধাই ও অন্যান্য সমস্ত উৎপাদনমান অত্যন্ত উন্নত। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। নাটকীয়তাহীন সহনীয় সুন্দর প্রচ্ছদ। পুরো বইটা মার্জিত ও সুশ্রী অবয়বের। নাগরী প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০১৮ অব্দে। এর গাত্রমূল্য ২০০ বাংলাদেশি টাকা।

প্রতিবেদন / জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: