স্বর্ণসংগ্রহ, শঙ্খসম্পাদনা

স্বর্ণসংগ্রহ, শঙ্খসম্পাদনা

SHARE:

হুবহু আমার কথা যদি তুলেও দেওয়া যায় তবু তাতে কোন কথাটা ব্যঙ্গ ক’রে বলেছি আর কোন কথাটা অনেক থেমে থেমে বাধো-বাধো অনুভবে বলেছি, আর কোনটা গড়গড় ক’রে, এসব ঠিক ধরা পড়ে না।

উপরের কথাগুলো শম্ভু মিত্র বলেছিলেন শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকারায়োজনে, বহু আগে, এই সাক্ষাৎকারটা ধারণের অনেক অনেক বছর বাদে বই হয়ে বেরিয়েছে। এটা প্রায় চল্লিশ বছরেরও আগের ব্যাপার, শম্ভু-শঙ্খ মুখোমুখি হবার, সংকলিত হতে এত কালক্ষেপণের কারণসমূহ সম্পাদকীয় ভাষ্যে এসেছে। ঘটনাটা খুবই চমকপ্রদ, মনে হয়েছে আমার, শঙ্খগদ্যে সেটা আরও মনোরম হয়েছে সে-তো বলতে হয় না। আজ থেকে প্রায় বছর-চল্লিশ আগে (বা তারও কিছু বেশি, বইয়ের ভূমিকায় বলা আছে ঠিকঠাক সন-তারিখ) একটি লিটলম্যাগাজিনের প্রয়োজনে আয়োজিত হয়েছিল অত্যন্ত ঘরোয়া ওই বৈঠকীটি, কিন্তু পরে সেইটা আর ছাপা হয়নি। লিটলম্যাগের এই একটা দায়িত্বহীনতার দিক, দুঃখজনক, এ-প্রসঙ্গে বাগবিস্তার বৃথা। বা দায়িত্বহীনতাও নয় ঠিক, ছোটকাগজের চারিত্র্যই তো অনিয়মিততা আর আকস্মিকতা, পুঁজির দৌরাত্ম্যের সঙ্গে পেরে উঠতে গেলে যেটুক আপোস করা দরকার তা করতে গেলে কাগজ নিয়মিত হয় নিশ্চয়, কিন্তু তখন ছোটকাগজ তার  চারিত্র্যগত গরিমা হারিয়ে থোড়-বড়ি-খাড়া গৌণ হয়ে বেঁচে থাকে। এই রোয়াবটুকুর জন্যই শীর্ষশির সে, ছোটকাগজ বা লিটলম্যাগ যা-ই বলি, প্রচলবিমুখদের নিকট সমাদৃত। কথাগুলো ছোটকাগজওয়ালাদের মুখে ব্যাপক ফুটত খৈয়ের মতো।

সবই ঠিক আছে, মানছি, কিন্তু কথা এথাকায় একটি বই নিয়ে, এটি কোনো কাগজালোচনা নয়। বৈঠক সংঘটনকালে, দেখতে পাচ্ছি হিসাব মিলিয়ে, শঙ্খ কবি হিশেবে মান্য তরুণ হয়ে উঠেছেন এবং কলেজে প্রভাষণার কাজ করছেন। সবার কাছে শঙ্খের আজকের যে কদর, তা তখনও তৈরি হয়নি বটে কিন্তু সুলেখক ও মেধাদীপ্ত মিষ্টি ব্যক্তিত্ব হিশেবে তরুণদের কাছে এবং বয়োবুদ্ধিজীবী ছাড়াও সংস্কৃতিনিষ্ঠ কর্মকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে শম্ভু মিত্র তখন স্বনামখ্যাত নট, পুরোদস্তুর নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যকার-নাট্যনির্দেশক ও বাচিক শিল্পী হিশেবে সর্বমহলে মান্যতা অর্জন করে নিয়েছেন। অবধারিত বিতর্কিতও। শম্ভুর সিগ্নেচার-প্রোডাকশনগুলো তখন মঞ্চে এসে গিয়েছে, তাঁকে নিয়ে চালু সমালোচনাগুলোও উঁকি দিতে শুরু করেছে, সেইসঙ্গে মিত্রানুসারীদের পদচারণাও শুরু হয়ে গিয়েছে। এই-রকমই ছিল প্রাঙ্গন, তখন, ওই তারুণ্যস্পর্ধিত নতুনাবাহক পত্রিকাটি সিদ্ধান্ত নেয় শম্ভু মিত্র সবিশেষ সংখ্যা সম্পাদন ও প্রকাশের। তো, ওই কাগজের তরুণ সম্পাদনকর্তাদের আহ্বানে এবং শম্ভু মিত্রেরই ইচ্ছায় শঙ্খ হয়েছিলেন প্রশ্নসঞ্চালক  তথা সাক্ষাৎকারের মূল পরিগ্রাহক। এতদিন সেই সাক্ষাতে-ধৃত কথাগুলো পরিত্যক্ত দেরাজে পড়েই ছিল। ক্যাসেটযুগেরও আগের প্রযুক্তি স্পুলমাধ্যমে (স্পুল — এই প্রযুক্তির বিশেষ কিছুই জানা নাই আমার, পরিস্কার নয় এটি কার্যত কীরকম ছিল, ভূমিকায় এর বিবরণ-বর্ণনা থাকলেও আমি ঠিক ভিশ্যুয়ালাইজ করতে পারি নাই জিনিশটারে) এই আলাপচারিতা ধারণ করা হয়েছিল। ওইভাবেই রক্ষিত ছিল এতকাল, লিখিত রূপান্তরণ তথা ট্র্যান্সক্রিপ্শন হয়নি আর। সম্প্রতি, এতগুলো বছরের ধুলো ও ধূসরতার পর, শঙ্খ ঘোষ ওই কথাগুলো উদ্ধার করেছেন; — নিজের দেরাজ ঝাড়পোছ করতে যেয়ে পেয়ে গিয়েছিলেন, ভাগ্যিস! ফলে একটা স্বর্ণখনি পেলাম আমরা বাংলাভাষিক ভূখণ্ডে।

তাই বলে কম দুরূহ ছিল না আকরিক থেকে ধাতু নিষ্কাশন, দুঃসাধ্যপ্রায় এবং রীতিমতো অভিযান, মনোজ্ঞ বর্ণনা রয়েছে বইয়ের একটি পরিচ্ছেদে। বই-আকারে ছাপাকালে শঙ্খ ঘোষ এর নাম দিয়েছেন ‘এক-বক্তার বৈঠক’, লক্ষণীয় ও তাৎপর্যবহ নামকরণ, নিজের নাম ছেপেছেন স্রেফ সংগ্রাহক হিশেবে; — এমনকি সম্পাদকও দাবি করেননি নিজেকে! শিক্ষণীয় সম্ভ্রম ও পরিমিতিবোধ। অথচ বেমালুম চেপে যেয়ে দুর্দান্ত এই সংলাপগ্রন্থের কর্তাবাবু হতে পারতেন শঙ্খ নিজে, হননি, তিনি শঙ্খ ঘোষ যে!

এই বই পড়তে যেয়ে অন্য এক শঙ্খ ঘোষের দেখা পাবো আমরা। না, তার ওই চিরপরিচিত গদ্যই বহাল, কিন্তু কত সুমার্জিত বিশ্বস্ততার সঙ্গে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করা যায়, এর এক অনন্য নজির এই বই। এই-রকম কাজকেই, সম্ভবত, ইংরেজরা বলে পিস্ অফ এক্সিলেন্স। বলি একটু, সংক্ষেপে, বইবিন্যাস নিয়ে। এমনিতেই রেকর্ডকৃত কথাগুলো শ্রবণদুরূহ, তদুপরি আলাপচারিতাকালে অবাঞ্চিত শব্দানুপ্রবেশ এবং কথালাপের ধর্মানুযায়ী ঘনঘন উল্লম্ফন-উৎক্ষেপ ও সহসা প্রসঙ্গান্তর বা আকস্মিক প্রসঙ্গমুলতবি — এইগুলো শঙ্খ সামলেছেন যেভাবে তা দেখার মতো। প্রচুর ফ্যুটনোট সত্ত্বেও বইটি অ-সুখপাঠ্য/দুষ্পাঠ্য হয়নি — বিস্ময়কর নয়? ব্যবহৃত হয়েছে একটি বিশেষ পাংচুয়েশন — লিডার সাইন বা ত্রিবিন্দু — অনুদ্ধারিত শব্দস্থলে, তবু মূল টেক্সটে নিজের কথা বসিয়ে দেননি সম্পাদক (তৎবচনে সংগ্রাহক, যদিও)। অন্যদিকে শম্ভু মিত্রের যে বিশেষ ব্যক্তিত্ব-ভাবভঙ্গি-স্বরপ্রক্ষেপ-কথাচাল-মন্দ্রগভীরতা-বাগ্মিতা — মোটকথা ম্যানারিজম ও ভার্সেইটিলিটি — তার সবই জীবন্ত তথা লাইভ মনে হয়।

কেমন করে এটা করেছেন শঙ্খ, এই লাইভ টেলিকাস্ট, চল্লিশ বছর ধূসর ফ্যুটেজগুলি রিলে দেখিয়েছেন যদিও, বইটি পড়ে দেখুন ধরতে পারবেন, হয়তো রপ্তও করতে পারবেন অনেককিছু। উদাহরণের মতো, উদাহরণ নয়, খানিকটা কারখানার ভেতরদিকটায় যাই আসুন। ধরা যাক, শম্ভু কথা বলতে বলতে হয়তো কবিতা আওড়ালেন, বা গান গাইলেন, বা প্রাচীন কোনো গ্রেকো-ল্যাটিন ট্র্যাজেডি থেকে সংলাপ কণ্ঠাভিনয় করলেন, বা সমসাময়িক কোনো সতীর্থ বিষয়ে বীতশ্রদ্ধ হলেন, বা উত্তেজিত হলেন কোনো বিবাদমূলক প্রশ্নের অবতারণায় — এই সবকিছুই শব্দে ধৃত বইটিতে। যারা শম্ভু মিত্রকে চেনেন — আমার বয়সী যে-কেউ যারা একাধটু বই হাতে নেন এবং পড়েন নিয়মিত, মঞ্চের খোঁজপাত্তা রাখেন নিয়মিত, আবৃত্তি শুনেছেন প্রেম-অপ্রেমের প্রবেশিকা বয়সে, তারা কমবেশি শম্ভু মিত্রকে চেনেন, জানেন শম্ভুমিথগুলো, মিত্তির মশাইয়ের সাফল্য-ব্যর্থতাগুলো, শম্ভুকে নিয়ে তাঁর স্বকালের ডামাডোল-নীরবতা ও তাঁর বিরুদ্ধে কন্সপিরেসিগুলো — এই কিংবদন্তি নট তাদের সামনে অবিকল মূর্ত হয়ে উঠবেন আবার, বইটি পড়ার সময়। এই সম্প্রচারকৌশল এমন যে, নেপথ্যে থেকে একবারও মুখ প্রদর্শন করেননি দৃশ্যধারণকারী, ক্যামেরার সামনে আসেননি ক্যামেরাগ্রাফার। দু-তিনটে কেবল শব্দ খর্চে দৃশ্য মূর্তায়ন, অযথা বাগবিস্তারহীন টীকাভাষ্যটিপ্পনী, মায় গাওয়া বা আবৃত্তির সময়ের শম্ভুকণ্ঠের মডিউলেশন এমনকি সংলাপাভিনয়ের মুদ্রাগুলো উজ্জ্বলভাবে দেখতে/শুনতে পাই আমরা, দেখি কিংবা শুনি বিশেষত্ব নজরে রেখেই।

বইটি আমি পড়েছি, হয়ে গেছে কম করেও বছর-অনেক, আমার আপিশ থেকে এনে। এখন তো নাগালে নাই, থাকলে কিছু কোটেশন উগরানো যেত এখানে। আজ পুরানা ডাইরি নাড়াচাড়া করতে যেয়ে একপাতায় ওই উদ্ধৃতিটি পাই যেটি ঝুলিয়ে রেখেছি এই নিবন্ধিকায় এপিগ্রাফ হিশেবে। এবং ঝাঁৎ করে মনে পড়ে যায় বইটির ছিমছাম শরীর, স্মৃতি থেকে বের করতে বসি পুরনো মুগ্ধতা। কাভার ডিজাইন করেছেন শিল্পী হিরণ মিত্র। বইটা আমাদের আপিশের উন্মুক্ত গ্রন্থকোণে পাওয়া যাবে, যেটি নির্বাহ করেন এনায়েত ইউএস ইসলাম, ইতোমধ্যে কোনো বঙ্গীয় মার্ক টোয়েনের খপ্পরে না-পড়লে এনায়েতভাই বইভিক্ষুককে নিরাশ করবেন না আমি জানি। আর তাছাড়া বাজারে তো আজকাল বছরভর ইলিশ-কাঁঠাল পাওয়া যায়ই। যারা বইদোকান থেকে বইটি কিনে নিজের বৌয়ের প্রতিপক্ষ হিশেবে পাকাপাকি ঘরে তুলতে চান, তাদের জন্য বইয়ের নাম জানানোর পাশাপাশি আর মাত্র একটি তথ্য দিতে পারি, স্মৃতিকুয়া থেকে তুলে, এটি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার ‘তালপাতা’ নামে একটি প্রায়-অফবিট প্রকাশনাগার থেকে।

দেশীয় বইমেলায় ইন্ডিয়ান মাল তো পাওয়া যাবার কথা না, আনলেস্ বইটা বাংলাদেশি কোনো পাব্লিশার রিপ্রিন্ট করেন। সম্প্রতি এই হুজ্জৎ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে যে একই বই ইন্ডিয়ান প্রাদেশিক প্রকাশক ছাপছে এবং একই সময়ে উপর্যুপরি বাংলাদেশি প্রকাশকের ব্যানারেও গড়াগড়ি খাচ্ছে বছরভর ধুলায়। আবেগী ইয়াং দেশজ কবিরা তাদের বইয়ের ফ্ল্যাপে যত্ন করে ব্র্যাকেটে বইপ্রকাশের সাল-সাকিন লিখে বেশ ভারতীয় উন্নত সভ্যতায় এনরোল্ড হবার ক্লেইমটা করছে। শুভঙ্করের ফাঁকিটা সকলেই জানে, কেউ বলতে যায় না। ভারত আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায় — ভারতে আমার পাঠক প্রচুর — এমন ভাবটা খারাপ না। বাংলাদেশের বই জিন্দেগিতেও আর ভারতে হালাল ব্যবসা করতে পারবে বলে মনে হয় না। যুগে যুগে এটিএন ইয়াংনাইট কবিরা ব্র্যাকেটে ভারত লিখে বইয়ের ফ্ল্যাপে ভাব নেবে। এদিকে বাতিঘরের মতো বইদোকান ইন্ডিয়ান বইয়ের সুস্থায়ী ডিস্ট্রিবিউটর হয়ে দেশের সংস্কৃতিশিরায় রক্ত, রহমত ও বরকত দানিয়া যাবে। দেশের বইবাজার নিয়া ভাববে এমন পাগল বা আহমদ ছফা বাংলাদেশে কেন জন্মাবে আবার? ফলে, চলছে, চলবে, চলুক, গোলেমালে।

এই বইটা বাংলাদেশের বইদোকানগুলায় পাওয়া যায় নিয়মিত, কয়েকটা সংস্করণও হয়ে গেছে এরই মধ্যে বইটার।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

COMMENTS

error: