আমার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের কবিতা || শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আমার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের কবিতা || শক্তি চট্টোপাধ্যায়

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখনি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে-পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চিরস্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চিরসমুজ্জল।
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,
এই নিয়ে তাহার গৌরব।
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।
শেষ লেখা
(জোড়াসাঁকো, কলিকাতা, ৩০ জুলাই ১৯৪১, সকাল সাড়ে-নয়টা)

রবীন্দ্রনাথের কোন কবিতাটি আমার সবচেয়ে প্রিয় এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা খুবই মুস্কিল। আসলে ওঁর বহু কবিতাই আমার প্রিয়তম। ‘প্রিয়তম’ বলতে তো একটা কবিতা হওয়া উচিত, কিন্তু রবিঠাকুরের অনেক কবিতাই প্রিয়তম হয়ে রয়েছে একই সঙ্গে। তার মধ্যে শেষ লেখায় শেষ কবিতা ‘তোমার সৃষ্টির পথ’ আমাকে এই বয়সে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। যেতে থাকে।

এই কবিতায় দর্শন যত বেশি আছে, কবিত্ব তার তুলনায় অনেক কম। এখানে কবি যেন সারাজীবনের যা-কিছু লেখা, কীভাবে পেয়েছেন, তার একটা ভাষ্য কবিতার মধ্যে দিয়েছেন। ভাষা অত্যন্ত সরল, জটিলতা বিন্দুমাত্র নেই। এখানে উচ্চারণ খুবই স্পষ্ট, বাহুল্য একেবারেই নেই। একটি শব্দও পর্যন্ত আমার ধারণা বদলাতে পারা যাবে না। ওঁর অনেক কবিতায়, বিশেষত প্রথম দিককার কবিতায় কিছু কিছু বাহুল্য আছে। কিন্তু শেষ জীবনের কবিতায় শেষ সপ্তক, রোগশয্যায়, শেষ লেখায় কবি অনেক সংহত ও সরল হয়ে এসেছেন। সমস্ত অলঙ্কার ত্যাগ করে সাদামাটাভাবে সবকিছু দেখা, অথচ তার ভেতরে রয়েছে একটি বিশুদ্ধ বক্তব্য। এই পর্যায়ের কবিতাগুলিই আমাকে বেশি টানে।

যখন তিনি বলছেন “তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি / বিচিত্র ছলনাজালে, / হে ছলনাময়ী” বোঝা যায় দীর্ঘসময় যা-কিছু সৃষ্টি করে গেছেন — সবকিছুই মায়া বা ছলনা মনে করেছেন। কবিতার শুরুতে অবিশ্বাস। কিন্তু শেষে “অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে / সে পায় তোমার হাতে / শান্তির অক্ষয় অধিকার” — এই বিশ্বাসটা ফিরিয়ে এনেছেন। যে সাবলীলতার মধ্য দিয়ে ছলনাটি সইতে পারে, সে-ই শান্তির অক্ষয় অধিকার লাভ করে। ঐ ছলনাটির প্রয়োজন আছে। ছলনাকে ছলনা বলে ধরে নেওয়াটাই বড় কথা। তাতেই তো শান্তি। কেননা, এই সৃষ্টির পথ সবই তো ছলনাময়ীর মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছে ‘নিপুণ হাতে সরল জীবনে’ — জীবন সরল, জটিলতা কিছু নেই, কিন্তু ঐ সারল্যের ভেতরে ছলনাময়ীর সৃষ্টি জটিলতা এনে দিয়েছে।

এই ছলনাময়ী কে? মনে হয়, যিনি সৃষ্টি করাচ্ছেন তিনিই। কোনো তত্ত্বকথা নয়। আসলে কবির যা-কিছু সৃষ্টি তার মূলে যিনি — নারীও হতে পারেন, প্রকৃতি, যে-কেউই হতে পারে। আবার সব মিলেমিশে ছলনার একটি সক্রিয় অস্তিত্বও বলা যেতে পারে।

এই কবিতার বক্তব্যের সঙ্গে আমার জীবনের এক অর্থে মিল পাই। আমার যা-কিছু লেখা সেসব তো সচেতনভাবে লিখি না — কে যেন লিখিয়ে নেয়। হঠাৎ-হঠাৎ একটা সময় আসে, এমন একটা গূঢ় অবস্থার মধ্যে চলে যাই, তখন লেখা হয়। সচেতনভাবে লিখতে গিয়ে কখনোই লেখা হয়নি। সে-কারণে আমার লেখা হয়ে যাওয়ার পরে সেখানে কাটাকুটি প্রায় একেবারেই করি না। তবে আমি ঠিক ‘ছলনাময়ী’ বলছি না, এক-ধরনের ক্ষমতা, কোনো শক্তি যা গোপনে থাকে — তারই তাগিদে লিখি। লিখে যেতে হয়।


রচনাতথ্য : লেখকের গদ্যসংগ্রহ চতুর্থ খণ্ড থেকে এই রচনাটি গৃহীত। উল্লেখ্য, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যসংগ্রহের প্রথম খণ্ডটা ছাড়া বাকি খণ্ডগুলো কবিভক্তরা ব্যতীত খুব-একটা সাধারণ পাঠক পড়ে দেখেন না বোধহয়। নানা কারণেই প্রথম খণ্ডটায় নিরীক্ষামূলক গদ্যের নজিরটা আমরা পায়া যাই শক্তির হাতবাহিত, ‘কুয়োতলা’ আর অন্যান্য প্রথমদিককার নামকরা আখ্যানগুলা হাজির প্রথম খণ্ডে, অন্যান্য খণ্ডগুলোতেও চমৎকার সমস্ত গদ্য রয়েছে। এই গদ্যটা, আগেই বলা হলো, চতুর্থ খণ্ডের। এইটা ভারতের দে’জ পাবলিশিং  প্রকাশিত শক্তি চট্টোপাধ্যায় গদ্যসংগ্রহ ৪  (১৯৯৭, কলকাতা) থেকে নেয়া। চারনাম্বার খণ্ডটায় কিশোরসাহিত্য ও অগ্রন্থিত রচনা রয়েছে কেবল। শুধু শ’খানেক পৃষ্ঠা ছাড়া সাড়ে-চারশতাধিক পৃষ্ঠার বইটা আদতে একটা অগ্রন্থিত রচনারই সংগ্রহ। রবীন্দ্রনাথকেন্দ্রী নিবন্ধটা সেই অগ্রন্থিত অংশের শেষভাগ থেকে নেয়া। — গানপার

… …

COMMENTS

error: