ভাটির জার্নাল ১ || সরোজ মোস্তফা

ভাটির জার্নাল ১ || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

একদিনের ভ্রমণে তাড়া থাকে খুব। আকাশের দিকে তাকানোর উদাসীনতা, মায়া ও আনন্দ থাকে না। বরং চোখে থাকে অস্থিরতা। কখন পৌঁছুব; কখন ফিরব। যে-পথে যাওয়া সে-পথে ফিরে আসা।

অনেকের চোখ মিলিত হয় যে-যাত্রায় তাকে কি ভ্রমণ বলব? পিকনিকের হুল্লোড় ছাড়াও এই দেশে আমরা অনেকে মিলেই বেড়ানোর সুখ খুঁজে পাই। চড়ুইভাতির উল্লসিত সামিয়ানা থেকে এই বেড়ানোর রঙ ভিন্নতর। সমমনা না হলেও টিমের দু-একজনের মত ও ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করে এগোতে থাকে ভ্রমণের উল্লাস।

সেই ভিন্নতর রঙের একটা জলভ্রমণ করার সৌভাগ্য হলো। নেত্রকোণা ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজন। নবাগত কমিটির সভাপতি কবি মুশফিক মাসুদ এবং সম্পাদক ফটোগ্রাফার খোকন মোদক আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক। সাংবাদিক লাভলু পাল চৌধুরী এবং কবি শিমুল মিল্কীর পরামর্শে জার্নালিস্ট-সংঘের বাইরে কয়েকজনকে নিমন্ত্রণ দেয়া হলো। এই মওকায় আব্দুর রাজ্জাক, সাইফুল্লা এমরান, চন্দন সাহা রায়ের সাথে আমারও সুযোগ হলো হাওরে যাওয়ার।

বিলম্ব আর ঝঞ্ঝাট না হলে বেড়ানোয় সুখ আসে না। সাদা টি-শার্ট আর মাথায় গামছা পেঁচিয়ে সাধু সাধু ভাব নিয়ে সকাল আটটার ভ্রমণ শুরু হলো নটায়। যদিও আগেই প্রচারিত হয়েছে, ‘দিনে যাব দিনে ফিরব’। কিন্তু ঘোষণা না মেনে সকালের ঘুমটা লম্বা করে একেকজন শহিদ মিনার চত্বরে আসতে লাগলেন।

যে-কোনো আয়োজনে শুরুর আগের একটা শুরু থাকে; প্লানিংকর্মীরাই সেই চাপটা বহন করেন। প্লানিংমাফিক সব না হলেও পরিচ্ছন্ন মনে উনারা আয়োজনে মাধুর্য ঢালতে থাকেন। মদনের উচিতপুর থেকে খালিয়াজুড়ি হয়ে কল্যাণপুর-কৃষ্ণপুর-চাঁনপুর। ফেরা হবে ভাদ্রের সন্ধ্যায়। ট্রলারের ছাদে শুয়ে নক্ষত্র দেখে। একই পথে।

দুই
উচিতপুর ঘাটে সেই ভোর থেকে প্রস্তুত আছে ট্রলার। দূরে বহুদূরে দ্বীপের মতো ছোট ছোট গ্রাম আর মোবাইলটাওয়ার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমাদের এই ভ্রমণে বাউলসাধক মৌলাও আছেন। বৈষ্ণব আখড়ায় প্রবেশের দিনে সাথে একজন বাউল থাকবেন না, এটা হতেই পারে না। বাউলকে পেয়ে ভাদ্রের রোদ বিকিরণের প্রবল মুহূর্তে ঘাটের ভক্তেরা আবেদন করলেন গাইতে হবে। মৌলাও অগ্রজের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে গাইলেন উকিল মুন্সির গান। ঘাটের সমস্ত চক্ষু-মন তখন উকিলের কথা আর মৌলার কণ্ঠে সমর্পিত। এই রৌদ্রতাপে উকিলের গানের কথার ভেতরে ঢুকে শ্রোতাদের চোখ চকচক করছে। দরদী কণ্ঠে মৌলা গাইছেন ‘তুমি ধরো গুরুসঙ্গ / তোমার পাপে ভরা অঙ্গ / ভেতর-বাহির আগে করো পরিষ্কার / ও মধুর পিরিতি’। মৌলা দুটো গান গাইলেন। গান শুনতে শুনতে পাপে ভরা অঙ্গ ধুতে ধুতে শ্রোতার খুব উতলা হলেন। কেউ কেউ সাথে চলে যাওয়ার বায়না ধরলেন। কিন্তু পথের সাথীকে সবসময় সাথী করে নেয়া যায় না।

মনে হয় ধীরে ধীরে উঠে যাবে কাঠের নৌকার স্থাপত্য। হাওরে কত রকমের নৌকা যে চলে! যাত্রীর নৌকা, বিয়ের নৌকা, বালির নৌকা, পাথরের নৌকা, কয়লার নৌকা নিয়ে মাঝিরা আসছে, মাঝিরা যাচ্ছে। মাটির বাসনের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ঘাটে ঘাটে মহাজনের যে-নৌকা ভিড়ত, ছোটবেলায় এদের বলতাম বাজিতপুরের নাও। জানি না কেন বলতাম! হয়তো কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে নৌকাগুলো আসত। বাকিতে মালামাল দিত। ফসল উঠলে মালামালের মূল্য বুঝে নিতে গিরস্তবাড়িতে হাজির হতো। ধানভর্তি নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরত। জীবনবাস্তবতায় একেকজন মাঝি এভাবেই একেক রঙের নৌকা বাইছেন।

হাওরের মাঝিদের চোখে স্পষ্ট লেগে থাকে বিরহ। ঘরে ফেরার আকুতি। এই যে সুরমা-কংস-ধনু-মেঘনা হয়ে একেকজন মাঝি মালামাল নিয়ে ঘুরছেন, চোখের মণিতে লুকিয়ে রাখছেন বিরহ; আকাশের দিকে উদাসীন তাকিয়ে এরা কী ভাবছে! ‘মেঘদূত’ আজো যে প্রাসঙ্গিক এটা বন্দরে বন্দরে ঘুরতে-থাকা মাঝিদের চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। হাওরের এই বিরহী জীবনের সাথে মিশতে মিশতেই হয়তো উকিল মুন্সির কণ্ঠে নেমেছিল বিরহের সুর।


তিন

বিরহী উকিলের প্রেমভূগোলে মিশে সেদিন আমরাও ভেসেছিলাম হাওরের জলে। নেত্রকোণার শেষ মাথায় জলের বর্ডার। এখানে জলের উপরে ভাসছে নেত্রকোণা-সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ-হবিগঞ্জ জেলার সীমারেখা। বলা যায়, সুনামগঞ্জের কিনারে, চাঁনপুর গ্রামে, নয়ন গোস্বামীর হাঁসারা আখড়া। এটি বৈষ্ণব সাধুদের সাধনাশ্রম। প্রায় তিনশ, মতান্তরে সাড়েতিনশ বছর আগে নয়ন গোস্বামী নির্জন এই পল্লিতে গড়ে তুলেছিলেন ভক্তিবাদের প্রেমাশ্রম।

এখানে হিন্দু-মুসলমান যে-কেউ আসতে পারেন। মন্দিরের ঠাণ্ডা ফ্লোরে বসে প্রার্থনা করতে পারেন; গাইতে পারেন প্রেমগান। মন্দিরের প্রাসাদ সবার জন্য উন্মুক্ত। আশ্রমে প্রচুর কাক ও পাখির সমাগম। এখানে কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। এখানে ধর্ম খুব সহজ। এ-রকম একটা গমনাগমনহীন নির্জন জায়গায় তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই আখড়াটি চলছে। নয়ন গোস্বামী আখড়াটির প্রতিষ্ঠাপুরুষ।

একটা সময় পরে ইতিহাস বলার লোক থাকে না। কল্পনায়-কল্পনায়, লোকবর্ণনায় দালিলিক ভিত্তির বাইরে রচিত হয় নতুন ইতিহাস। তাই, পৃষ্ঠা উল্টিয়ে চানপুর আখড়ার ইতিহাসটা জানানোর কেউ নেই আজ। অথচ অনেকেই বলেছেন ‘ইতিহাসটা জাইন্যা আইসো’। কিন্তু কে বলবে শুরুর ইতিহাস? ভাটির এই নির্জন ভূমিতে সাধুরা কেন তৈরি করলেন বৈষ্ণব আখড়া? সমাজশাসন থেকে একটু দূরে নদীর তীরে সাধুরা কেন গেয়েছেন সহজসাধনা ও প্রেমধর্মের গান? শ্রী চৈতন্যের প্রেমধর্মে পুরো বাংলাই বদলে গিয়েছিল। নবদ্বীপের শাসনাঞ্চল ছাড়াও সবচেয়ে বেশি বদলেছিল সুরমা-কুশিয়ারা-ধনু-কংস-মগরার অববাহিকা।  ‘প্রেমে শক্তি / প্রেমে ভক্তি / প্রেমে মুক্তি / প্রেমে দেবতা / প্রেমে ধুয়ে যায় ক্লেদ-ক্লান্তি-মলিনতা’ : ভক্তি ও মরমিবাদের আশ্চর্য সুন্দর সাধনা ও আখড়া গড়ে উঠেছিল ভাটিবাংলায়। শিতালং শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুর্বিন শাহ, রশিদ উদ্দিন, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সি, শাহ আবদুল করিম, গিয়াস উদ্দিন আহমদের মতো ভাবুকেরা এই ধারারই সন্তান।

মানুষের মন ও মননে প্রভাব তৈরি করে নদী। প্রত্যেক জাতির দেহ ও মনোকাঠামোর ভেতরে বসবাস করে নদী ও নদীজ সংস্কৃতি। জীবনযাপন, ধর্ম, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পে গুপ্ত স্রোতের মতো প্রভাব বিস্তার করে নদী। নদীকেন্দ্রীক পূর্ববাংলায় প্রেমবাদ-ভক্তিবাদ-মরমিবাদ ভূমিধৌত হয়ে সংযুক্ত হয়েছে। বাংলার এই প্রেমধর্মকে বঙ্কিমচন্দ্র সহ অনেকেই বাঙালি চরিত্রের দুর্বলতা ভেবেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র মনে করতেন, বাঙালির বিজাতীয়দের হাতে পরাজয়ের কারণও এই প্রেমমত্ততা। ‘প্রেমধর্ম সর্বনাশা’, এই ভাবনা থেকেই তিনি মনে করতেন জাতিনির্মাণ, রাজকার্য সম্পাদন এসবের সাথে প্রেমধর্মের বিরোধ স্পষ্ট।

চার
শুয়া উড়িল উড়িল উড়িল রে
জীবের জীবন শুয়া উড়িল রে।।

লা-মুকামে ছিলায় শুয়া আনন্দিত মন
ভবে আসি পিঞ্জরাতে হইলায় বন্ধন।।

পারস্যের মরমিবাদ আর ভারতের প্রেমবাদের সমবায়ে শিতালং সাধুর কণ্ঠে যে-গান ভেসে উঠেছে তাতেই নিহিত আছে বিপুল জনগোষ্ঠীর ধর্ম ও সংস্কৃতি। আত্মার সাথে আত্মা মিলনের তরিকা ও আকুতিতেই জন্মেছিল বাংলার প্রেমধর্ম। নদীয়ায় জন্ম নিলেও সিলেটের ঢাকাদক্ষিণের ছেলে চৈতন্যদেবই সমগ্র বাংলায় প্রেমধর্মের বাণী ও সুর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ মানুষের মুক্তির জন্যই তিনি এই ভাবান্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ধর্মের ভেদ মানুষের মিলনের অন্তরায় হতে পারে না। মানুষের চেয়ে সম্প্রদায় বড় নয়; ফারাক নেই উঁচু-নিচুতে। মানবমিলনের এই সুরে পুরো বাংলা মিশে গিয়েছিল চৈতন্যের প্রেমধর্মে।

আখড়ার ভিতরে চকচক করছে বহু প্রাচীন পিতলের তলোয়ার। পিতলের খাট। পিতলের পাতে লেখা জমির দলিল ও দানপত্র। লালসালু-আবৃত ভেতরের ছোট ঘরে নয়ন গোস্বামী ঘুমিয়ে আছেন। উত্তরাধিকারী মোহান্তরা এখনও আছেন। যতœ ও নিবেদেনে আখড়াকে বাঁচিয়ে রাখছেন।

নারায়ণ বৈষ্ণব নামের পনেরো বছর বয়সী একটি ছেলের সাথে কথা হলো। দেড় বছর বয়সে ওর বাবা ব্রজেন্দ্র সরকার ওকে আশ্রমে রেখে গেছে। খুবই কঠিন অসুখ হয়েছিল ওর। ডাক্তারও নাকি জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। নিরুপায় হয়ে মানুষের কথায় বাবা-মা পুত্রকে আশ্রমে রেখে গিয়েছিলেন। সেই থেকে ও আশ্রমে আছে। বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। নিরামিষভোজী। কোনোদিন বিয়ে করবে না। ছেলেমেয়েদের কম্বাইন্ড স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মেয়েদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না? প্রেম করতে ইচ্ছে করে না?’ সে সহজেই কথা নামিয়ে দিলো,  ‘করে না’। ওর কথা শুনে নিজেকে নিজেই শুনালাম, ‘প্রেম করতে ইচ্ছে না করলে, প্রেমের ভেতরে না থাকলে কেউ কি বৈষ্ণব হয়?’

লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত সমস্ত ছবি লেখকের সৌজন্যে পাওয়া। ব্যানারে ব্যবহৃত ছবির আলোকচিত্রী উসমান গনি।

… …

COMMENTS

error: