মকদ্দস আলম উদাসী ও তাঁর গান || মুহাম্মদ শাহজাহান

মকদ্দস আলম উদাসী ও তাঁর গান || মুহাম্মদ শাহজাহান

SHARE:

দারুণ উন্দুরে খোঁড়ে মাটি
বস্তার ধান গাতেদি দিলো বয়সে দিছে ভাটি রে

লেম নিভাইয়া ঘুমাই থাকি তলে দিয়া পাটি
আসা-যাওয়া করে উন্দুর কাছে পাই না লাঠি রে

কাপড়চোপড় খাটিলিল আরও খেতার গাট্টি
কোন সন্ধানে কাটতে কাটতে করল কুটিকুটি রে

বিলাইয়ে উন্দুরে দোস্তি চলছে মোটামুটি
মকদ্দস কয় সময়মতো করলামনু বেবাটি রে

একটা সময় আছিল যখন চাটি আর পাটিই আছিল গাঁওগেরামের মাইনষের ঘুমানোর বিছনা; এমন আরামের বিছনা, ইতা আজকের দিনে ভাবাও যায় না। ছনে ছাওয়া ঘর, মাটিতে পাটি পাইতা ঘুমানোর মজাই আলাদা। আহ! কী মজার ঘুম; আজকের কারেন্টের ফ্যানের বাতাসের সাথে তার তুলনাই অয় না। কথায় আছে না — সুখে থাকলে পুকে কামড়ায়; খালি পুকে না ভূতেও কিলায়।

হকলেরই জানা — রাইতে লেম নিভাই ঘুমাইলেই ভালা ঘুম অয়; লেম জ্বালাইয়া রাইখা ঘুমান যায় না আর ঘুম আইলেও ঘুমে মজা পাওয়া যায় না। রাইতে লেম নিভাইয়া যখন মানুষ ঘুমায়; তখনই আন্ধাইরের সুযোগ পাইয়া উৎপাত শুরু করে ঘরের উন্দুর বেটা। সে নিশ্চিন্তে, নিরাপদে আসা-যাওয়া করে ঘরে; আন্ধাইরে তার হাঁটাচলা টার পাইলেও কিচ্ছু করার নাই। আন্ধাইরের মাঝে উন্দুরও দেখা যায় না, লাঠিটাও খুঁইজা পাওয়া যায় না; উন্দুর মারা ত দূরের কথা। মাইনষের এই কমজুরির সুযোগ পাইয়া উন্দুর বেটা ঘরের বস্তার ধান গাতেদি নেয়; কাপড়চোপড়, খেতার গাট্রি খাইটাকুইট্টা খুটিখুটি করে।

অনেক আগেই সুনামগঞ্জের এক জমিদার — জোয়ানকি বয়সে বেবাটি আর উল্টাপাল্টা কাজ কইরা শেষ-বয়সে সব হারাইয়া মনের দুঃখে কইলা —

রঙের বাড়ই
রঙের বাড়ই রে ভীষণ উন্দুরায় লাগাল পাইল
উগার ভইরা তইলাম ধান খাইয়া তুষ বানাইল

উন্দুরা মারিবার লাগি বিলাই আনলাম ঘরে
বিলাই আর উন্দুরা বেটায় একহাইরে বাস করে

এক্কেবারে হাচা কথাই ত কইছলা জমিদারে। কইলে কিতা অইব; তাইনর মতোই হকলের অবস্থা, সময় থাকতে ইতা কেউ বোঝে!

ভাবনায় ধরি — উদাসীর মতে মানুষ একটা ভরা বস্তা; বা, জমিদারের মতে একটা উগার। এক-সময় ভরা আছিল —  আকলবুদ্ধি, জোয়ানী, শক্তিসাহস আরও কততা; হকলতা কইয়া ত আর হেষ করা যাইত না। দুনিয়াত আইয়া মানুষ কিতা শুরু করে? বেবাটি! উল্টাপাল্টা বুদ্ধি, উল্টাপাল্টা কাম আর হকল আচুদামী। লোভ আর লালসায় পইরা মইজা থাকে রঙতামাশায়। হকলতারই একটা সীমা আছে; লোভলালসার কথাই কউকা আর রঙতামাশার কথা কউকা। বেবাটি কাজকাম ত মাইনষরে দিয়া জোয়ানকী বয়সেই অয়; হুঁশ থাকে না! বয়সটা খুবই খারাপ। জোয়ানকী বয়সে মাইনষর মনে যা আয় তা-ই করে; বেহুঁশে-বেহিসেবী সময় কাটানোর সুযোগ পাইয়া উন্দুর বেটা তার কামটা ঠিকমতোই করে। বস্তার সব ধান আর মাল গাতেদি নেয়। নিয়মমাফিক মাইনষের বয়স বাড়ে; এক সময় বয়সে ভাটিও দেয়। মাইনষের যখন ঘুম ভাঙে, হুঁশ অয় তখন খেয়াল কইরা দেখে সময় আর নাই; এর মাঝে ঘরের বিলাইয়ে আর উন্দুরে দোস্তি পাতনের কামটাও শেষ অই গেছে। এখন আপছোছ করা ছাড়া আর কিতা করার আছে! জীবনের মূল্যবান সময়টা ত বেবাটি আর আকাম-কুকাম কইরাই গেছে!

আশ্চর্য! কত সুন্দর এই দুনিয়া, তেমনি সুন্দর আর উপভোগ্য মাইনষের জীবন; এই জীবনটারে লইয়া ত বুদ্ধিমান মাইনষের আপছোছ করার কথা না। তা-অইলে বিষয়টা কিতা? শেষ বয়সে আইয়া মানুষ কিতা সমস্যায় পড়ে? জোয়ানকী বয়সে কোনোদিন ভালা-মন্দ বুঝছে না, হালাল-হারাম তুকাইছে না, ঠিকমতো ধর্মকর্মও করার চেষ্টা করছে না; ন্যয়রে অন্যায় আর অন্যায়রে ন্যায় করতেই তাইন বেশি ভালা পাইতা। সুদ-ঘুষ-দূর্নীতি কইরা আর না-হয় জোরজবরদস্তি খাটাইয়া তাইন সহায়-সম্পদ কামাইছইন; হেষমেশ তাইনও একদিন আশ্রয় লইন ধর্মের কাছে। কই ধর্মের আশ্রয় লওয়া ত আর খারাপ না, খুবই ভালা কথা। কথা অইল ভালাটা আর তাইনরে দিয়া অয় কই? দেখি হেই বেবাট মূর্খমানব ধর্মরে আশ্রয় কইরা, ধর্মের মুখোশ মুখে লাগাইয়া শুরু করে আরেক নয়া খেলা। নিয়ম কইরা মসজিদ-মন্দিরে যায়; সমাজে তাইন এখন ইমানদার আর ধার্মিক। তাইনের হাবভাব আর চলাফেরা দেইখা মনে হয় তাইনের লাগি বেহেস্ত আর স্বর্গের দরজা খোলা। বেশিদিন লাগে না, অল্প কয়দিনেই তাইন অই যাইন সমাজে গণ্যমান্য; ধার্মিক, বিচারি আর গাঁওগেরামের মুরব্বি।

এমন কিছু ধার্মিক, বিচারি আর গাঁওগেরামের মুরব্বির জ্ঞান আর বুদ্ধির বাহার দেইখা ত মাথা ঘুরাই যায়। এক-সময় তাইন তাইনের স্বার্থ আর টেকা ছাড়া দুইনার কোনতা বুঝতা না; অনে দেখি হকলতাই বুঝইন। খালি ধর্মকর্ম না — কে মুসলমান, কে নায় ইতাও ভালা বুঝইন; দরকার মতো কেউর উপরে ফতোয়া জারি করার পথঘাটও তাইনের জানা আছে। এখন তাইনের কাম অইল — তাইনের চেয়ে শতগুণ বেশি শিক্ষিত-জ্ঞানী আর স্বভাবচরিত্রে ভালা মানুষ নিরীহ কেউরে ধর্মীয় মতে অপদস্থ করা। দূর্বল কেউরে সমাজও বাদ সাব্যস্ত করা। ভদ্র আর শিক্ষিত কেউরে গ্রাম্য রাজনীতির জটিল প্যাচে পালাইয়া জনমের শিক্ষা দেওয়া। কিছু নয়া ধার্মিক, বিচারি আর গাঁওগেরামের মুরব্বির কাজকাম দেখলেই বোঝা যায় — তাইনের ভিতরের বিলাই আর উন্দুরের দোস্তিটা ভালা কইরাই জইমা উঠছে।

ধার্মিক পণ্ডিতরা কইন — সময়মতো ধর্মকর্মের পথ ধরো; ধর্ম মানুষরে হেফাজত রাখে, ভালা পথে রাখে। মানলাম ইতা হাচা কথা; কিন্তু বাস্তবে কিতা দেখি আর শুনি! ভণ্ড ধার্মিকদেরও শতশত আকাম আর কুকামের খবর; তাজ্জব ব্যাপার! আইজ দেখি ধর্মীয় উপাসনালয়েও হেফাজত নায় নিরীহ মানুষ। আসলে ধার্মিক হওয়াটা যত সহজ; মানুষ হওয়াটা মনে হয় ততই কঠিন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কয়দিন গেলেই ধার্মিক হওয়া যায়; আর ধর্মীয় আচার-আচরণ, ইতা ত মনে অয় তিনদিনেই হিখা যায়। কোনো কোনো বিষয় না হিখলেও চলে — ‘এক্তা দাইতু বিহাজাল ইমাম’। ইতা কইরা অয়তবা ধর্মকর্ম আদায় অয়; তবে সঠিক মানুষ অওন যায় না। সঠিক মানুষ অইতে অইলে আরও কোনতা লাগে।

এলাকায় একটা কথা আছে — ‘ঘুইরাঘাইরা পাগলা বাজার’। এখন দেখি আসলেই ঠিক কথা। জ্ঞানী আর গুণীরা বারবার একটা কথাই কইছইন — নিজেরে চিনো, নিজেরে জানো। মানুষ ত অইসময় আসল মানুষ অয়, যখন হে নিজেরে চিনতে আর জানতে পারে। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দ্যেশ কইরা কইন — আপনে তারারে জিগাইন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কিতা হমাননি? (সূরা যুমার, আয়াত ৯)। নিজেরে সঠিকভাবে জানা আর চিনার লাগি চাই জ্ঞান; ইতা পাওয়া যায় বিদ্যাশিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষার মাধ্যমে যেতা কামাই করা যায় ইতা অইল জ্ঞান। এর লাইগা বহুত চিন্তাভাবনা কইরা অ্যালান ব্লুম কইন — ‘শিক্ষা হইছে আন্ধাইর থাইকা পহরের পথে রওয়ানা দেওয়া’।

হকল সময়ের লাইগা এক্কবারে হাচা একটা কথা—   দোলনা থাইকা কইবর পর্যন্ত জ্ঞান কামাই করো। মানে, দুনিয়াত জন্মের পর তাইকা মরণের আগ পর্যন্ত জ্ঞান কামাও; বিশ^নবি মুহাম্মদ (সা.) কইয়া গেছইন—  হকল সুস্থ বেটাবেটির জন্য জ্ঞান কামাই করা ফরজ। আবার কইছইন — জ্ঞান কামাইয়ের লাগি দরকার পরলে দুরের দেশ চীনে যাও। এতইত বোঝা যায় জ্ঞান মানুষের লাইগা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আদিম জংলী মানুষ এই পর্যন্ত আইছে জ্ঞানের হাত ধইরা। মানবজীবনের হকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে একমাত্র বিদ্যাশিক্ষা, আর তার তাইকা কামাই-করা সঠিক জ্ঞান; যার উপরে ভর কইরা মাইনষের জীবন গইড়া উঠব মাইনষের মতন; মাইনষের বসবাসের ঘরখানা অইব লোয়ার মতন শক্ত আর মজবুত। ইরকম ঘর অইলে উন্দুর বেটা আর মাইনষের ঘরে ঢুকার পথ পাইত নায়; আর ঘরে উন্দুর ঢুকতে না পারলে বিলাই আনারও দরকার পড়ত নায়।

দুই

আলোচনার সূত্রপাত সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত জনপ্রিয় একটি গান ও গানের বিষয়বস্তু নিয়ে; গানটির গীতিকার মকদ্দস আলম উদাসী। তেমন-একটা পরিচিত নন তিনি; বলা যায় নিভৃতচারী বয়োবৃদ্ধ এক বাউলসাধক। চুপচাপ-নিরিবিলি পড়ে আছেন জগন্নাথপুরের এক পল্লিগ্রামে; জন্ম তাঁর ছাতকের চরবাড়ায়, ১৩৫৪ বাঙ্গাব্দে। শৈশবেই লেখাপড়া ছেড়ে হাতে তোলেন দোতরা; মুখে মাটির সোঁদা গন্ধমাখা বাউল গানের সুর। এক-সময় নিজেও গান বাঁধা শুরু করেন। তাঁর গানের উস্তাদ প্রখ্যাত বাউল দূর্বিন শাহ আর আধ্যাত্মিক গুরু শুকুর আলী চিস্তী।

ইতিমধ্যে তাঁর রচিত বেশকিছু গান নিয়ে তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় মকদ্দস আলম উদাসীর নির্বাচিত গানের বই; প্রকাশক উপজেলা পরিষদ জগন্নাথপুর। বইটিতে উদাসীর জীবন ও বাউলজগতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক ভূমিকা লিখেছেন সাহিত্যজগতের গুণীজন কবি মোস্তাক আহমাদ দীন। প্রকাশনা প্রসঙ্গে সুন্দর, সাবলীল একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন জগন্নাথপুর উপজেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ।

মকদ্দস আলম উদাসীর রচিত গানগুলোর মধ্যে যেমন আছে সৃষ্টিতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, মুর্শিদি, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব; তেমনি আছে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি আর অনাচার নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় রচিত বেশকিছু গান। বৃহত্তর সিলেটের আনাচেকানাচে, গাঁওগেরামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আঞ্চলিক ভাষার হাজারো প্রবাদ-প্রবচন। উদাসী তাঁর গানে সার্থকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন এসব প্রবাদ-প্রবচনের দৃষ্টান্ত কিংবা উপমা। গাঁওগেরামের পারিবারিক আর সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে প্রচলিত কিছু প্রবাদ-প্রবচনের মর্মার্থ উঠে এসেছে তাঁর কয়েকটি আঞ্চলিক গানে। নিম্নে গানের কয়েকটি পঙক্তি তুলে ধরা হলো —

(১) 
দাদারে আদা পড়া হিকাওনি
কিতার লাগি কিতা অয় — হুনো খালি বুঝনি

বাপর খালি ভিটা দিলে বুড়া বেটির টেকর খাইলে
পানিরে আটকাইল আইলে — কাঁকড়ার গাতখান খাটোনি …

(২) 
ফস মাটি তুরকুল্লায় খোঁড়ে
বেসেবে পড়িলে কেউ
হখলে যাতা মারি ধরে …

(৩) 
তাউল্যার মাঝে লবণ থইয়া খাইবনে
পরর ছাল্লায় আগন মাসও
ফকির হইয়া ঘুরবনে …

(৪) 
চেঙ্গর মুল্লুক বেঙ্গে খাইলিছে।
বাঁশ থাকি ছিংলা বড় — জ্ঞানীর মাথা ঘুরাইছে

বাপর কথা পুয়ায় মানে না, বংশর ইজ্জত রাখত চায় না
মুরব্বিরে সম্মান দেয় না — কুছাল্লা কার পাইলিছে …

সবসময়ই গ্রাম্য সমাজে দেখা মেলে কিছু জটিল আর কুটিল চরিত্রের মানুষ; তাদের স্বভাবচরিত্র আর কাজকর্মের দৃষ্টান্ত দিতে রয়েছে কিছু প্রবচন। গ্রামের মানুষের কথাবার্তায় যুগের পর যুগ এগুলো ব্যবহার হয়ে আসছে। আজও প্রবচনগুলো টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে; সহজ-সরল শব্দের গাঁথুনীতে এ-ধরনের কিছু প্রবচন উঠে এসেছে উদাসীর বিভিন্ন গানে —

(১) 
ঘরর মাড়ইল কাটে সদায় উন্দুরে
গাছে উইট্টা কমলা খায় — লেঙ্গুড়কাটা বান্দরে

উন্দালর চিপাত বিলাই ঘুমাই থাকে হইয়া নিরাই
বুদি-হিয়াল সাজল জামাই বইল গিয়া বাঘর হাইরে …

(২) 
বগলতলিত দুষ রাখিয়া মাতব্বরি
গরিব-দুঃখী বিচার পায় না
বাপরে বাপ কি তকব্বরি …

(৩)
তোমার নিজর বিচার পরার মাইনষে করতানি
বেহুদা জাতাজাতি — পলোখানতা ভাংতায়নি

খালর মাঝে পানি বেশি, হেসে কররায় দুষাদুষী
রইতনায় মুখভরা হাসি — হিঙ্গির গালা খাইতায়নি …

(৪) 
নিজর বিচার নিজে কর বুচ্ছনি
আরেকজনে করলে বিচার তোমার ইজ্জত থাকবনি …

(৫)
এবোতরি স্বভাবখান তোর ভালা কর
তওবা-তিল্লা কইরা এবো ভালা মাইনষর সঙ্গ ধর …

দিনে দিনে মানুষের বয়স বাড়ে; প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মানবশরীরে দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা, বাড়তে থাকে সীমাবদ্ধতা ও অক্ষমতা। বৃদ্ধ বয়সের শারীরিক সমস্যা আর জটিলতা; তা এড়িয়ে যাওয়ার পথ নেই প্রাণিজগতের বুদ্ধিমান প্রাণি মানুষের। আশ্চর্য হতে হয় বয়োবৃদ্ধ এক বাউলের রসবোধ দেখে। বৃদ্ধ বয়সে নিজের শারীরিক অক্ষমতা আর অসুখবিসুখ নিয়ে উদাসীর রসিকতা; তেমনি সময়ের যুবকদের প্রতি সতর্কবার্তা নিয়ে তাঁর একটি গানের পঙক্তি এ-রকম —

ঝিলকাইছ না রে ভাই
ওনে আমার আগের দিন আর নাই।
রাইত কেমনে যায় খবর পাই না
কত আর ডাক্তর দেখাই …

‘বাংলার বাউল’বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে — হাতে দোতরা কিংবা বেহালা, মাথায় বাবরি চুল,  জীর্ণশীর্ণ চেহারার নিরীহ গোছের একজন সহজ-সরল মানুষের প্রতিকৃতি। যার নাই কোনো সহায়-সম্বল, হয়তো-বা কারো ঠিকানাটুকুও নেই; আজ এখানে তো কাল ওখানে। সমাজে শুনতে হয় নানাজনের নানান ব্যঙ্গবিদ্রুপাত্মক কথাবার্তা; শেষ-বয়সে জোটে অবহেলা আর অনাদর। কখনো গাঁওগেরামের কুচক্রীদের কারণে পিতৃভিটে ছেড়ে হতে হয় পরবাসী। তেমনি গৃহহীন-পরবাসী বাউলসাধক মকদ্দস আলম উদাসী; দুষ্টপ্রকৃতির গ্রাম্য মাতব্বরদের প্রতি তাঁর অসহায়ত্বের ক্ষোভ আর মানুষের প্রতি মানবিক মূল্যবোধের চিরন্তন বাণীটা প্রকাশ করেন তাঁর একটি গানে —

নিজর সম্মান পাইবার লাগি পরার ইজ্জত মারিছ না
শোন তরে কই মন বেগড়া — বকাবকি করিছ না

বুঝো কথার সারমর্ম অহিংসা পরম ধর্ম
নিজে করো নিজর কর্ম — পরার দুষ আর তুকাইছ না …

  • মকদ্দস আলম উদাসী ও ফকির শমছুল

… …

COMMENTS

error: