সুরের অমৃত পথে : উৎপলদা ও গৌরাঙ্গদা || সরোজ মোস্তফা

সুরের অমৃত পথে : উৎপলদা ও গৌরাঙ্গদা || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

পুরো শহরকে ধূপের ধোঁয়ায় স্নাত করে শিকলমামা উত্তরা হোটেলে ঢুকলেন। ধূপের ঘ্রাণ এক চুমুকেই যেন সবার ক্লান্তি শুষে নিলো। হোটেলের রুটি-ভাজির স্যাঁতসেঁতে রুগ্নতা কিংবা মানুষের কেওয়াজের ভেতরে ধূপের শুভ্রতা পবিত্রতাই ছড়ালো। বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে ধূপের এই ঘ্রাণ আমার খুব ভালো লাগে। পবিত্র-পবিত্র লাগে! শিকলমামাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মামা কেমুন আছেন’? ‘আছি! যাচ্ছি! নিরুদ্দেশ যাত্রা’।

বুটের ডাল, ডিমভাজা আর গরম গরম রুটি খেয়ে মানুষ বাড়ি ফিরছে। হোটেল বন্ধ হবে আরো মধ্যরাতে। মানুষের মুখগুলো মেশিনের মতো কিংবা ছোট ছোট মীনের মতো দিনশেষে রুটি খেয়ে বাদশাহি মুডে বাড়ি ফিরছে। আমি, এমরান, শিমুল সেই হোটেলেই বসেছি। প্রায়ই বসি। আমাদের দেখে বংশীবাদক মুখলেসভাই এলেন। ‘আপনারা আজ উদীচীতে গেলেন না? সবাই স্মৃতিচারণ করল! উৎপলদার গান গাইলো!’ আসলে মোখসেলভাইয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। অন্তর্লীন আলসেমির নিজস্বতার ভেতরে ডুবে আজ আর উৎপলদাকে ডাকা হলো না।

মানুষকে না-ডাকলে মানুষ ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে থাকে। বইয়ের আলমারি কিংবা ট্রাঙ্কের অচিন অন্ধকারেও আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু নেত্রকোণার মানুষ ইমোশন ও ভালোবাসায় উৎপলদাকে ডাকে। লোকালয়ের কথ্য ইতিহাসে দাদার নামটা সম্প্রসারিত হবে। জেনারেশনের উজ্জ্বল প্রভাতে কিছু অগ্রজের নাম আত্মায় রেখে দিতে হয়।

দুই
২৭ জুন এই শহর জানল উৎপলদা গলায় দড়ি দিছে। মৃত্যুর সিদ্ধান্ত সহজ না। কিন্তু দাদা নিয়েছিলেন। কেন? এই প্রশ্নের উত্তরবৃত্তান্ত মনোবিদ ইয়ুং অভিজ্ঞতার আলোকে ভেতর থেকে ঢালতে পারবেন। মানুষের মনোরোগকে হয়তো বিশ্লেষণ করা যাবে। কিন্তু মনোরোগের আশ্চর্য মনকে কে থামাতে পারবে! কে বলবে কেন নেমে আসে আত্মহত্যার আশ্চর্য অন্ধকার!

মালগোদামের পাশে মালগাড়িগুলোর মতো অনড় দাঁড়িয়ে ছিল না উনার মন। সমাজ কিংবা মানুষের আঘাতে আঘাতে উনার মনে হয়তো জং ধরেছিল। হয়তো তিনি নিজের নৌকার হদিস পাচ্ছিলেন না। সে-সময়টা খুব অস্থির ছিলেন দাদা। যে-রাতে ঝুলে পড়বেন সে-রাতেও হয়তো নিজের সাথে নিজেই লড়ছিলেন। একটার পর একটা গান গাইছিলেন। আবার রাতের আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে বাইরেও নাকি উনাকে হাঁটতে দেখা গেছে। হাঁটতে হাঁটতে হয়তো স্টেশানে চা খেয়েছেন। হয়তো মধ্যরাতে আলেফ খাঁর দোকানের গরম রুটি খেয়ে আবারো জীবনের দিকে তাকিয়েছেন। হয়তো একবার ঘরে ঢুকছিলেন; আবার বাইরেও তাকাচ্ছিলেন। উনার ব্যাগেই নাকি ছিল শাদা নাইলনের দড়ি। একটা শাদা দড়ির ভার লোকটা একাই বহন করছিলেন! যিনি চলে যান তিনিও হয়তো চক্ষু না ভিজিয়ে কাঁদেন। গাছের মতো একা নিজের ভার নিজে বহন করে কাঁদেন। নিজের কান্নাটা কেউ দেখে না। নিজের কান্নাটা কাউকে দেখানো যায় না। গোপনে গোপনে মন হয়তো মনকে ডাকতে থাকতে থাকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে যখন মানুষ আর দাঁড়াতে পারে না, মানুষ তখন চলে যাওয়ার জলজ্যান্ত অ্যালবামে ঢুকে পড়ে। চলে যাওয়ার মুহূর্তেও মানুষ মূলত স্বার্থপর। নিজের শাদা দড়িটা ছাড়া তখন আর কিছুই ভাবে না সে।

আত্মহত্যা মূলত একটা ভীষণ স্বার্থপরতার রোগ। নিজেকে লুকিয়ে ফেলার এই রোগ মানুষের মধ্য থেকে কে যে আবিষ্কার করল! জুন মাসের এক ভোররাতে উৎপলদাও এই রোগে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কীভাবে পারলেন তিনি! অথচ তিনি জানতেন এই শহরটা তার। এই শহরটা তাকে খুব ভালোবাসে। অথচ একটা নাইলনের রশির ভেতরে আটকে দিলেন স্বপ্ন ও নিঃশ্বাস।

তিন
এমন ভোরও আসে পৃথিবীতে যখন সূর্যের চেয়ে তীব্র হয়ে দেখা দেয় মানুষের হাহাকার। তখন সত্যের চেয়ে তীব্র হয়ে দেখা দেয় মানুষের কাল্পনিক গল্প। মানুষ চলে যায়, কিন্তু জনপদের চলমান ইতিহাসে মানুষকে নিয়ে রচিত হয় মানুষের গল্প। এইসব গল্পে শ্রদ্ধা থাকে, থাকে মানুষ হারানোর আক্ষেপ। মগরার তীরে উৎপলদা একটা মিথ। উৎপলদা একজন গানপাখি — যিনি জনপদের মানুষকে না-জানিয়ে চলে গেছেন। মানুষ চলে গেলেও ইতিহাসের রেখায় উপস্থিত থাকে মানুষের রূপ।

দাদার মৃত্যু নিয়ে কত কত গল্প শুনি। মুখ ও মুখরতায় সব গল্পই নীল আকাশের ভঙ্গি। তবে যাত্রার বিবেকশিল্পী গৌরাঙ্গ আদিত্য এখনো পথের ফকিরের মতো মাথা চাপড়িয়ে কান্দে। বলে, ‘আমারে ফকির বানায়া সে চলে গেল। সে নিজেও মরল, আমারেও মারল। আমার গানের রেকর্ডিং করছিল সে। সে চলে যাওয়ায় সব বন্ধ হয়ে গেল। কে আর দরদী হয়! ওর মৃত্যুর জন্য আমিও দায়ী। সেই রাতে আমার ওর বাসায় থাকার কথা ছিল। দুজনে মিলে গান করছিলাম। পাশে থাকলে সুরের সহচর — মনে গান নামে, অন্তরে নামে শান্তির ধারা।

সে-রাতে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। সুরের ভেতরে নামতে নামতে সে-কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম রাতের ট্রেন চলে গেছে। রেলস্টেশনের কাছেই ওর বাসা। কিন্তু ট্রেনটা একটু নয়, বেশ লেটে আসায় আমি ওর থেকে বিদায় নিয়ে শেষ রাতে মোহনগঞ্জ চলে আসি। এই সুযোগে আমারে ফাঁকি দিয়া ভোররাতে পাখি উড়াল দিলো। মোহনগঞ্জ স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমি বাড়ি ফিরেছি আর রশিহাতে উৎপল গেছে নিজেকে লুকাতে। আহা রে! তোর জীবনটা কি খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল? আহা রে! কী বেদনার সেতার তুই বহন করছিলি রে দাদা! যদি জানতাম বুকের গহীনে লুকিয়ে রাখতাম। তোকে চলে যেতে দিতাম না আমি! তুই ছিলি আমার অন্তরপাখি! একজনমে অন্তরপাখি দু’বার ধরা দেয় না’।

গৌরাঙ্গদার কথা থামে না। নিজের সিন্দুক থেকে কথা নামাতে থাকেন। ‘মানুষটা আমারে পথে বসায়া গেল গো দাদা। এমন একজন মানুষ আমি কই পাবো! উৎপলের মতো দরদী সহচর আমি কই পাবো? সহচর ছাড়া কি জীবন চলে? সুরের মানুষ ছাড়া কি কণ্ঠ নামে? থাকুক ব্যথা, বেদনা ও দারিদ্র্য — শিল্পীকে পবিত্র থাকতে হয়। উৎপলের জীবন ছিল পবিত্র। মায়া ও পবিত্রতায় চারপাশকে নিয়ে হাঁটছিলেন উৎপল। উৎপল একা ভালো থাকতে চাইত না। সবাইকে নিয়ে, সবাইকে শিখিয়ে — একটা মুগ্ধতার পৃথিবী সে রচনা করতে চাইছিল। সে একজন অসাধারণ কম্পোজার ছিল। এমন কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই যা সে বাজাতে পারত না। লিখত অসাধারণ সব গান। সেসব গানের সুর ও গায়কীও তার ছিল। পরনিন্দার বায়ুরোগে ভেসে যায়নি উৎপল’।

‘আহা রে! পৃথিবীর মায়া তুই কেন-যে ত্যাগ করলি! তোর জীবনটা ছিল শাদা শঙ্খ। তবে কি কোনো মানবীর জন্য দুর্বহ প্রণয়ই ছিল তোর মৃত্যুর কারণ! নাকি আরো কোনো অন্ধ জানালায় তুই ঢুকে গিয়েছিলি! তুই তো ওস্তাদ ছিলি সবার। শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে সবাইকে তুই মাতিয়ে দিয়েছিলি। তবে কেন চলে গেলি? আমার খুব কষ্ট  লাগে। এত পবিত্র আত্মা আমি আর পাইনি দাদা। তুই-ই ধুয়ে দিতে পারতি আমার এই মনের ধুলোবালি। আমার গানের আর রেকর্ডিং হলো না। রেকর্ডিং কোনো বিষয় না। জীবনে কতকিছুর রেকর্ডিং হয়নি। তাতে কী এসে গেছে! কিন্তু তোকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। আজ আমার কোনো আশ্রয় ও আশ্রম নেই। মানুষের আশ্রম লাগে।  যেখানেই দেখা হোক তুই আমাকে পায়ে ছুঁয়ে প্রণাম করতি। আমি তোর কাছে বিনয় শিখেছি। সহচর ছাড়া একা একা শিল্পী হওয়া যায় না উৎপল’।

‘তুই নাকি ব্যাগে রশি নিয়ে ঘুরতি। আমি এর কিছুই জানতাম না। আমি জানলে তোর ব্যাগ থেকে রশি লুকিয়ে ফেলতাম। এই শাদা নাইলন রশির রোগ তোর মন থেকে, এই পৃথিবী থেকে দূর করে দিতাম। তোর মনটাকে হালকা করে দিতাম। আমি জানলে সে-রাতে তোকে জড়িয়ে ধরে সারারাত ঘুমিয়ে থাকতাম। সারাজীবন তোর ছায়ার পাশে ছায়া হয়ে থাকতাম। তোকে মরতে দিতাম না। এমন অদেখায় থাকে আমাদের মন! উৎপলকে হারিয়ে আমি খুব কাঙাল হয়ে গেলাম গো! এই কাঙালত্ব তোমাকে দেখাতে পারব না’।

লাল সোয়েটারের নিচে একজন গৌরাঙ্গ আদিত্য এভাবেই কাঁদতে থাকেন। এই কান্না শিল্পীর জন্য শিল্পীর কান্না। এই কান্না সহচরকে হারিয়ে সহচরের কান্না। আমি জানি গৌরাঙ্গদার এই কন্না থামবে না। তিনি তাই গাইতে থাকেন —

‘নিদয় বন্ধু দয়া কইরা
দেখা দেও আমারে।
দিনে দিনে দিন চইলা যায়
পাইলাম না তোমারে।।
দেখা দেও আমারে’।

চার
আমাদের তখন যৌবন ও খামখেয়ালির এক অপূর্ব বয়স। বুকের ভরাট নিঃশ্বাসে সহজেই খুশি থাকি। মগরা তখনও পূর্ণাঙ্গ স্রোতের পাহাড়ি নদী। ‘এই তো এখানে এমন’, ‘আমরা জীবনমুখী’, উদীচী, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পৌষমেলা কিংবা বাউল গানের আশ্চর্য আসরে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ আবেগ। সেই আবেগেই আমি দাদাকে দেখেছি। ছিলেন ছোটখাটো মানুষ। ফর্শা। চঞ্চল ও একাকী থাকার নিবিড় সাধক। প্রথম সাক্ষাতে গম্ভীর কিন্তু ধীরে ধীরে বিস্তারিত হতো সম্পর্কের ঘ্রাণ ও চুম্বন। গান শুনেই আপ্লুত হতো মানুষ। গান গাইতে ও গানের কথায় সুর বসিয়ে দিতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। এমন কোনো যন্ত্র নেই যেটা তিনি বাজাতে পারতেন না।

ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়েছিলেন। মাঝপথে পড়া থামিয়ে চলে এলেন। কেন এলেন? একটা সেতার কাঁধে করে চকপাড়ায় চলে এলেন। এলেন মানে বসে থাকলেন না। পুরো শহরে সংগীতের হাওয়া ছড়িয়ে দিলেন। না-এলে হয়তো নিজেই নিজের ভেতরকে প্রকাশিত করতে পারতেন। সংগীতের আরো গভীরে ঢুকে যেতে পারতেন কিংবা বড় পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারতেন। ছোট শহরে এসে বর্ষার পানির মতো ভেসে ভেসে ছোট ছোট জীবনের সুর ও যন্ত্রণায় তলিয়ে গেলেন। সবার দুঃখের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের দুঃখটাকে আড়াল করে রাখলেন। মানুষের কাজের ইতিহাস লেখা যায় কিন্তু মানুষের মনের ইতিহাস কে লিখতে পারে।

পাঁচ
পুপুলারিটির দিকে উনি ছুটেননি। তবে স্বাবলম্বীর চাকরিটা না করলে উনি হয়তো আরো গানে থাকতে পারতেন। আচ্ছা, শিল্পীজীবনের অতৃপ্তিই কি উনাকে হলুদ দোয়েল বানিয়ে দিয়েছিল? অতৃপ্তিতে অতৃপ্তিতে ধুলোয় ধুলোয় মিশে গিয়েছিল উনার মন। উৎপলদা ছিলেন একটা কল্যাণী সেতার। কেন-যে মানুষটা ছায়া লুকিয়ে ফেললেন! পৃথিবী তাই বর্ষাময়ূরের আশ্চর্য চোখ! যে-রাতে চলে গেছেন তিনি, সেদিন দুপুরের গল্প বলছিলেন শিল্পীর সহকর্মী কৃষিবিদ সেলিমভাই। তিনি বলেন, ‘দুপুরে আমার রুমে এসে বসলেন। তিনতলায় আমার রুমে এসে খুব সম্ভবত তারাপদ রায়-এর দারিদ্র্যরেখা  কবিতাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। খুব দরদী কণ্ঠে কবিতাটি পড়েছিলেন। প্রায়ই কবিতা শুনাতেন। সে-দুপুরে কেন এই কবিতাটি পড়েছিলেন বলতে পারব না। ব্যাগে তখন ঐ রশিটি ছিল। মনে হয়, এই রশিটি কয়েকদিন ধরেই ওর ব্যাগে ছিল।  তখনও বুঝতে পারিনি। মনেই আসেনি-এমন একটা কাণ্ড ঘটবে!’

উৎপলদার সুকান্তটাইপ একটা ছবি আছে। উদীচী   ছবিটা টানিয়ে রেখেছে। এই ছবিটা ছাড়াও তিনি পুরো শহরটায় আছেন। এই শহরের গলিতে গলিতে দাদা সুর ও সংগীতে চঞ্চল গতিতে হাঁটছেন। ছোটখাটো মানুষটার এই হাঁটাটা খুব সুন্দর।

… …

COMMENTS

error: