কিছু কিছু বই, কিছু শুধু হই চই

কিছু কিছু বই, কিছু শুধু হই চই

‘বলা হয় আমরা সবাই নাকি জীবনের অর্থ খুঁজি। আমার কিন্তু মনে হয় না যে আমরা সত্যিই জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াই। আমার বিশ্বাস, যা আমরা খুঁজে ফিরি তা হলো জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকার একটা অভিজ্ঞতা — যেন জীবন আমাদের একেবারে নিখাদ বস্তু-সমতলে আমাদের গভীর অন্তর্দেশে অস্তিত্বের আর বাস্তবতার অনুরণন শুনতে পায়, যেন আমরা সত্যিই বেঁচে থাকার বিপুল আনন্দ অনুভব করি।’ [জোসেফ ক্যাম্পবেল। মিথের শক্তি । অনুবাদ ও ভূমিকা : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। ঐতিহ্য, ঢাকা ২০০৭]

‘মিথের শক্তি’ আমার অভিজ্ঞতা-অন্তর্গত হওয়ার আগে মিথ মাত্রেই মনে হতো বিতিকিচ্ছিরি রকমের বিকৃতি। মনে হতো পৌরাণিক গল্পগাছা সমস্তই আদতে অতিশয় অসূরীয় কায়কারবার। রিডিক্যুলাস্ ক্যারিকেচার মনে হতো স্রেফ। দেব-দেবীদের কূটকচাল ও কলহ, যুদ্ধবিগ্রহ, ন্যাক্কারজনক নিগ্রহ, যৌনউদ্ভটতা ইত্যাদি নিছক ফাইজলামি ভাবতাম। কিন্তু ‘মিথের শক্তি’ পড়ে যাকে বলে অন্তর্চক্ষু-খুলে-যাওয়া, তেমনটাই হয়েছে। পুরো জগতকে, জীবনকে, নিতিদিনকার ঘটনাপ্রবাহগুলোকে এক অন্য আতশকাচের তলায় রেখে দেখবার একটা চোখ তৈরি হয়, বলা যায়, এইটা পাঠের পর থেকেই। কিন্তু চোখটা আগের ন্যায় নাই সম্প্রতি। বিভিন্ন নদী ও বন্দরের ঘাটে ঠেকে ঠেকে নয়নের নানাবিধ ধান্দা বাড়তে বাড়তে এখন আগের সেই সহজিয়ানা নাই। কী আর করা যাবে, অগত্যা, ভাই!

ইশ্কুল-কালেজে এককালে অ্যাডমিটেড ছিলাম মনুষ্য সমাজের মেম্বার হইবার আশে। সেইটা হয়ে ওঠে নাই, কিন্তু কতিপয় কিতাবের নাগালে যেতে পেরেছিলাম বৈকি, দিগগজ হইতে ব্যর্থ হয়েছি স্বীয় কর্মদোষে। অ্যানিওয়ে। আফসোসে আয়ুনাশ হয়, কাজেই নিরাফসোস রহি। ইশ্কুলকারিকুলামের আওতায় এক্সাম্ উত্তীর্ণ হবার জন্য বছর-কয়েক পৌরাণিকীর পাতা উল্টাতে হয়েছিল। মূলত রোম্যান্, গ্রিক্, গ্রেকোরোম্যান্ মিথোলোজিই ছিল পাঠ্য। চোখমুখ কুঁচকিয়ে বুঁজিয়ে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে, সেই বিপত্তারণ হয়েছিল নমো-নমোভাবে। অ্যাডিথ হ্যামিল্টন্ নামের একজন তখন সর্বছাত্রপাঠ্য ছিলেন। মনে-পড়ছে-না-নাম দুইয়েকজন আরও ছিলেন রেফ্রেন্স বইয়ের লিস্টিতে। সেই সময়টায় একটা বাংলা বই বেরিয়েছিল ‘প্রতীচ্য পুরাণ’ নামে, ফরহাদ খান প্রণীত, এইটা হাতে পেয়েছিলাম তখন। হয়েছিলাম উপকৃতও। অনেক বছর বাদে যেয়ে অ্যাডিথ হ্যামিল্টনের বইটা আস্ত বঙ্গানুবাদ করেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, কবি তিনি এবং ছিলেন ইংরেজি লিট্রেচারেরই শিক্ষক, অবশ্য তদ্দিনে লেখাপড়ার পাট চিরতরে চুকিয়ে এই নিবন্ধকার গুনাগার বান্দা সকালসন্ধ্যা ধান্দার দাস।

পুরাণ নিয়ে, পৌরাণিক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যেকটা ক্যারেক্টার ও ইন্সিডেন্সেস্ নিয়ে, অ্যাডিথ হ্যামিল্টন রচিত বইটাই সেকেলে শিক্ষার্থীরা নাগালে পেত অধিক। প্রোক্ত দুইটা বাংলা বই ছাড়াও পরে বেশকিছু বই, গ্রিক্ মিথোলোজির বই, বেরিয়েছে এখানে। অ্যাডিথ হ্যামিল্টনেরই বইটার আরেকটা ভাষান্তরিত গ্রন্থরূপ বাজারে এসেছে এক-সময়, ‘গ্রিক মিথলজি / দেবতা ও বীরদের চিরায়ত উপাখ্যান’ শীর্ষক, বইটা আসাদ ইকবাল মামুন অনুবাদ করেছেন। প্রকারান্তরে এহেন বই শিক্ষার্থীসখা হলেও পরিচিতিমূলকতা ছাড়া এগুলো অন্য কোনো গূঢ় তফসিরের হদিস দ্যায় না। তা সত্ত্বেও বইগুলো থেকে গ্রিক্/রোম্যান্ মিথসমূহের কাহিনিরেখাটা আঁচ করা যায়।

কিন্তু মুখস্থই করতে হয়েছে মিথের রেফ্রেন্সেস্, ঠাঠা মুখস্থ, একটা সময় পর্যন্ত। পরীক্ষায় নিম্নমাঝারি স্কোর করার গরজে হেন অপকর্ম নাই যা সাধনে পিছপা বাঙালি। কিন্তু পরীক্ষাযামিনীগুলো ফুরাতে-না-ফুরাতেই বিদ্যা ফুড়ুৎ। পৌরাণিক চরিত্রগুলো কোনটা কার জ্ঞাতি, কে কার রাইভ্যাল্, কী যাতনাবিষে দংশিয়াছে কে কারে ইত্যাদি বিদঘুটে প্যাঁচগোচ মনে রেখে জীবনযাপন-দক্ষিণায়ন মুসিবতেরই বাৎচিত। পুরাণের বিভিন্ন অভাবিত অজাচারের বাস্তবিক ব্যাখ্যা, আখ্যানগত দ্যোতনা, মোদ্দা কথায় মিথের মজাটা আখ্যানভাগ থেকে বের করার সূত্র জোসেফ ক্যাম্পবেলের সাক্ষাতেই জীবনে প্রথম হাতে পাই।

‘সৃজনমূলক জীবনের দিকে’ তেমনি আরেকটা বই, ঠিক মিথভিত্তিক না-হলেও আধুনিক জগজ্জটিলতার বহুকিছু নিয়ে এই বইটা, আর্নল্ড টয়েনবি এবং দাইসাকু ইকেদা পারস্পরিক আলাপ-সংলাপের সংকলনগ্রন্থনা, ‘মিথের শক্তি’ বইটার স্মৃতিই ফিরায়ে এনেছিল কয়েক বছরের ব্যবধানে, এই দুইটা বই-ই বাংলায় পড়া। ভালো অনুবাদই বলতে হবে উভয়টা। ক্যাম্পবেলের সঙ্গে বিল্ ময়ার্সের কথোপকথনভিত্তিক বই ‘মিথের শক্তি’ খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের অনুবাদে বেহতর লা-জওয়াব। পয়লা বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে বেরিয়েছিল, বহু বছর আউট অফ প্রিন্ট থাকবার পরে এখন ‘ঐতিহ্য’ সংস্করণ লভ্য। পুরাণতত্ত্বের আরেকটা গ্রন্থ ‘দ্য গোল্ডেন বাউ’ অনুবাদ করেছেন ইলিয়াস অনেক বছর বাদে, জেমস্ ফ্রেজার প্রণীত, এইটাও উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত বলতে হচ্ছে একই কিসিমের না-হলেও আরেকটা বই পড়ার অভিজ্ঞতা, পাওলো কোয়েলো বইটার রচয়িতা, ‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন্ অ্যাক্রা’ নামের এই বইটা পাঠ-অন্তর্ভূত হয়েছে ম্যানাস্ক্রিপ্ট আকারেই বঙ্গানুবাদনের অন্তর্বর্তীকালে, একেবারেই রিসেন্ট বছর-দেড়েকের মধ্যে, এইটার অনবদ্য বঙ্গানুবাদন করেছেন জাকির জাফরান, বইটা আজ বা কাল পড়ে দেখতে পারি।

কী প্রাচ্য কী প্রতীচ্য — দুনিয়ার তাবৎ পুরাণকথাকে মনে হতো স্রেফ উদ্ভটত্বে আকীর্ণ, অন্ধকার অবকল্পনায় আবিল এক জগৎ, মানবের মনোবিশ্বে পুষে-রাখা বল্গাহীন অবদমনের অত্যদ্ভুত অভিব্যক্তি, স্খলন-পঙ্কিলতার পৃথুল প্রকাশ। ভাবনার ওই অবস্থান অনড় থেকেই যেত, যদি না পেতাম এই মিথগ্রন্থটির খোঁজ। এবং অনড়-অবিচল জড়তায় আচ্ছন্ন রয়ে যেত আমার জীবনজগৎ, যাপনের যাবতীয় অভিজ্ঞতা; ভাগ্যিস, বইটি এ-জীবনে নাগালে এসেছে আমার! ‘মিথের শক্তি’ পাঠোত্তর কতভাবেই-না লাভবান হয়েছি আমি, বলার অপেক্ষা বাহুল্য।

শুধু ‘মিথের শক্তি’-ই নয়, এমন আরও দুইয়েকটা বই আমার দেখার ভঙ্গি বদলে দিতে কাজে এসেছে। যেমন : ‘দ্রষ্টা’/‘দি প্রফেট’। কা’লিল্ জিব্রান্। এই বইটির বন্ধুমহলে-বিতরিত বিজ্ঞাপন আমার জবানিতে এক ও অসংশয় আজ তক্। আমি বলি কি, — পৃথিবীতে অনেক ধর্মগ্রন্থ এসেছে, এবং সমস্ত ধর্মগ্রন্থই সীমার ভেতরে সুন্দর; একটা সাধারণদৃশ্য সীমানা সকল ধর্মগ্রন্থ বা স্ক্রিপ্চারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; সেই সীমানাটি হলো : ধর্মগ্রন্থগুলো প্রতিটাই গোত্র-বিভাজিত, এক গোত্রের ধর্মগ্রন্থ অন্য গোত্রের নিকট নিরঙ্কুশ গ্রহণযোগ্য নয়। পেছনে পর্যাপ্ত কারণও রয়েছে আলবৎ। কিন্তু ‘দি প্রফেট’/‘দ্রষ্টা’-কে আমি বলি সর্বমানবের পঠিতব্য ধর্মগ্রন্থ। বইটার বহুবিধ বঙ্গানুবাদ মার্কেটে মেলে, এর-ওর নানান বরন ও উচ্চতার বঙ্গজ অধ্যাপক-অনধ্যাপক অনুবাদকের, অ্যাট-লিস্ট পাঁচখানা ট্র্যান্সল্যাশন্ উল্টেপাল্টে দেখে সেই প্রথম-পঠিত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদটাই মনে হয়েছে খাসা।

মানুষজাতির ধর্মগ্রন্থ। অত্যধিক বাড়িয়ে বলা হয়ে যায়? কী জানি! কিন্তু আমি অমনটাই বলি এবং এখনও বদলাইনি ওই অভিমত। তেমনটাই কথা খাটে ‘মিথের শক্তি’ বইটি বিষয়ে। আর এত কথা মনে উঠছে আজ, অনেকদিন পর, ‘মিথের শক্তি’ ফিরে দেখতে যেয়ে।

লেখা / জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: