আমার বন্ধু সুবীর || মুকুল আচার্য্য

আমার বন্ধু সুবীর || মুকুল আচার্য্য

SHARE:

হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আমার সাথে সুবীর নন্দীর পরিচয়, আলাপ এবং একান্ত আপনজন হওয়ার সুযোগ হয়েছিল; যা তার পরিবারের সঙ্গে সখ্য পর্যন্ত গড়ায়। আমি সুবীর নন্দীর এতটাই আপনজন ছিলাম তার সকল সুবিধা-অসুবিধা আমার সাথে শেয়ার করত। সুবীর ভালো ছাত্র ছিল।

সুবীর নন্দী স্কুলে গান করত, স্কুলের অনুষ্ঠানগুলিতে এত সুন্দরভাবে গাইত, যা এখনও মনে পড়ে। নিয়মিত এসব গানের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল দেশাত্মবোধক, আধুনিক, নজরুলগীতি। আমি স্কুলের পরে তার বাসায় (হাসপাতাল সড়ক) গিয়ে প্রায় প্রতিদিন গান শুনতাম। রেওয়াজ করত প্রতিদিন। তার সাথে অংশগ্রহণ করত তবলায় সজল দত্ত, গান গাইত কাজল দত্ত, মাঝেমধ্যে ইরাদি (ফুলদি); তারপর সন্ধ্যার আগে আমার বাসায় সপ্তাহে তিন-চার দিন। আমার বাসাসংলগ্ন দোতলায় বসে দুই-তিন ঘণ্টা রেওয়াজ করত।

সুবীর ছোটবেলা থেকেই গানপাগল ছিল। আমাদের হবিগঞ্জের একমাত্র উস্তাদ বাবর আলী সাহেবের কাছে তার হাতে খড়ি হয়। স্কুলজীবনে তারপর স্থানীয় অনুষ্ঠানগুলিতে গান শুরু করে। মাঝেমধ্যে আমিও ওইসব অনুষ্ঠানে থাকতাম। নজরুলজয়ন্তী, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে তার সাথে আরও যারা গান করতেন তাদের মধ্যে সুবীরের বড়ভাই তপন নন্দী, কাজল দত্ত এবং আরও অনেকেই যাদের নাম এখন মনে আসছে না।

ক্লাস ফাইভ থেকে নাইন পর্যন্ত সুবীর নন্দী ছিল হবিগঞ্জে একক গায়ক। সুবীরের বাবা সুধাংশু নন্দী আমার পরমশ্রদ্ধেয় মেশো মহাশয় হবিগঞ্জ মাধবপুর এলাকার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে চাকরি করতেন, বড়ভাই নূপুরদা থাকেন ভারতের আসাম ভিভ্রুগড়ে। নূপুরদার ছোট তপনদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া করতেন, তিনিও ভালো গান করতেন। তিনি ছিলেন গজলপ্রিয় এবং মেহেদি হাসান, ওস্তাদ গোলাম আলীর অনেক জনপ্রিয় গান তপনদার কাছ থেকে প্রথম শুনি। ভারতের প্রখ্যাত মুকেশজির জনপ্রিয় গজলের মধ্যে একটা গান আজও মনে আছে আমার, ঐ গানটা হলো, ‘হর খুশিছে খুশি রহ, তুমহারে লিয়ে’; তপনদাকে বারবার অনুরোধ করতাম ঐ গানটা গাওয়ার জন্য। ইরাদি (ফুলদি), তিনিও গান করতেন। তার হরেক গানের মধ্যে একটা গানই ছিল প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া : ‘এমন একটা ঝিনুক খোজে পেলাম না’, প্রায়ই ঐ গানটা শুনতে চাইতাম।

আস্তে আস্তে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে চলে আসি কলেজে। বৃন্দাবন কলেজ, হবিগঞ্জ। আমি ছাত্ররাজনীতির নেশায় সবে হাতে খড়ি নিয়েছি। সুবীরের ছোটভাই রঞ্জু বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর, তার ছোট ফংকু সেও আমেরিকাপ্রবাসী, তার ছোট পার্থ সেও আমেরিকাপ্রবাসী। তবে একমাত্র পার্থ সুবীরের শেষসময় দিন-কয়েকের জন্য এসেছিল এবং সুবীর আইসিইউতে যাবার পর সে দেখা করতে গিয়েছিল কিন্তু চিকিৎসকদের অনুমতি পাওয়া যায় নাই ইন্টেন্সিভ ইউনিটের ভিতরে প্রবেশের। তাই আমিও সুবীরকে দেখতে যেতে প্রবল ইচ্ছা থাকলেও আর যাওয়া হয় নাই, তার এক আত্মীয় অনুরাগ হোম রায়-এর সাথে আমি এবং আমার স্ত্রী সার্বক্ষণিক ফোনে কথা বলেছি। সবসময় পার্থ ছিল সুবীরের দেখভাল করার জন্য।

সুবীর প্রথমদিকে নজরুলের গান এবং আধুনিক গানের চর্চা করত। আমি কলেজে যাওয়ার পর সুবীরকে আরও ঘনিষ্ঠ হিসেবে পেয়েছিলাম। সুবীরকে প্রতিবছর দুর্গাপূজায় ভারতীয় গানের স্বরলিপি সহ গানের বই এনে দিতাম। সুবীর তখন স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ছিল এবং এই জনপ্রিয় শিল্পী হওয়ার পিছনে তার একনিষ্ঠতা এবং আধুনিক বাংলা গানকে পছন্দ করা প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

সুবীর কলেজের অনুষ্ঠানে বা স্থানীয় অনুষ্ঠানে যে গান করত তা আমার বাসায় বা তার বাসায় আগে রেওয়াজ করে নিত। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী মতিলাল মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলি সেইসময় তাকে স্থানীয়ভাবে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ঐ সময় আমাদের সাথে যারা পড়তেন বা স্থানীয় অনুষ্ঠানে ঐ গানগুলি শুনতেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে।

তার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়-এর ‘কত-না হাজার ফুল’, ‘সবকিছু ফেলে যদি তোমার আগেই চলে যাই’, ‘যদি-না কোনোদিন এই গান শোনো’, তারপর সত্তর দশকে যে-গানগুলি আমাদের সকলকে উৎসাহিত করত, যেমন ভারতীয় প্রখ্যাত ভূপেন হাজারিকার কয়েকটি গান সুবীরের কণ্ঠে নিয়মিত শোনা যেত : ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ও ‘দোলা’ ইত্যাদি।

শহরের আরেক বাসায় তার গানের চর্চা হতো হবিগঞ্জের বাণিজ্যিক এলাকার খোকাদার বাসায় তার বোন নীনা খানের কাছে। সপ্তাহে এক-দুই দিন তবলায় থাকত সজল দত্ত, বুলবুল খান।

সুবীরের সাথে কয়েকবার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সাদামাটা জীবন ভালোবাসত সে।  রাজনীতি করার কারণে আমাকে সে প্রায়ই বকত। আমি ফার্স্ট ইয়ারে কলেজে উঠেই বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে কলেজ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমাদের পরিষদ ছিল শহীদ জসীম পরিষদ। আমি সহ-সাধারণ সম্পাদক হই এবং বিপুল ভোটে আমাদের প্যানেল জয়লাভ করে। এতে সুবীর কোনো পার্টি না করলেও ঐ সময় আমাদের প্রচুর সাহায্য করে। এটা সম্ভবত ’৬৮/’৬৯-র ঘটনা।

রাজনীতির কবলে সারাদেশ, আইয়ুববিরোধী রাজনীতি। সর্বত্র অস্থিরতা, হরতাল, মশাল মিছিল। সর্বত্র মানি না মানব না ধ্বনি, তবু সুবীর বাসায় বসে বসে রেওয়াজ করত। আমি প্রায় রোজই তার কাছে গিয়ে গান শুনতাম, ভুপেন হাজারিকার ঐ বিপ্লবী গানগুলো : ‘বিস্তীর্ণ নদীপথে’ ইত্যাদি। দিন দিন পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। বাংলার সর্বত্র গর্জে ওঠে সব স্কুল-কলেজ। আমি সাময়িক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই সুবীরের কাছ থেকে।

এরই মাঝে বাবলু পাল চৌধুরী, কালী বাড়ী রোড-এ তাদের বাসা, তার কাছ থেকে একটা প্রস্তাব আসে এবং আমরা একটা শিল্পীদের নিয়ে সংগঠন করি। সবাই মিলে বাবলুদার বাসায় বসলাম এবং ঐ শিল্পীগোষ্ঠীর নামকরণ করা হয় ‘উদয়ন শিল্পী গোষ্ঠী’, যার সভাপতি তপন নন্দী এবং সম্পাদক হন বাবলু পাল চৌধুরী। সুবীর ও আমি জয়েন্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করি। ওই সময়ে যারা হবিগঞ্জ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গান করতেন তাদের মধ্যে বাবলু পাল চৌধুরী, তপন মহারত্ন, উজ্জ্বল ভট্টাচার্য্য, ঊষা বিশ্বাস, অপু ভট্টাচার্য সহ আরো অনেকেই। সে-সময় বিপ্লবী গান দেশাতত্মবোধক গানই হতো বেশি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান সুবীর প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে তুলে ধরত খুব সুন্দরভাবে।

পরে এক-পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে দেশ আরো অচল হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর প্রক্রিয়া আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে। সমগ্র দেশ হরতালের আওতায়। স্কুল-কলেজ, গাড়ি-রেল সব বন্ধ। চারিদিকে মৃত্যুর খবর। এরই মাঝে একদিন সুবীর এসে রাত্রিবেলা আমাকে বলল, সকলে প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতে যাওয়ার। আমিও তাই বলি আর উপায় নাই। ২৫শে মার্চের পর দলে দলে লোক ভারতে চলে যাচ্ছিল। সুবীরকে আমি বলতে গেলাম পরিবারের সকলকে নিয়ে প্রথমে বাবার কর্মস্থল তেলিয়াপাড়া চা-বাগান এবং পরবর্তীতে সীমান্তের ঐ পারে মিদাই সুন্দর টিলার কাছাকাছি তারা চলে যায় পরিবারের সকলকে নিয়ে। আগরতলা ত্রিপুরায়। আমরাও আগরতলা যাই এবং আগরতলায় সুবীর আমার সাথে আরএমএস চৌমুহনীতে আমাদের বাসায় সোজা এসে ওঠে। আমি তাকে সাথে নিয়ে মিদাই টিলা যাই এবং পরবর্তীতে ট্রাকযোগে ধর্মনগর পর্যন্ত দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে রেলস্টেশনে পৌঁছি এবং খুব কষ্ট করে আমরা করিমগঞ্জ পৌঁছাই এবং সবীরের সাথে আত্মার কতটা মিল ছিল যে করিমগঞ্জে থানা রোডে তার কাকা অরুন নন্দী থাকতেন, উনি করিমগঞ্জ অ্যাপেক্স ব্যাংক ম্যানেজার, উনার বাসায় তুলে দেই।

আমরা সকলে বাবা-মা সহ আগরতলা নিরাপদ মানে না হওয়ার কারণে করিমগঞ্জ থানা রোডে আমার বড়ভাইয়ের বাসায় চলে আসি। সুবীর আসত আমাদের বাসায়, আমি রোজ যেতাম তার বাসায়। একসময় মুক্তিযুদ্ধের টানে আমি চলে আসি আগরতলার ‘ইয়ুথ ক্যাম্প’-এ। কিছুদিনের মধ্যে আর-একবার করিমগঞ্জ এসে শুনলাম মেসোমহাশয় আর নেই, সুবীরের বাবা মানে আমাদের মেসো পরলোকগমন করেছেন। তার কিছুদিন পর আমার বাবাও মারা যান। করিমগঞ্জে একদিন এয়ার এ্যাটাক হয়, কিন্তু আমরা সকলেই নিরাপদে ছিলাম। সুবীরের বাবার মৃত্যুর পর তারা ভিভ্রুগড় তাদের বড়ভাইয়ের কাছে মানে নূপুরদার কাছে চলে যায়। সেখান থেকে আস্তে আস্তে দেশে ফেরত আসে এবং বাসায় সবকিছু মেরামত করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে শুরু করে।

সুবীর দেশ স্বাধীন হওয়ার গানে আরো বেশি সক্রিয় হয় গান নিয়ে। রেওয়াজ বৃদ্ধি করে। তাকে যারা সবসময় সহযোগিতা করেন তাদের মধ্যে ওস্তাদ বাবর আলী, তবলায় সজল দত্ত। এবং সিলেট রেডিওর স্টার আর্টিস্ট কাজল দত্ত, তার বড়ভাই তপন নন্দী, মা পুতুল নন্দী এবং বড়বোন ইরা নন্দী এবং নিনাদি।

সুবীরকে নিয়ে উদয়ন শিল্পী গোষ্ঠীর বৃন্দাবন কলেজে অনেকে অনুষ্ঠানের মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের সাহায্য করার জন্য আমরা অনুষ্ঠান করি। যার আহ্বায়ক ছিলাম আমি। বর্তমান অডিটরিয়ামে উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পীদের মধ্যে রথীন্দ্রলাল রায়, সিলেট-এর আকরাম হোসেন, হিমাংশু গোস্বামী ও দুলাল ভৌমিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৃন্দাবন কলেজে ৩য় বর্ষে পা দেই ১৯৭৩-৭৪ ইংরেজিতে এবং ঐ বছর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম কলেজ সংসদ নির্বাচন। আমি জিএস পদে নির্বাচন করি। আমাদের প্যানেল ছিল কাশেম-মুকুল পরিষদ, কলেজ-অধ্যক্ষ ছিলেন কাজী আইয়ুব আলী স্যার।

সুবীরের একান্ত ইচ্ছায় এবং আমাদের প্রচেষ্টায় বৃন্দাবন কালেজে শিক্ষা সপ্তাহ সন্ধ্যার আয়োজন করি। সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন তপনদা এবং সুবীর নন্দী। স্থানীয় শিল্পীদের মধ্যে বাবলু পাল চৌধুরী, তপন মহারত্ন, উত্তম রায়, ঊমা বিশ্বাস, উজ্জ্বল ভট্টাচার্য্য, অপু বিশ্বাস, লাইজি আক্তার প্রমুখ।

বৃন্দাবন কলেজ শিক্ষা সপ্তাহ ১৯৭৩-৭৪-এ সুবীর প্রধান ভূমিকা পালন করে। ঐ অনুষ্ঠানটিতে যারা অংশগ্রহণ করেন তার মধ্যে শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কুদরত-ই-খুদা, আরো বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিকগণ ছিলেন। ৩য় দিনে সংগীত সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে আসেন আব্দুল আলীম, রথীন্দ্রলাল রায়, নিনা হামিদ সহ আরো অনেকে। সবার গান গাওয়ার এক-পর্যায়ে আসেন আব্দুল আলীম, কয়েকটা গান গাওয়ার পর ছাত্রদের মধ্যে এক-পর্যায়ে তুমুল মারামারি এবং ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ির একটা মুহূর্তে আব্দুল আলীম সাহেবের মাথায় একটা বড় ঢিল পড়ে, ফলে তিনি মঞ্চ থেকে পাশের রুমে চলে যান এবং রাত্রিবেলা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আমাকে দেখান কপালের একপাশে সুপারির মতো ফুলে গেছে। আমি পা ছুঁয়ে মাফ চাই সকলের পক্ষ থেকে। এ-রকম আরো অনেক অনুষ্ঠান সুবীর, আমি এবং বাবলু পাল ও তপনদার সহায়তায় করেছি।

এক-সময় পারিবারিক প্রয়োজনে তাকে চাকরিতে যেতে হয় এবং জনতা ব্যাংক সিলেট শাখায় তার চাকরি হয়। আমাদের সকলকে ছেড়ে ঐ হবিগঞ্জকে পিছনে ফেলে সে সিলেটে যায় এবং সাথে আমিও যাই সিলেট। গায়ক বিদিতলাল দাশ ওরফে পটলদার সার্বিক সহযোগিতায় পটলদার বাসার সামনে এবং গায়ক আকরাম সাহেবের বাসার কাছে একটি ঘরে সুবীর তার চাকরিজীবন শুরু করে। একদিন থাকার পর গায়ক দুলাল ভৌমিক ও পটলদার অনুরোধে সিলেট লাক্কাতুরা চা-বাগানের বড়সাহেবের বাংলায় গানের অনুষ্ঠান হয়; এতে স্থানীয় কয়েকজন শিল্পীই ছিলেন। এটাই ছিল সুবীরের সাথে একান্ত পরিবেশে আমার থাকা। তারপর কয়েক মাস ট্রেনিং করে ঢাকাতেই থেকে যায় সুবীর। আমি যতবার ঢাকা গেছি তার সাথে দেখা হতো এবং নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী সংস্থায় যাতায়াত করত। সিলেটের ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ খান সুবীরকে খুব স্নেহ করতেন এবং ভালবাসতেন। সুবীর বিয়ে করে কুলাউড়ার কাছে। নাম মনে নেই সম্ভবত লমনবাগ চা-বাগানে। সেখানে তার সাথে গেছি পরিবারের সবাই সহ অন্যান্য বন্ধুবান্ধব।

বিয়ের পর সুবীর তার মা-ভাই সবাইকে নিয়ে একবাসায় থাকত দেখতাম। আমার সাথে যোগাযোগ ছিল। আমি বুঝতে পারিনি সুবীর এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। আমাকে পাগল করে ফেলেছিল ভালো একটা বাসা দেখার জন্য। সুবীর ঢাকা থেকে চলে আসতে চায়, বারবার না করার পরও অবিচল থাকায় আমি সুরবিতান ললিতকলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সেক্রেটারি কাজল সাহেবকে অনুরোধ করি তার সাবেক বাসার কাছে কোনো বাসা পাওয়া যায় কি না এবং কথামতো কাজল সাহেব বাসা নিয়ে আমাকে জানান সুবীরকেও জানান, তারপর কি মনে করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সুবীর। শেষ সময়ে তার হবিগঞ্জ প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাটা প্রকাশ করলে আমি এবং কাজল সাহেব বলাবলি করছিলাম সুবীর বোধহয় আর বেশিদিন থাকবে না দুনিয়ায়।

সুবীর, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ, আমরা তোমার আত্মার শান্তি কামনা করি। তোমার পরিবারের সকলের জন্য প্রার্থনা করি, ওরা ভালো থাকুক। আর আমি প্রার্থনা করি বন্ধুদের অনেকে চলে গেছেন, অনেকে যাবার পথে, দীর্ঘ সময় আমরা সকলে একসাথে ছিলাম। তোমার মৃত্যুর পর আমার জন্য একটু জায়গা রেখো তোমার কাছে, এই প্রার্থনা আমার, বন্ধু!

মুকুল আচার্য্য প্রয়াত সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর বাল্যবন্ধু। হবিগঞ্জে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন তারা। প্রাক্তন কাউন্সিলর মুকুল আচার্য্য হবিগঞ্জের ডাকঘর এলাকায় থাকেন।

সুবীর নন্দী স্মৃতিতর্পণমূলক এই লেখাটা গানপারের অনুরোধে লেখক রচনা করেছেন, এই কারণে বাংলাদেশে সুবীর নন্দীর গুণগ্রাহী শিল্পী-শ্রোতা এবং গানপ্রিয় সকলেই কৃতজ্ঞ রইলাম লেখকের কাছে।

লেখকের সঙ্গে আমাদের সংযোগটুকু ঘটিয়ে দেন সুবীর নন্দীরই আরেক বন্ধু দীপক রায়। আমরা তার কাছেও অকপট ঋণ কবুল করছি। — গানপার

… …

আগের পোষ্ট

COMMENTS

Posari IT Solution
error: