খোদার নাই অভিমান : সিমিনের জিকিরে / জেমসের ক্বলবে  || ইমরান ফিরদাউস

খোদার নাই অভিমান : সিমিনের জিকিরে / জেমসের ক্বলবে  || ইমরান ফিরদাউস

SHARE:

লোকবাঙলা নিয়ে অনেক কথা ছড়ায়ছিটায় বা সমগ্রআকারে আছে বইপুস্তকে। মানুষের জবানে। হেই! নগরবাঙলার ইতিহাস কই?  অতিপরিবর্তনশীল নগর ঢাকার নিজস্ব বাঙলা কালচারের গল্প কার ঝোলার কাঁধে? যা আছে বইয়ের পাতায় বা সিনেমার পর্দায় তার অধিকাংশই মোনাফেকির তরফদারিতে ঠাঁসা। এইখানে আপনে খুঁজে পাবেন না নগরের অন্যতম প্রাণ বোহেমিয়ান আত্মার আসা-যাওয়ার নৃ-তাত্ত্বিক খোঁজ বা নগর নামক উন্মূল জন-পরিসরে একজন বাউলের অস্তিত্বমানতার সমাজবীক্ষণিক আলোচনা। যা পাবেন তা হলো এইসব সত্ত্বাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করার খবর। আরও পাবেন ফ্রি-স্পিরিট থেকে গর্বিত অর্থডক্স হয়ে উঠার গল্প। পির-আউলিয়া, কালীমন্দির-সন্ন্যাসী, সন্ত, মাজার-মুর্শিদে ঘেরা ঢাকার নিজস্ব ঝঙ্কার চিনতে গেলে শুনতে হবে ছাদপেটা গানের তুমুল নিনাদ। আরও, শুনতে হবে মাজারে মাজারে থালা-বাটি দিয়ে তালগোল-পাকিয়ে-তোলা ক্যাকোফনির বিদেহী সুর। পাগল-মজনুদের বিচ্ছেদযন্ত্রণায় কুঁকড়ে-থাকা আশেকের জীবাত্মার ফানা-ফিল্লাহ হওয়ার আকুতি। বুইঝা নিতে হবে যে, আত্মার যতন বিনে নাজাত নাই। জিকির আত্মার ক্বলবের নাচন, এই অগতির জিঞ্জির থেকে রেহাই নেওয়ার উপায়।  মহাজগতের লগে রুহানিজগতের ট্রানজিট।

খেয়াল করে দেখেন, গুরুমুখী সংস্কৃতির বাঙলায় তথা বাঙলাদেশের নগরকালচারে দুইটা ক্রান্তিকালীন সময়ে দুই গুরুর আবির্ভাব ঘটে। স্বাধীনতাযুদ্ধের জাস্ট পরেই গুরু আজম খান। এবং স্বৈরাচারউত্তর ’ ৯০-এর ঢাকায় ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। স্মার্টলি দায় এড়াতে শিখে উঠা নাগরিক পরিসরে এই দুই স্বভাবগায়ক দুই সময়ে খাড়ায় নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুইলা নেন লোকবাঙলার দেশি, উদাসী, মারেফতি, চাষী কালচারকে, প্রতিরোধের সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরার দায়।  যে কারণে গুরু আজম খান হক মাওলারে খোঁজেন এত সুন্দর দুনিয়ার মাঝে, নগরবাউল গমগমে কণ্ঠে আওয়াজ দেন নিরানব্বই নামে তিনি, দুইভুবনের মধ্যমণি। বাঙলা রক ভাবতে গিয়ে ভুলে যাইয়েন না রক মানে কাউন্টারকালচার আর প্রত্যেক অঞ্চলের কাউন্টারকালচার তার তার স্থানীয় প্রতিরোধের জবানকে ঘিরে বিকশিত হয়। তাকে ভুলে নয় বা পলিটিক্যালি অ্যাপ্রোপ্রিয়েটগিরির মধ্যে দিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর মধ্যে দিয়ে নয়।

হায় হায় করে ওঠে তামাম জাহান
নুরের ঝিলিক দেখে

নগর ঢাকার একমাত্র ফাঙ্ক-স্যোওল গীতবাদ্যের দলের নাম ছিল GrooveTrap। সেই দলের অন্যতম শিল্পী সিমিন সাইফুদ্দিন।  তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ানিবাসী। গেল বছর নগরবাউল জেমস্ যখন অস্ট্রেলিয়া সফরে এলেন, তখন ওপেনিং অ্যাক্ট হিসেবে সিমিন ও তাঁর দল সংগীত নিয়ে হাজির হন। তারই প্রস্তুতি হিসেবে জিকির গানটি প্র্যাকটিসপ্যাডে কাভার করেন। গানটা ‘দুখিনী দুঃখ করো না’ অ্যালবামের। দেহলভী-র লেখা। ‘জিকির’ গানে ভাইটাল রোল এহসান এলাহি ফান্টির ড্রামসবাদন। বাঙলা তাল কেটে-ভেঙে হাফনোটে লীলাময়ী তানের শিরদাঁড়া খাড়া করিয়ে দেন যা জিকিরকে চালিত করে অদেখা মাশুকের পানে।

প্রলয়ের শিঙায় ফুঁক দিয়ে ওঠে ইস্রাফিলে
চারিদিক থেকে ক্বলবে ক্বলবে রোল পড়ে যায় …
তলে তলে তল্লাটে তল্লাটে জিকির ওঠে

এ-অবধি নারীকণ্ঠে জিকির শোনার সৌভাগ্য ঘটে নাই। সিমিনের কল্যাণে তা ঘটল। জেমস্ যেখানে অনুচ্চভারী ভোকালে টেনে টেনে গায়েবি হুকুমের আদেশে খোয়াবি বয়ানে জিকির করেন, সেখানে সিমিন জিকিরকে আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত করে নেন। দ্রুততালে নিচুস্বরের চিৎকার মুহূর্তেই নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় জিন্দা ও মুর্দা মাঝে ভেদকারী মায়াবি পুলসিরাতের সামনে। বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কারে রুহের আরশে ইশকের তুফান ওঠে। সিমিন ও তার দলের ভার্শনে,  কসমিক ট্রিপে থাকা জিকির গানের বাদ্যযন্ত্রগুলো লোকবাঙলার বিনয়ী, ঢাকগুঢ়গুড় আঙ্গিক যেমন মোহিনী তালে সুরপাশে বেঁধেছে তেমনি পরমানন্দে ফাঙ্ক-রকের মেলবন্ধনে পয়দা করেছেন ক্ষিপ্ত-লয়ের উষ্ণ সুরবাহার। মেলোডিকে খোদা জেনে সিমিনের এই পরিবেশনায় মূল গানের কাঠামোতে পেলব মায়ায় জড়িয়ে আছে মনের মতো গ্রুভি রিদম, নিবিড় বেসলাইনের পুরু আওয়াজ, সিন্থেসাইজারে অ্যাসিডরকের ঘোরলাগা ট্রিপি নোট, ক্যাজুয়ালি ক্লাসি স্টাইলে বাজানো সেক্সি গিটারের ছয়তারে নেচে বেড়ানো বিস্তৃত সোলো ও অচিন্তিত মনের এলেমেলো হ্যালোসিনেজিক ভালোবাসা।

কবর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সকল ইনসান্ …
ইয়া রব ইয়া রব বলে ইয়া রব ইয়া রব বলে …

প্রেমফুলের একটা সোহাগী টানের জন্য বেচাইন হয়ে ওঠে হাজার হাজার রকপ্রাণ। জেমস্ থেকে ফিলিংস হয়ে নগরবাউল অবধি ঘএর রে বসে বা কনসার্টের ময়দানে বহুত জেমসভক্ত এখনো হেইলাদুইলা, শরীর ঝাঁকায় মোহগ্রস্থের মতো রব তোলে গুরু গুরু বলে জিকিরের তানে। এই গানে এমন দেখা গেছে পাগল ভক্তদের সেজদায় যাইতে। ভিডিওলিঙ্ক লাগে না। এইগুলা আরবান মিথ। চোখের সামনে রচিত হয়, কিন্তু মনে হয় যেন কখন ঘটল টের পাইলাম না।

বলেন “ইয়া রব ইয়া রব … ইয়া রব ইয়া রব … ।।  রিপিটে চলবে।

… …

COMMENTS

error: