‘রাইট টু রিটার্ন’ /  ফিলিস্তিনিদের দেশযাত্রা : সাক্ষাৎকারে ডকুফিল্মনির্মাতা সেন্টু রায় || সরোজ মোস্তফা

‘রাইট টু রিটার্ন’ / ফিলিস্তিনিদের দেশযাত্রা : সাক্ষাৎকারে ডকুফিল্মনির্মাতা সেন্টু রায় || সরোজ মোস্তফা

বিজ্ঞাপনমুখী সমাজে নিরহং শিল্পী থাকেন অনেক অনেক অন্তরালে। অন্তরাল মানে, নিমগ্ন সংগীতশিক্ষার্থীর মতো সংগোপনে, সারলিক সম্ভ্রান্ততায় চলে নিজের সাধনা।

সেন্টু রায় এই পৃথিবীর নিরহং চলচ্চিত্রনির্মাতা ও সংগীতশিক্ষার্থী। পৃথিবীর প্রতি বিনীত-মার্জিত পদক্ষেপে বিনির্মাণ করে যাচ্ছেন মানুষ ও সময়ের সত্যইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতির ইতিহাস । তাঁর চলচ্চিত্র মূলত ‘আত্মবোধনের গান’; ইতিহাসের অভিঘাত-অভিজ্ঞান এবং আত্মযাপনের দার্শনিকতা। এই ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়, আমাদের মধ্যে চৈতন্য তৈরি করে। তিনি আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলচ্চিত্রে উচ্চতর পড়ালেখা করেন। আমেরিকায় বসবাসকালীন স্বাধীনতাকামী, নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের নিয়ে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘রাইট টু রিটার্ন’।

‘রাইট টু রিটার্ন’ (Right to Return) তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে ভূমিবিতাড়িত মানুষের ইতিহাস। ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত একটা মিউজিশিয়ান পরিবারের হাহাকার ও বেদনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই তথ্যচিত্র। কীভাবে এই তথ্যচিত্রটি নির্মিত হলো — এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন নির্জন নির্মাতা সেন্টু রায়।

তথ্যচিত্রনির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছেন সরোজ মোস্তফা। অনুলিখন করেছেন কবি মোতাছিম বিল্লাহ।

রাইট টু রিটার্ননির্মাণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। আমেরিকায় বসে এমন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের অনুভব কেন তৈরি হলো?
আমরা বাংলাদেশের লোক। মুক্তিযুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন মানুষ আমার ভাই। মানুষ ও মানবিকতার মৌলিক পরিচয়টাই আমি বিশ্বাস করি এবং ধারণ করি। বঞ্চিত মানুষ দেখলেই ব্যথা অনুভব করি। মানুষের পাশে থাকার জন্যই বেঁচে আছি। সারাজীবন মানুষের পাশেই থাকতে চাই। এই ছবিটা করেছি বোধহয় এইরকম ধরেন ২০০০/২০০১-এর দিকে। আমার সাথে একটা ছেলে পড়ত। হুমায়ুন নাম। ওর প্রকৃত বাড়ি ইরান। জ্ঞানে-চিন্তায়-দৃষ্টিতে খুব প্রগ্রেসিভ। ইসলামি উত্থানের পরে তারা চলে আসছিলো। এমনিই চলে আসছিলো…

ওরাও কি ফিলিস্তিনি?
না না, ইরানেরই। তো, হুমায়ুন আমার বন্ধু হয়ে গেল। আমার সে-বন্ধু বাংলাদেশের নাম কখনো শুনে নাই। আমি একটু অবাক হলাম! তোমরা বাংলাদেশের নাম কখনো শোনো নাই? পরে আবার ভাবলাম, আচ্ছা না-ই শুনতে পারে বাংলাদেশের নাম। সবাই যে বাংলাদেশের নাম শুনবে এমন কোনো কথা নাই। তো, ওকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস শুনালাম।

আপনি কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন?
হার্ভার্ড। পড়তাম এবং মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করতাম। এখনো সেই পথেই আছি।

আপনার বন্ধু হুমায়ুনও কি একই সাবজেক্টে পড়তেন?
হ্যাঁ, একই সাবজেক্টে। প্রি অপজিট করতে গিয়েছিলাম। নাইন ক্রেডিট অফ প্রি অপজিট। সেও এসেছিল। ম্যাস-কমিউনিকেশনে। আমার মুখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি শুনে সে একেবারে থ! ইশ…

ওই প্যালেস্টাইনি পরিবারটাকে কীভাবে চিনলেন? তাদের সম্পর্কে জানলেন কীভাবে?
বন্ধু হুমায়ুনই প্যালেস্টাইনের পরিবারটি সম্পর্কে বলেছিল। বলেছিল, ওঁরা খুব মিউজিক ভালোবাসে। ওঁরা খুব উদার, মানবিক আর নিজের ভূমিকে ফিরে পেতে  লড়ছে। আমি বললাম, চলো।
আমরা তো ছোটবেলা থেকেই শুনেছি প্যালেস্টাইনের কথা। আমাদের কবিতাতে, গদ্যে-পদ্যে-গানে সব জায়গাতেই প্যালেস্টাইন আছে। প্যালেস্টাইনের দুঃখের কথা আছে।
আমি বললাম, চলো। তাহলে পরিচয় করিয়ে দাও একদিন। ওদের সাথে পরিচিত হলে আমার খুব ভালো লাগবে। তারপর একদিন পরিচয় করিয়ে দিলো।
এই পরিবারটায় ছিল তিন মেয়ে এক ছেলে, তার স্ত্রী আর সে। তার স্ত্রী হলো মিশরের মেয়ে। আর ফিলিস্তিনি ছেলে। আমরা সমবয়সী ছিলাম। দ্রুতই ঘনিষ্ঠতাও তৈরি হয়ে গেল। সেও দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের নাম শুনে নাই। হতেই পারে, মেনে নিলাম। সেভেন্টিওয়ান সেভেন্টিটুতে তো আর আজকের মতো অবস্থা ছিল না। আমি তাকে বললাম যে দেখো আমরা কিন্তু বাংলাদেশের লোক তোমাদের প্যালেস্টাইনদের হৃদয় পড়তে পারি। আমরা এ সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি। তোমরা যেমন সারাপৃথিবীর মধ্যে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েছ আমরাও তো দুই জায়গায় দুটি ভাগে। যদিও পাশাপাশি তবু দেশ ভাগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম, এককোটি লোক স্থানান্তরিত হওয়ার এই ব্যথাটা, ম্যাস কিলিং-এর বিষয়গুলা আমরা ভালোই অনুধাবন করতে পারি। তো আমি বললাম যে তুমি যদি প্যালেস্টাইনি একটা ছবি করে দাও তাহলে খুবই ভালো হয়। আমি একটা ডকুমেন্টারি করতে চাই। সে তো খুবই উৎসাহী, বলতেছে আমি যেহেতু আরবের লোক… করতে চাই। ভালোই আগ্রহ দেখালো। এই তারপরে আমি কাজটা শুরু করলাম। গল্পটা এখানে করলাম এই কারণে যে বাংলাদেশ একটা সময় এই পরিস্থিতিতে থেকেছে, এখন সে-জায়গা থেকে উতরে গেছে। এখন তারাও সংগ্রাম করছে, একসময় সে-পরিস্থিতি থেকে উঠে আসবে। তাদেরটা এখনো সমাধান হয় নাই, আমাদেরটা একটা সমাধানে পৌঁছেছে।

মানে বাংলাদেশের মানুষের যে মুক্তির সংগ্রাম সেই মুক্তির সংগ্রামের ধারণাটা প্যালেস্টাইনের মানুষের মাঝেও ছিল?
ছিল না, এখনো আছে। একই তো। একই ঐ প্রক্রিয়ার মধ্যে তারা আছে আরকি।

আচ্ছা, প্যালেস্টাইনি পরিবারটা সম্পর্কে একটু বলুন।
ওই পরিবার বলতে ওই আমার বন্ধু যে ফুয়াদ, সে ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ডের আরকি। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করে আর ওর ওয়াইফ লাইব্রেরিয়ান। মেরিল্যান্ডের একটা লাইব্রেরিতে কাজ করে। আর তার ছেলেমেয়েরা তো সবাই তখন ছাত্রছাত্রী। বড় মেয়ে শিরিন। তারা ছয়জনের পরিবার। প্রথমে এই ছয়জনের সাথে এই ইন্টারভিউ করে গল্পটা বলেছি। তারা তো ওয়াশিংটন ডিসিতেই থাকত। তো ওইখানে প্যালেস্টাইন সেন্টার নামে একটা সংগঠন ছিল। তারা প্যালেস্টাইন নিয়েই কাজ করত। প্যালেস্টাইনের লোকেরাই সেটা বানাইছে। তারা প্যালেস্টাইন নিয়ে নানান ধরনের চিন্তাভাবনা করে বহির্বিশ্বে তাদের সমর্থন আদায় এবং ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য কাজ করে। পৃথিবীবাসীকে জানানোর চেষ্টা করে প্যালেস্টাইনের কি অবস্থা। তারাও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।

আপনি ভূমিবিতাড়িত একদল মানুষের হৃদয় পড়তে চেষ্টা করেছে কিন্তু আমার কথা হচ্ছে যে একজন ইহুদি বা প্যালেস্টাইনের মূল ইতিহাসটা কি এখানে উঠে এসেছে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। এসেছে।

আপনি কীভাবে সেই ইতিহাসটাকে ধরার চেষ্টা করেছেন?
আমি ধরার চেষ্টা করেছি মূলত ইসরায়েলিরা কীভাবে এখানে আসলো, বসতি স্থাপন করল। তারা বলে যে ২০০০ বছর আগে জেরুজালেমেই ছিল তাঁদের ধর্মস্থান। তারা জেরুজালেমের লোক ছিল। পরে তারা নানা বাস্তবতায় পর্যায়ক্রমে বিতাড়িত হয়ে নানান জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েছে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পরে প্যালেস্টাইন তো দেখল করে নিয়েছে ব্রিটিশরা। দখল করে নেওয়া বলতে ব্রিটিশ কলোনি ছিল ঐটা। এই কলোনি থাকা অবস্থায় ব্রিটেনে যে ইহুদিরা ছিল তারা এখানে প্যালেস্টাইনে আইসা জায়গা কেনা শুরু করল। প্রথম জায়গা কেনাই শুরু করল, কারণ ল্যান্ড তো পড়ে গেছে মধ্য-আরবে। ফার্ম করবে এমন কথা বলে কিনতে থাকল। তারা থাকা শুরু করল এবং প্যালেস্টাইনের বাসিন্দারাও চাহিদা দেখে উচ্চ দাম হাঁকাতে থাকল। ব্রিটিশ ইহুদিরা একসময় বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করল এখানে জায়গার দাম অত্যাধিক, থাকা যায় না। এভাবে চলতে থাকার পরে এক সময় প্যালেস্টাইনিরা উপলব্ধি করল তারা তো আসলে ফাঁদে পড়ে গেছে! তারপর তারা বিদ্রোহ করে বসল যে তারা আর জমি বিক্রি করবে না। ব্রিটিশদের এই ইন্ধনটা বোঝার পর ১৯৩৭ সালে বিদ্রোহ করে বসল। তখনও তো ইজরাইল হয় নাই। প্যালেস্টাইনি আর ইহুদিদের মাঝে ব্যাপক বিরোধ তৈরি হলো। কিন্তু ব্রিটেন আবার প্যালেস্টাইনিদের কঠোর হাতে দমন করল। তখন বিদ্রোহ বাড়তে থাকল। এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল যে ওই সময় এমন কোনো প্যালেস্টাইনি পরিবার নেই যে-পরিবারের অন্তত একজন নিহত হয়নি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি জেল খাটেনি। তখন দুইপক্ষ আর একসাথে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল। অন্যদিকে ১৯৩৩ সাল থেকে হিটলার আবার ইহুদি নিধন শুরু করল, চললো ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। যখন যুদ্ধ থামল তখন সবাই দেখল যে ইহুদিদের নির্দিষ্ট কোনো স্থান নাই। বিশ্ববাসী প্রশ্ন করল এদের যেভাবে মারা হয়েছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা তো আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। এদের জন্য একটা রাষ্ট্র গঠিত হওয়া দরকার। যেহেতু ১৯৩৭ সালে কিছুসংখ্যক ইহুদি এখানে বসতি স্থাপন করেছিল তারা সবাই চিন্তা করল যে এইখানেই ইহুদিদের আলাদা একটা রাষ্ট্র গঠন করা হোক। ইহুদিদের একটা নিজস্ব রাষ্ট্র। জাতিসংঘ এই সিদ্ধান্ত নিলো ১৯৪৭ সালে। তারপরে ১৯৪৭ সালে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ইহুদিরা এখানে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া শুরু করল। তো আসলে তারা আসার কিছু পরেই তারা শুরু করে দিলো ভূমিদখল আস্তে আস্তে। কারণ প্রচুর পতিত জমি আছে! ১৯৪৮ সালে ডিপ্লান না কী যেন একটা পরিকল্পনায় তারা বলল যে প্যালেস্টাইনিরা আমাদের কেনা জমি বেদখল করছে। আসলে ইজরায়েলিদের মূলত দখল করবে এইটাই হইল অপারেশন। প্যালেস্টাইনিদের একটা ভয়ভীতি দেখানো। সেই প্রেক্ষিতে তারা বলল যে এইটা আমাদেরই জমি, আমাদেরই ভূমি! তোমাদেরকে একঘণ্টা সময় দিলাম ত্যাগ করো এই ভূমি। এইটা আমাদের জায়গা। একঘণ্টা সময় দিলো এবং তাদেরকে একঘণ্টার মধ্যেই বহু গ্রাম খালি করতে হলো। গ্রামে হাজার হাজার বৃদ্ধ মানুষ আছে।
তো আমি যে ছয়টা পরিবার ছবিতে দেখিয়েছি তারা প্রত্যেকেই ছড়িয়েছিটিয়ে গেছে। কেউ হয়তোবা মা-খালারা চার বোন। মা সামনে জাহাজ পেয়েছে চলে গেছে মিশর। কেউ বাস পেয়েছে চলে গেছে জর্ডান। কেউ ট্রেন পেয়ে চলে গেছে সিরিয়া। এরকম। কেউ চলে গেছে কুয়েত। মানে যে যেটা সামনে পেয়েছে। কারণ সময় একঘণ্টা। যে যেখান থেকে পারে এক থেকে দুইঘণ্টা সময়ের মধ্যে একবারে এককাপড়ে বেরিয়ে গেছে। সেটি হচ্ছে সবচাইতে বড় ট্রাজেডি। সেখান থেকে গল্পের শুরু, সেই ১৯৪৮ সালে। এই তারা যে ১৯৪৮ সালে ঘর ত্যাগ করা শুরু করল সেটা তো আজও চলছে। এই ইজরাইলিদের জায়গা দখল আর প্যালেস্টাইনিদের গৃহত্যাগ, আজকেও দেখেন একই জিনিস চলছে। কারণ দেখেন যে জর্ডান যেমন বর্ডার সিল করে দিয়েছে … সিরিয়া, মিশর বর্ডার বন্ধ করে রেখেছে। বর্ডার খুললেই তো তারা ঢুকবে আইসা। ওরা এটুকু ডিসক্লোজ করেছিল ১০ লাখ লোক চলে গেছে দক্ষিণে। এইসব লোকেরে তো কোনো ঘরবাড়ি নাই কিচ্ছু নাই। তার জায়গা নিয়েছে স্কুলঘরের বারান্দায়। মিশর ভয় পায় যে বর্ডার খুললেই তো এরা ঢুকবে। আর একবার ঢুকলে তো কখনো যাবে না। যাবে কোথায়? কীভাবে যাবে? মৃত্যুর মধ্যে যাবে কেন? মিশরে এখানেই তারা কাজকাম করবে, থাকবে। রুটিরুজি খুঁজে নিবে। এই হইল ট্রাজেডি। ওইটাই এই ছবির মধ্যে আমি ধরার চেষ্টা করছি আরকি।

আচ্ছা পৃথিবীতে এই যে রিফিউজি মানুষ, ওরা তো এক ধরনের রিফিউজি মানুষ...
বাইরে যারা আছে তারা তো রিফিউজি মানুষ। এমনকি ভিতরে যারা আছে তারাও রিফিউজি। কেননা তারাও রিফিউজিদের মতোই আছে। কারণ গাজাতে তারা জাতিসংঘের রিফিউজিক্যাম্পে আছে।

মানুষের এই যে হাহাকারটা, আমি ধর্মের কথা বলছি না, ভূমি থেকে বিতাড়িত করা, ভূমি দখল করা সর্বোপরি মানুষকে যে ধ্বংস করার টা প্রক্রিয়া, এত এত শিশু মারা যাচ্ছে! কিছুদিন আগে মানে ২০০০ সালের দিকেও কি চিত্রগুলো একই ছিল?
একই। একই ছিল। যেটা ধরেন যে আজকে একটু বেশি বেশি হয়ে গেছে ওই সময় একটু কম ছিল। কিন্তু একই, একই জিনিস ছিল, একই বর্বরতা ছিল।

এই যে ছবিটা আপনি করেছে, ছবিটা করার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের দায়টা আপনি পালন করেছেন, কিন্তু ২০২৩ সালে আজকের দিনেও, আজকের সকালেও, যখন ওই যে সিরিয়ার শিশুটা মারা গেল, মানে বড়ভাইটাকে ধরে ছোটভাইটা হাসপাতালেবেডে শুয়ে আছে বড়ভাইটা মারা গেছে এবং ছোটভাইটারে কান্নাকাটি করে সে একটু ধরতে পারতেছে। সেও উঠতে পারতেছে না। অর্থাৎ শিশুটিযে ক্রন্দন আজকে ২০২৩ সালেও। ধরেন যে প্রায় ৭০ বছরের একটা ধারাবাহিক সংঘর্ষ এটার কোনো মীমাংসা হচ্ছে না। এবং সেজায়গায় দাঁড়িয়ে আপনি ইতিহাসের কোথায় দাঁড়িয়ে কতটুকু মানবিক দায়িত্ব পালন করছেনএটা আপনাকে কি কোনোভাবে কষ্ট দেয়?
খুবই, খুবই কষ্ট দেয়। কারণ আমি এই পরিবারের সাথে মিশেছিলাম। মিশে ছবিটা করেছি। আমরা, আমি, একই শহরে ছিলাম। এই ছবিটা আমি ২০০২ সালে করেছি বোধহয়। আমি এখানে (বাংলাদেশে) এসেছি ২০০৭ নাগাদ। প্রায় ১৮-২০ বছর আগে হবে ছবিটা করেছি। তো ওই পাঁচ বছর ২০০২ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে সবসময় তাদের বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে আমাকে ডাকত। কারণ আমাকে তাদের ভালো লাগত। তারা আরবের সন্তান আর আমি আরবের সন্তান না, তবুও তাদের নিয়ে ছবিটা করছি তাদের খুব ভালো লেগেছিল। তারা বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে আমার ছবি নিয়ে দেখাইত, আমাকে ডাকত যে আসো। আমি মঞ্চে উঠলে পরিচয় করিয়ে দিত যে আমি নন-আরব। আরবের লোক না, বাংলাদেশের একটা ছেলে। আমাদেরকে নিয়ে ছবি করেছে। আমি তখন যুবক বয়সের, আমি তখন খুব গর্ববোধ করতাম। ওইসব ছেলেমেয়েদের সাথে আমি থাকতাম। শুধু প্যালেস্টাইনের ছেলেমেয়ে না — মধ্যপ্রাচ্যের, সিরিয়ার; এখন তো সিরিয়ায় গণ্ডগোল। তখন সিরিয়াল গণ্ডগোল ছিল না। সিরিয়া, জর্ডান — ওদের যারা ইউনিভার্সিটিতে ছিল তারা সিনেমাটা দেখাইত, আমাকে ডেকে নিত। তো আমি তাদের পরিবারের মতো হয়ে গেছিলাম একদম। কিন্তু আজকে খুবই খারাপ লাগে। খুব খারাপ লাগে। গুমরে কাঁদি। ওদের কথা ভেবে খুব খারাপ লাগে।

না, একটা জিনিস হচ্ছে যে ওরা যেরকম আরব, আপনি আরব না, আপনি মানুষ। ওরা ইরানি, ইরানি পরিবারের সাথে আপনি মিশেছেন আপনি ভারতীয় এরা ইরানীয়। কিন্তু এই যে মানুষের হাহাকারের ইতিহাসটা আপনি ফিল্মে তুলে ধরেছেন এবং এই ফিল্মটা ওরা সবাই দেখছে। আজকে২৩ সালে ডুকরে আপনার মাঝে ক্রন্দন তৈরি করতেছে তো এইটা কি আসলে সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য আমাদের স্বার্থ কিংবা আমাদের প্রতিহিংসা দায়ী না?
দায়ী তো। কি শিখলাম এই ইতিহাস থেকে আমরা?

আচ্ছা, এইটার জন্য কাকে আমরা দায়ী করব? ধরেন, এই পরিস্থিতিটা তো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক।
এ তো মন্দ কাজ। ভিতরে আলো না থাকলে যা হয় আরকি! আলোকিত মানুষ তো এই কাজ করতে পারে না। আলোকিত মানুষ তো আরেকজন মানুষের চোখের অশ্রুর কারণ হতে পারে না। শুধু অন্ধকারই পারে এই কাজ করতে। তার মানে আমরা সভ্যতার কথা বলতেছি ঠিকই কিন্তু ব্যক্তিজীবনে আমরা তো সভ্য হয়ে উঠতেছি না। প্রযুক্তি হয়তো উন্নতি করতেছে কিন্তু ভিতরটা আমাদের সভ্য হয়ে উঠতেছে না। নাহলে কাউকেই স্পর্শ করছে না এও কী হয়! মানুষের মৃত্যু, মানুষের হাহাকার মানুষকে স্পর্শ করে না — মানুষের হৃদয় তো এইরকম না। তাদের হৃদয়ই এইরকম যারা অন্ধকারে আছে, যারা আলোতে নাই।

এইটাকে অনেকেই ইহুদি এবং মুসলিমএরকম একটা গণ্ডি ভিতর দেখতে চায়। আমি এটাকে মানুষের বিপর্যয় হিসেবেই
সেইটাই কথা। ইহুদি কোনো কথা না। পরশুদিন ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হিলে ৩০৩ জন গ্রেফতার হয়েছে। তারা সব ইহুদি সম্প্রদায়। তারা সব গেছে ঐখানে। গিয়ে ক্যাপিটাল হিল একদম দখল করে ফেলেছে।

প্রতিবাদ করেছে। ইহুদিরাই। গ্রেট!
হ্যাঁ গ্রেট। সমস্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইহুদিরা আছে, বিশাল বড় বড় প্রতিবাদ করতেছে; লন্ডনে মিছিল করেছে, সব জায়গাতেই করতেছে — এইটা হইতে পারে না… আমার ধর্ম এইরকম না… ধর্মের শিক্ষা আমাদের এইরকম না। এমনকি তেলআবিবে মিছিল করতেছে। তারা বলতেছে — এইটা বন্ধ করো… এইটা হইতে পারে না।

আপনি দেখেন রবীন্দ্রনাথ এইটা নিয়ে কথা বলেছেন। খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। এবং রবীন্দ্রনাথ এত অসাধারণ যে সময়টায় তাঁর ব্যক্ত কথাগুলো ২০২৩ সালে এসেও কত জীবন্ত মনে হইতেছে! মানুষের পক্ষে কথা বললে যে সেটা জীবন্তই হয় সেটার প্রমাণ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ বলতেছে যেতোমরা সবাই আরব, প্যালেস্টাইনিরাও আরব ইহুদিরাও আরব। সুতরাং তোমরা সংঘর্ষ করে, হানাহানি করে নিজেদেরকে শেষ করে দিও না।এইরকম কথাবার্তা রবীন্দ্রনাথ সময়টায় বলেছেন। আচ্ছাএই ছবিটা করতে গিয়ে, মানে আজকে তো আপনার কান্না আমরা স্বচক্ষে দেখলাম; সেই সময়ও নিশ্চকান্নাই ছিল?
কান্নাই ছিল। ওদের একজনকে ইন্টারভিউ করতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেছি। মনে করেন এই যে আল ইমরান বলতেছে — দেখো আমি হইতেছি এইখানে, আমার মা-বাবা থাকে সৌদি আরবে। আমার এক ভাই থাকে কাতারে আরেক ভাই কুয়েতে। আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার মামার সাথে চলে এসেছি ওয়াশিংটন। কিন্তু আজে আমার ভাইকে ভাইয়ের ছেলেমেয়েকে চিনতে পারব না। তারা কুয়েত থাকে, কাতার থাকে, মা-বাবা থাকে সৌদিআরব। আমাদের একটা ইতিহাস আছে। আমাদের পরিবারের একটা ইতিহাস আছে। … এইসব শুনে আমি আর কান্না ধরে রাখতে পারিনি। বলে যে — আমরা চলে এসেছি, সব দখল করে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু আসার সময় আমাদের বাসার চাবিটা নিয়ে এসেছি। আমার ছেলেকে দিয়ে বলেছি — তোমরা কিন্তু রিফিউজি না, তোমার একটা বাড়ি আছে, একটা দেশ আছে, সেইখানটায় তোমার বাড়ি।

আচ্ছা! আপনার যে টিচার ছিলেন, যেভদ্রলোক...
প্রোফেসর এবি ফোর্ড।

উনি কোন দেশের?
অ্যামেরিকান।

অ্যামেরিকান, কৃষ্ণাঙ্গ। ছবিটা নিয়ে তাঁর অভিব্যক্তি কি?
সাংঘাতিক ভালো। তাঁর খুব ভালো লেগেছিল।

সে তো এই ছবিটার কথকও?
হ্যাঁ। কথক।

সে কি, মানে এই বিষয়ে তাঁর
সেইটা সে তীব্রভাবে ঘৃণা করত। তাছাড়া ও ইহুদি প্যালেস্টাইনি নিয়ে কাজ করত। প্যালেস্টাইনিরা যে আজকে টেরোরিস্ট হইছে এর একটা কারণ তো আছে। প্যালেস্টাইনিরা কেন শুধু শুধু ইট মারবে?
তুমি যে একজনের বাড়িতে গিয়া কইবা, — বাড়িটা ছাড়…বাড়িটা আমার! সে কিছু কইবে না? এত বছর ধরে তার বাপদাদার ঘরঠিকানা৷ সে চারপাঁচ পুরুষ ধরে এখানে থাকে। আর তুমি গিয়ে বলবা যে বাড়িটা আমার! কারণ তোমার হাতে একটা রাইফেল আছে। রাইফেল থাকলেই কি মাইনা নিতে হবে? তো স্বাভাবিকভাবেই সে একটা ইট মারল। আর সে ইট মারলেই তুমি বললা টেরোরিস্ট! এইটা হইল? এইটা টেরোরিস্টের ডেফিনিশন? এইটা হয়? তো টেরোরিস্টের বাড়ি দখল করছ সে তো প্রতিবাদ করবেই। টেরোরিস্ট না তো যা খুশি তুমি কও গিয়া। টেরোরিস্ট হওয়ার কারণ তো আছে। সেই কারণটা অনুসন্ধান করো যে কি কারণে সে টেরোরিস্ট হইল। আপনার বাড়ি যদি আমি দখল করি তো আপনি প্রতিবাদ করবেন না? নাকি করবেন না?
(প্রশ্নকারী প্রত্যুত্তরে) — অবশ্যই করব।
(সেন্টু রায় যোগ করেন) — তো আপনি প্রতিবাদ করলে যে-কেউ আপনাকে টেরোরিস্ট কইলে কী কিছু যায় আসে আপনার?
(প্রশ্নকারী উত্তরে বলেন) — না। কিচ্ছু যায় আসে না।
(সেন্টু রায়) — তাহলে? সোজা কথা।

ছবি করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের ইন্টারভিউ আপনি করেছেন। এবং সে-সময়টার পর্যবেক্ষণ কি ছিল?
পর্যবেক্ষণ বলতে সে-সময়টায় অবাক হইতাম যে অ্যামেরিকার ট্যাক্সের পয়সায় ইজরায়েলিরা যুদ্ধ করতেছে। সেসময় তো তারা (নাগরিকরা) জানত না যে তাদের পয়সায় প্যালেস্টাইনে নির্যাতন হয়। শিশুহত্যা হয়। আমি এমন অনেকের ইন্টারভিউ নিয়েছি যারা এইসব জানবে কি প্যালেস্টাইনের নামই শুনে নাই কখনো। তারা জানত যে ইজরায়েলকে তারা সাহায্য করতেছে। কিন্তু ইজরায়েল সেইটা নিয়ে কি করত সেইটা তারা জানত না। আর সেইখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ইজরায়েলকে দিত অ্যামেরিকান সরকার। আর সেই অ্যামেরিকাবাসী জানে না প্যালেস্টাইন দেশটা কোথায়। যা-ও দুয়েকজন বলে যে হ্যাঁ শুনছি তো, এইটা ইজরায়েল নামে একটা দেশে, সেখানে কী-যেন প্রবলেম আছে। তারা জানেই না কোথায় কী হচ্ছে না-হচ্ছে!

এইটার জন্যতো আপনাকে এফবিআই ধরছিল?
এফবিআই ধরেছে বলতে হ্যাঁ প্রশ্ন করেছিল। তারা যখন জেনেছে আমি বাংলাদেশের লোক…

এইটার জন্য কমপ্লেন করেছিল কে?
কেউ-একটা করেছে। আমি জানি না ঠিক। আমি যখন নানা জায়গায় নানাকিছু খোঁজাখুঁজি করতে লাগলাম, ফুটেজের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিলাম, তখন তারা এসেছিল। তারা এসে বললো যে এমনকিছু বলা যাবে না যেটাতে কনফ্লিক্টটা বাড়ে।

ফাইন ফাইন। মানে কনফ্লিক্ট বড়ানো যাবে না, তবে ফুটেজ দিতে কোনো সমস্যা নাই?
হ্যাঁ ফুটেজ দিতে সমস্যা নাই তবে কনফ্লিক্ট বাড়ানো যাবে না। এই এই বললে কনফ্লিক্ট বাড়তে পারে, এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। এফবিআই তো খুবই অরগানাইজড একটা বাহিনী, না?

এমনিতে এই ছবিটার দৈর্ঘ্য কত?
ছবিটা বোধহয় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের।

আর পাত্রপাত্রীর সংখ্যা? কতজনের সাথে কথা বলেছেন?
পথচারীর সংখ্যা তো অনেক। আমেরিকানরা আর প্যালেস্টাইনি ছয়টা পরিবার। আর প্রফেসর ফোর্ট।

ফোর্ট নামের এই ভদ্রলোকের কথা খুব আকর্ষণ করছিল আমাকে। এমনিতে আরএইটা তো আপনার দ্বিতীয় ছবি?
হ্যাঁ। দ্বিতীয় ছবি।

আচ্ছা। একটা বিষয়ধরেন, এ যে তথ্যচিত্র, অর্থাৎ ডকুমেন্টারি ফিল্মই বানাবেন এরকম প্রত্যয় কেন করলেন?
ইতিহাসকে ফিকশন করে কাহিনি বললে এটার ভিতর ডকুমেন্টেশন থাকে না। ডকুফিল্মের কাজই হলো এখানে আপনি যা বলবেন সম্পূর্ণ সত্যবাস্তবতার সাথে মিল থাকতে হবে। যে দেখবে জানবে সে সম্পূর্ণ সত্য তথ্যটা জানতেছে।

মানে ফিল্মের মধ্য দিয়ে ইতিহাস বলা।
হ্যাঁ। ফিল্মের মধ্য দিয়ে ইতিহাস বলা।

এই ছবিটা করে আপনার শান্তির জায়গাটা কোথায়?
প্যালেস্টাইনের শিশুরা মারা যাচ্ছে এবং আমি সেটা আমার ফিল্মে তুলে ধরতে পেরেছি। এর গোড়ার ইতিহাসটা মানুষকে জানাতে পেরেছি। মানুষ তো মনে করে যে এইটা বোধহয় ইহুদি আর মুসলমানের যুদ্ধ। এর পেছনে যে একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, একটা বঞ্চনার ইতিহাস আছে। সেইখনে একটা ষড়যন্ত্র আছে। এই সবগুলো বিষয় বলতে পেরেছি অল্প সময়ের মধ্যে। সেইসঙ্গে গানে, সংগীতে, সুরে একটা আবহ তৈরি করেছি যেন খুব কাঠখোট্টা তথ্য মনে না হয় দর্শকদের কাছে। আর তাছাড়া ফিলিস্তিনের না শুধু, মধ্যপ্রাচ্যের প্রচুর লোক মিউজিশিয়ান। আমাদের অনেক রাগই তো মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে। ওরা খুবই মিউজিকলাভার।


ব্যানারে ব্যবহৃত ছবিটি ফিল্মের একটি স্ক্রিনশট; রচনার ভিতরে সেন্টু রায়ের পোর্ট্রেইটগুলো সরোজ মোস্তফার ক্যামেরায় ধারণ করা এবং তাঁরই সৌজন্যে পাওয়া। — গানপার


রাইট টু রিটার্ন ডকুফিল্ম
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি

গানপার

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you