একবিংশ শতকের এক ফুটবলনক্ষত্র : দুই ফিল্মমেইকারের নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র

একবিংশ শতকের এক ফুটবলনক্ষত্র : দুই ফিল্মমেইকারের নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র

SHARE:

ফ্রেঞ্চ ফুটবলতারা বলতেই জিনেদিন জিদানের নাম প্রথমে মেমোরিতে আসে, এরপরে আর-যারা, ফ্রেঞ্চ ফুটবলের সিজনড একটা বিউটির তারিফ তো সকলেই করবেন, এইটিনের ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপেও ফরাশি স্যকারের সৌরভ স্পোর্টস্-সমুজদারমাত্রই স্বীকার করবেন মোহন-মনোমুগ্ধকর। ফাইন্যাল পর্যন্ত এসেছে ফ্রেঞ্চ ফুটবল শান্ত অথচ সমর্থ সৌন্দর্য ছড়ায়ে। শেষমেশ কাপ ঘরে তুলেছে। এইটিনের ফ্রেঞ্চ টিমেও স্মরণীয় ফুটবলার একাধিক। তবু ফরাশি ফুটবলের মহাতারা আজতক ওই একজনই। জিনেদিন জিদান।

ঢুঁশের দৃশ্য মনে পড়ছে? খেলা যারা রেগ্যুলার দেখেন, তারা সেই ইতালির প্লেয়ারটাকে তেড়ে পেট-বরাবর চান্দিছোলা মাথায় জিদানের ঢুঁশদৃশ্যটা ভুলে গেছেন। ভুলে গেছেন স্বভাবশান্ত জিদানের সেই ক্যারিয়ার-খতম-করা আকস্মিক ক্রোধমূর্তি। কিন্তু মনে রেখেছেন মহাতারকার খেলাম্যাজিক। অনেক অনেক দিন কেটে গেছে। এখনও ওই ইতালি ভার্সাস ফ্রান্সের মধ্যকার বিশ্বকাপম্যাচে জিনেদিন জিদানের ঢুঁশঘটনার নেপথ্য কারণ রহস্যাবৃত। অনেকেই অনেককিছু অনুমান করেছেন, জিদান মুখ খোলেন নাই।

কিন্তু এই নিবন্ধে সেসব প্রসঙ্গ নয়। একটা ছায়াছবির খবর দিতেই নিবন্ধটা ড্রাফ্‌ট করা যাচ্ছে। এবং অনেকেই নিশ্চয় সিনেমাটা দেখেছেনও। বছর-বারো পূর্বেকার সিনেমা। আদতে এইটা কাহিনিচিত্র নয় সেই-অর্থে, এইটা বস্তুত তথ্যচিত্র। ডকুমেন্টারি। ‘জিদান, অ্যা টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি পোর্ট্রেইট’ এর নাম। ছবিটা আগাগোড়া যত্নে তুলেছেন ডগ্লাস গর্ডন ও ফিলিপ্পি প্যারেনো যৌথভাবে। এর মেইকিঙটা আসলেই ইন্ট্রেস্টিং। বলছি, ধীরে, কিয়ৎক্ষণ পরে।

একটা একক ম্যাচ ফোকাসে রেখে এই ফিকশনোপম তথ্যচিত্রটা বানানো হয়েছে। একটি রিয়্যালটাইম ডকুফিকশনের আদল পেয়েছে গোটা জিনিশটা। ম্যাচটা ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের একটা ম্যাচ। ম্যুভি রিলিজ হয়েছে ২০০৬ নাগাদ। সতেরোটা ক্যামেরা প্রায় একলগে সিনক্রোনাইজ করে এই চিত্রটা ধারণ ও প্রয়োজনীয় সম্পাদনাকাণ্ড করা হয়েছে। স্টেডিয়ামজুড়ে ম্যাচ-চলাকালীন ক্যামেরাগুলো বসায়ে রেখে দেয়া হয়েছিল। সম্পাদনাপ্যানেলে এরপরের কাজটুকু করতে যেয়েই ফিল্মমেইকারদ্বয় ক্যারিশ্মা দেখিয়েছেন। ডকুফিক হলেও ডকুফিক নয় যেন। গোটা জিনিশটা আস্বাদনের জন্যে খেলাপ্রিয় দর্শকপাঠক ফিল্মটার কাছে যেয়ে একবার অবশ্যই বসবেন।

সতেরোটা ক্যামেরাই রিয়্যালটাইমের সেই ম্যাচে কেবল জিনেদিন জিদানকেই অনুসরণ করে গেছে। মাল্টিপ্যল অ্যাঙ্গেল থেকে কেবলই জিনেদিন জিদানের বিভিন্ন মৌহূর্তিক ভঙ্গি সিনেমায় বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করা হয়েছে। এক নয় দুই নয় সতেরোটা ক্যামেরার ফ্যুটেইজ থেকে এডিটকালে মেইকাররা সিনক্রোনাইজেশনের জন্যে বেছে নিয়েছেন মোক্ষম মুহূর্তভঙ্গিমাগুলো। অনবদ্য উপভোগ্য ম্যুভি।

কিন্তু গোটা নব্বই মিনিট জুড়ে কেবলই জিদানকে দেখানো হয়েছে? হ্যাঁ, ইন্ট্রেস্টিং হয়েছে ব্যাপারটা এই কারণেই, খেলা গড়িয়েছে একের পা থেকে অন্যের পায়ে, খেলার ফুটবল গেছে মিডফিল্ড থেকে প্রতিপক্ষবক্সে, ক্যামেরা যায় নাই, ক্যামেরা গড়ানো হয় নাই জিদানকে ছেড়ে অন্য কোনো বলখেলোয়াড়ের দিকে। ক্যামেরা জিদানকেই ফলো করে গেছে। ফের ফিরে এসেছে ফুটবল জিদানের পায়ে, ক্যামেরায়, দর্শকের চোখে। এইভাবে এগিয়েছে ক্যামেরাকীর্তি শুরু থেকে শেষপর্যন্ত নব্বই মিনিট পাক্কা।

সাক্ষাৎকারে এই সিনেমা নির্মিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে প্যারেনো ও গর্ডন দুজনেই সমস্বরে বলেন যে তারা আইডিয়াটা পেয়েছেন দুনিয়াজয়ী চিত্রশিল্পী ফ্র্যান্সিস দ্য গয়া এবং ডিয়েগো ভ্যালেস্কুইয়েসের পেইন্টেড পোর্ট্রেইচার দেখে; এবং সাম্প্রতিক চিত্রশিল্পের আরেক তারকা অ্যান্ডি ওয়ার্হোলের রিয়্যালটাইম ফিল্মপোর্ট্রেইটস্ দেখেও দুই নির্মাতা সাহস করতে পেরেছেন উচ্চাভিলাষী নিরীক্ষায় ঝাঁপ দিতে।

একসঙ্গে লাইভ টেলিভিশন ব্রডকাস্ট থেকে এবং নিজেদের ক্যামেরাগুলো থেকে ফ্যুটেইজ নিয়া ছায়াছবিটাকে মেইকারদ্বয় আরও জঙ্গমপূর্ণ করে তুলেছেন। রসভঙ্গ তো হয়ই নাই, বিস্ময়াবিষ্ট হতে হয় বেশকিছু জায়গায়। কাজেই সিনেমায় একসঙ্গে অ্যাট-লিস্ট দুইটা লেয়ার সবসময় চালু রয়। লাইভের ফ্যুটেইজ এবং ম্যুভিনির্মাতাদ্বয়ের রেকর্ডেড নিজস্ব ফ্যুটেইজ। কখনো কখনো ডুয়াল-চ্যানেল ভার্শন। ম্যুভিনির্মাতাদ্বয়ের সিনেম্যাটিক ভার্শন একদিকে, যেখানে র‍্য ফ্যুটেইজগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে, টেলিভিশনের সরাসরি-রিলে-করা ভার্শন আরেকদিকে। ফের একই ইমেইজে দুই স্ট্রিমই সিঙ্ক করে দেখানো হয়েছে অকেইশন্যালি। দ্বিমুখী এই নির্মাণকৌশল সিনেমায় সেলিব্রেটিহিরো নন্দিত ফুটবলার জিনেদিন জিদানকে আরও উদ্ভাসিত করেছে। একে তো ফুটবলারের আজীবন চর্চিত নৈপুণ্যের খোঁচখাঁচ আরও গভীরে দেখা যায়, আবার সিনেম্যাটিক ক্যারিশ্মায় বিমোহিত হওয়ারও মওকা পাওয়া যায়।

খেলানির্ভর সাহিত্য/সিনেমা যারা দেখতে প্রেফার করেন, এই সিনেমাটা ট্রাই করে দেখলে ঠকবেন না।

TITLE Zidane, a 21st century portrait ARTWORK TYPE Film/Video & Installation Directors Douglas Gordon and Philippe Parreno MEDIUM Two-channel video projection, with sound CREDIT LINE Solomon R. Guggenheim Museum, New York Purchased with funds contributed by the Young Collectors Council, Jacqueline Sackler, Geoffrey Fontaigne, Younghee Kim-Wait, Kipton Cronkite, Celeste Hughey, and Dawne Marie Grannum; with additional funds contributed by adidas RUNTIME 90 minutes YEAR REALESED 2006 COPYRIGHT © Douglas Gordon and Philippe Parreno

লেখা : সুবিনয় ইসলাম

… …

আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: