‘ওটা হয়ে গেছে’

‘ওটা হয়ে গেছে’

তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত।

বিদ্যুতানুপস্থিতির সুবাদে কি-করা-যায়-কি-করি ইতস্ততভাবে বইতাকের পুরনো চটিচিকন বইগুলো টেনে টেনে দেখছিলাম, মলাট ইত্যাদি মূলত, তখনই ভিতরকোণ থেকে এল উঠে একটি জীর্ণ-ঝরোঝরো দশার হলদেটে পেপারব্যাক। বহুকাল আগের, গ্রন্থপ্রকাশতথ্য চোখ বুলিয়ে ক্যাল্কুলেইট করে দেখলাম বইয়ের লেখক তখনও জীবিত ছিলেন, সম্ভবত ওই সময়েই তিনি নিজে একটি প্রকাশনালয় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন যেখান থেকে বিদেশি ইংরেজি বইয়ের আদল অনুসরণে পেপারব্যাক বাংলাবই ছাপা হবে এবং সর্বসাধারণ-পাঠক-আকর্ষক সুলভমূল্যের বাংলাবইয়ের বাজার গড়ে উঠবে। এইসব ও এর আগের-পরের ইতিহাস আমরা তার নিজের জবানিতে জেনেছি তৎপ্রণীত আত্মজৈবনিক রচনাগুলো থেকে, পেয়েছি তার কল্লোলযুগের সতীর্থদের স্মৃতিনিবন্ধ ও গ্রন্থাদিতে, এখনও ওই বিশেষ সময়পর্ব মশহুর হয়ে আছে বাংলাসাহিত্যে।

বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস রাত রে বৃষ্টি  ইতিউতি নজর বুলিয়ে যেতে যেতে সেই-কবেকার প্রথম-পাঠোত্তর অনুভূতিস্মৃতি মনে পড়ছিল। তখন তো উপন্যাস ছাড়া আর-কিছু পঠনযোগ্য বলে মনেই হতো না। কাহিনিকীর্ণ আমাদের সেই বেড়ে-ওঠা দিনগুলো! কালেভদ্রে মাসে-চান্দে এক-দুইবার ভিসিআর বা সারামাসে চৌদ্দইঞ্চি সাদাকালোয় একটামাত্তর পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি ব্যতীত উপন্যাসেই উজাগর রাত্রি কাটিয়ে এই বৃদ্ধবয়সে এসে পেয়েছি বিচিত্তির বিনোদনোৎস। পেয়েছি, হায়, এই এল-ডোরাডো ব্লগ-ফেসবুক! বলিহারি ইউটিউব!

বলছিলাম বুদ্ধদেব বসু ও রাত রে বৃষ্টি  নিয়ে। এটি তিরিশের দশকে আবির্ভূত আমাদের আদিম আধুনিক লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক শক্তিশালী একজনের হাতে রচিত ও প্রকাশ-সমকালেই তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়াক্রান্ত রচনাগুলোর একটি। খুব-যে মার্গীয় রচনা, তা নয়, বা বুদ্ধদেবের নিজের ম্যাগ্ন্যামোপাসও এটি নয়। এরপরও বলতেই হবে, বাংলা আখ্যানজগতে এই উপন্যাস উল্লেখযোগ্য ঘটনা এক। তৎকালে এটি ব্যান্ হয়েছিল সম্ভবত, অথবা ব্যান্ করার জোর দাবি উঠেছিল, অশ্লীলতার অভিযোগে। এখনও, তৎকালে তো বটেই, আজও এটি একটি বারুদ। ব্যান্ ইত্যাদি হাল্লাগোল্লার কারণে প্রভাবিত হয়ে মুখস্থ সমীহপ্রকাশ নয়, এই বয়সে এসে এখন থম ধরে ভেবে দেখি, কী দুর্ধর্ষ এর ট্রিটমেন্ট! কী আখ্যানবয়নকৌশল! আর বুদ্ধভাষা আমাদেরকে গত কয়েক প্রজন্ম ধরে বুঁদ রেখেছে, এর সুরুয়াস্বাদুতা আর এর ঝর্ণাজলস্বচ্ছতায়, এ নিয়া বাগবিস্তার বাহুল্য। সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্তকর এ-আখ্যানের সূচনাপ্যারাগ্রাফ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে, একেবারেই বিমূঢ় করে ফেলে এর স্টার্টিং। ইংরেজিতে একে বলে, সম্ভবত, অ্যাব্রাপ্ট স্টার্টিং।

প্রথমবার পড়ার সময়, মনে আছে, কেমন ভূমিকম্প হচ্ছিল টের পাচ্ছিলাম। পূর্বনির্ধারিত নৈতিকতা আর আচরিত অভ্যাস, যৌনচৈতন্য, প্রথাভাবনা প্রভৃতি টলে উঠছিল। অসহায় বেদনা, সক্রোধ, হচ্ছিল। পরে, অনেক অনেক বছর পরে, সেই অসহায়তার কারণ সম্পর্কে বেশ-একটা বোঝাপড়া হয়েছে যদিও। তখন, ওই বয়সে, পড়তে পড়তে বা পাঠশেষে এমতো মনে হচ্ছিল যে, এ বুদ্ধদেবের নিজের জীবন নয় তো? উঁকি দিচ্ছিল তখন ওইরকম অন্যায় একটা ভাবনা। অন্যায়, কেননা লেখকের ব্যক্তিজীবন নিয়া যাচ্ছেতাই ভাবতে পারে না পাঠক। ওটা অসভ্যতা। তবু কেমন যেন সন্দেহটা যাচ্ছিল না, রাত রে বৃষ্টিবিধৃত গল্প খোদ বুদ্ধদেবের নিজের জীবনেরই, আজও কি সন্দেহ থেকে রেহাই মিলেছে? কে তবে সে? কাহিনির স্বামীটি? নাকি স্বামীর বন্ধুটি? কিন্তু অন্যায় এই চিন্তা বালখিল্য তো বটে। এহেন সন্দেহের পাল্লায় পড়ে খাবি খেতে হবে উপন্যাসটি পড়তে যেয়ে, যারা বুদ্ধদেবের ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যিকজীবন সম্বন্ধে সম্যক জানেন।

২.
আজকাল যা-কিছুই পড়ি, বিস্মৃত হই অব্যবহিত পরেই, ভুলে যাই পঠিত প্রায় সবই। এটা, আমার মনে হচ্ছে, একটা রোগের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এই অবস্থার অবসান বা উত্তরণ হবে কি না জানি না। অথচ আগে, এই কিছুকাল বছর-কয়েক আগেও, যা-কিছু পড়তাম তার সবই মনে থাকত প্রায়। লাইন-বাই-লাইন না-হলেও, অন্তত চরিত্রচিত্র-গল্পভাগ, বিষয়বস্তুরেখা মনে থাকত। স্বচ্ছ-স্পষ্ট মনে রাখতে পারতাম, সুপরিস্কার পারতাম বলতেও, কোথায় ও কখন কী পড়েছি না-পড়েছি। ইদানীং কেন হেন দুরবস্থা? তার মানে তাহলে এ-ই কি যে, যা-কিছু পড়ি আজকাল তাতে স্মৃতিগ্রাহ্য/স্মরণযোগ্য সারবত্তা কম? না, তা নিশ্চয়ই নয়। কেননা আগে যা পড়তাম তার সবই নিশ্চয় সমস্মরণযোগ্য ছিল না, তা-ও তো সমানভাবেই মনে থাকত। তবে? বয়স বাড়লে বুঝি এমনটাই স্বাভাবিক? হবে হয়তো, কে জানে।

৩.
এইটুকু জরুর মনে আছে যে ওই ‘ওটা’ দেখবার রগরগে প্রবৃত্তিতাড়িত হয়েই জীবনের মাতাল দিনগুলায় রাত রে বৃষ্টি   পড়েছি। কিন্তু ‘ওটা’ দেখাইতে যেয়ে ম্যাসি করে ফেলেন নাই বুদ্ধদেবজি। মিলার বা লরেন্স করে ফেলেন নাই। কিন্তু প্রথম বাক্য ‘ওটা হয়ে গেছে’ থেকেই জিনিশটা বাকি পৃষ্ঠাবলি জুড়ে থেকে গেছে ন্যাপ্থলিনের ঝিমধরা ঘ্রাণের ন্যায় লেগে। একটুও সরব নয়, লাউড হয় নাই মোটেও, অথচ ‘ওটা’ আছে।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

জাহেদ আহমদ

COMMENTS

error: