শাহ আবদুল করিম ও তাঁর মদনমাঝির সুলুক সন্ধান || মুহাম্মদ শাহজাহান

শাহ আবদুল করিম ও তাঁর মদনমাঝির সুলুক সন্ধান || মুহাম্মদ শাহজাহান

বর্ষাকালে যতদূর চোখ যায় চারদিকে শুধু পানি আর পানি; নদী-নালা, খাল-বিল সব পানিতে একাকার। গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে-চলা ছোট নদী কালনী; নদীর ওপারে বিশাল হাওর বরমা। ভরাবর্ষায় হাওরের বিশাল পেটে বিলীন হয়ে গেছে নদী; তার আলাদা কোনো অস্তিত্ব আজ চোখে পড়ে না। দিগন্তে কালো রেখার মতো দৃষ্টিগোচর হয় পানিতে ভাসমান হাওরের ওপারের ছোট ছোট গ্রামগুলো, যদি দিনের আবহাওয়া থাকে বৃষ্টিমুক্ত আর রৌদ্রোজ্জ্বল। ঝিরঝির বাতাসে হাওরের পানিতে ছোট ছোট ঢেউয়ের সারি; সূর্যের আলোর প্রতিফলনে ঢেউয়ের উপর তৈরি করছে রূপালি ঝিলিক। এ যেন শান্ত-স্নিগ্ধ হাওরের অনন্য এক অপূর্ব রূপ। এদিক-ওদিক থেকে হাওরের বুকে চলে কতশত নায়ের আনাগোনা। হাওরের অপূর্ব রূপবৈচিত্র্যের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে এগিয়ে চলে নাও, তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। একসময় হারিয়ে যায় দৃষ্টিসীমার বাইরে, কোনো-এক অজানা দূর দিগন্তের পানে।

বর্ষাকালে আফালের প্রচণ্ড বৃষ্টিবাদলের দিনে হাওরের আরেক রুদ্র রূপ; দেখে মনে হবে সামনে দিগন্তবিস্তৃত এক সমুদ্র। এসব দিনে দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল গতিতে প্রবাহিত হয় মৌসুমী বায়ু; হাওরের বুকে জন্ম নেয় বিশাল বিশাল উথাল ঢেউয়ের সারি। যেন মুহূর্তে গিলে ফেলবে হাওরের বুকে ভাসমান ছোট ছোট সব নাও। ভয়ে আতঙ্কিত মাঝিমাল্লাদের এদিক-ওদিক ছোটাছুটি; যার যার নাও বাঁচানোর সে-কী প্রাণপণ চেষ্টা! এদিকে ঢেউয়ের পর ঢেউ প্রচণ্ড আক্রোশে আছড়ে পড়ে হাওরপাড়ের গ্রামে; মনে হয় তার পাড়ে গড়ে-ওঠা জনবসতিকে তছনছ করে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। সেইসব দিনে প্রকৃতির সন্তান মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু গাছগাছালির তৈরি প্রতিরোধব্যবস্থাই ভরসা; বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো ঢেউয়ের হাত থেকে জনবসতিকে রক্ষার জন্য সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে হিজল-করচের প্রাকৃতিক দেওয়াল।

প্রত্যন্ত ভাটিঅঞ্চলে কালনী নদীর পাড়ে গড়ে-ওঠা গ্রাম উজানধল; ছনে-ছাওয়া ছোট একখান কুঁড়েঘর, যেখানে ঘরের সামনে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে বর্ষার কালনী নদী আর বরমার হাওর। নিরবে-নিভৃতে বর্ষাকালের পানিবন্দি গ্রামে নিজ কুঁড়েঘরের দাইড়ে (বারান্দায়) বসে গভীর ভাবনায় মগ্ন নিভৃতচারী এক মহান ভাবুক; সামনে তাঁর দিগন্তবিস্তৃত হাওরের বিশাল জলরাশি। তাঁর ভাবনার শেষ নেই; গরিবের ঘরে জন্ম, নেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, নেই দীক্ষা। বেঁচে থাকার জন্য চাই দু-মুঠো অন্ন, সে-সম্বলও যে তাঁর নেই। শত সমস্যা নিয়ে যার জন্ম, তাঁর মনের ব্যথাবেদনা-দুর্বলতার কি আর শেষ আছে? একসময় শত সমস্যা, দুর্বলতা আর ব্যাকুলতা নিয়ে মহান ভাবুক গেয়ে উঠেন —

মনের দুঃখ কার কাছে জানাই মনে ভাবি তাই
দুঃখে আমার জীবন গড়া তবু দুঃখরে ডরাই।।

গরিবকুলে জন্ম আমার আজও তা মনে পড়ে
ছোটবেলা বাস করিতাম ছোট্ট এক কুঁড়েঘরে

দিন কাটিত অর্ধাহারে রোগে কোনো ঔষধ নাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই।।

একসঙ্গে জন্ম যাদের তেরোশ’ বাইশ বাংলায়
আনন্দে খেলে তারা ইস্কুলে পড়িতে যায়

আমার মনের দুর্বলতায় একা থাকা ভালা পাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই।।

মহান ভাবুকের মনের দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয় নিরবে-নিভৃতে একা থাকার ভালোলাগা; তাই হয়তো-বা বর্ষার পানিবন্দি সময়টাতে বসে থাকেন নিজ কুঁড়েঘরের দাইড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকেন গভীর ভাবনায়; ধীরে ধীরে তাঁর ভাবনা আরো প্রসারিত হয়, তেমনি হয়ে ওঠে আরো গভীর। কখনো উপভোগ করেন বর্ষার পানিতে পরিপুষ্ট হাওর-বাওরের অনন্য এক রূপবৈচিত্র্য; একসময় তাঁর তীক্ষ দৃষ্টি প্রসারিত হয় হাওরের বুকে। দেখতে পান বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন দিকে ছুটে-চলা ভিন্ন আকার-আকৃতির, ভিন্ন রং ও রূপের নৌকা কিংবা ‘নাও’।

একসময় মহান ভাবুকের অন্তর্দৃষ্টিতে সামনের শুধু বরমার হাওরটাই নয় পৃথিবীটাই রূপ পরিবর্তন করে হয়ে ওঠে ভবসাগর; যে-সাগরের বুকে বিভিন্ন আকার-আকৃতির, রঙবেরঙের, পালতোলা, দাড়টানা কিংবা কদাচিৎ মাঝিমাল্লাবিহীন মানুষ নামের ছোট ছোট ‘নাও’ ছুটে চলেছে দিগ্বিদিক। দেখতে নায়ের মতো হলেও সেগুলো সাধারণ নাও নয়; মহান ভাবুক সে-নায়ের নাম দিলেন ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’। তিনি নিজেকে কল্পনা করেন একটি ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ হিসেবে; ছুটে চলেছেন কোনো-এক অজানা গন্তব্যে!

আবার গভীর ভাবনায় ডুবে যান মহান ভাবুক; নিজেকেই প্রশ্ন করেন  — কবে, কীভাবে এই ভবসাগরে ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামের অগণিত নায়ের আনাগোনা? নাও বানানোর মহাজন, মিস্তরি কিংবা কারিগরই-বা কে? সে-নায়ের মাঝি কিংবা মাল্লারাই-বা কারা? গন্তব্যই-বা কোথায়? এই যে ভবসাগরে ময়ূরপঙ্খী নায়ের ছুটে চলা, যেন কারো দিকে কারো চাওয়ার ফুরসৎ নেই; কে কিভাবে তার নাও নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে সেটাই বড় কথা। গন্তব্যে ছুটে চলার পথে কেউ জারি-সারি গায়, কেউ সুখের আর কেউ বিরহরে গান ধরে, আবার কেউ চুপচাপ শুধুই ছুটে চলে; কেউ ধীরে, কেউ দ্রুতগতিতে, কেউ চোখের পলকে। ছুটে চলার পথে কেউ-বা হারায় পথ, কেউ হারায় শক্তি, কেউ হারায় দিশা, কেউ হারায় লক্ষ্য : কারো ময়ূরপঙ্খী নাও হয়তো-বা পথেই ডুবে যায় অকালে, অসময়ে। এতসব ভাবতে ভাবতে তাঁর মনের গভীরে জন্ম নেয় কল্পিত ‘ময়ূরপঙ্খী’ নায়ের রূপে নিজেকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন; আর নিজেকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। একসময় মহান ভাবুক ভবসাগরের সীমাহীন দূরদিগন্তের অজানা-অদৃশ্য গন্তব্যের দিকে চেয়ে নিজের মনে গেয়ে ওঠেন —

কোন মিস্তরি নাও বানাইলো এমন দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

চন্দ্র-সূর্য বান্ধা আছে নায়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝিমাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

রঙবেরঙের কত নৌকা ভবের তলায় আয়
রঙবেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

জারি গায়, ভাটি বায় করতাল বাজায়
মদনমাঝি বড়ই পাঁজি কত নাও ডুবায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

হারাজিতার ছুবের বেলা কার পানে কে চায়?
মদনমাঝি হাল ধরিয়ো ঈমানের বৈঠায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

বাউল আবদুল করিম বলে বুঝে উঠা দায়
কোথা হতে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়।।

একসময় মহান ভাবুকের অন্তর্দৃষ্টি আরো গভীরতম হয়; তিনি কল্পনা করেন তাঁর ময়ূরপঙ্খী নায়ের কল্পিত কোনো কারিগর কিংবা মহাজনকে। তিনি ‘আমি’ রূপে দেখতে পান ময়ূরপঙ্খী নায়ের সুজনকাণ্ডারি সেই নিজ সত্তা কিংবা আত্মাকেও। নিজ সত্তা কিংবা আত্মার সাথে একটি কল্পিত সম্পর্কও জুড়ে দেন তিনি সেই মহাজন পরমসত্তা কিংবা ‘পরমাত্মার সাথে। তিনি নির্দিষ্ট করেন, সত্তা তথা আত্মার উৎস সেই মহাজন ‘পরমসত্তা’ তথা ‘পরমাত্মা’। সত্তার কল্পিত একটি গন্তব্যও তিনি নির্দিষ্ট করেন; ময়ূরপঙ্খী নাও নিয়ে সে-সত্তার একমাত্র গন্তব্য সত্তার কল্পিত উৎস তার পরমসত্তার দিকে। মহান ভাবুক কল্পনা করেন — সত্তা কিংবা আত্মা তার বাহন ময়ূরপঙ্খী নাও নিয়ে সঠিক গন্তব্যে অর্থ্যাৎ তার কল্পিত উৎস পরমসত্তা কিংবা পরমাত্মার দিকে পৌঁছার দায়িত্ব অর্পিত করেছে ‘মন’ নামক এক মাঝিকে। এই অজানা আর অচেনা মাঝির দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে তার ময়ূরপঙ্খী নাও। মহান ভাবুক তার ভাবনাকে নিবদ্ধ করেন সেই অজানা আর অচেনা মনমাঝির প্রতি।

মহান ভাবুক শঙ্কিত হয়ে ওঠেন তাঁর মনমাঝিকে নিয়ে; তিনি দেখতে পান তাঁর ময়ূরপঙ্খী নায়ের একেবারে কেন্দ্রে মনমাঝির রহস্যপূর্ণ জটিল অবস্থান আর তার মনোস্তাত্ত্বিক জটিল সব কার্যকলাপ, যেখানে দিনরাত বিরামহীনভাবে ঘটে চলেছে রহস্যপূর্ণ আলো আর আঁধারের লুকোচুরি খেলা। এই মনমাঝিকে জানাটাই যে মানুষের জন্য ভীষণ এক কঠিন কাজ; সেই মনমাঝি আর তার কর্মকাণ্ড জানতে পারলেই কি নিজেকে জানা হয়! মহান ভাবুকের ভাবনাটা আরো গভীরতর হয়। তিনি ধীরে ধীরে মনমাঝির আরো গভীরে পৌঁছতে থাকেন; দেখতে পান মনমাঝির অভ্যন্তরে শক্তিধর মদনমাঝি তথা যৌনশক্তিকে।

Abdul Karimমহান ভাবুক সর্তক হয়ে ওঠেন; তবে তাঁর ভাবনার গভীরতা এবং তীক্ষ্ণতা আরো বাড়তে থাকে। তিনি চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হন ‘মদনমাঝি’ তথা ‘যৌনশক্তি’ দ্বারা সংগঠিত কার্যকলাপ। মূলত মনমাঝি কিংবা তাঁর সহযোগী ‘মাল্লাগণ’ দ্বারা সম্পাদিত সকল কর্মকাণ্ডের উৎস ‘যৌনশক্তি’, যে-শক্তির মধ্যে নিহিত রয়েছে দুটি রূপ — একটি তার ‘আদিম পশুসুলভ শক্তি’ যাকে চিহ্নিত করা যায় ‘কুপ্রবৃত্তি’ হিসেবে, আরেকটি ‘মনুষ্যসুলভ শক্তি’ যেটিকে চিহ্নিত করা যায় ‘সুপ্রবৃত্তি’ হিসেবে। মহান ভাবুক দেখেন, ‘মনুষ্যসুলভ শক্তি’ বা ‘সুপ্রবৃত্তি’ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনমাঝি কিংবা তার বাহ্যিক স্বরূপ মানুষের দ্বারা সংগঠিত হচ্ছে বিভিন্ন মনুষ্যসুলভ স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। এমনিভাবে সুপ্রবৃত্তি দ্বারা সম্পাদিত কর্মকাণ্ডের তৎপরতায় একসময় মনমাঝি ও তার ময়ূরপঙ্খী নাও পৌঁছে যাবে তার কল্পিত লক্ষ্যে। মহান ভাবুক প্রত্যক্ষ করেন — মনমাঝিকে তার কর্মকাণ্ড সহজে এবং সুচারুরূপে সম্পাদিত করতে ময়ূরপঙ্খী নায়ে আছে তার কিছু সহযোগী মাল্লা কিংবা ইন্দ্রিয়। ‘সুপ্রবৃত্তি’ দ্বারা চালিত ইন্দ্রিয়গুলোর সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টায় চালিত হচ্ছে মনমাঝির সেই ময়ূরপঙ্খী নাও; গন্তব্য তার কল্পিত ‘পরমাত্মা’ তথা ‘পরমবন্ধুর বাড়ি’।

মহান ভাবুক তার অন্তর্দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত করেন — মদনমাঝি তথা যৌনশক্তির আরেক ভয়ঙ্কর কদর্য রূপ আদিম পশুসুলভ কুপ্রবৃত্তির প্রতি। তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, কুপ্রবৃত্তিই মনমাঝি ও তার ময়ূরপঙ্খী নাও তথা মানুষের ধ্বংসের জন্য একমাত্র দায়ী। মনমাঝির সামান্যতম কোনো অসতর্কতা কিংবা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ‘কুপ্রবৃত্তি’ ঝাঁপিয়ে পড়ে মনমাঝির সহোযাগী মাল্লা তথা ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর; প্রকৃতিগতভাবে কুপ্রবৃত্তির দ্বারা অতি সহজেই প্রভাবিত হয় ইন্দ্রিয়গুলো। সে কৌশলে প্রভাবিত করে তাদের চালিত করে কুপথে, তাদের দ্বারা সম্পাদিত করে নেয় আদিম পশুসুলভ কোনো ‘কু-কাম’। এভাবেই মনমাঝি তথা মানুষের মন ধীরে ধীরে হয়ে পড়ে কুপ্রবৃত্তি দ্বারা চালিত ইন্দ্রিয়ের দাস; মনমাঝি নিজেকে সমর্পিত করে মদনমাঝি কিংবা তার থেকে উৎসারিত কুপ্রবৃত্তির কাছে। একসময় মনমাঝি ও তার ময়ূরপঙ্খী নাও হারিয়ে ফেলে তার দিশা, সুদূরপরাহত হয়ে পড়ে তার কল্পিত সঠিক গন্তব্যে পৌঁছা। তাই মহান ভাবুক তাঁর নিজ মন কিংবা মনমাঝিকে স্বগতোক্তি করে গেয়ে ওঠেন — ‘মদনমাঝি বড়ই পাঁজি কত নাও ডুবায়’।

মহান ভাবুকের আর বুঝতে বাকি থাকে না তাঁর ময়ূরপঙ্খী নায়ের ভবিষ্যৎ; তাঁর কল্পিত ‘রঙ্গিলা বন্ধুর বাড়ি’ কিংবা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাটা নির্ভর করে মনমাঝি তথা তার শক্তির উৎস মদনমাঝির ওপর। শক্তিধর মদনমাঝি ও তার সুপ্রবৃত্তি ব্যবহার করে মনমাঝি তার ময়ূরপঙ্খী নাওকে চালিত করতে পারে কল্পিত ‘রঙ্গিলা বন্ধুর বাড়ি’ পৌঁছার সঠিক পথে। আবার সেই মদনমাঝি ও তার কুপ্রবৃত্তির প্রভাবে ময়ূরপঙ্খী নাও চালিত হতে পারে ভুল পথে। এমন ঘটলে কখনো মানুষরূপী ময়ূরপঙ্খী নায়ের পৌঁছা হবে না তার কাঙ্ক্ষিত সঠিক গন্তব্যে কিংবা স্থির লক্ষ্যে। মহান ভাবুক এক সময় গেয়ে ওঠেন — ‘মদনমাঝি হাল ধরিয়ো ঈমানের বৈঠায়’, অর্থাৎ মদনমাঝির উপর তিনি আস্থা রাখেন; তবে তার হাতে তিনি তুলে দেন ‘ঈমানের বৈঠা’।

মহান ভাবুক বুঝে নেন মদনমাঝি ছাড়া যে তাঁর নাওখানাও অচল। ময়ূরপঙ্খী নায়ের হালের দায়িত্ব যে তারই হাতে; শক্ত হাতে হাল ধরে সে-ই তো তাঁকে পৌঁছে দেবে তাঁর স্থির লক্ষ্যে, সঠিক গন্তব্যে। লক্ষণীয়, মহান ভাবুক এখানে হালের বৈঠাকে সযত্নে রূপান্তরিত করেছেন ঈমানের বৈঠায়। ঈমান তথা বিশ্বাস শব্দ দ্বারা তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন তাঁর সেই সুপ্রবৃত্তিকে? — ইতোমধ্যে যে-সুপ্রবৃত্তির উপর তাঁর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছে অগাদ বিশ্বাস আর আস্থা! সুপ্রবৃত্তির প্রভাবে তিনি তাঁর মনমাঝিকে নিজ সত্তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন!

মহান ভাবুক সেদিকেও তার ভাবনাকে সম্প্রসারিত করেন। তিনি তাঁর মন বা মনমাঝিকে নিয়ন্ত্রণে একনিষ্ঠ সাধনায় মগ্ন হন; মনোযোগী হয়ে ওঠেন তাঁর মন এবং ইন্দ্রিয়ের প্রতি। তিনি বুঝতে পারেন সুপ্রবৃত্তি দ্বারা ইন্দ্রিয়কে পরিচালিত করতে পারলেই মনটাও যে সুপথে ধাবিত হয়। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর কর্তব্য ঠিক করে ফেলেন — সুপ্রবৃত্তিকে আরো সমৃদ্ধ, আরো উৎকৃষ্ট, আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে; যাতে ধীরে ধীরে মদনমাঝির মধ্যে নিহিত সুপ্রবৃত্তিই একসময় শক্তিমান হয়ে ওঠে। সেই শক্তিমান সুপ্রবৃত্তি দ্বারাই তখন চালিত হবে ইন্দ্রিয়গুলো। সুপ্ত কুপ্রবৃত্তি একসময় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাবে। কুপ্রবৃত্তি আর কখনো সহজে মনমাঝিকে ফাঁকি দিয়ে তার ময়ূরপঙ্খী নাওকে কুপথে চালিত করতে পারবে না। পরিশেষে মহান ভাবুক তাঁর ‘মনমাঝি’ তথা সুজন কাণ্ডারিকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে গেয়ে ওঠেন —

তুমি সুজন কাণ্ডারি নৌকা সাবধানে চালাও
মহাজনে বানাইয়াছে ময়ূরপঙ্খী নাও।।

বাইছা বাইছা পাইক তুলিয়া নাওখানা সাজাও
যুগ বুঝিয়া ছাড়ো নৌকা সুযোগ যদি পাও।।

অনুরাগের বৈঠা বাইয়া প্রেমের সারি গাও
রঙ্গীলা বন্ধুর দেশে যাইতে যদি চাও।।

বাউল আব্দুল করিম বলে বুইঝা নাওয়ের ভাও
লক্ষ্য ঠিক রাখিয়া বাইয়ো যাইতে সোনারগাঁও।।

এখানে লক্ষণীয় যে, মহান ভাবুক তার ‘মনমাঝি’ তথা সুজন কাণ্ডারিকে সাবধানী, সত্যসন্ধানী এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতি একাগ্র হতে নির্দেশ করেন; সর্বোপরি যে-বিষয়টির প্রতি তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বা আরোপ করেন সেটি হলো — ময়ূরপঙ্খী নায়ে সহযোগী হিসেবে আরো কিছু উৎকৃষ্ট, একনিষ্ঠ ‘পাইক’ বা ‘মাল্লা’ তুলে নেওয়া। যাদের দ্বারা ময়ূরপঙ্খী নাওখানা আরো সমৃদ্ধ হবে, আরো মনোরমভাবে সজ্জিত হয়ে উঠবে। সেই পাইক বা মাল্লা কারা হতে পারে কিংবা তাদের স্বরূপই বা কি তাও তিনি নির্দিষ্ট করেছেন ‘অনুরাগ’ আর ‘প্রেম’ শব্দ দ্বারা। মানুষের অর্জিত সঠিক-সুস্থ জ্ঞানই জন্ম দেয় মানবমননে রাগ-অনুরাগ আর প্রেম-ভালোবাসার। প্রকৃত জ্ঞান জন্ম দেয় — সুবুদ্ধি, সুচিন্তা, সুবিবেচনা ও সুকর্ম। মানুষ হয়ে ওঠে আরো জ্ঞানী, সৎ, মানবিক, নান্দনিক, সৃষ্টিশীল, প্রেমিক, সাবধানী, সুকৌশলী ও সুবিবেচক এবং সর্বোপরি সুমানুষ হিসেবে। এতসব সদগুণাবলিসমৃদ্ধ সুমানুষের মধ্য থেকেই কেউ কেউ পরিচিতি পান ‘মহামানব’ হিসেবে। তাই মহান ভাবুক নির্দেশ করেন, সদ্বগুণাবলিসম্পন্ন সুকুমারবৃত্তিগুলোই হবে তাঁর ময়ূরপঙ্খী নায়ের সহযোগী পাইক তথা মাল্লা। এতসব গুণের মাঝিমাল্লার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ ময়ূরপঙ্খী নাও তথা এতসব গুণের অধিকারী সুমানুষের পক্ষেই সম্ভব তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কিংবা মহান ভাবুকের সেই কল্পিত ‘রঙিলা বন্ধুর বাড়ি’ পৌঁছা।

প্রকৃতির সন্তান মানুষ, তার জন্ম প্রকৃতিতে, বেড়ে ওঠাও প্রকৃতিতে; আর জীবনের সমাপ্তিও ঘটে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে। প্রকৃতির নিয়মে মানুষ জন্মগতভাবে একটি বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়, সেটা হলো তার ‘চিন্তাশক্তি’। এই চিন্তাশক্তিই মানুষকে দিয়েছে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও পরিচিতি। ‘চিন্তাশক্তি’ কাজে লাগিয়ে মানুষ প্রকৃতি থেকে আহরণ করে জ্ঞান। অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে মানুষ নিজেকে গড়ে তুলেছে বুদ্ধিমান, কৌশলী ও শক্তিশালী প্রাণী হিসেবে।

সেই আদিকাল থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে মানুষ নির্ভর করেছে তার অর্জিত জ্ঞান তথা বুদ্ধির প্রতি। তাকে দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে যেমন এগিয়ে আসেনি কোনো অদৃশ্য শক্তি, তেমনি বিপদের সংকেত জানাতে আসেনি কোনো দৈববাণী। আদিকাল থেকে মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও শক্তি তাকে যুগিয়েছে সাহস, দেখিয়েছে সঠিক পথ। জ্ঞানই একসময় তাকে করে তুলেছে নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল; মানুষ হয়ে উঠেছে আরো মানবিক, সর্বোপরি সুমানুষ হিসেবে। মেধা ও মননে মানুষ পৌঁছেছে আজ উৎকর্ষতার চরম শিখরে। তাই হয়তো-বা প্রকৃতির সন্তান মহান ভাবুক তাঁর নিজের সত্তার প্রতি আরোপ করেননি কৃত্রিম কোনো নিয়মনীতি; প্রয়োজন বোধ করেননি প্রথাগত কোনো মতবাদের। তাই তিনি তাঁর আরেকটি গানে নিজের অভিব্যক্তি এভাবেই প্রকাশ করেন —

তন্ত্র-মন্ত্র করে দেখি তার ভিতরে তুমি নাই
শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ি যত আরো দূরে সরে যাই।

মহান ভাবুক ভালো করেই জানতেন কৃত্রিম কোনো নিয়মনীতি কিংবা প্রথাগত মতবাদ কোনোভাবেই কালউত্তীর্ণ হতে পারে না; তেমনি প্রকৃতিগত কারণে সকল মানুষের জন্য সেইসব রীতিনীতি সমভাবে গ্রহণযোগ্যতাও পায় না। তাই তিনি তাঁর অর্জিত জ্ঞান, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার উপর স্থাপন করতে পেরেছিলেন অপরিসীম আস্থা ও বিশ্বাস।

বাংলা ভাদ্র মাসের নবম দিনে এই মহান ভাবুক বাউল শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুদিবস; ১৪১৬ সনের ৯ ভাদ্র তাঁর ‘সত্তা’ ইহজগতের বাহন ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ ত্যাগ করে ‘পরজগৎ’ তথা তাঁর কল্পিত ‘রঙিলা বন্ধুর বাড়ি’ পৌঁছার অজানা-অচেনা গন্তব্যে পাড়ি জমায়। জানি না সেই মহান ভাবুকের ‘সত্তা’ তাঁর কল্পিত ‘রঙিলা বন্ধুর বাড়ি’ পৌঁছাতে পেরেছে কি না! তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, তিনি তাঁর ময়ূরপঙ্খী নাওখানা সাজিয়েছিলেন উৎকৃষ্ট সব মাঝিমাল্লা তথা মানবিক, নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল গুণাবলি দিয়ে; তাই তিনি তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য রেখে যেতে পেরেছেন কালউত্তীর্ণ কিছু সৃষ্টি। অন্তর দিয়ে যখন তাঁর সৃষ্টি-করা গানগুলো শুনি, তখন অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে পাই তাঁর কল্পিত ময়ূরপঙ্খী নাওখানা; যা আজও ঝিলমিল ঝিলমিল করে ভেসে বেড়াচ্ছে ভবসাগরে। দূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসে তাঁর সেই বিখ্যাত আবেগভরা গানের ব্যথিত সুমধুর সুর —

কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু, ছেড়ে যাইবা যদি …

… …

COMMENTS