ট্রেন্ডি কালচারাল অ্যাক্টিভিজম ও পরলোকগত রাকেশ ভট্টাচার্য

ট্রেন্ডি কালচারাল অ্যাক্টিভিজম ও পরলোকগত রাকেশ ভট্টাচার্য

SHARE:

সিলেটের অত্যন্ত পরিচিত ও সর্বজনপ্রিয় সংস্কৃতিকর্মী রাকেশ ভট্টাচার্য হঠাৎ করে দেহ রাখলেন। স্ট্রোক। অত্যন্ত হতচকিত অকাল বয়সে। এরই মধ্যে দেখতে দেখতে কয়েকদিন হয়ে গেল উনার শরীরী অনুপস্থিতির। বাগিচা  নামে একটা উদ্যোগ বাস্তবায়িত করেছিলেন উনি নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে, একটা এমন দোকান যেখানে লোক্যাল রিসোর্সেস থেকে নান্দনিক নিত্যব্যবহার্য শোপিসেস পাওয়া যেত, নগরীর নাটকপাড়া লামাবাজারের সেন্টারেই ছিল দোকানটা, আমাদের অনেকেরই প্রথম প্রেমের কার্ডফার্ড ওইখান থেকে কেনা। দ্বিতীয়-তৃতীয়ও বোধহয়। এইটা ওই সময়, আর্চিস  তখনও আসে নাই বা আরও যারা আজাদআইডিয়াল  ছিল তাদের জিনিশপত্তর বাজারিমার্কা মনে হতো আমাদের প্রণয়িনীদের কাছে। সেহেতু সেই আমাদের যৌথচেতনা উন্মেষের দিনগুলায় নিঃসঙ্গতার করুণ কর্কট থেকে বাঁচানোর রক্ষাকর্ত্রীদেরে ম্যানেজমেন্টে রাকেশ ভট্টাচার্য ও তার বিউটিফ্যুল ইনিশিয়েটিভ বাগিচা  সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। উনি ইন্তেকাল করলেন স্ট্রোকে। এই নিখিলবিস্তারী নিঃসঙ্গতার দিনগুলায়। তার শববাহক খুব বেশি নিশ্চয় হয় নাই, বিপর্যয়ের এই সময়ে কে হবে কার শ্মশানবন্ধু, যদিও সময় স্বাভাবিক থাকলে নগরীর সংস্কৃতিকর্মীদের ব্যাপক সমাগম হতো উনার সৎকারযাত্রায়। অ্যানিওয়ে। এইটুকু করা ছাড়া আর কিছুই তো করবার নাই। ট্রিবিউট জানাই। নিতান্ত ছোট্ট এই লেখার মাধ্যমে আমরা তারে শেষ শ্রদ্ধা জানাই গানপার  থেকে।

একটু যদি রাকেশ ভট্টাচার্যের সময়টা আমরা রিক্যাপ করতে যাই, সিলেট নগরীর বিশেষ একটা টাইম ঘুরে আসা যাবে। দেখা যাবে আমাদেরও দুর্বার সময়টাকে একাংশে। এইটা সেই সময় যখন প্রান্তিক চত্বর  কেন্দ্র করে সিলেট শহরে থিয়েটার ও কালচার শেইপ আপ করছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরে এবং গোটা আশির দশক জুড়ে, এবং নব্বইয়েও, প্রান্তিক চত্বর  একটা কালচারাল হাব্ হয়ে উঠেছিল নগরীর মানুষদের কাছে। এই জায়গাটার নাম প্রান্তিক  হয়েছিল কচিকাঁচার আসর প্রান্তিকের নামানুসারে। সম্ভবত সাতাত্তর-আটাত্তর সাল নাগাদ বা তারও আগে থেকে মেডিক্যালশিক্ষার্থীদের শামসুদ্দীন ছাত্রাবাসের সংলগ্ন জায়গাটায় প্রান্তিক কচিকাঁচার আসর  বসত। সমসময়ে আরেকটা আসরও শুরু হয় দীপালি কচিকাঁচার আসর  নামে। এই দুই আসরের শিশুকিশোরেরা দেশব্যাপী বিভিন্ন ইভেন্টে পার্টিসিপেইট করে কালচারাল পার্ফোর্ম্যান্সের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে সেইসময়।

প্রান্তিকেই ধীরে ধীরে সিলেটের সদ্য-স্বাধীন সাংস্কৃতিকভাবে তৎপর তারুণ্য ও যুবসমাজ নানান অ্যাক্টিভিটি নিয়া হাজির হতে থাকে। কেউ আবৃত্তি, নৃত্য কেউ কেউ, এবং নাটক তো বটেই। থিয়েটারতৎপর তরুণদের সেরা সময় গিয়েছে এই প্রান্তিককেন্দ্রী সিলেটের চৌহাট্টায় রিকাবিবাজারে। এখানেই সিলেটের পুরানা নাট্যদলগুলার মধ্যে নাট্যায়নকথাকলি  ইত্যাদি বিশিষ্টতা লাভ করে। নিত্য মহড়া, হাঁকডাক হৈহল্লা, মানুষের পদচারণমুখর একটা জায়গা ছিল প্রান্তিক। পরে এইটা আর থাকে নাই। পরে, অনেক পরে, দুইহাজারের পরে এসে প্রান্তিক চত্বর চিরতরে গুটিয়ে যায়। কেন, কীভাবে, অত কথায় আপাতত কাজ নাই। কিন্তু অনুমেয় যে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যা-কিছু সাংস্কৃতিক অর্জন জুটেছে তার সবই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী ডিক্টেটরদ্বয়ের সামরিক পাদুকার তাড়ায়। এরপরে যখন সত্যি সত্যি নির্বাচনের মাধ্যমে ডেমোক্রেসিলিডারদেরে নেতৃত্বে এনেছি আমরা, হালুয়া-রুটির হিস্যা কাড়াকাড়িতেই গিয়েছে ভেস্তে সবকিছু। গত দেড়দশকে আমরা দেশ থেকে সবধরনের নির্বাচনের বালাই চুকাতে পেরেছি, নিজের মতপ্রকাশ বলতে ফেসবুক রয়েছে এবং সেখানেও গণতন্ত্রপ্রদীপের দৈত্য প্রহরারত।

বলছিলাম রাকেশ ভট্টাচার্যের সোনালি সময় নিয়ে। সেই সূত্রেই এসেছে প্রান্তিকপ্রসঙ্গ। খুবই সংগত কারণে রাকেশ ভট্টাচার্যের সেরা কালটা প্রান্তিকে কেটেছে। খুব সম্ভবত দর্পণ থিয়েটারের কর্মী ছিলেন তিনি। কিন্তু নাট্যক্ষেত্রেও খুব-যে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যেত তাকে, এমনও নয়। দিলখোলা মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত উচ্ছ্বাসভরা মানুষ। নগরীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলায় তাকে দেখা যেত সবসময়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে একটা ব্যাপার স্বীকার্য যে এদেশে সংস্কৃতিকর্মী বলতেই এখন বোঝায় পাণ্ডাগিরি। সংস্কৃতিকর্মী মানেই পাওয়ারপার্টির লেজুড়বৃত্তি। রাজনীতিক দলগুলার (না, বাংলাদেশে রাজনীতিক দল একটাই, আওয়ামী লীগ, প্লুরাল বললেই ইতিহাসবিকৃতি হয়) একদম অপোগণ্ড সমর্থকটাও যেমন এখন অন্যকিছু না করে স্রেফ গুণ্ডামি দিয়াই করেকম্মে খায়, শিল্পোদ্যোক্তা হয়া যায়, বাড়িগাড়ি বাগায়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ঘটনাটা অবিকল তা-ই। কিন্তু সবসময় এমন ছিল না। আশির দশকে দেখেছি নিজের গাঁট উজাড় করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনসমাগমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। রাজনৈতিক দুই বড় দলের সেভাবে অ্যাক্টিভিটি ছিল কি? পিচ্চি ছিলাম আমরা, যা-কিছু দেখেছি বা শুনেছি তা আজকের বুঝবুদ্ধি দিয়া মিলায়া নিতে পারি। ছিল না। সাংস্কৃতিক কর্মীদের পরিশ্রমের ফসল গিয়েছে নষ্ট নেতৃত্বের অর্থগৃধ্নু সঙ্কীর্ণ প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতিকদের ভোগে।

এই সময়েই রাকেশ ভট্টাচার্য বিকশিত হয়েছেন এবং এই কারণেই পরে সম্ভবত আমরা তাকে আর অত তৎপর দেখতে পাই না। বাগিচা  ইত্যাদি দোকানপাট তো আর অতটা ভ্যালু দিবার কিছু না। রাকেশ ভট্টাচার্য সম্ভবত কোপআপ করতে পারেন নাই সিচ্যুয়েশনের সঙ্গে। এই বিকট হরিব্বল হাওয়ামাস্তানির সঙ্গে কে পারবে সবিবেক নিজেরে মানায়ে নিতে? যে পারে সে পারে, যারা পেরেছে তারা পেরেছে, কেউকেটা কেষ্টুবিষ্টু হয় তারা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিকের লেয়ার আফটার লেয়ার! কেউ উপজেলায়, কেউ জেলায়, কেউ কেন্দ্রপর্যায়ে। বেবাকেই লিডার। সম্মানীয় গুণ্ডা। পাণ্ডা। সাংস্কৃতিক সেবায়েত।

এইখানেই ট্রিবিউটের যৌক্তিকতা রাকেশ ভট্টাচার্যকে নিয়ে যে এই লোকের কীর্তি নাই। বিস্তর কীর্তিমানের ভিড়ে এই লোক কীর্তিহীন থাকতে পেরেছে বলেই ট্রিবিউট জানানো যায়।

হ্যাভ অ্যা নাইস ইটার্ন্যাল অভিযাত্রা, রাকেশ ভট্টাচার্য! সদগতি হউক সর্বায়তনিক।
গানপার

… …

COMMENTS

error: