চেতনার পালাবদল ও করোনা প্রসঙ্গ ২ || আহমদ মিনহাজ

চেতনার পালাবদল ও করোনা প্রসঙ্গ ২ || আহমদ মিনহাজ

SHARE:

সহাবস্থানের সংস্কৃতি নাকি আত্মস্বার্থের রাজনীতি : গাইয়া ইকোলজি সমাচার


করোনা-পরবর্তী বিশ্ব ব্যক্তিস্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ঐকতান রচনার ভাবনায় মন দিলে মানবজাতি তথা সমগ্রের উপকার হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও সেই লক্ষণ বিশ্বের সর্বত্র অনুপস্থিত। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, তবে মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে ঐকতান রচনার লড়াইয়ে যারা জুগালি খাটছেন তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়তো আরও বেশি জরুরি। পরিবেশবিজ্ঞানী জেমস লাভলক তাঁর গাইয়া হাইপোথিসিসে (Gaia hypothesis) স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের জীবনচক্রের দেখভাল করতে সক্ষম পৃথিবীর ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর এই পৃথিবীর নাম হচ্ছে গাইয়া। বন্ধু ও প্রতিবেশী নোবেলজয়ী ইংরেজ লেখক উইলিয়াম গোল্ডিং তাঁকে নামটি রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বন্ধুর পরামর্শে সেই থেকে লাভলক গ্রিক ধরিত্রীদেবীর নামে পৃথিবী এবং তার জীবনচক্রকে গাইয়া নামে ডেকে চলেছেন। এ হলো সেই পৃথিবী যে তার জন্মলগ্ন থেকে দিবাকরের সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণের ভারসাম্য বজায় রেখে এখনও জীবিত। এটা সেই গাইয়া নামের পৃথিবী যে তার দেহের তাপমাত্রাকে জীবনচক্রের প্রয়োজন অনুসারে স্বয়ংক্রিয়তায় স্থিত রাখতে ও পুনরুদ্ধারের শক্তি রাখে। গাইয়া তাই একাধারে দেবী ও জননী। সেই দেবী ও জননীর জীবনচক্রের অংশরূপে মানুষের স্থান ও ভূমিকা নিয়ে লাভলকের মতো মিস্ত্রীরা যেসব কারুকাজ এতদিন নিভৃতে করে গেছেন, এখন বোধহয় সময় হয়েছে তা খুঁটিয়ে দেখার।

পৃথিবী নামক গ্রহের জায়গা থেকে ‘জীবন’ আসলে কী সেই হদিশের কিনারা করতে লাভলক এর জায়মান হয়ে ওঠার ইতিহাসে সফর করেছেন; এর বায়ু, মাটি, জল ও অন্তরীক্ষ জুড়ে বিরাজিত জীবনসৃষ্টিকারী পরিবেশ ও উপাদানগুলোর খবর করেছেন আদি থেকে অন্ত অবধি। সেই আদি-অন্তের খতিয়ান পাঠ করলে বোঝা যায় গাইয়া কী করে নিজের জীবনচক্রে স্বয়ংক্রিয় ও স্বনির্ভর থাকে। সে কবেকার কথা! জন্মলগ্নের ধূসর ক্ষণে জীবনের জন্য সহনীয় আলো বিকিরণে সূর্য বড় কৃপণ হয়ে পড়েছিল। কার্বন গ্যাসের পুরু কম্বলে ঢাকা বায়ুস্তর সেদিন তাকে বেঁচে থাকার ওম দিয়েছিল। সুতরাং বায়ুস্তরে কার্বনের মেঘ মানেই খারাপ বা ক্ষতিকর, গাইয়া নামের ধরিত্রীদেবীর সাপেক্ষে বিষয়টি এ-রকম নয়। এর মানে অবশ্য এই নয়, লাভলক জানেন না হালজামানায় বায়ুদূষণে মসীবর্ণ গাইয়াকে বাঁচাতে হলে কার্বন নিঃসরণের হার সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা কেন প্রয়োজন!

প্রাকৃতিক অথবা মানবিক কারণে সৃষ্ট স্বাভাবিক দূষণে লাভলকের গাইয়া ক্ষতির কারণ দেখে না। তাপগতিবিদ্যার ধরাবাঁধা নিয়মের ছকে সেই দূষণকে সে নিজের জীবনচক্রের জন্য অনুকূল করে তোলার শক্তি রাখে। কিন্তু মানুষের হুজুগে জীবনযাপন আর তার সঙ্গে তাল দিয়ে বাড়তে থাকা অগোছালো মিলকারখানার কারণে মিথেন কার্বনে আর সালফাইড যখন সালফেটে রূপ নিতে থাকে তখন সেটা গাইয়ার মনেও বিলুপ্তির শঙ্কা জাগায়। সেই রূপান্তরের পরিণামে অ্যাসিডের ঘনীভূত মেঘ তৈরি হয় বায়ুস্তরে, যার মধ্যে গাইয়া হয়তো নিজের বিনাশ ও পতনের ছায়াটি দেখতে পায়। সত্য বটে, সখি ভেনাস ও মার্স এই অ্যাসিড-বহুলতার কারণে সেই জীবনের স্বাদ এখনও পেল না যার গর্বে গাইয়া এত রঙ্গিনী ও গরবিনী।

একালের মানুষের জন্য লাভলকের গাইয়া তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা এইখানে যে এটি মানুষকে পৃথিবী কেমন করে স্বয়ংক্রিয়তার ভিতর দিয়ে নিজের জীবনচক্রকে পুনরুদ্ধার করে তা বুঝতে সাহায্য করে। এই পৃথিবী স্ব-নিয়ন্ত্রিত (Self-regulatory) স্বয়ংক্রিয়তার মাধ্যমে বারবার নবীন হয়ে ওঠে এবং আসীন হয় দেবী ও মায়ের ভূমিকায়। গাইয়াকে তাই মাতৃজননী বললেও খুব-একটা ভুল হয় না। যদিও গাইয়ার এই নবায়নের ফেরে পড়ে মানুষ যদি কোনও কারণে বিলুপ্তির সম্মুখীন হয় তাহলে তার আর ফেরার পথ নেই। মানুষের তাই মনে রাখা প্রয়োজন, গাইয়া নিজের স্ব-নিয়ন্ত্রিত জীবনচক্রকে নতুন করে ফিরে পায় ও স্থিতিশীল থাকে। সে এক ফিনিক্স! অথচ সেই জীবনচক্রের গর্ভে ভূমিষ্ট মানুষের সাধ্য নেই একবার ধ্বংস হলে পুনরায় ফেরত আসার। সুতরাং নিজে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষকে গাইয়ার রাজে চালিত জীবনচক্রটি উপলব্ধি করা এবং সেই অনুসারে জীবনযাপনের পরিবশেটি সাজানো প্রয়োজন।

লাভলকের অভিধানে এটা হলো Integration বা একীভবন। তাঁর একটাই চাওয়া, মানুষ যেন গাইয়া নামধারী এই পৃথ্বীর Self-regulatory বা স্ব-নিয়ন্ত্রিত স্বভাবের ধারা বুঝে নিজেকে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রগতির সংস্কৃতিতে পোক্ত করে তোলে। বিরোধ নয়, — ঐক্য। বিচ্ছেদ বা বিভাজন নয়, — মিলন। পরমাপ্রকৃতি মাতৃশক্তির পায়ে ভক্তিতে লুটিয়ে পড়া কিংবা এর দূষণ ঘটছে দেখে হাহাকার নয়, বরং তার সাথে সহাবস্থানের সংস্কৃতি কী করে রচনা করা যায় সেটা নিয়ে ভাবা জরুরি এখন। গাইয়া ও মানবের জীবনচক্রের এহেন গ্রন্থনা নিয়ে লাভলক সহ একদল বিজ্ঞানী বিগত কয়েক দশক ধরে বিরামহীনভাবে বলে যাচ্ছেন। শুধু মানুষের জন্য একটি মানবিক বিশ্ব তৈরি করলেই তো হবে না, মানুষ ও পৃথ্বীর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপনের ঐকতানই একমাত্র পারে পৃথিবীর জীবনচক্রে মানুষের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে। গাইয়া নিয়ে নিজের প্রথম গ্রন্থ GAIA: A New Look on Life at Earth-এ লাভলক তাই লিখেন :

গাইয়া বিষয়ক এই প্রকল্পনা তাদের জন্য যারা ধরিত্রীর বুকে পদচারণা করতে ভালোবাসেন অথবা স্রেফ সেখানে দাঁড়িয়ে পড়েন এই বিস্ময়কে অবলোকন ও অনুমান করার জন্য, — যে-জীবন এই ধরিত্রী বহন করে সেখানে আমাদের উপস্থিতির পরিণাম কী হতে পারে। এটা, সেই নৈরাশ্যবাদের বিকল্প যে কিনা প্রকৃতিকে আদিম শক্তিরূপে ভাবে তাকে দমন ও জয় করার জন্য। এটা, অধিকন্তু আমাদের গ্রহ নিয়ে চিত্রিত হতাশাজনক ছবির বিকল্প, যে-ছবি তাকে স্মৃতিভ্রষ্ট নভোযান বলে ভাবে, — সূর্যের অন্তর্নিহিত চক্রটি ঘিরে যে কিনা চিরকাল ধরে চালক ও লক্ষ্যহীনভাবে ভ্রমণ করেই চলেছে।

পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষতি-অবচয় ইত্যাদি নিয়ে আতঙ্কিত বা উৎকণ্ঠিত হওয়ার পরিবর্তে মানব-উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও জীবনধারাকে সেই অবচয় রোধে কীভাবে ব্যবহার করা যায় লাভলক সেদিকে জোর দেওয়ার কথা বিরামহীনভাবে বলে চলেছেন। তাঁর মতে, মিল-কারখানা ও মানুষের জীবনধারা থেকে উৎসারিত বিষাক্ত বর্জ্য (যেটি অতিরিক্তি অ্যাসিড নিঃসরণের উৎস); মিথেনের মাত্রা বৃদ্ধি (যেটি প্রকারান্তরে আদি পৃথিবীর সময়কার মিথেনের পরিমাণের সমতুল্য হতে চলেছে); সাগর লবণাক্তই থাকা প্রয়োজন তবে সেটা যেন বেশি লবণাক্ত না হয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কী করা যায় সেটি সকলের ভাবা উচিত। গাইয়ার স্ব-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা পরিবেশ আর মানবরচিত আবহের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের বিজ্ঞান নিয়ে লাভলকের গবেষণায় যে-অন্তর্দৃষ্টির সুলুক পাওয়া যায় সে-সম্পর্কে রাষ্ট্রসংঘকে কখনও উচ্চকিত হতে শোনা যায়নি। GDP বা মোট দেশজ উৎপাদন আর মাথাপিছু আয়ের মোহে আবিষ্ট রাষ্ট্রসংঘের সময় কোথায় এসব কথা কানে তোলার?


GDP-র বিকল্প হিসেবে ভুটানের রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক সার্ক সামিটে GNH বা Gross National Happiness-র প্রস্তাব তুলেছিলেন। যার মোদ্দা কথাটি হচ্ছে GDP-র সাহায্যে রাষ্ট্রের নাগরিকদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপ বৈষম্য দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে না। রাষ্ট্রের উচিত এটা পরিমাপ করা, তার নাগরিকরা প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের ন্যুনতম প্রয়োজনগুলো মিটাতে পারছে কি না। পরিমাপ করা প্রয়োজন, সামাজিক জীবনধারায় নাগরিকরা কতটা সুখী ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ করে জীবন কাটাতে পারছে। দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে এসে জোর দেওয়া প্রয়োজন ঠিক কীভাবে জীবনযাপন করলে মানুষ ও তাকে ঘিরে বিদ্যমান পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে, যেন তাকে আর দরিদ্র নামে চিহ্নিত হতে না হয়।

জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিধ্বনি মিলে কেনেডিকুলের বিখ্যাত বংশধারা থেকে আগত রবার্ট এফ কেনেডি ওরফে ববি কেনেডির বক্তব্যে। ষাটের দশকে নির্বাচনী প্রচারণায় ববি বলেছিলেন বটে :

এমনকি আমরা যদি পার্থিব দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কাজ করেও থাকি, তারচেয়ে বড় কাজটি সেখানে বাকি থেকে যায়, সেটি হলো পরিতৃপ্তি, অভিরুচি আর মর্যাদা লাভের দারিদ্র্যকে মোকাবিলা করে ওঠা,-যেটি আমাদের সকলকে পীড়িত করছে।

আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ এখন বৎসরে ৮০০ বিলিয়নের ওপরে, অথচ এই দেশজ উৎপাদন দিয়ে যদি আমরা আমেরিকাকে বিচার করি তাহলে এটি বহন করছে বায়ু দূষণ ও সিগারেট পণ্যের বিজ্ঞাপন, আর সড়কে লাশের মিছিল সরানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স।

এটা আমাদের ঘরকে তালা দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে কি না সেটা গণনা করে, আর গণনা করে কারাগারে অন্তরীণ সেইসব লোকদের যারা এটা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে। এটা রেডউড বনানীর ধস আর আমাদের বিশৃঙ্খল টানাহ্যাঁচড়ার কারণে প্রকৃতির এই বিস্ময় কতখানি হারিয়ে গেল সেই হিসাব কষে। নাপাম ও নিউক্লিয়ার বোমার সংখ্যা গুনতে থাকে সে, আর শহরগুলোয় দাঙ্গার বিরুদ্ধে লড়াকু পুলিশের জন্য বরাদ্দ সাঁজোয়া যানের হিসাব কষে। এটা হুইটম্যানের বন্দুকবাজি আর স্পেকস কতজনকে ছুরির আঘাতে খুন করেছে সেটি গণনা করে, আর টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোর হিসাব করে সে; যারা আমাদের শিশুসন্তানদের কাছে খেলনা বিক্রয় করার জন্য সহিংসতাকে মহিমান্বিত করছে।

মোট দেশজ উৎপাদন এখনও আমাদের সন্তানের স্বাস্থ্য, গুণগত শিক্ষা অথবা খেলাধুলা থেকে আনন্দ আহরণের জন্য নয় আমাদের কবিতার সৌন্দর্য অথবা বৈবাহিক জীবনের শক্তি, প্রকাশ্য বিতর্কসভায় আমাদের বুদ্ধিদীপ্ততা, কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের সততা এসবের কিছুই সেখানে যোগ হয় না এটা আমাদের ইচ্ছাশক্তি অথবা সাহসিকতার পরিমাপ করে না; আমাদের জ্ঞানকে সে পরিমাপ করে না, না পরিমাপ করে শিখনকে; সহানুভূতির হিসাব যেমন করে না, দেশের প্রতি আমাদের আত্মনিবেদনকেও হিসাবের মধ্যে আনে না; — এটা, মোটের ওপর সবকিছু পরিমাপ করে, শুধু জীবনকে যা মূল্যবান করে তোলে, — সেটি ছাড়া

এবং, আমেরিকা সম্পর্কে সমস্ত খুঁটিনাটি সে আমাদের জানিয়ে দিতে পারে; একমাত্র আমেরিকান বলে নিজেকে নিয়ে আমরা কেন গর্ব করে থাকি সেটা ছাড়া আমাদের ঘরের ক্ষেত্রে এটা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর যে-কোনও দেশের জন্যও সত্য হবে

যতদূর জানি মানবসমাজের সত্যিকার সুখের খবর নেওয়ার জন্য প্রতিকূল বিশ্বে ভুটান এখনও Gross National Happiness-র ছকেই তাদের অর্থনীতিকে পরিচালনা করে আসছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সহ বিশ্বের দাপুটে অর্থনীতিবিদরা ভুটানের GNH-কে বাঁকা চোখেই দেখে থাকেন। False Propaganda-র মাধ্যমে ভুটান তার সমাজে শোষণ ও বৈষম্য জারি রেখেছে এবং জনগণকে হতদরিদ্র জীবন বেছে নিতে বাধ্য করছে ইত্যাদি অভিযোগ ভুটানের বেলায় নতুন কিছু নয়। ভুটান তা-বলে তার নীতি থেকে সরে আসেনি। সত্য, তথাকথিত অর্থে ভুটানবাসীর গড় ক্রয়ক্ষমতা ও বহুমুখী পন্থায় জীবনযাপনের সামর্থ্য সীমিত। কেইনসীয় অর্থনীতির ছকে ভোগ ও পণ্য উৎপাদনের শক্তিও অন্যদের তুলনায় যথেষ্ট সীমাবদ্ধ। যে-কারণে তাদের জীবনযাপনে ঝাঁ-চকচক আড়ম্বরের বাহার চোখে পড়ে না। যদিও স্মরণ রাখতেই হচ্ছে ভুটান সেই দেশ যে তার মোট বনজ সম্পদকে গত কয়েক দশকে সন্তোষজনক হারে বাড়াতে পেরেছে। জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুকের সময় ভুটানের বনজ সম্পদ ছিল প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশের কাছাকাছি, যেটা এখন পঁচাত্তর শতাংশ ছাড়িয়েছে। বনজ সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটি প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বায়নের শতেক চাপ সহ্য করে সীমিত দেশজ সম্পদ ও উৎপাদনশক্তির জোরেই তথাকথিত মাথাপিছু আয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের ওপরে তার অবস্থান; — প্রায় তিন হাজার ডলার!

মোট দেশজ উৎপাদন ও মাথাপিছু আয়ের বাড়বাড়ন্তের রিলে রেসে লিপ্ত সমাজে আয়বৈষম্য ও অসম-প্রতিযোগিতার কারণে কীভাবে দারিদ্র্যের ভৌতিক আবহ সর্বক্ষণ জারি থাকে তার উদাহরণ ভারত ও বাংলাদেশেরে মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পিরামিডের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায়। তিরিশের দশকের মহামন্দার সময় খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ সিমন কুজনেটস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাপক হিসেবে GDP-র প্রস্তাব দিয়েছিলেন। চাহিদা সৃষ্টি করা এবং সেই অনুপাতে পুঁজির প্রবহমানতা বৃদ্ধির বিচারে কুজনেটসের প্রস্তাবনা সমাজে দারিদ্র্য নিরসনে কতটা কার্যকর সে-প্রশ্নটি সম্ভবত নতুন করে তোলার সময় হয়েছে।

চাহিদা মাফিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য অ্যাডাম স্মিথ Commercial Society-র যে-ছক তৈরি করেছিলেন, কেইনস-এর যুগে এসে সেই ছকে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল। মানববিশ্বের ভোগশক্তি বাড়ানোর অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে তিনি জোর দিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে অনবরত নতুন পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করা, পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য উৎপাদনসক্ষম খেটে-খাওয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা, বাজারমূল্যকে বিপণনের মাধ্যমে ভোগে রূপান্তরিত করা, এবং ফলাফল হিসেবে বিনিয়োগমূল্যকে উদ্বৃত্তমূল্যে রূপান্তরিত করার অর্থনীতি উন্নয়নের সূচকরূপে বিশ্বজুড়ে বহাল রয়েছে। যে-উন্নয়নে প্রকৃতির সমুদয় উৎস থেকে শুরু করে স্বয়ং মানুষ নিজেও পণ্য বলেই বিবেচিত এখন।

সমাজকে বিত্তবান ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকাঠামোয় ভাগ করার কেইনসীয় ছক সারা বিশ্বে কমবেশি দাপটের সাথে নিজের রাজত্ব বহাল রেখেছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারকেও সেই ছকে ফেলে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উন্নত বিশ্বে দারিদ্র্যের সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে, তবে যে-পিরামিডের ওপর এটি দাঁড়িয়ে সেখানে দুটি শ্রেণিকে সক্রিয় দেখা যায়। পিরামিডের চূড়ায় ব্যক্তিপর্যায়ে বিনিয়োগে সক্ষম বিত্তবান মালিক শ্রেণি এবং মধ্য থেকে নিচ অবধি উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি শ্রমিকের ভূমিকায় সেখানে খেটে মরে।

দারিদ্র্য বজায় রেখে উন্নয়নের এই ছক উন্নয়নশীল বিশ্বেও বিরাজিত। পিরামিডের স্তরটি যদিও ভিন্ন। চূড়ায় যথারীতি বিত্তবান মালিক শ্রেণির বিচরণ; মাঝখানে উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এবং নিচের পুরোটা জুড়ে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে হতদরিদ্র শ্রেণির বিচরণ চলে সেখানে। অসম এই অবস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বজায় রাখার খেলাটি পুরাতন এবং আজোবধি সেখানে লক্ষণীয় কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। উন্নয়শীলের লক্ষ্যই হচ্ছে উন্নত হওয়া। পিরামিডের নিচের লোকগুলোকে মধ্যস্তরে উঠিয়ে আনা তার কাছে সেই উন্নয়নের সূচক বলে গণ্য। অতঃপর মধ্য থেকে নিচের স্তর অবধি তাদেরকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির বগল বাজায় সে। এতে সুবিধা হলো শ্রেণিভেদ অনুসারে সম্পদ বণ্টনের ছকটি বজায় রাখা যায়, যা পিরামিডের চূড়ায় অবস্থিত লোকগুলোকে সম্পদের সিংহভাগ কুক্ষিগত রাখা ও পুঁজিপ্রবাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

জটিল এই বিনিয়োগচক্র থেকে সকলের জন্য কিছু-না-কিছু বখরা হাসিল করতে হলে যে রাজনৈতিক নীতি, সদিচ্ছা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয় উন্নত ও উন্নয়নশীল সর্বত্র সেটি অনুপস্থিত। যে-কারণে বিশ্বের মোট সম্পদের সত্তুর ভাগ সীমিতসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে আর পৃথিবীর গুরুতর সব অর্থনৈতিক সামিটে রাষ্ট্রপ্রধান, ব্যবসায়ী, দলদাস অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়নবিশেষজ্ঞরা গুরুগম্ভীর মুখ করে ভাবতে বসেন, ‘হুম! দারিদ্র্য এক সসস্যা বটে! এর থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আরও ভর্তুকি আরও প্রণোদনা আরও বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন প্রয়োজন। যেন গরিব নামে চিহ্নিত লোকগুলো করে খেতে ও কিনে খেতে পারে।’ ‘করে খাওয়া ও কিনে খাওয়া’-র এই সংস্কৃতিতে মানুষ ও প্রকৃতি সকলেই তাই GDP ছকে বন্দি। কাজেই, মোট দেশজ উৎপাদন ও মাথাপিছু আয়ের মধ্যে শুভঙ্করের যে-ফাঁকি দারিদ্র্যকে বহাল রাখে, প্রাকৃতিক জীবনব্যবস্থা থেকে মানুষকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন ও দূরের করে তোলে, মানবিক বিশ্ব তৈরির নামে মানুষকে শুধু মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ ও বন্দি হওয়ার মন্ত্রণা দেয়, সেই ব্যবস্থার চেয়ে ভুটানের GNHনির্ভর পদ্ধতি হয়তো অনেক বেশি মানবিক ও প্রাকৃতিক।

উন্নত দেশগুলোয় ব্যক্তির বিনিয়োগ ও পুঁজি সঞ্চয়ের গতিকে কেইনসীয় ছক প্রণোদনা দিলেও, ভোগ্য পণ্যের বিচিত্র সমাহারে মানুষের স্বাদের জগৎকে আমূল বদলে দিতে সক্ষম হলেও কোভিড-এর মতো সংকটের মোকাবিলায় ব্যবস্থাটি যে যথেষ্ট কার্যকর নয় তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। তারপরেও কোভিড-পরবর্তী উন্নত দেশগুলো মৌলিক অধিকারের জাতীয়করণে যেতে চাইবে না এটা নিশ্চিত। রাষ্ট্র ও আমলাতান্ত্রিক খবরদারি জাতীয়করণকে অনেক ক্ষেত্রে বিষম করে তোলে। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রমাণ। যে-কারণে মানুষের মৌলিক অধিকারের জাতীয়করণের সমাজতান্ত্রিক ছকের (এটি ত্রুটিহীন এমন নয়, তবে মন্দের ভালো) সঙ্গে কেইনসীয় অর্থনীতির দ্বন্দ্ব সনাতন। মালিকপক্ষ ও বাদবাকিদের মধ্যে বৈষম্য বজায় রেখেও প্রতিটি ব্যক্তিকে পিরামিডের চূড়ায় ওঠার সুযোগ করে দেওয়া, সেইসঙ্গে আপাত স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের স্বস্তি, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার স্ফূর্তি ইত্যাদি কারণে ব্যক্তিমালিকানার যে-বিশ্ব গড়ে উঠেছে সেখানে বৈষম্য সত্ত্বেও একটি ভারসাম্যে সমাজ স্থিত থাকে। সেই ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ও মতান্তর থাকলেও সহসা এতে বড় কোনও পরিবর্তন বা তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক ছকে সম্পদের জাতীয়করণের দিকে রাষ্ট্রগুলোর ধাবিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে মানুষের মনোজগৎ নিজেকে জাতীয়করণের অধীন সত্তা হিসেবে দেখার চাইতে ব্যক্তি-স্বকীয়তা ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে তাতে সন্দেহ নেই। ফলে ব্যক্তিমালিকানা আরও নতুন গতি পাবে সামনে। পশ্চিমা দেশগুলো শস্তা শ্রমমূল্যের সুবিধাটি কাজে লাগাতে ভোগ্য পণ্য উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বিপণনের ক্ষেত্রে কলকারখানা ক্রমশ চীনে সরিয়ে নিয়েছিল। এখন হয়তো সেটা ক্রমশ চীন থেকে সরে উন্নত জাপান এবং উন্নয়নশীল ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, ব্রাজিল কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্ররূপে ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের সুযোগ থাকবে বিনিয়োগের এই সুযোগটি বাগানোর।

The Economist-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভারতীয় মহিন্দ্র গ্রুপের কর্ণধার আনন্দ মহিন্দ্র সে-রকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের উদীয়মান দেশগুলোর বহুজাতিক কোম্পানির অসম যুদ্ধ করোনা-পরবর্তী সময়ে নতুন গতি পাবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শ্রমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝারি উদ্যোক্তাদের গর্ভে বিলীন হতে পারে। অন্যদিকে মাঝারি উদ্যোক্তারা অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে জুড়ি বাঁধবে। মহিন্দ্র মনে করছেন কোভিড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বে পণ্য সরবরাহকারী শৃঙ্খলের পুরোটা কীভাবে চীনের একচেটে হয়ে উঠেছিল। এখন সেই সরবরাহশৃঙ্খলে বেইজিং-নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়ার অনুসন্ধানটি আরও অগ্রবর্তী ও গভীর হবে। অটোমেশননির্ভর পরিষেবার পরিধি যেমন বাড়বে, মানুষের কর্মবিভাজনের সংস্কৃতিও নতুন আকার ধারণ করবে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি ও রোবোটিকস শাসিত পৃথিবীতে সকল প্রতিষ্ঠানই চাইবে প্রচলিত অফিসনির্ভর কাজের পরিধিকে সীমিত করে ঘরের চৌহদ্দিতে ছড়িয়ে দিতে। এতে শ্রমমূল্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় সঙ্কোচনের সুযোগটি তারা নিতে পারবে।

Zoom-এর মতো একসঙ্গে বহুসংখ্যক মানুষকে অনলাইন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সেবা দিতে সক্ষম প্রযুক্তিসেবার প্রসার সামনে আরও ব্যাপক হবে এটা নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মার্ক কারনি দার্শনিক মাইকেল স্যান্ড্যালের সুরে সুর মিলিয়ে নিদান হাঁকছেন কোভিড-পরবর্তী বিশ্ব-অর্থনীতি Market Economy-র গতানুগতিক পুঁজি প্রবাহ থেকে সরে আসবে এবং Market Society-র ওপর ভর করে পুঁজির নতুন মেরুকরণের দিকে সামনে পা বাড়াবে। ব্যক্তিপুঁজির ব্যবহারে আগেকার স্বকীয়তার বদলে সামাজিক আন্তঃসম্পর্কনির্ভর পুঁজি সঞ্চালনের দিকে ঝুঁকবে বিশ্ব। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। জনস্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষা সেই Market Society-র পুঁজি সঞ্চালনে প্রাধান্য পাবে। বিবেচিত হবে পরিবেশেবান্ধব পণ্য উৎপাদনের বিষয়টিও। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের  মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার কথা জার্মানির মতো রাষ্ট্র এখন থেকে ভাবতে শুরু করেছে। অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের কথায় তার আভাস গোপন নেই। সম্প্রতি বলেছেনও : — “It will be all the more important that if we set up economic stimulus programmes, we must always keep a close eye on climate protection…,” সবুজ অর্থনীতির পুরোনো হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গটি তাই নতুন করে সামনে চলে এসেছে।

এইসব ইতিবাচক সম্ভাবনার মধ্যেও প্রশ্ন থেকেই যায়, বিশ্বনেতাদের মধ্যে ফিডেল কাস্ত্রোর মতো কেউ কি বলবেন, “কিউবায় আমরা বোমা তৈরি করিনি, তার বদলে ডাক্তার তৈরি করেছি। সকলের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারে এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করেছি।” মনে হয় না সেটি সম্ভব। কেইনসীয় ছকে বহাল থেকে Market Society-র মাধ্যম পুঁজির সঞ্চালন এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহনের সমতুল্য। মানুষের খেয়েপরে বেঁচে থাকার এইসব তোড়জোড়ের মধ্যে দারিদ্র্যের পিরামিডে নতুন কোনও মেরুকরণ ঘটবে, নতুন ডিসকোর্স তৈরি হবে এমনটি আশা করার যৌক্তিক কারণ বিশ্বে তাই বিদ্যমান নেই। দারিদ্র্য আসলে সত্যি কি জিনিস সে-নিয়ে নবীন ভাবনা, বিবেচনা ও পরিকল্পনা গতি পাওয়ার সম্ভাবনা যে-কারণে ক্ষীণ। এর জন্য রাষ্ট্রসংঘের মধ্যে একতা ও সহমতে পৌঁছানো জরুরি। জাতিসংঘের মতো কাগুজে বাঘের নেতৃত্বে সে-রকম ঐকতান রচনার সুযোগ কি সত্যি বিদ্যমান বিশ্বে?


দারিদ্র্য বিষয়টি অনেকটা জেমস লাভলকের ‘জীবন আসলে কী?’ প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজার মতো ঘটনা। লাভলক এর বৈজ্ঞানিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়ে বেজায় হোঁচট খেয়েছিলেন। তিনি দেখলেন বইয়ের-পর-বইয়ে বিরামহীনভাবে মানুষ ও প্রকৃতির সমুদয় ক্রিয়াকে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেছে, পাতা উল্টালেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে মানুষ এবং তার উদ্ভাবিত রকমারি প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এক-লহমায় বুঝে ফেলা সম্ভব। কিন্তু সমুদয় ক্রিয়াকে একত্র করেও ‘জীবন’ ব্যাপারখানা কী তার কোনও কিনারা মিলে না। তিনি দেখলেন শ্রোডিঙ্গারের মতো ধীমান বিজ্ঞানীরা জীবনের ক্ষুদ্র স্বরূপ কীভাবে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বৃহৎ ও জায়মান হয় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, যদিও তা কার্যত প্রহেলিকায় ঘেরা।

পৃথিবীর এই অনুপম পরিবেশমণ্ডল যেখানে স্ব-নিয়ন্ত্রিত, পৃথিবীর ইকোলজি তাপগতিবিদ্যার সূত্র অনুসারে বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপির মাত্রায় ভারসাম্য স্থাপনের মাধ্যমে নিজেকে সচল রাখে, যার কারণে বায়ু, জল, মাটি ও অন্তরীক্ষের মধ্যে অভাবনীয় এক আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয়, সেই স্ব-নিয়ন্ত্রিত প্রবহমানতার মধ্যে তিনি জীবন কী সেই প্রশ্নের কিনারা খুঁজে পেলেন। নিজের প্রথম বইয়ে তাই অকপটে লিখেছেন : “The entire surface of the Earth including life is a self-regulating entity and this is what I mean by Gaia.” তাঁর এই উপলব্ধি বৈজ্ঞানিক হলেও এর মধ্যে ভারতীয় বৈদিক সূক্তের চিরায়ত সুরটি ধরা পড়ে, — এই ভূমা ও পৃথ্বী এবং সমুদয় জড় ও জীবিত প্রাণ স্বয়ংক্রিয়, স্ব-নির্ভর, স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং তা-ই ব্রহ্ম।

শতবর্ষী লাভলক তাঁর অন্তর্দৃষ্টির গুণে জানেন মানববিশ্ব পৃথিবী তথা সৃষ্টির এই স্ব-নিয়ন্ত্রিত গুণকে অনুধাবন করে ওঠার বিজ্ঞান থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। এটাকে সে তার হৃদয়ে অনুভবের ক্ষমতা রাখে না। জীবন নিয়ে যত সংজ্ঞা ও মিথ তা মানুষের নিজের সৃষ্টি। বার্ট্রান্ড রাসেল সচেতনার আলোচনায় প্রশ্ন রেখেছিলেন, — নদীকে মানুষ চৈতন্যহীন ভাবে, যদি তা-ই সত্য হয়ে থাকে তাহলে নিজের গতিপথ মনে রেখে সে কী করে হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে? কেমন করে নিজেকে ভেঙে পুনরায় গড়েপিটে নিচ্ছে?

মার্টিন হাইডেগার তাঁর The Question Concerning Technology১০ নামক বিখ্যাত অভিভাষণে কথাটি অন্যভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলছেন, নদীর ওপর সেতু বানিয়ে মানুষ ভাবে সে কিছু উদ্ভাবন করে ফেলেছ। না, সে কোনওকিছু উদ্ভাবন করেনি। সে যা করেছে সেটি হচ্ছে ‘আবিষ্কার’। নদী ও তার তলদেশের গঠনপ্রকৃতির মধ্যে সেতু তৈরি হওয়ার যেসব গুণ ও সম্ভাবনা ছিল মানুষ সেটি আবিষ্কার করায় সেতু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। সেতু তৈরির এই গুণ ও সম্ভাবনা যদি নদী বা তার তলদেশে না থাকত সেক্ষেত্রে মানুষের পক্ষে ওটা তৈরি করা সম্ভব হতো না। যতদিন এই গুণের কথা অজানা ছিল ততদিন মানুষ সেতুটা বানাতে পারেনি। অন্যরা সেটা জানতে পারছে না বলে আজও সেতু বানাতে পারেনি। এই ‘জেনে ওঠা’-র নাম হচ্ছে আবিষ্কার এবং আবিষ্কারই ‘প্রযুক্তি’-র জনক। এটা হচ্ছে মেধা এবং এটাই সভ্যতা। তার মানে কিন্তু এই নয় মানুষ পৃথিবীর জীবনচক্রকে নতুন করে সৃষ্টি করছে অথবা এখন থেকে এই জীবনচক্রের ওপর তার রাজত্ব চলবে, একে যেমন ইচ্ছা শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করবে সে। শাসক হওয়ার এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মানুষের পক্ষে পৃথিবীতে প্রাণের মাহাত্ম্য বোঝা ও তার সঙ্গে সদয় আচরণ করা সম্ভব নয়। মানুষ সেই ভুলটি অনবরত করে আসছে বলে পৃথিবীর স্ব-নিয়ন্ত্রিত ইকোলজির জন্য সে এখন হুমকির কারণ।

মানুষ ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সদর্থক সম্পর্কে জুড়ে থাকার ভাবনাটি মানবসমাজে শক্ত মাটি পায়নি। মানুষ কি কোনওদিন জানতে চেয়েছে পাহাড়-নদী-সাগর-অরণ্য অথবা পশু-পাখি-পতঙ্গরা আসলে তাকে নিয়ে কী ভাবে? যদি তাদের ভাষা বোঝা যেত তবে মানুষের প্রশংসায় তারা মুখর হতো কি? মনে হয় না! কালের গতিতে মানুষ প্রাকৃতিক বিবর্তনের স্বাভাবিক গতিপথে বারবার হস্তক্ষেপ করেছে। প্রয়োজন মেটানোর বাহানায় প্রকৃতির সমুদয় উৎসের প্রতি তার নির্দয় ও স্বেচ্ছাচারী হওয়ার যে-ইতিহাস, সে-কারণে অন্য কারও পক্ষে তাকে ভালোবাসা কঠিন। গুন্ডাকে হয়তো ভয় পাওয়া যায় কিন্তু ভালোবাসা সহজ নয়।

জেমস লাভলক তাঁর The Revenge of Gaia গ্রন্থে পৃথিবীর স্ব-নিয়ন্ত্রিত গুণের ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও তার কারণে সংঘটিত পরিবর্তন মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে যে-বাখানি গেয়েছেন করোনা-পরবর্তী বিশ্ব তার থেকে শিক্ষা নেবে এমনটি আশা করা এই মুহূর্তে অতিকল্পনা। সে-কারণে হয়তো শতবর্ষী এই বিজ্ঞানী Novacene১১-এর মতো গ্রন্থ রচনার তাগিদ বোধ করেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর এই সর্বশেষ গ্রন্থে তিনি বর্ণনা করেছেন আগামী বিশ্ব কীভাবে রোবটস ও সাইবারনেটিকসের কারণে আমূল বদলে যেতে বাধ্য হবে। সেই ইকোলজির মধ্যে গাইয়া-বিলগ্ন মানুষ যদি গাইয়ার অংশ রূপে বেঁচে থাকতে চায়, যদি চায় গাইয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে মেরামতের ফলাফল থেকে উদ্ভূত মারণ ঠেকাতে তবে তাকে তার নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির দূরদর্শী ব্যবহারের ভাবনাটি আগে ভাবতে হবে। এটাই আজকের বিজ্ঞানের পরিভাষায় Futurism।

বিজ্ঞান কর্তৃক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত এই Futurism-কে লাভলক তাঁর Novacene-এ নতুন ভাষা দিয়েছেন। যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, রোবটস ও সাইবারনেটিকসকে ইকোলজির কুশলী পরিমাপক ও ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে ব্যবহার করা মানুষকে শিখতে হবে। মানুষ যদি সে-কাজটি করতে ব্যর্থ হয় গোটা মানববিশ্ব যন্ত্রশাসিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাসে পরিণত হবে। রচিত হবে মানুষ নয়, যন্ত্রমানবের নয়া বিশ্ব। সেই বিশ্বেরও একদিন পতন ঘটবে, যখন যন্ত্রশাসিত জীবন পৃথিবীতে তার জন্য নির্ধারিত সহনীয় তাপমাত্রার সীমাটি আর বজায় রাখতে পারবে না। তাপগতিবিদ্যার সেই Chaos, যার কারণে পতন ঘটবে পৃথিবীর এবং নতুন রূপান্তর ঘটাবে প্রকৃতি।

ধরিত্রীর দেবী গাইয়ার কি মৃত্যু হবে তখন? হয়তো না। নিজেকে সে পুনরায় সাজিয়ে তুলবে নতুন কোনও জীবনচক্রের ছকে। সেটাই হবে তার ইকোলজি। সেই চক্রে যদি প্রাণের অস্তিত্ব থাকে তারা কি বন্দনায় মুখর হবে দেবী গাইয়ার? দূরাতীত ভবিষ্যতের সেই অমলিন স্বয়ংক্রিয় ও স্বনির্ভর দেবীকে কি তারা আদিযুগে মানবপ্রণীত শান্তিস্তোত্রের ভাষায় বন্দনা করবে? তারা কি মুখর কণ্ঠে কোরাস ধরবে :

ওম! তিনি যেন আমাদের রক্ষা ও প্রতিপালন করেন,
আমরা যেন একীভূত হয়ে কর্ম সমাধা করিতে পারি,
সকলে মিলে সফল হই, কখনও পরস্পরের বৈরী না হই।
আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তারা যেন সুস্থির থাকে,
বাক্য, নিঃশ্বাস ও শ্রবণ যেন অনুভবের শক্তি দান করে।
নিরালোক ব্রহ্ম আর উপনিষদের রহস্যের অংশ যেন হতে পারি
যেন বিচ্ছেদ না ঘটে দুজনের।
আমি স্বয়ং যেন সে-জ্ঞানকে লঙ্ঘন না করি,
যেন মতি থাকে জ্ঞানে,
ধর্ম আমায় পথ দেখাক, শুভ প্রেরণায় চালিত করুক।
ওম! পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক, শান্তি বিরাজিত হোক।১২

সেই ভবিষ্যৎ অনেক দূরের মনে হলেও লাভলক মনে করেন এটা আসন্ন। কিন্তু মানুষের পৃথিবী কি সেজন্য প্রস্তুত? নেতারা কি প্রস্তুত? অবস্থাদৃষ্টে সে-রকম মনে হচ্ছে না। কেন, সে-প্রসঙ্গ পরের কোনও কিস্তির জন্য তোলা থাক।


 প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র ঋণস্বীকার
১. Gaia Hypothesis overview: gaiatheory.org;
২. GAIA: An New Look on Life at Earth by James Locelock, Oxford University Press, 1979; Translation: Self;
৩. Gross National Hapiness: grossnationalhappiness.com; A New Measure of Well-Being From a Happy Little Kingdom By Andrew C. Revkin, Oct. 4 2005 The New York Times;
. Bobby Kennedy on GDP: ‘measures everything except that which is worthwhile; The Guardian.com; Translation: Self;
. Simon Kuznets; An untold story of the lopsided GDP by Kirno Sohochari;
. Less globalisation, more tech: The changes covid-19 is forcing on to business, The Economist, April 11, 20 Edition;
. Mark Carney on how the economy must yield to human values by Mark Carney; The Economist, April, 2020 Addition;
. Germany’s Merkel wants green recovery from coronavirus crisis by Michael Nienaber, Markus Wacket; Reuters.com article;
. GAIA: An New Look on Life at Earth by James Locelock, Oxford University Press, 1979;
১০. The Question Concerning Technology by Martin Heidegger, 1977;
১১. Novacene by James Lovelock, penguin, July 2020;
১২. শান্তিস্তোত্র, কেন উপনিষদ; অনুবাদ : লেখক;

… …

COMMENTS

error: