প্যারোডিস্ট, প্যাট্রিয়ট অ্যান্ড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ন্যাশনস্টেইট অথবা মাইলস-ফসিলস ফিৎনাফ্যাসাদ || জাহেদ আহমদ

প্যারোডিস্ট, প্যাট্রিয়ট অ্যান্ড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ন্যাশনস্টেইট অথবা মাইলস-ফসিলস ফিৎনাফ্যাসাদ || জাহেদ আহমদ

প্যাট্রিয়টিজম্ ইজ্ দ্য লাস্ট শেল্টার অফ স্কাউন্ড্রেল্স। কথাটা স্যামুয়েল জন্সন নামে কেউ বলে থাকবেন বহুকাল আগে। এই ভদ্রলোক ইংরেজি ল্যাঙ্গুয়েজের গাব্দাগোব্দা অভিধান আর কবিজীবনীকার হিশেবে এতদঞ্চলে প্রসিদ্ধ। ঠোঁটকাটা ছিলেন। কড়া লাইনের ক্রিটিক লিখতেন। তখনকার প্রায় বেবাক লেখকদেরই লেখাপত্তরে, — কেবল জন্সন একলাই নন, — অ্যাফোরিজমের প্যাটার্নে সেন্টেন্স মেইকিঙের একটা টেন্ডেন্সি লক্ষ করা যাবে। যেমন ছিলেন আমাদের এখানকারও অনেকেই, কিছুকাল আগে পর্যন্ত, লিখতেন প্রবাদবাক্যশৈলী দিয়ে এবং রচিত বাক্য মাত্রই ছিল চোখা তীক্ষ্ণ। ওই সিক্সটিজের অনেকেই, বিগত শতকে, লিখতেন স্মরণীয় বচনের আদলে। যেমন হুমায়ুন আজাদ। পড়তে যেয়ে লোকে যেমন আমোদিত হতো, হয় আজও, অতি তীক্ষ্ণতার ঠাপানিতে বেজায় বিরক্তও হতো লোকে। লেখালেখি জিনিশটা আর-যা হোক শুধু চোখা বাক্যাবলির চয়নিকা যে নয়, তীক্ষ্ণ অথবা ভাঁড় ভোঁতা আদলের কথাঠাপ নয়, সেন্সটুকু কমন্ লোকেরা খুইয়ে বসেছে কি না মাঝেমধ্যে সন্দেহ হয়। ইদানীং সন্দেহ ঘোরতর কমনার্স ফেবুস্ট্যাটাসঠাপে জেরবার হয়ে।

এপিগ্র্যাফিক যে-একটা বাক্যে এই নিবন্ধ অবতরণ করেছে, একদম পয়লা লাইনে লক্ষণীয়, এই তিতপুরানা আমলের কথাটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবার পেছনে একেবারেই রিসেন্ট সোশ্যাল এবং সোশিয়োকালচারাল ফেনোমেনাগুলো সংশ্লিষ্ট। চুন থেকে পান খসলেই ইদানীং ধরণী দ্বিধা, মানে এক-খসাতে দেশ দুইভাগ, স্বাধীনতার পক্ষ ও প্রতিপক্ষ তো পুরানাকালিক যুগ্ম অপোজিশন। বর্তমানে দেশভাগের ক্যাটিগোরি-ইন্ডিক্যাটরগুলো নববিন্যাস্ত। নতুন নতুন সূচক, বয়ানের সবক, যতসব নবঢঙা সারণী ও ছক গজাচ্ছে মুহুর্মুহু চৌদিকে। ব্যাপারটা ভালো, উৎফুল্লকর, উন্নয়নের লক্ষণযুক্ত। মুশকিল অন্যত্র। নোটন নোটন পায়রা হলেও ঝোটন বাঁধবার পরে ঠাহর হয়, কিসের নতুন কিসের নয়া, পায়রাগুলো পুচ্ছে-পাখায় ত্রিকালপ্রাচীন। শুধু ঠমকে ও ঠাঁটে একটুকু যা আধুনিকায়ত। অন্যথায় যেই বিচি সেই লাউয়েরই মাফিক। কাঁহাতক, কহ, নব নব কল্কি দিয়া প্রাচীন গাইঞ্জা টানা! আল্লার দুনিয়ায় নিত্যনয়া ড্রাগের কত-না ব্র্যান্ড কতই-না রেলা! তাদিগের টেইস্ট-সোয়াদ-এফেক্ট সমস্তকিছুই পৃথক বৈশিষ্ট্যে আলাদা। দাঁড়াও পথচারী বিচ্ছিন্ন-পথবিভ্রান্ত প্রজন্ম! জন্ম যদি তব বর্তমান বাংলায়, বাংলাদেশে, ইন্ডিয়া-ইন্ডিয়া হাঁকিয়া ষাষ্টাঙ্গে ক্ষেতের নাবালে লুটোপুটো গড়াগড়ি যাও! বন্ধুরাষ্ট্র, মিত্রশক্তি, প্রতিবেশী কৃপাস্বামী ইত্যাদি মিছিলের বন্যায় ভেসে যায় ধুয়েমুছে যায় নিত্যকার মহাভারতীয় করাল আগ্রাসন ও অপমানকর বহুবিধ প্রজাতান্ত্রিক অনৈতিকতা আর অন্যায়।

প্যাট্রিয়টিক পার্ভার্শনে এখন, অধুনা, বর্তমান বাংলাদেশ সয়লাব। সমস্তকিছুতেই দ্বিকোটিক চিন্তাদারিদ্র্য সর্বত্র। হয় তুমি নিঃশর্ত সমর্থন করিয়া যাও আমারে, ম্যেরা হামসফর হও, নতুবা তুমি আমার শত্রু বলিয়া ট্রিটেড হবে। অ্যামেরিকানীতি ডিউরিং ওয়ার অন টেরর। এবং এখনও তা-ই। কিন্তু অ্যামেরিকা আমরা গার্হস্থ্য বৈঠকে ডেকে আনতে চাই না, অ্যামেরিকারে আমরা হালে বেইল দেই না, ভারতের মতো মহা বাংলাদেশবন্ধু থাকতে অ্যামেরিকা নিপাত যাক। বন্ধুরাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধমিত্র, ঔদার্য-অবতার। মাদার ইন্ডিয়া। তাহারা বাংলাদেশসাংস্কৃতিক সূতিকাগার। বাংলাদেশরাজনীতির প্রণয়সিদ্ধা পাহারাদার। বাংলাদেশার্থনীতিক চৌকিদার। উহারা আমাদের ভালো চায়, ক্রেতার খোঁজে বেরোবার আগেই ওরা আমাদের মালসামান ব্যুকিং দিয়া ছিনাইয়া নিয়া আমাদের দুঃখ ঘোচায়, আমরা তাদের মিত্রস্তন্যপানের ঋণ শুধিবারে নাহি পারি ইহজন্মে। এদিকে চোখে চালশে, দেহে নাই বল, বুকে ল্যাক অফ কনফিডেন্স। এই আমাদের অপরূপায়িত সোনার বাংলাদেশ। চুতিয়াবৃত্তিতে এখন আমরা চ্যাম্পিয়্যনপ্রায়। ফেসবুকে এহেন চুতিয়াবৃত্তি, নিজের নাক কেটে পরের নরুনের কিমৎ চুকানো, নিযুত নিদর্শন দেখে যাই আমরা নানা ঘটনার মুড়ায় এবং লেজে।

এই ঘটনা আজকে নয়, কিংবা কালকেও নয়, ঢের ধূসর দূরের বছরে এর সূত্রপাত। দুইহাজার-পনেরো সনের গোড়ার দিককার কোনো-একটা মাসে এই মিসহ্যাপ সংঘটিত হয়েছিল। অতীব দুঃখের হয়ে ব্যাপারটা বাংলাদেশপ্রেমীদিগের বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া দ্যায়। ইন ব্রিফ দি ঘটনা ওয়্যজ্ রূপম ইসলাম বাংলাদেশেরে এক ‘নয়া পাকিস্তান’ বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছেন। বস্তুত রূপম ইসলামের তবিয়তের খবরাখবর কোনোদিনই রাখি নাই, তিনি চিংড়ি না হাতি ইত্যাদি নিয়া মাথা ঘামাই নাই, কিন্তু উনার বঙ্গবাণী শুনে একটা ইন্ট্রেস্ট গ্রো করে উনার সম্পর্কে। ফেসবুকে এক বন্ধুর আপডেট-করা স্ট্যাটাসসূত্রে এই বিটকেলে ব্যাপারটা জানতে পারি। কিন্তু ব্যাপারটা কি, মেইন ফ্যাক্ট যাকে বলে, সেইটা খানিক আগায়ে যেয়ে বলি। ইনবক্সে সেই বন্ধু সবিশদ ঘটনার ক্লিপিংস ফরোয়ার্ড করেন অনতিবিলম্বে, এনলাইটেন্ড হতে পারি বিলম্বে হলেও সেই সুবাদে। গোড়ায় ভেবেছিলাম ব্যাপার হয়তো গান নিয়া। বাহাস যদি হয় গান নিয়া, তা-ও রক/ব্যান্ডগান, তদুপরি তাহে ইন্ডিয়ান গলাবাজি, ইন্ডিয়া ভার্সাস বাংলাদেশ, তো ভাবলাম যে এইটা জানা জরুর। ঘটনার সূত্রপাত রূপম ইসলাম নামে এক ল্যলিপ্যপি সিঙ্গারের বাংলাদেশবিদ্বেষী ফেসবুকস্ট্যাট-আপডেট থেকে। ঠিক কি বলেছিলেন রূপম, প্রত্যঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ‘ফসিলস’ ব্যান্ডের ভোক্যাল, ঘটনাকালীন দুইদিন নেটে না-থাকার কারণে জানতে পারিনি। সার্চ দিয়ে পেলাম না কিচ্ছুটি। কিন্তু ব্যাপারটা জানা আমার জন্য খুব জরুরি। ইনবক্সে জানতে চাইলে, ইফ পসিবল রূপমবক্তব্য কোট করতে অনুরোধ জানালে, সেই বন্ধুটি আমাকে বাধিত করেছেন তথ্য যোগায়ে।

এমনিতে সেই বন্ধুটি নিজে যে-একটা স্ট্যাটাসস্টেটমেন্ট শেয়ার করেছিলেন, সেই ঘৃণাবেদনামেশানো অবস্থানপত্র পুরোটার স্পিরিট আমি সমর্থন করি। কিন্তু উনি আবার আজকালকার ট্রেন্ডি বিপ্লবী, রিবিউক-স্প্রেডিং রেভোল্যুশনারি, তিনবাক্যের স্ট্যাটাসে তেরোটা মাতাপিতাধসানো শরীরী-ইঙ্গিতভরা গালি ছাড়া তারটা খাড়ায় না। মানে, তার যুক্তি খাড়ায় না, তার সিচ্যুয়েশন-পজিশন বিবৃত হয় না। গালিবুদ্ধিজীবী আর গালিজিহাদি নিয়া আমরা ভালোই দিনাতিপাত করে যেতেছি। কিন্তু ফসিলসের রূপম আর মাইলসের শাফিন দ্বৈরথকালে এই বন্ধুটা আলাপ তুলেছিলেন যে আমাদের/ওদের রক হয় কি হয় না।

আমারও অলমোস্ট অভিন্ন অপিনিয়ন। ওদের রক হয় না। ড্রামিং জিনিশটা সার্প্রাইজিংলি ওরা বিলকুলই পারে না বলে মনে হয় আমার। আর গিটার নয়, রক মিউজিকের মূল ব্যাপারটা ড্রামিং দিয়া খাড়া করতে হয় বলে আমার আগাগোড়া মনে হয়েছে। হ্যাঁ, গিটারগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। কিংবা পার্কাশন-কিবোর্ডস সবকিছুই। ডিলান বলেন বা আরও যারা আংরেজি সিক্সটিজের ফোক-রক করেছেন তারা ব্যাঞ্জো-মাউথঅর্গ্যান প্রভৃতির পাশাপাশি গিটারটাকে/গিটারগুলোকে ব্যবহার করেছেন নবতর দ্যোতনায়, রকায়িত সৌকর্যে। প্রেতাত্মা পায়রাবিলাসীদের হাতে এন্তার বাদ্যযন্ত্র, নবাবি লিরিক্স, সুচারু ফুটিলেও রকাগ্নি জিনিশটা তাদের দেশলাই থেকে ঠিক স্পার্ক করে না।

Shafin ahmed Miles

তা, যা-হোক, ফ্যাসাদের উৎপত্তি কোত্থেকে? দেখা গেল যে অ্যাট-অল মিউজিক নয়, মিউজিকের ধারকাছ দিয়াও কিছু নয়, লেগেছে লড়াই প্যাট্রিয়টিক কারণে। একবিংশ শতকে প্যাট্রিয়টিক লড়াই মানেই স্পোর্টসগ্রাউন্ড। অথবা সাম্প্রদায়িক হিংসা। রূপম ইসলামের ব্যাপারটা অবশ্য পারিবারিক ইজ্জত-নিরাপত্তার দিকে একটা ডায়মেনশন পেয়েছে। উনার পরিবারকে ‘লে অফ বিচেস’ বা এ-রকম ফেসবুকিশ কুত্তাঘোঁৎ গলায় কিছু-একটা বলেছিলেন বাংলাদেশজ মাইলস  ব্যান্ডের ড্রামার তূর্য। অমনি বাবু বউয়ের পক্ষে ডুয়েল লড়ার পরিবর্তে একটা গোটা দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন। এই দেশটা আবার তার রুটিরুজির গ্রাউন্ড তো, ফলে অচিরে মাফ চেয়ে লম্বা কান্নাকাটিফিরিস্তি। রুটিরুজির দুশ্চিন্তা কার না আছে ভাই! কিন্তু তূর্যের পক্ষ লইয়া মাইলসেরই লিডভোক্যাল শাফিন আহমেদ এসে ফের ইংরেজি বুলি আর ইংরেজি গালির যে-জ্ঞানের বহর দেখালেন অভিধানের পাতা কেটে, সেইটা আরেক মূর্খামি। ইংরেজি ভাষাটা শাফিন যদি রিয়্যালি ভালো জানতেন, তাইলে রক মিউজিকটা আরেকটু উন্নত উপায়ে করতে পারতেন। দশকেরও উপর দিয়া যায় মাইলস  তো ময়দানে দেখি না আর। ফলে প্যাট্রিয়ট হইলেই তো হইল না। পাইকারি প্যাট্রিয়ট হওয়া আর রূপমের ন্যায় প্যারোডিস্ট দুইটার কোনোটাই আমাদের খুব-একটা কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। খালি শোর-মাচানো হবে, ফেসবুকে ফার্স স্টেজড-অন হবে, মিউজিকের বা মাদার্ল্যান্ডের বৃদ্ধাঙ্গুলির উপকারটাও হবে না। মাইলস  আর ফসিলস  দুই দলেরেই নিজেদের কাজটা করে যেতে হবে, সেইটা পারলে আপনাআপনিই প্যাট্রিয়টের খেতাব জুটবে তাদের মুকুটে। কিংবা আমরাই দিমু কথা দিলাম, আর-কোথাও না-পারি তো ফেসবুকে। আর তামশা-করিয়েদেরে স্পেশ্যাল অ্যাওয়ার্ড দেবার ব্যাপারটা আলোচনাসাপেক্ষ।

রূপমের বলদগিরির সীমাশুমার নাই সত্যি, কিন্তু রূপমের মহত্ত্বও হ্রস্ব নয় একেবারে। সেই দুইহাজার-পনেরো সনের বলদবাজির সময়েও রূপম রকমিউজিকের বাংলা অ্যারেনায় বাংলাদেশের পথিকৃৎ-ভূমিকা অকুণ্ঠ গলায় স্বীকার করেছেন। ইন্ডিয়ান কুণ্ঠিত কপট চরিত্রের রুস্তমদের কাছে এই স্বীকৃতিটা বাংলাদেশ কখনো আশাও করে নাই, নিজের উন্মাদনায় চিরদিন গান গেয়ে গেছে ব্যান্ডস্ফূর্ত বাংলাদেশ, যেমন যাচ্ছে আজও। রূপম ইসলাম এইখানে ব্যান্ডক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিষ্কম্প ঘোষণা দিয়ে এসেছেন যে তিনি এবং তার প্রজন্ম সংগীতসংস্কারাচ্ছন্ন কলকাতায় বেড়ে উঠেছেন বাংলাদেশের ব্যান্ডগান শুনে, বেড়ে উঠেছেন এবং খোয়াব দেখেছেন বাংলাদেশের ব্যান্ড ম্যুভের দেখানো পথে, শেষে ম্যাকের তথা মাকসুদুল হকের ফিডব্যাক এবং পরবর্তীকালের ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ তার কাছে হয়ে উঠেছে বাংলা রকের আল্টিমেট চূড়া।

Rupam Islam Fossils

ম্যাক তথা মাকসুদুল হক শুধু রূপমকে নয়, বাংলা রকের একটা বিরাট অংশকে ম্যাক মেন্টর করেছেন নেপথ্যে থেকে; এবং বাংলাদেশে রকলিগ্যাসি দীর্ঘ ও সুপুষ্ট অনেক, এইটা আমার পকেটের নয় শুধু, অনেকেই মনে করেন এমনটা। কার্পণ্য-কপটতা না-করে রূপম নিজে এই কথাটা স্বীকার করেন সবার আগে দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। ‘বাংলা রক মিউজিক’ কথাটা ম্যাকই প্রথম বলতে শুরু করেন, ব্যান্ড বলত যখন সবাই এবং ‘বাংলা রক’ বললে একটু উশখুশ করত সক্কলেই। কবীর সুমন ম্যাক নিয়া এবং বাংলা রক নিয়া বহু উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলেছেন আর পণ্ডিতি করেছেন। কবীরজি মিউজিক নিয়া ব্যাপক জানেন, কিন্তু রকের ব্যাপারে তার স্যুয়িপিং কমেন্ট শুনে সবসময় সেই ব্যাপকতা নিয়া আমি সন্দিহান বলিয়াই স্বীকার করব। যদিও উনি আমাদের আজম খান নিয়া আদিখ্যেতা করেন, শুকরিয়া জানাইবার ভাষা আমাদের নাই সেইজন্যে; ব্যাপার হচ্ছে, তিন দশক ধরে আজম খান বাংলাদেশে গুরু সম্বোধনে রকপ্রৌঢ় ও রকপোলাপান সক্কলের কাছে সমাদৃত; খান-অনোয়ার্ডস্ অন্তত দুটো প্রজন্ম বর্তমান বাংলাদেশে রকপ্রতিষ্ঠিত; কবীর সুমন গুরুকে চেনেন, সুমনের প্রাথমিকতায় আটক-থাকা মানবিক বয়সেরই ধর্ম, অথচ গুরুকে বিদ্যায় এবং অন্য অনেকভাবে ছাড়িয়ে-যাওয়া শাবকশিষ্যদের কর্মমাহাত্ম্য হৃদয়ঙ্গম করা কবীর সুমনের ধারণসামর্থ্যের বাইরে। অবশ্য কবীর সুমন বরাবরই নিজেকে ছাড়া আর-কাউকে দেখতে পান বলিয়া আদৌ মনে হয় না। যা-ও-বা মায়েস্ত্রো দুইয়েকজনের নাম মুখে নেন, যতটা-না গানের রিকগ্নিশন তারচেয়ে বেশি বিনয়ানত-শ্রদ্ধাবতার আর কানের লতি চিমটানো ভক্তি প্রকাশের ব্যারিটোন ভোয়েস বুজরুকি। নিজের আসন উচ্চে দেখাবার কৌশলগত কারণই সেই নামোচ্চারণে মুখ্য মনে হবে। এইগুলো বলার একটা চেষ্টা নানাভাবেই করতে চেয়েছি, কিন্তু টেক্নিক্যালি আমার লেখাপত্র অত উৎরোয় না আমি জানি, সেইজন্যে এইসব নিয়ে একটু শেইকি/রিলাক্ট্যান্ট থাকি সবসময়। অ্যানিওয়ে।

দেখেছি যে একটা কথা বাতাসে কবেকার কোন আদ্দিকাল থেকে চাউর হয়ে আছে, কথাটা এ-ই যে, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার এভার-সাক্সেসফ্যুল ব্যান্ড নাকি মহীনের ঘোড়াগুলি! কিংবা আরও বলা হয় যে এতদঞ্চলে মহীনের ঘোড়াগুলি-ই প্রথম, পথিকৃৎ, পায়োনিয়্যর ব্যান্ড! সাক্সেসফ্যুল কি না সে-ব্যাপারে বলা শ্রোতাগোষ্ঠীবিশেষের পার্সেপশনের ব্যাপার হলেও হতে পারে, কিন্তু প্রথম/স্টোনলেয়ার প্রভৃতি ব্যাপার তো তথ্য দিয়া মাপ্য; অথচ তথ্যাদি থাকা সত্ত্বেও আমরা মানিয়া নিয়া যাইছি প্রচারণা; আচ্ছা, এখন একজন নিজের চোঙা ফুঁকিয়া প্রচার তো করে যেতেই পারে; এর বিরুদ্ধে চোঙা হাতে ময়দানে নামলে পরিবেশ দূষণ ঘটে। দুঃখটা বা ফার্সটা ঘটে যখন দেখি মিথ্যে সেই প্রচারণার পক্ষেই আমরা আমাদের থালাবাটি-ডেগডেকচি-বগলপাছা বাজাইয়া চলিয়াছি ইতিহাস-প্রাক পর্ব হইতে! ঘোড়ারা ভালো করেছে যেমন, ম্যাড়মেড়ে মিউজিক করেছে এরচেয়েও অনেক বেশি। কিন্তু এইটা ঠিক যে গোটা ভারতবর্ষের প্রাদেশিক বাংলায় মহীনের ঘোড়াগুলির সঙ্গে টেক্কা দেবার যোগ্য ব্যান্ড/রকগ্রুপ আজও গড়ে ওঠে নাই। যদ্দুর জানি যে মহীনের ঘোড়া-রা স্টেজে পার্ফোর্ম করে আসছে আমাদের কারো কারো জন্মলগ্ন থেকে, নাইন্টিন সেভেন্টিএইট থেকে, অ্যালবাম যদিও পরে রেকর্ড হয়ে বেরিয়েছে। সেই তুলনায় কবীর সুমন, তখনকার সুমন চট্টোপাধ্যায়, অতি সাম্প্রতিকের ঘটনা। সুমনের অ্যালবাম নাইন্টির গোড়ার দিকে, নাইন্টি টু বা থ্রিতে, এসেছে মার্কেটে। এখন যদিও সুমন নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ফিকশন বলে বেড়ান যে তিনি হ্যানত্যান ইত্যাদি করে আসছেন আরও অনেক আগে থেকে ইত্যাদি। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত বা বাংলা রক মিউজিক এইসব পশ্চিমবঙ্গীয় ঢোলক-হার্মোনিয়্যম গানবাদ্যির ঢের আগে থেকেই বিরাজিছে। এমনকি মহীনের ঘোড়াও তো খুব উন্নত মনে হয় না আমাদের ব্যান্ড/রকের তুলনায়। অ্যাট-লিস্ট বেড়াভাঙা বৈপ্লবিক নতুন তো অবশ্যই নয়। ইন ফ্যাক্ট মনে হয়নি কোনোদিনই। কিন্তু সুন্দর গান গেয়েছে ওরা নিশ্চয়ই।

রূপমের ক্ষেত্রে আমার রিজার্ভেশন এইটাই যে উনি প্যারোডি স্টাইলের মিউজিক করেছেন। যেইটা আবার নচিকেতা আরও উন্নতভাবে করে আসছিল আগে থেকেই। এবং নচি আমাদের ম্যাকের বা মাকসুদুল হকের তথা তার ব্যান্ড-অ্যাক্টিভিটির ভক্ত, ইন্টার্ভিয়্যুতে এককালে নচি ফিডব্যাক ও ম্যাক সম্পর্কে মুগ্ধতা প্রকাশিয়াছেন। অঞ্জন তো বলা বাহুল্য। কবীর সুমন যে হ্যানত্যান নানাকিছুর পথিকৃৎ বলিয়া দাবি করে আসছেন অনেকদিন ধরে, একসময় নিচু গলায় বললেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই গলা আরও চড়েছে, এবং সম্প্রতি ইউটিউবের কল্যাণে এন্তার কবীরসাক্ষাৎকার শুনে মনে হয়েছে অ্যাট্ লাস্ট বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন গানওলা। তা-নইলে কেউ অন্ধের ন্যায় নিজেরেই ফিরে ফিরে দেখবে কেন সমস্তকিছুর কেন্দ্রে! অনুষ্টুপ প্রাক-শারদীয় ২০১৪ সংগীতসংখ্যায় ছেপে বেরোনো সুমনালাপ অসহনীয় আত্মম্ভরিতাভরা। এই দাবিগুলো সব না-হলেও অধিকাংশ নস্যাৎ করা সম্ভব আমাদের ব্যান্ড/রক মিউজিকের গোল্ডেন টাইম নিয়া আলাপটা আমরা যদি ঠিকঠাক করে যেতে পারি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দেশে ব্যান্ডমিউজিক নিয়া কেউই তো বলবে না, আমরা যদি বলাটা জারি না-রাখি।

1982 miles

কিন্তু ম্যাকপ্রসঙ্গ এর সঙ্গে, সেই দ্বিসহস্রপনেরোর ফসিলস-মাইলস দ্বৈরথের রেস্লিঙে, কেমন করে জড়ালো বোঝা গেল না আদৌ। রূপমের বউ মনে হয় রূপসা দাশগুপ্ত, ম্যাককে বেশ স্যরি-ট্যরি বললেন দেখলাম ফেসবুকপৃষ্ঠায়। অ্যানিওয়ে। এতটা সাংগীতিক অসার অফলা আমরা হয়ে যাইনি নিশ্চয় যে অ্যাট-লিস্ট সংগীতমূল্যাঙ্কনে যেয়ে রূপম ইসলাম তথা ফসিলসের প্রসঙ্গ টানব। প্রসঙ্গ তো দূরের বহু, রকসংগীতের সঙ্গে ওয়েস্টবঙ্গের ডিস্ট্যান্স যেমন, রূপম ইসলাম গং বাংলাদেশের রক/ব্যান্ডবুকে অনুষঙ্গ হবারও কোনো সুযোগ তৈয়ার করা আপাতত দুঃসাধ্য। চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডের ওই গানটা ইয়াদ আছে তো? দুধ খেলে, ভালো ছেলে হলে, গায়ে গত্তি লাগলে একদিন হয়তো রূপমেও রক ফুটবে। কেননা আপনি যদি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলাদেশে জন্মিয়া থাকেন, বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে আপনার কলিজা তাহলে ব্যাপক টগবগানো উদার ও সুপরিসর ধরে নেয়া যায়, আপনি স্বীকারিবেন যে বেহতর দর্প আমাদের না-থাকলেও গত অর্ধশতকে সংস্কৃতিলিপ্তির এই একটা জায়গায় তথা ব্যান্ডগানে স্ট্যান্ড করার মতো অশ্বত্থঋজু হতে পেরেছি আমরা।

ভারত বহুকিছুতেই আমাদের চেয়ে এগিয়ে, ব্যাপক এগিয়ে, এইটা দিবসালোকের চেয়েও সত্য। বিদ্যাবুদ্ধি, কূটনীতি, বিজ্ঞান ও ভূরাজনৈতিক নেতৃত্ব, সর্বোপরি বিজনেসে ওরা আমাদের চেয়ে একশ বছর এগিয়ে। কেবল কয়েকটা জায়গায়, যেমন এডুকেশন ফর অল্ এবং রক্-ন্-রল্, বাংলাদেশের সঙ্গে এককাতারে এসে দাঁড়াতে রেসের গতি ইন্ডিয়াকে সেভেনফোল্ড এক্সেলারেইট করতে হবে। এবং, বলা বাহুল্য, অমর্ত্য সেন বলেছেন বলেই নয়, এইচডি ইন্ডেক্সে এদেশ মেট্রোসিটিকেন্দ্রী উন্নয়ননীতির ভূখণ্ড ভারতের চেয়ে ঢের এগিয়ে। এই কথাটা পৃথিবীর সর্বাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দেশগুলোর অগ্রসারির একটি ইন্ডিয়া স্বীকার করুক বা না-করুক, রাষ্ট্রীয় মদতে বেশুমার মুসলমান-শিখ-দলিত-মনিপুরী-আদিবাসী-মাওবাদী নিধনের দেশ ভারতের ‘শিক্ষিত’ ও ‘আধুনিক’ জনগোষ্ঠীর বিবেচনাবোধের পরিচয় শেষমেশ বিধর্মীনিধনকারী নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি-শিবসেনা-বজরঙ্গ খুনতৃষ্ণ জোটের মসনদে এনে বসানোর মধ্যেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশে যেদিন এই ধরনের প্রকাশ্য-দিবালোকে-ধৃত হন্তারক মসনদাসীন হবে, সেইদিন রকমিউজিকের গর্জন ও গলা আমাদের চিরতরে মিউট হয়ে যাবে। এই নিবন্ধকারের আঙুলে এবং কিবোর্ডে এককাৎরা সেন্স থাকতে সেইটা হবে না বলেই মনে হয়। এইখানেও পশ্চিমবেঙ্গল তথা ভারতমহান ছোটমুটো-টুটাফাটা বাংলাদেশের কাছে বহরে-গতরে এবং অবশ্যই আত্মায় বেঁটেখাটো।

mission F

রূপম নয়, বেচারা তো গানগম্যির দিক থেকে একদম দুগ্ধপোষ্য, ধরতে হবে সত্যি মিউজিশিয়্যান যারা, মিউজিকে সত্যি কিছু কন্ট্রিবিউট করেছেন যারা তাদেরকে, সংলাপ বলি বা ঝগড়া বলি চালাতে হবে কবীর সুমনের সঙ্গে। এখনকার চাল্লু বুলিতে ফ্যাসাদ বলতেই লোকে ডিস্কোর্স বোঝে সম্ভবত। রূপম ও অন্যান্য গল্প মার্জিনে আসবে তখন এমনিতেই। রূপম প্রমুখ দ্রব্যাদি ইন-অল-সেন্সেস বাইপ্রোডাক্ট। কবীর সুমন ওখানকার গানে এত প্রভাববিস্তারকারী, এমনকি রকসংগীতের লিরিক্স লিখতে যেয়েও সুমনের ভঙ্গি দিয়া চালাইয়া চলিছেন উচ্ছিংড়ি-খাওয়া পংবং রকারবর্গ। অন্যদিকে এইটাও মনে রাখি, লিরিকের জন্য জামাইবাবুকে আমরা দুইদশক ধরে যথেষ্ট সম্মানদক্ষিণা দিয়াছি। টোট্যাল মিউজিকের জন্য তো দক্ষিণা পাবার হক কবীরজি রাখেন না। আর রূপম-ফসিলস ইত্যাদিকে ইগ্নোর করে কথা আরম্ভ করতে হবে। পারলে রূপমের প্যারোডিগিরি দুই-চাইরবাক্যে ধরিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। না-হলে ল্যেসার-ইম্পোর্ট্যান্ট থিং আবার হুদাই ইম্পোর্ট্যান্স পেয়ে যাবে। দেড়আংলি মিডিয়োকারেরা স্টারডম পেয়ে যাবে। এরা না, স্টার এদের মধ্যে এক সুমনই। এরা সবাই সুমনের পেট থেকে বেরিয়ে রকগানের লিরিক্স লেখে, সেই সুমনেরই সমাজবাস্তবতার গান গায়, সেই নিম্বুড়াচিপা শ্রেণিচিত্র ইত্যাদি নিয়া মায়াকান্নাঝরা ক্লাসনোটস লেখে। একেই বলে বুড়া শালিকের ঘাড়ে রোঁ। হুড়োহুড়ির কিছু নাই। ধীরেসুস্থে কাজ করা দরকার।

তবে দেশপ্রেমী হিশেবে রূপম এগিয়ে গেলেন শাফিনের চেয়ে। এই দ্বিসহস্রষোলো সনে এসে ব্যাপারটা আমাদের কাছে মিনারেল-ওয়াটারের ন্যায় ক্লিয়ার হলো, রকমিউজিকে মিকিমাউস হলেও রূপম ইসলাম প্যাট্রিয়টিজমে হার্কিয়্যুলিস্। উনাদের দেশের স্বাধীনতাদিবসের সেলেব্রেইটিং ইভেন্ট ‘আজাদি মিউজিক কন্স্যার্ট’ ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের ব্যান্ড ‘মাইলস’ ইনভাইটেড হয়েছিল। রূপম পুরনো দলিলদস্তাবেজ বের করে ব্যাপক স্বদেশপ্রণয়ের নজির দেখায়ে বাংলাদেশের তথা মাইলসের অংশগ্রহণ তামাদি করে দিতে সক্ষম হলেন। রূপম তার জায়গায় ঠিকই আছেন। যদিও ফেসবুকিশ বক্তব্যপ্রভাবিত হয়ে এহেন ‘বয়কট’-ম্যুভমেন্ট রূপমের তথা ভারতমাতার মানসিক ইম্যাচিয়্যুরিটির প্রকাশ প্রমাণ করে। এক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশীদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন যদিও, রকমিউজিকে বাংলাদেশানুসৃতির ব্যাপারটা রূপম সবসময় স্বীকার করে এসেছেন ভারতস্বভাববিরুদ্ধ বিরল সাহস ও মহত্ত্বের সঙ্গে, পলিদ্বীপের অধিবাসী আমরা নিজেদের মধ্যে ভেটো-বয়কট-দ্বিবিভাজনের খেলাটা খেলতে খেলতে চল্লিশ বছরের সিলসিলাধারী, ইসলামসাহেব এইখানেও রানারআপ হয়ে রেকর্ডেড রইলেন বাংলাদেশের তথা তামাম জাহানের কাছে।

কিন্তু স্বদেশপ্রেমে শাফিনও কম যান না। ক্যালকাটার ফাটাকেষ্ট মঞ্চে গাইবার আমন্ত্রণে শাফিন মোটামুটি ব্যাগপ্যাক নিয়া খাড়াইয়াই গিয়াছিলেন বোধহয়; কিন্তু রূপমের প্রেমান্দোলনে ব্যাপারটা ভেস্তে যেতেই বিবিধ স্বদেশপ্রণয়ালাপ ফাঁদিয়া শাফিন বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি আগে ফেসবুকিশ যেসব ভুলভ্রান্তিগুলো করেছেন বন্ধুরাষ্ট্র তথা বাংলাদেশের শাশ্বত স্বাধীনতাযুদ্ধমিত্র পশ্চিমভারতের বিরুদ্ধাচার করে, সেসব আসলে ছিল উনার বাংলাদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। উনি সীমান্তহত্যা, ব্যাটিং-বোলিং, গঙ্গা-ফারাক্কাপানি ইত্যাদি কীর্তিকলাপে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশধ্বংসী ক্রিয়ায় বেদনার্ত হয়েই শ্যামপিরিতি বিস্মৃত হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসসিরিজ চালিয়েছেন। উনি ভারতের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী চিরদিন, উন্নয়নপ্রার্থনাকারী ইন্ডিয়ার, বন্ধু হয়েই চিরদিন পাশে পাশে রইতে চান এমনিতে, ভাষায় না-হলেও ভাবে সেই ইঙ্গিতই আমরা পাইনু। দুইজনেই যেহেতু একই পিচে খেলেছেন, অন্তত উনাদের যার যার ভাষ্যমতে, স্বদেশপ্রণয়ের পুতুপুতু পিচে, কাজেই ফাইন্যালি প্রেমে জয় হয়েছে কার সেইটাই বিবেচ্য। গো-হারা হেরেছেন শাফিন, জয় হয়েছে রূপমের। মাঝখান দিয়া শাফিনের স্বদেশবাসী ভক্তকুল উনারে শাপলাবাদী তথা শাহবাগবিরোধী ছাপ্পা হাতেনাতে সেঁটে দিয়েছে পেটে-পিঠে। আরও বহু সমীক্ষাজাত সম্মার্জনী মন্তব্য হলুদ ও লিলুয়া। ‘ভারতবিদ্বেষ’ প্রকাশিয়া পার পাইবেন আমাদের জীবদ্দশায়, শাফিন কিংবা শাহেনশা আলামপনা আপনে যে-ই হউন, এইটা না-মুমকিন।

নগদে বেশকিছু ক্ষয়ক্ষতি শাফিনের হলেও হতে পারে, যদিও তিনি বিবৃতি দিয়াছেন তার কোনো মূর্তিজনিত অথবা আর্থিক-সাংগীতিক ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই মর্মে, দেখোয়াড় হিশেবে আমাদের প্রোফিট হয়েছে ষোলোআনা। আমরা দেখেছি যে ভারতের ব্যাপারে ব্যক্তিক পর্যায় থেকে কেউ কথা বললেও সেইটা ভারতবিদ্বেষ বলিয়া গণ্য হয়। কিন্তু উগান্ডা বা আরবামিরাত বা আফ্রিকা বা অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তান বা পাকিস্তান নিয়া আমরা যা-ইচ্ছা-তা বলিয়া যাইলেও উহা সংশ্লিষ্ট সেই দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বলিয়া গ্রাহ্য নয়। নিজেদের মধ্যে, দ্যাট মিন্স ভারত-বাংলাদেশ মধ্যে, ব্যাঁকাত্যাড়া বাতচিত পার্মিসিবল্ নয়। দেখেছি যে প্রেশারটা আসে মেইনলি নিজেদের ভিতর থেকেই, মানে দেশের সঙ্গে একমাত্র প্রতিবেশী প্রিয়তমার কথিত ‘সৌহার্দ্যসদ্ভাব’ বজায় রাখিবার ঠিকাদারবর্গ মূল প্রেশারগ্রুপের কাজ করেন, নিখর্চা দালালের সহযোগিতা ভারত পেয়ে আসছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়লগ্ন হইতে। এরও অনেক ঐতিহাসিক-স্বভাবনৈতিক-মনৌপনিবেশিক কারণ রয়েছে, এই নিবন্ধে সেসব কারণদর্শানো প্রসঙ্গ না। দালালি প্রোফেশন নিয়া আমার কোনোই ইনহিবিশন নাই। কিন্তু আমি চাই আমার দালালির কিমৎ চুকিয়ে সেবায়েত হইবার সুযোগ দেয়া হউক আমারে।

এই পুরা সার্কাসটার মধ্যে, রূপম-শাফিন সার্কাসটার মধ্যে, একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে দেশপ্রেমে আমরা সেই লিবিয়ার জঙ্গলের মামদো ভূতেরও অধম রয়ে গেছি। কোথাকার কোন তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যক্তি রূপম বা প্রসেনজিৎ বাংলাদেশকে ‘নব্যপাকিস্তান’ বলল বা ‘বিড়াল’ বলল আর আমরা সেইটাকে নিয়া ভারতের গোটা ডিপ্লোম্যাটিক পলিসি ভাবিয়া আন্দোলিত হইবার জোশ ও জজবা বোধ করতে থাকিলাম। তদ্রুপ এই নিবন্ধকার যদি ইন্ডিয়া নিয়া বাপান্ত-মাতান্ত বকাবাদ্যি দিয়া শাপান্ত করে জনৈক মহাভারতীয়রে, এর মানে এ নয় যে ভারতপ্রশ্নে এহেন একাব্যক্তিক অথবা গোষ্ঠীবদ্ধ বকাবকিই বাংলাদেশরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান। এইগুলো দিয়া রাষ্ট্রীয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হয় না। ব্যবসাগত সমতা ও সুষম স্বার্থবিনিময় ছাড়া পরিণত মনস্ক-দেহস্ক দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত ও চলনসই রাখার বিকল্প কোনো উপায় আমার জানা নাই।

Albums of Miles

নিছক নৌটঙ্কিপনা বা খেলাধুলার মারামারি দিয়া আদিকালে দামামা বাজানো সম্ভব হইলেও বর্তমানে মামলা অতটা চাইল্ডিশ নয় মনে হয়।  ইন্ট্রেস্টিং যে, এইধারা সার্কাসে একটা পৃথক রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান বেচারাকে গালি হিশেবে ব্যবহার করছে যে দুই মায়ের পেটের ভাই, দ্বন্দ্বসমাস শাফিন-রূপম তথা বাংলাদেশ-ভারত, একজন গালি খেয়ে তেলেবেগুনে ফুঁসছে ফের আরেকজন গালি দিয়ে নিজের দেড়আংলা কাম প্রশমিত করছে, এর মাঝখান দিয়া পাকিস্তান মিয়ারে শিষ্টাচারবহির্ভূত অপমান করা হচ্ছে সেইটা কেউ লক্ষ করছে না। মাঝখান থেকে বেবাক বিষয়াশয়ে বাইন্যারি-অপোজিশনতৃপ্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানবোধ প্রকাশ্য দিবালোকে ন্যাংটো ধরা খাচ্ছে। একেবারেই ইম্যাচিয়্যুর মামলাটা, — বাল তো গজায়ই নাই, নুনুও ঘুঙুরপরানো।

তবে কি প্রীতিভাজন রইবা তুমি ইন্ডিয়া ঠাকরুনের? যতদূর পর্যন্ত অ্যাফোর্ড করা যায় প্রীতিভালোবাসা, ফাইন; কিন্তু আদাজল খেয়ে, চোখ-মাথা নুইয়ে, শ্যামপ্রীতি নিরন্তর বজায় রেখে যাবার ধনুর্ভাঙা পণ প্রারম্ভে করে বসে থাকা আখেরে বেক্কলের কারবার। দুইটা দেশের সম্পর্ক কেমন, পরিণত না অপরিণত, বুঝতে হয় বার্গেইন বা দরকষাকষি দেখে। সেইটা যা-কিছুই হোক, ইশ্যু যা-ই হোক, দরকষাকষির দক্ষতা বা দখল দেখেই একে অন্যের সমীহ তথা পারস্পরিক সম্ভ্রম আদায় করে। এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তো পরিণত নয়ই, উপরন্তু নুয়ানো। ভক্তিমূলক বন্ধুত্বের। ভক্তরা খানিক দেশাত্মবোধক না-হইয়া মানসম্মান বাঁচাইবার, প্রেস্টিজ পাংচারের কেলেঙ্কারি হইতে বাঁচিবার, উন্নত পন্থা নাই দ্বিতীয়। সো, সুন্দরবন নিয়া আস্তে কথা বলো, টিপাই নিয়া আলাপ তুলিও না, ফারাক্কা হ্যাজ্ গ্যন্ উইথ দ্য উইন্ড, ক্যুয়িক রেন্টাল খদ্দের হইয়া বাঁচো, ট্র্যানজিট নিয়া নাতিপুতিরা আদায়-উশুলে নামব বোধহয়। এবং রোহিঙ্গা ইশ্যুতে ইন্ডিয়ার বিগব্রোসুলভ বদমায়েশি চাক্ষুষ করিয়া বালিকা বাংলাদেশ অভিমানাহত খাজুল নয়নে বন্ধুর পানে চাইয়া থাকো, মুখে রা কাড়বার নাই উপায়। ক্যেই স্যেরা স্যেরা।

ব্যাটিং-বোলিং নিয়া বাচিক যুদ্ধে ব্যাহত হয়ে বেফায়দা ফেসবুকিশ ক্রিকেটবোদ্ধা জাতির উপহাস কুড়াইয়া লইও না, পারলে খেলামাঠে ব্যাট-বল্ করো উস্তাদ! ওইটার জন্য লোক আছে, তারে তার কাজটুকু করে যেতে দাও। ফোক আর রাগা ফেস্টে বাত্তি জ্বালাইয়া ভারতীয় মরাহাঁজা গাইয়েদেরে আনো অসুবিধা নাই, কিন্তু তার আগে ক্যাল্কুলেইট করে দ্যাখো তোমার ঘরে আগত অতিথিদের সামনে তোমার সন্ততিদের কয়জন গাইবার চান্স পাবে; রেশিয়ো মনমতো না-হলে রূপমের রাস্তা ধরো, ভারতের বা অ্যামেরিকার বা আদ্দিসআবাবার আগ্রাসন ঠেকাও। বন্ধুত্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক-রকম, আচরণ বিবেচনায়, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেক। কথাটা জানো না তা নয়, জানো তুমি, কিন্তু ভারতক্ষেত্রে পাশরিয়া যাও কেন সোনামন? পরিণত বোধবুদ্ধির রাষ্ট্র গড়ে তুলতে বিয়িং অ্যা বাংলাদেশী দিস্ ইজ্ য়্যুর দৈশিক দায়িত্ব।

A step Farther by Miles

শোনো, দুনিয়ায় আল্লা সবাইরে সবকিছু দিয়া পাঠায় না। হাসিল করিয়া লইতে হয়। কেউ কম কেউ বেশি, নিজের কিছু-না-কিছু থাকে যেইটা আইডেন্টিফাই করে সেরে পরে এগোতে হয়। ব্র্যান্ডিং দরকার। প্রোমো দরকার। অনেককিছুই ছিল তোমার, যা আক্কেলদোষে বেখেয়ালে তোমার মিত্রশক্তি নিয়ে গেছে শিশিরশিকারের ন্যায় আলতো চরণে, প্যাটেন্ট করে নিয়েছে নিজনামে নিম থেকে শুরু করে ঘোড়ামুত্রা আর চুত্রা পাতাটাও, তুমি তখন কীর্তনবিভোর ঘুমাচ্ছিলে। এখনও তোমার ঘুম ভাঙবে না, হায়! ব্যান্ডের গানে, রকমিউজিকে এতদঞ্চলে, বাংলাদেশ মধ্য-নব্বই পর্যন্ত উন্নত ছিল; — কথাটা সাম্প্রতিক সার্কাসকালীন অনেককেই বলতে শোনা গেল, অংশত সত্য হলেও অধিকতর সত্যের খাতিরে বলা কর্তব্য যে সেই উন্নতির পরম্পরা আজও অব্যাহত। বর্তমান দুইহাজার-ষোলো সনে এবং নিকটভবিষ্যতের সতেরো-আঠারোয়, যে-কয়টা ব্যান্ড একনিশ্বাসে ভালো চিহ্নিত হবে বাংলাদেশে, — একবিংশদিনের ব্যান্ড সবাই, — একব্যক্তির কররেখায় সেগুলো গুনে কুলনোর নয়। লিস্টি দিচ্ছি না। টাকাপয়সা বাগাইতে পারলে, ইন্ডিয়ান স্টেট ব্যাংক বা অ্যাম্ব্যাসির কাছ থেকে, একটা রিসার্চ প্রোজেক্ট লঞ্চ করতে পারেন আপনি নিজেই।

কিন্তু শুরু করেছিলাম স্যামুয়েল জন্সন দিয়া। মানে একটা এপিগ্র্যাফ কোট-আনকোট ঝুলন্ত রচনাসূচনায়। শেষেও শুরুর রেশ রাখি একটু? হুমায়ুন আজাদ একটা কবিতা লিখেছিলেন তার অন্তিম কাব্যগ্রন্থের আগের কাব্যগ্রন্থে, ‘দেশপ্রেম’ সেই কবিতার নাম, কবিতাবইয়ের নাম ‘কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’; জন্সন রয়েছেন সেই কবিতা জুড়ে, স্যামুয়েল জন্সন এবং প্রোক্ত এপিগ্র্যাফ তার, সেই কবিতাটা আস্ত পড়ে ফেলি ফিরে একবার ফের উদ্ভট উটের পিঠে চেপে দেশভ্রমণ করতে করতে।

আপনার কথা আজ খুব মনে পড়ে, ডক্টর জনসন।
না, আপনি অমর যে-অভিধানের জন্যে, তার জন্যে নয়, যদিও আপনি
তার জন্যে অবশ্যই স্মরণীয়। আমি অত্যন্ত দুঃখিত তার জন্যে
আপনাকে পড়ে না মনে। আপনাকে মনে পড়ে, তবে আপনার
কবিদের জীবনীর জন্যেও নয়, যদিও তার জন্যেও আপনি অবশ্যই
স্মরণীয়। আমি আবার দুঃখিত, ডক্টর জনসন। আপনার কথা মনে পড়ে
সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে; আপনার একটি উক্তি আমার ভেতরে বাজে
সারাক্ষণ। আড়াই শো বছর আগে একবার আপনার মুখ থেকে
বের হয়ে এসেছিল একটি সত্য যে দেশপ্রেম বদমাশদের
শেষ আশ্রয়। আপনার কাছে একটি কথা জানতে খুবই
ইচ্ছে করে স্যামুয়েল জনসন; — কী ক’রে জেনেছিলেন আপনি
এই দুর্দশাগ্রস্ত গ্রহে একটি দেশ জন্ম নেবে একদিন,
যেখানে অজস্র বদমাশ লিপ্ত হবে দেশপ্রেমে? তাদের মনে ক’রেই কি
আপনার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল এই সত্য?
ডক্টর জনসন, আপনি আনন্দিত হবেন জেনে যে বদমাশরা
এখানে দেশের সঙ্গে শুধু প্রেমই করছে না, দেশটিকে
পাটখেতে অলিতেগলিতে লাল ইটের প্রাসাদে নিয়মিত করছে ধর্ষণ।

বর্তমানে ফেসবুকে দেশপ্রেমবাহার দেখে এই কবিতার প্রণেতা আজাদ এবং কবিতায় স্মৃত ডক্টর জন্সন উভয়েই কী ভিমরি খেতেন না? যার যা কাজ সে তা না করে স্রেফ ফাঁপা বুলি আওড়ায়ে যেয়ে ভাবছে অ্যাক্টিভিস্ট বনে গেছে ব্যাপক। কথায় কথায় স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়াশীলতা ছাড়া আজ আর ক্রিয়া নাই কোনো। বর্তমান বাংলায় নিউটনের তৃতীয় ফর্মুলা ছাড়া আর কোনো সূত্রানুসূত্রের চর্চা হারাম ফোঁটাটাও গরহাজির বস্তুত। তুমি মিডিয়াবাহিত ঘটনায় ইম্প্রেসড হয়ে মারদাঙ্গা স্ট্যাটাস দিচ্ছ না মানেই হচ্ছে তুমি বিপক্ষ ষণ্ডা দাগের ধামড়ার ছাপ্পা লভিয়াছ। পরক্ষণে ফের আরেক ইশ্যু তুমি অ্যাড্রেস্ করলেই স্বীয় বোধবুদ্ধিচিন্তা পাব্লিশের কারণেই বিরাগভাজন হয়ে যাচ্ছ দেশপ্রেমপাইকারদের। এই মিডিয়েভ্যাল্ মদ্দা-মাদিদের দেশপ্রেমঠাপে একটুকু চুপ করবি তুই, দোহাই, দিবি মোরে অবসর ভালোবাসিবারে?

… …

COMMENTS

error: