চেতনার পালাবদল ও করোনা প্রসঙ্গ ১ || আহমদ মিনহাজ

চেতনার পালাবদল ও করোনা প্রসঙ্গ ১ || আহমদ মিনহাজ

SHARE:

লুক মন্টাগনিয়ার ছদ্মবিজ্ঞান সমাচার


কোভিড-১৯’র জিনোম সিকোয়েন্সে HIV-র (Human Immunodeficiency Virus) ক্ষুদ্র অংশের উপস্থিতি এবং জিনোমগত প্রকৌশলের সাহায্যে কোভিডে উক্ত ভাইরাসের সংযোজন নিয়ে নোবেলজয়ী ভাইরাসবিশেষজ্ঞ লুক মন্টাগনিয়ার ও তাঁর সহকর্মী গণিতবিদ জাঁ-ক্লদ-পেরেজের বক্তব্য বিজ্ঞানীমহলে সমালোচনার ঝড় তুলবে এটা অনুমিতই ছিল। হার্বাল ও হোমিওপ্যাথ সম্পর্কে বিশেষ পক্ষপাতের কারণে তিনি এমনিতেই সমালোচিত। এছাড়া মন্টাগনিয়ারের ভ্যাকসিনবিরোধী মনোভাব, HIV ভ্যাকসিন তৈরিতে বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ভূমিকা ও তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিরোধে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সুফল সংক্রান্ত গবেষণা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের জন্য বিজ্ঞানীমহলের বড় অংশ ছদ্মবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকরূপে তাঁকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। যদিও কোনটা বিজ্ঞান আর কোনটা ছদ্মবিজ্ঞান এ-নিয়ে মতান্তর অনেকদিনের পুরোনো। বিজ্ঞানের স্বীকৃত নীতি অনুসরণ করার পরেও ছদ্মবিজ্ঞানকে বিবেচনা করা অনেকসময় কেন প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে সে-সম্পর্কে বিজ্ঞানের মনীষা থমাস স্যামুয়েল কুন তাঁর ‘বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের গঠনপ্রকৃতি’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন।

আচরণবাদী অর্থনীতির Cognitive Dissonance বা কোনও বিষয়ে জ্ঞান, ধারণা ও মতামতের অনৈক্য বিজ্ঞানীমহলকে কীভাবে ছকবন্দি করে ফেলে, কেন তাঁরা ছদ্মবিজ্ঞান বলে নাকচ হওয়া তাত্ত্বিক প্রস্তাবনাকে পৃথক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা ও বিবেচনায় অপারগ হয়ে পড়েন, অথবা ভিন্ন পরিসরে ভাবার ফলে বাতিল তত্ত্ব কী করে স্বয়ং বিজ্ঞানের জন্য অনেকসময় যৌক্তিক হয়ে ওঠে ও চেতনার পালাবদল ঘটাতে ভূমিকা রাখে ইত্যাদি বুঝতে হলে কুনের বইটি স্মরণ রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। অ্যারিস্টোটলের ‘মেকানিকস’ গ্রন্থ পাঠের প্রাথমিক ও পরবর্তী অভিজ্ঞতা কীভাবে তাঁকে প্যারাডাইম শিফট বা চেতনার পালাবদল সংক্রান্ত তত্ত্ব রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল সেই বিবরণ পাঠ করলে বোঝা যায় দীর্ঘ সময় ধরে থমাস কুনের গ্রন্থটি বিজ্ঞানীমহলে কেন অস্বস্তি ও বিরক্তির সাথে উচ্চারিত হতো। সে-সময় বইটি পাঠকের যোগ্য সমাদর কুড়ায়নি। পরে, সম্ভবত আশির দশকে ব্যবহারিক অর্থনীতিবিদরা কুনকে তাঁদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক করে তোলেন এবং বইটি দ্রুত বেস্টসেলারের তকমায় ভূষিত হয়। পদ্ধতিগত আলোচনায় নতুনত্বের জন্য বিজ্ঞানীমহলেও তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি জোটে।

উত্তম বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রয়াত পদার্থবিদ ও মহাকাশবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং চারটি শর্তের কথা তাঁর The Grand Design বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন। হকিংয়ের মতে সর্বজনস্বীকৃত তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করার সময় একজন বিজ্ঞানীর চারটি শর্ত মনে রাখা প্রয়োজন : প্রথমত তাঁর তত্ত্বটি নান্দনিক গুণাগুণ সম্পন্ন হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, সেই তত্ত্বকে যে-কোনও ব্যাখ্যা বা মতামতের সাথে যেমন-খুশি জুড়ে দেওয়া ও খাপ খাওয়ানো যাবে না। অর্থাৎ Flexibility এখানে খামখেয়ালি ও যাচ্ছেতাই বিষয় হতে পারবে না। তৃতীয়ত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে সংঘটিত পর্যবেক্ষণ-পরীক্ষণকে তত্ত্বটি সমর্থন করবে এবং পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল ও ব্যাখ্যার সঙ্গে তার সাযুজ্য থাকবে। সর্বোপরি সেই তত্ত্বের মধ্যে ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। এই চারটি শর্তের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ কোনও তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা অন্তত বিজ্ঞানের জন্য বিবেচ্য হতে পারবে না।

বিজ্ঞানের কাজের ধারা বিবেচনায় হকিংয়ের শর্তগুলো মোটের ওপর যথাযথ হলেও থমাস কুনের আলোচনার সাথে তারা সাংঘর্ষিক এমন কিন্তু নয়। কারণ বাতিল-হওয়া তাত্ত্বিক প্রস্তাবনাকে সেখানে হকিং-নির্ধারিত শর্তের পরিসরে যেমন যাচাই করা সম্ভব, যাচাইয়ের পর খারিজ বা বাতিল হলেও পুনর্বিবেচনার পৃথক পরিসর থেকে সেই তত্ত্ব নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সুযোগ থেকেই যায়,  যার নেপথ্যে Nothing is ultimate fair for any scientific theory-র ভাবনা থমাস কুনের চেতনার পালাবদল সংক্রান্ত তত্ত্বে বহমান থাকে। যেহেতু আমাদের মনে রাখতেই হয় স্বীকৃত পন্থায় তত্ত্বকে যাচাই করা বিজ্ঞানের জন্য অনিবার্য হলেও বিজ্ঞান প্রথমত কোনও বিশ্বাসের প্রতিনিধি নয়; বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া (Continual Process) এবং সে-কারণে বাতিল প্রস্তাবনাও সময়ের পালাবদলে সেখানে নতুন করে প্রাসঙ্গিক গণ্য হতে পারে।

সে-যাকগে, লুক মন্টাগনিয়ারকে থমাস কুন প্রণীত চেতনার পালাবদল সংক্রান্ত বক্তব্যের সাপেক্ষে আকর্ষণীয় উদাহরণ রূপে ভাবা যেতে পারে। বিজ্ঞানের বিশ্বজনীন স্বীকৃত পন্থার বাইরে যাওয়ার কারণে তাঁকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিরক্তি ও উষ্মা কাজ করছে। কোভিড-১৯’র বেলায় তাঁর দাবিটি যে-কারণে বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের এতটা খেপিয়ে তুলেছে! বিদ্যমান অস্বস্তির মধ্যে এই শঙ্কাটি যোগ হয়েছে,-কোভিড-১৯’এ HIV-র জিনোম সিকোয়েন্সের উপস্থিতি বিষয়ে মন্টাগনিয়ারের বক্তব্য শুধু অতিরঞ্জনের বহিঃপ্রকাশ তা নয়, সাধারণ বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেচনার ঘাটতি সেখানে প্রকটভাবে চোখে লাগে। এই ঘাটতি প্রকারান্তরে তাঁকে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসীদের মিত্রে পরিণত করেছে এবং নিজেকে রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তিনি করে দিয়েছেন। মিথ্যে নয়, অণুজীব গবেষণায় নোবেলজয়ী একজন বিজ্ঞানীর বক্তব্যকে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসীরা উদ্দেশ্যমূলক অর্থে ব্যবহার করতেই পারেন এবং অনেকে সে-কাজটি করছেনও। মন্টাগনিয়ারের সহযোগী গবেষক ক্লদ পেরেজ তাঁর গবেষণাপত্রের প্রাথমিক খসড়ায় কোভিড-১৯’র জিনোম সিকোয়েন্সে HIV-র সন্নিবেশ (Insertion) বিষয়ক গাণিতিক বিন্যাস প্রকাশের পর থেকে বিশেষজ্ঞ ও কৌতূহলী আমজনতা বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলশ্রুতিতে লোকের উপহাস ও তিরস্কার দুজনের ওপর সমানে বর্ষিত হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ 20 Minutes নামক ফরাসি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মন্তব্যবিভাগে পাঠকদের বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। জনৈক পাঠক তার মন্তব্যে মন্টাগনিয়ারকে বার্ধক্যে-আক্রান্ত উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘তাঁর বক্তব্যে যদি ছটাক পরিমাণ বিশ্বাসযোগ্যতা থাকত তাহলে আপনাদের কি মনে হয় না ট্রাম্প সুযোগটি লুফে নিত না?…এটা কি আজব নয়, বিশ্বের কোনও দেশই বিষয়টি নিয়ে সরব হচ্ছে না?’ আরেক পাঠক জাঁ-ক্লদ-পেরেজের গাণিতিক মডেলকে ‘জনৈক ছদ্মগণিতবিদের উদ্বেগজনিত খামখেয়াল’ বলে মন্তব্য ঠুকেছেন। পাঠকদের অনেকেই পেরেজ ব্যবহৃত Fibonacci Numbers পদ্ধতির সাহায্যে জিনোম সিকোয়েন্সের গাণিতিক মডেল নিয়ে সংশয় ও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। গাণিতিক এই পদ্ধতির সাহায্যে RNA (Ribonucleic Acid) ও DNA (Deoxyribonucleic Acid) জিনোম সিকোয়েন্স কতটা নির্ভরযোগ্য ফলাফল দিতে পারে সে-নিয়ে মতান্তর রয়েছে।

পাঠকদের এহেন প্রতিক্রিয়ার জবাবে অন্য এক পাঠক লিখেছেন, ‘একমাত্র ফ্রান্সেই বেনামি লোকজন বিশ্বের প্রথমসারির একজন সংক্রমণবিশেষজ্ঞ ও নোবেলজয়ী ব্যক্তিকে নিয়ে রসিকতা করতে পারে।’ তার মন্তব্যের জের ধরে মন্টাগনিয়ারকে উপহাস করার পাশাপাশি ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী দিদিয়ের রাউল্ট ও মনতানিয়ে’র প্রসঙ্গ টেনেছেন অনেকে। উঠে এসেছে গবেষণায় ক্ষতিকর অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ তৈরিতে রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক বিজ্ঞানীদের প্রণোদিত ও প্ররোচিত করার বিষয়টি। সোজা কথায় মন্টাগনিয়ার ও পেরেজের বক্তব্যকে হাস্যকর সরলীকরণ হিসেবে দেখছেন সকলে।

HIV ছেড়ে মন্টাগনিয়ার বলা-কওয়া নেই হঠাৎ কেন কোভিড-১৯ নিয়ে পড়লেন সে-প্রশ্নও উঠেছে। কোভিড নিয়ে Cognitive Dissonance অর্থাৎ নিজের মত এবং বিশ্বাসের অনুকূল নয় এমন মতামতকে খারিজ করার প্রবণতা সকলের মধ্যে কমবেশি আসর করেছে সেটা বুঝতে তাই অসুবিধা হয় না। ইংরেজ অণুজীবগবেষক জুন আলমেইদার ক্ষেত্রে ষাটের দশকে এমনটি ঘটেছিল। নিজের উদ্ভাবিত আণুবীক্ষণিক যন্ত্রে করোনাভাইরাস শনাক্তের দাবি করেছিলেন তিনি। সেকালের বিজ্ঞানীমহল বিষয়টিকে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের Cognitive Dissonance-এ স্থিরসংকল্প থাকার কারণে আলমেইদা ভাইরাসের যে আণুবীক্ষণিক প্রতিলিপি বিজ্ঞানীমহলে উপস্থাপন করেছিলেন সেটা তখন ধোপে টেকেনি। অণুজীবগবেষকরা সকলে কমবেশি জুন আলমেইদার প্রতিলিপির মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলেন। মন্টাগনিয়ার হয়তো সেই ইতিহাস স্মরণ করে চুপচাপ বসেছিলেন।

সমস্যা হলো লুক মন্টাগনিয়ার তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে এখন অবধি অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ কোনও গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি। যদিও তিনি এবং পেরেজ দুজনেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্রটি তাঁরা অচিরে প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। হতে পারে ভারতীয় গবেষকদের কথা ভেবে তিনি প্রথমে নীরব থাকা শ্রেয় ভাবছিলেন। সার্স গ্রোত্রের ভাইরাস কোভিড-১৯’এ HIV-র উপস্থিতি ওই গবেষকদল আগেই লক্ষ করেছিলেন। তাঁদের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে এর গাণিতিক ও যৌক্তিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে তাঁরা সবিস্তার লিখেছেনও। যদিও বিজ্ঞানীমহল সেটাকে ‘অতিরঞ্জন’ বলে ইতোমধ্যে নাকচ করেছেন। ইংরেজ অণুজীব গবেষক ট্রেভর ব্র্যাডফোর্ড তাঁর টুইটারবার্তায় ভারতীয় গবেষকদের দাবিকে সোজাসাপটা বাতিল করেছেন। তাঁর মতে একটি ভাইরাসের মধ্যে অন্য আরেকটি ভাইরাসের জিনোমগত গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রাকৃতিকভাবে এটা অনেকসময় ঘটে থাকে। জিনোমগত প্রকৌশলের সাহায্যে কোনও ভাইরাসের প্রোটিন-আবরণে অন্য ভাইরাসের সংযুক্তি ঘটানো যায় না এমন নয়, তবে ল্যাবে বসে কাজটি সম্পাদন অতীব দুরূহ। এছাড়া HIV বা এ-রকম ভাইরাসের জিনোমগত বৈশিষ্ট্য অন্য ভাইরাস মিউটেশন বা পরিব্যক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করতেই পারে। সুতরাং করোনাভাইরাসে HIV জিনের কিয়দাংশের সংযুক্তি ঘটেছে দেখে বিরাট হাইপোথিসিস ফেঁদে বসা মানুষের মনে আতঙ্কই ছড়াবে শুধু। ব্র্যাডফোর্ড বিষয়টিকে HIV নিয়ে আরেকটি ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ধারাবাহিকতা বলে একরকম উড়িয়েই দিয়েছেন।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম CNEWS-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় অণুজীবগবেষক ও মানবজিনতত্ত্ব গবেষণা সংস্থার পরিচালক মনসেফ বেনকিরেনও ব্র্যাডফোর্ডের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ভারতীয় গবেষকদল এবং মন্টাগনিয়ার-পেরেজ জুটির বক্তব্যকে ভ্রান্ত বলে একহাত নিয়েছেন। বেনকিরেন এক্ষেত্রে বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত দুটি নিবন্ধের উদাহরণ দিয়েছেন। ল্যাব পর্যায়ে সার্স কোভিড-২’র জিনোমে HIV সংযুক্তির প্রমাণ উক্ত গবেষকরা নাকি খুঁজে পাননি। বেনকিরেন তাঁর বক্তব্যে জানাচ্ছেন, সার্স কোভিড-২ নিউক্লিয়িক অ্যাসিডের রসায়নে সৃষ্ট একটি RNA ভাইরাস। কম্পিউটারে RNA ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণে ব্যবহৃত থ্রিডি মডেলিংয়ে বিজ্ঞানীরা চারটি বর্ণ A (অ্যাডেনিন), U (ইউরাসিল), C (সাইটোসিন) ও G (গুয়েনিন)-এর সমাবেশ ও প্রতিসমাবেশ কীভাবে নিউক্লিয়িক অ্যাসিডের শিকল তৈরি করছে সেটাকে সচরাচর বিবেচনা করে থাকেন। এখন অন্য ভাইরাসের জিনোমে এ-রকম দুই বা একাধিক বর্ণের সমাবেশ ও প্রতিসমাবেশ থেকে তৈরি শিকল বা জেনেটিক ব্যাচের অস্তিত্ব রয়েছে কি না সেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। যদি একইরকম ব্যাচের উপস্থিতি পাওয়া যায় তার মানে কিন্তু এই নয় দুটি ভিন্ন ভাইরাস সমপ্রকৃতির জিনোম বহন করছে বা পরস্পরের মধ্যে জিনোমের সিকোয়েন্সটি তারা বিনিময় করেছে। ব্যাপারটি প্রাকৃতিক কারণেও ঘটতে পারে। ‘আমি বই পড়ি’ ও ‘আমি টিভি দেখি’ এই দুটি বাক্যের মধ্যে ‘আমি’ শব্দটি সাধারণভাবে উপস্থিত। কিন্তু দুটি বাক্য যে-ক্রিয়াকে নির্দেশ করছে তারা ভিন্ন। কোভিডের ক্ষেত্রে HIV-র উপস্থিতি যদি ঘটেও থাকে সেটা ওই ‘আমি’ শব্দের সাধারণ উপস্থিতির চেয়ে বেশি গুরুতর কিছু নয়।

বিজ্ঞানীমহলের এহেন মনোভাবের কারণে ভারতীয় গবেষকদল তাঁদের গবেষণাপত্রটি সাইট থেকে প্রথমে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য অন্য একটি সাইটে তাঁরা এটি পুনরায় প্রকাশ করেন। মন্টাগনিয়ার ও পেরেজের মতের সমর্থকদের ধারণা অদৃশ্য চাপে তাঁরা গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে-যাহোক, 20 Minutes-এর ভাষ্য মোতাবেক খ্যাতনামা চিকিৎসক ও অণুজীবগবেষক জেরার্ড গুইল্যুম দশকেরও বেশি সময় মন্টাগনিয়ারের সঙ্গে গবেষণাগারে কাজ করেছেন। বয়োবৃদ্ধ এই বিজ্ঞানী বিগত মার্চ মাস থেকে কোভিডের জিনোম সিকোয়েন্সের থ্রিডি মডেলিং নিয়ে কম্পিউটারে কাজ করছেন এবং বারবার পরীক্ষার পরেও (মোট ৮৮ বারের মধ্যে ৮৭ বার) কোভিডের জিনোম বিন্যাসে HIV-র ক্ষুদ্র একটি সিকোয়েন্সের উপস্থিতি পাচ্ছেন জেরার্ড সেটা জানতেন। এপ্রিল মাসে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে মন্টাগনিয়ারের সঙ্গে এ-বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত আলাপ হয়। জেরার্ড তাঁকে জিগ্যেস করেন নিজের এই আবিষ্কার নিয়ে তিনি কেন ঘরে একলা বসে রয়েছেন? তাঁর উচিত মিডিয়াকে বিষয়টি জানানো। পরবর্তীতে তাঁর হয়ে তিনি সেই ব্যবস্থাটি করে দেন। জেরার্ডের কেন যেন মনে হয়েছিল মন্টাগনিয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে দ্বিধা ও অস্বস্তিতে ভুগছেন। যদিও বৃদ্ধ বিজ্ঞানী তাঁকে তৎক্ষণাৎ শুধরে দিয়েছিলেন, ‘দেখো, আমার বয়স ৮৭ চলছে এবং ভবিষ্যৎ পেছনে ফেলে এসেছি; সুতরাং আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

ওদিকে পেরেজ জানিয়েছেন কোভিড-১৯’র জিনোম সিকোয়েন্সের গাণিতিক বিন্যাস নিয়ে রচিত তাঁর গবেষণাপত্র নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠার মুহূর্তে যে-সাইটে এটি প্রকাশিত হয়েছিল সেখান থেকে মুছে দেওয়া হয়। কোভিড-১৯ কোনওভাবেই ল্যাবসৃষ্ট নয়,-চীনের উহান ল্যাবের এই দাবি তখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছিল। পেরেজের ধারণা, তাঁর গবেষণাপত্র সাইট থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পেছনে এর কোনও ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। গবেষণাপত্রটি পরে অন্য একটি সাইটে পেরেজের সংযোজক বক্তব্য সহ পুনরায় প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের যৌথ অনুসন্ধান কোভিড-১৯’র জিনোম বিশ্লেষণের প্রথম ধাপে ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স অর্থাৎ নিউক্লিয়িক অ্যাসিড শৃঙ্খলের অন্তত তিনটি পৃথক অঞ্চলে HIV-1-র উপস্থিতি এবং দ্বিতীয় বা পরবর্তী ধাপে আরও তিনটি অঞ্চলে HIV-2 ও SIV (Simian Immunodeficiency Virus) জিনোমের উপস্থিতি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সেইসঙ্গে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, উহানের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজার থেকে ছড়িয়ে-পড়া এবং নিউমোনিয়ার মারি সৃষ্টিকারী সার্স গোত্রের ভাইরাস কোভিড-১৯’র জিনোমগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পূর্ববতী সার্স ভাইরাসগুলোর বিলক্ষণ তফাৎ রয়েছে।

প্রসঙ্গত মনে রাখা প্রয়োজন ভারতীয় গবেষকরাও তাঁদের গবেষণাপত্রে পেরেজের অনুরূপ বক্তব্য নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। উক্ত গবেষণাপত্রে তাঁরা কোভিড-১৯’র জিনোমে HIV-র চারটি Insertion বা সন্নিবেশ ঘটেছে বলে দাবি করছিলেন; যেটি অন্যান্য করোনাভাইরাসে নাকি পাওয়া যায়নি। গবেষণাপত্রের উপসংহারে তাঁদের মন্তব্যের সারসংক্ষেপটি উদ্ধৃত করা প্রয়োজন। সেখানে তাঁরা বলছেন :

Our analysis of the spike glycoprotein of 2019-nCoV revealed several interesting findings: First, we identified 4 unique inserts in the 2019-nCoV spike glycoprotein that are not present in any other coronavirus reported till date.

পেরেজও একই সুরে জানিয়েছেন অন্যান্য সার্স করোনাভাইরাস জিনোমে HIV-1-র এহেন উপস্থিতি কখনও ঘটেনি, যেটি কোভিড-১৯’র জিনোম সিকোয়েন্সে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন। জিনোমের মোট ব্যাপ্তির ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল অর্থাৎ এক-শতাংশ জুড়ে HIV-1, 2 ও SIV-র উপস্থিতি প্রাকৃতিক পরিব্যক্তির মাধ্যমে ঘটেছে বলে তাঁদের প্রত্যয় হয় না। এটি একদিক থেকে কোভিড-১৯’র জিনোমগত পরিব্যক্তি ও অভিযোজন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মনে হলেও ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্সের ২৭৫টি Base pair (bp)-র মধ্যে ১৬৯ নাম্বার Base Pair-এ উচ্চমাত্রায় সংক্রমণের ঝুঁকি বহনকারী ৬টি HIV/SIV-র সংযুক্তি মনে ভয় জাগিয়ে তোলে। পেরেজ তাঁর গবেষণাপত্রে মন্তব্য করেছেন :

To adapt to the disorder of its DNA resulting from the insertion of the 6 HIV / SIVs, the COVID-19 genome has most certainly increased its level of global organization by adaptation mutations…And we will now have to fear that this genome will continue to mutate in order to optimize its overall level of organization.

কোভিড-১৯’এ সংঘটিত মিউটেশন বা পরিব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিসৃষ্ট নয়; বরং ঔষধনির্মাতা প্রতিষ্ঠানের হয়ে নতুন ভ্যাকসিন তৈরির প্রয়োজনে করোনাভাইরাস গোত্রের অণুজীব নিয়ে গবেষাণাগারে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাবশত এটি বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল :— পেরেজ ও মন্টাগনিয়ার তাঁদের এই দাবির সপক্ষে প্রামাণিক দলিলপত্র এখনও হাজির করতে পারেননি। ওদিকে কেভিড-১৯ যদি সম্পূর্ণ প্রকৃতিসৃষ্ট ভাইরাস হয়েও থাকে সেক্ষেত্রে তার উৎস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে শুরু থেকেই দ্বিমত রয়েছে। ভাইরাসটি বাদুড় থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও অনেকে আবার বাদুড় থেকে পেঙ্গোলিন হয়ে এটি মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে বলে মত দিচ্ছেন।

চিনের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য ব্যাপক হওয়ার কারণে পশুখাদ্যের বাজারে বন্য প্রাণীর বিচিত্র সমাবেশ ও মানুষের সঙ্গে তাদের সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। একাধিক প্রদেশে বহু বছর ধরে সাপ, বেজি, বাদুড় ও পেঙ্গোলিন সুস্বাদু খাবার হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। পৃথক প্রজাতির বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীর একত্র সমাবেশ ক্ষতিকর অণুজীবের এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি এমনিতেই বাড়িয়ে তোলে। তদুপরি উক্ত প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান পরিস্থিতিকে যে-কোনও সময় নাটকীয় ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। সুতরাং উহানের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজার থেকে কোভিড-১৯’র অতিমারিরূপে ছড়িয়ে-পড়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

এখানে যেটি অস্বাভাবিক সেটি হচ্ছে এর মিউটেশন বা পরিব্যক্তির ধরন। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বহু দেশে এখনও এর জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে কোনও গবেষণা হয়নি। দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে-পড়ার ক্ষেত্রে ভাইরাসটি তার স্বরূপে কী পরিবর্তন ঘটাচ্ছে সে-সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণায় পৌঁছাতে হলে এর দেশ তথা অঞ্চল ভিত্তিক সংক্রমণের ধরন, রোগের প্রাক ও পরবর্তী লক্ষণ ইত্যাদির তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি। দেশভিত্তিক জিনোম সিকোয়েন্সের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া কোভিড-১৯ সম্পর্কে মারিবিশেষজ্ঞ ও অণুজীবগবেষকরা এখন পর্যন্ত যেসব মত দিয়েছেন তার সবগুলো কমবেশি বিবেচনায় রাখতেই হচ্ছে। মন্টাগনিয়ার ও পেরেজের বক্তব্যও সে-কারণে ভ্রান্ত ও ছদ্মবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক বলে বাতিল করার আগে আরেকবার খতিয়ে দেখা উচিত।


বিগত দুই দশকে মানবদেহে বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু, সার্স, মার্স ও ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিবেচনা করলে বলতেই হচ্ছে মোটের ওপর সবগুলো রাষ্ট্র মহামারি ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রস্তুতি, জনসচেতনা তৈরি ও সতকর্তা গ্রহণের ব্যাপারে কমবেশি উদাসীন ছিল। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে-থাকা পশুখাদ্যের বাজারগুলো চরম অস্বাস্থ্যকর। স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতার কোনও বালাই সেখানে নেই। সুতরাং কোভিড-১৯ প্রাকৃতিক উপায়ে মানবদেহে ছড়িয়ে-পড়ার পেছনে শক্ত যুক্তি রয়েছে। শঙ্কার বিষয় হলো ভাইরাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে যেসব রা্ষ্ট্র অনেক বেশি সক্রিয় ও তৎপর তাদের সকলের ল্যাবসুরক্ষার গুণগত মান একরকম নয়। উহানের গবেষণাগারটিও তথৈবচ। এর সুরক্ষার মান ও গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো প্রশ্ন উঠিয়েছে।

Newsweek-এ Fred Guterl, Naveed Jamali ও Tom O’connor সম্প্রতি এ-নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ফেঁদেছেন। উক্ত প্রতিবেদনে তাঁরা এই দাবি অবশ্য করেননি জৈব-মারণাস্ত্র তৈরি বা এহেন কোনও উদ্দেশ্যে উহানের ল্যাব থেকে কোভিড-১৯ ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটেছে এবং পরে দুর্ঘটনাবশত বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে-রকম সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁরা পাননি বলে প্রতিবেদনে পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন। বহির্বিশ্বে তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে চীন সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রামাণিক তথ্য-প্রমাণ উদ্ধার করা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার নামান্তর যদিও! যথাসম্ভব সতর্কতা ও নির্ভরযোগ্য উৎস ব্যবহার করে রচিত প্রতিবেদনটি অবশ্য কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাঠকের নজরে এনেছে :

  • চীন সরকার প্রথম থেকেই উহানের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজারে পশুদেহের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সহাবস্থানের কারণে কোভিড-১৯’র বিস্তার ঘটেছে বলে দাবি করে আসছিল। সংক্রমণের আদি পর্যায়ে যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা ওই বাজারে যাতায়াতের কারণে আক্রান্ত হয়েছেন বলে প্রচার করা হচ্ছিল। যদিও মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি ও একদল চীনা গবেষকের যৌথ অনুসন্ধান এক্ষেত্রে বিপরীত তথ্য দিয়েছে। তাঁরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমিত হয়েছিলেন এমন ৪১ জনের মধ্যে ৩৩ শতাংশের উহানের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের বাজার বা পশুদেহের সাথে কোনওপ্রকার সাক্ষাৎ সংযোগ ছিল না। ওই বাজারে যারা গিয়েছিলেন ও পরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের কারও সঙ্গে উক্ত ৩৩ শতাংশের কোনও সংযোগ ঘটেনি। তবু তারা সেই সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ভাইরাসটি সংক্রমণের আদি পর্বে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। সেক্ষেত্রে উহানের ভাইরোলজি গবেষণাগারের কিছু-একটা ঘটেছিল বলে সন্দেহ থেকেই যায়।
  • বিগত পাঁচ বছর যাবত উহানের ভাইরোলজি গবেষণাগারে GOF (gain of function) নামক পদ্ধতির সাহায্যে বিভিন্ন প্রজাতির ভাইরাস কীভাবে মানবদেহে সংক্রমিত ও মহামারি সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রাখে সে-সম্পর্কে গবেষণায় লিপ্ত ছিল। উক্ত গবেষণায় সার্স মহামারি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস গোত্রের অণুজীবকে স্যাম্পলরূপে ব্যবহার করা হয়েছিল। গবেষণাকালে ভাইরাসের চরিত্র বদল ও ল্যাব থেকে দুর্ঘটনাবশত বেরিয়ে-পড়াটা তাই অস্বাভাবিক নয়। Newsweek-এর প্রতিবেদকরা এ-প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনেছেন। এ-রকম একাধিক ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভাইরাস সংক্রান্ত গবেষণাগারে অতীতে ঘটেছে। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অনুদানে পরিচালিত গবেষণাগার থেকে এ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণু বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তাৎক্ষণিক ৮৪ জন এতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বেইজিংয়ের ল্যাব থেকেও সার্স ভাইরাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা অতীতে ঘটেছে। যদিও বিপজ্জনক হওয়ার আগেই সেটাকে দমন করা সম্ভব হয়েছিল। সেইসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন গুয়ানডং প্রদেশে সার্স ছড়িয়ে-পড়ার তথ্য চীন সরকার সেই সময় প্রায় চারমাস গোপন রেখেছিল। এই ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে ল্যাবে যারা কাজ করেন তারা প্রথমত আক্রান্ত হন অথবা এর বাহকে পরিণত হন। উহানের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি সেটা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
  • অণুজীব গবেষণার ক্ষেত্রে ল্যাবে সচরাচর সুরক্ষার সকল ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গবেষণার ধরন ও পদ্ধতির কারণে অনেকসময় ভাইরাস বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণাগারে মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাস তৈরি করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। হল্যান্ডের এরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রন ফুচিয়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে বার্ড-ফ্লু’র বাহক H5N1 ইনফ্লুয়েঞ্জাকে Animal Passage পদ্ধতির সাহায্যে নেউল প্রজাতির মধ্যে সংক্রমিত করে নতুন মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাস তৈরি করেছিলেন :— Newsweek-এর প্রতিবেদনে সেই প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। Science জার্নালে ফুচিয়েরের গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার পর তৎকালীন ওবামা প্রশাসন এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে গবেষণাগারে এ-ধরনের গবেষণা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। যদিও ফুচিয়ের Nature সাময়িকীতে সংক্রমণজনিত গবেষণায় GOF কেন অপিরহার্য সে-সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরার পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে মার্কিন সরকার গবেষণায় সৃষ্ট ভাইরাসের ক্ষেত্রে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ভ্যাকসিন তৈরির শর্তে গবেষণার অনুমতি বহাল রাখেন।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কমপক্ষে ৩০টি এ-রকম ল্যাব রয়েছে যেখানে GOF পদ্ধতির মাধ্যমে Animal Passage কীভাবে পশুদেহে সংক্রমণ ছড়ায়, সংক্রমণের মাত্রা Respiratory-tract pathogens সৃষ্টিতে কতটা ভূমিকা রাখে এবং এর প্রতিষেধক কীভাবে তৈরি করা যায় ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করে থাকে। আসন্ন কোনও মহামারি প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য এ-রকম গবেষণার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এতে বিপদের ঝুঁকি থেকেই যায়। উহানের ক্ষেত্রে যে এমনটি ঘটেনি সেটা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনও আসেনি। যেহেতু চীনের ভাইরাসগবেষণায় দক্ষ টেকনিশিয়ানের অপ্রতুলতা ছাড়াও সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

Newsweek-এর এই প্রতিবেদন অন্যভাবে লুক মন্টাগনিয়ারকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। HIV গবেষণায় কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির জন্য বিশ্বের বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মরিয়া প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে মন্টাগনিয়ার গোড়া থেকেই সক্রিয় রয়েছেন। ভ্যাকসিনের বিকল্প হিসেবে মানুষের পুষ্টিমান বৃদ্ধি ও ভিটামিনের উৎস প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তৈরি Antioxidants-র মাধ্যমে HIV প্রতিরোধের কার্যকর পন্থা আবিষ্কারের কথা তিনি বহুবার বলেছেন। প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত High Diet Source ব্যবহার করে তৈরি Antioxidants-এর মানবকোষে কার্যকারিতা নিয়ে অবশ্য বিস্তর মতভেদ ও আপত্তি রয়েছে। যেহেতু গবেষণায় এর কার্যকারিতা এখনও সফলভাবে প্রমাণিত নয়।

সে-যাহোক, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির বিরুদ্ধাচারণ যে-রাজনীতির বাতাবরণ তৈরি করে থাকে মন্টাগনিয়ারকে তার শিকার হিসেবে ভাবা যেতেই পারে। যে-কারণে তাঁর প্রাকৃতিক উপাদান নির্ভর গবেষণাপদ্ধতি (যেখানে তিনি আয়ুর্বেদ বা হোমিওপ্যাথকে বিবেচনায় রাখতে প্রস্তুত) বিজ্ঞানীমহল সহ অনেকেই সমালোচনার তূণে বিদ্ধ করতে পিছপা হননি। এটা শুধু Cognitive Dissonance-এর সমস্যা এমনটি নয়, বিশ্ব জুড়ে জনস্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্র ও বহুজাতিক পুঁজির খেলবাজির অংশও বটে। যেখানে মন্টাগনিয়ারের মতো বিজ্ঞানীরা মিত্র নয় বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বয়োবৃদ্ধ এই বিজ্ঞানীকে ক্রমশ একঘরে করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে পুনর্বিবেচনার আগেই তাঁকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও বহুজাতিক-পুঁজিশাসিত বিজ্ঞান নিজের মহিমা ও অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন।


ভ্যাকসিন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতি কত মর্মান্তিক হতে পারে সেটা আফ্রিকার দেশগুলোর খবর করলে বোঝা যায়। রোগপ্রতিরোধী ও জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন গ্রহণে আফ্রিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও নানা কুসংস্কার ও অনীহা রয়েছে এটা সত্য; বিপরীতে পশ্চিমা রাষ্ট্র বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভ্যাকসিনের ক্ষতিকর অপপ্রয়োগের নজিরও কম নেই। সেদিন ফেসবুক নিউজফিডে আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা এক ভদ্রলোকের পোস্টে চোখ আটকে গেল। তাঁর পোস্টে অজ্ঞাতনামা চিত্রকরের আঁকা একটি ছবি তিনি শেয়ার করেছিলেন। ছবির বিষয়বস্তু কৌতূহল-উদ্দীপক। পশ্চিম থেকে আগত ভ্যাকসিনেটর আফ্রিকানিবাসী এক মহিলার শিশুকে ভ্যাকসিন দিতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। মহিলাটি ভ্যাকসিনেটরের গলায় ছুরি ঠেকিয়ে তাকে প্রতিহত করতে চাইছেন। তার মুখের রেখায় অমলিন বিষাদ ও কাঠিন্য মিলেমিশে শিল্পীর তুলিতে আাঁকা ছবিটি যেন অন্যকিছুর আভাস দিচ্ছিল।

ছবিটি কী ইঙ্গিত করছে সে-সম্পর্কে পোস্টদাতা সকলের মন্তব্য জানতে চাইছিলেন। মন্তব্যের তালিকায় আফ্রিকা ছাড়াও পশ্চিমের নাগরিকরা ছিলেন। ছবিটিকে ভ্যাকসিন গ্রহণে আফ্রিকানদের সহজাত ভীতি ও সংস্কারের প্রতিচ্ছবি বলে অনেকে দাগাতে চাইলেও একাধিক মন্তব্যে ছবির পেছনে নিহিত রাজনীতির বিষয়টি চাপা থাকেনি। আফ্রিকাবাসীদের সহজাত প্রকৃতি-নির্ভর জীবনযাপন ও নিজেকে রোগবালাই থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রাকৃতিক পদ্ধতির সঙ্গে পশ্চিম থেকে আগত চিকিৎসাপদ্ধতির সাংঘর্ষিক ইতিহাসের বয়ান পশ্চিমনিবাসী একাধিক মন্তব্যকারীর মন্তব্যে উঠে আসছিল। সেই সূত্রে জানা গেল পশ্চিমা ধাঁচের নগরায়ন কীভাবে আফ্রিকার মানুষগুলোকে তাদের গোষ্ঠীভিত্তিক অরণ্যসংলগ্ন জীবনযাপনের সংস্কৃতি থেকে শুধু দূরের করে তোলেনি, তাদের সহজাত রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতাকে আমূল পালটে দিচ্ছে।

আফ্রিকা মহাদেশে একাধিক মারি সৃষ্টিকারী অণুজীব বিস্তারের নেপথ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর ঔপনিবেশিক শাসনের অবদান যেমন রয়েছে, ইবোলার মতো সাম্প্রতিক মহামারি প্রতিরোধে সৃষ্ট ভ্যাকসিন প্রয়োগের সময় বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক মানসম্মত ভ্যাকসিনের পরিবর্তে নিম্নমানের অথবা অকার্যকর ভ্যাকসিন সরবরাহ ও প্রয়োগের রাজনীতি আফ্রিকায় যথারীতি বহাল রয়েছে। লুক মন্টাগনিয়ার কেন অ্যালোপেথিকের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির পাশাপাশি বিতর্কিত হার্বাল বা হোমিওপ্যাথির জন্য গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করার পক্ষে সাফাই গাইছেন তা বুঝতে হলে বহুজাতিক পুঁজির আগ্রাসী স্বার্থের রাজনীতি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর পথ হয়তো ছদ্মবিজ্ঞানকে উৎসাহিত করার দুয়ার খুলে দিয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞান দিয়েই-বা কি হবে যদি তা বহুজাতিক পুঁজির ভাড়া খাটতে নিজের মেধাস্বত্ব বিক্রি করে? কথাটি বিজ্ঞানবিরোধী শোনালেও করোনা-সংকটের এই ক্ষণে মানুষের জীবনযাপনের সামগ্রিক সংস্কৃতি ও তার নেপথ্যের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার সময় হয়েছে।


প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র ঋণস্বীকার :

১. The Structure of Scientific Revolutions by Thomas S. Khun, The University of Chicago Press, 1962; PDF: Stanford Archives;

২. Grand Design by Stephen Hawking and Leonard Mlodinow, Bantom Books, 2010; PDF: academia.edu;

৩. No, the coronavirus was not created from HIV, contrary to what Professor Luc Montagnier claims by Alexis Orsini; April 17 20; Web Source: 20 Minutes.fr;

৪. She discovered coronaviruses decades ago-but got little recognition by Sydney Combs, April, 2020; nationalgeographic.com;

৫. The proximal origin of SARS-CoV-2 by Kristian G. Andersen, Andrew Rambaut, W. Ian Lipkin, Edward C. Holmes & Robert F. Garry; Web Source: Nature.com;

৬. Uncanny similarity of unique inserts in the 2019-nCoV spike protein to HIV-1 gp120 and Gag by Prashant Pradhan, Ashutosh Kumar Pandey, Akhilesh Mishra, Parul Gupta, Praveen Kumar Tripathi, Manoj Balakrishnan Menon, James Gomes, Perumal Vivekanandan, Bishwajit Kundu; Web Source biorxiv.org;

৭. Wuhan COVID-19 synthetic origins and evolution by Jean-Claude Perez; Web Source: zenodo.org;

৮. The controversial experiments and Wuhan lab suspected of starting the coronavirus pandemic by Fred Guterl , Naveed Jamali ও Tom O’connor, Web Source: Newsweek, April 27, 2020;

… …

COMMENTS

error: