কবি ও লেখকদের মৃত্যু তো অন্য-দশজন মানুষের মতন অনাড়ম্বর ন্যাচারালভাবেই হয়া থাকে। সেইটা যদি হয় দুর্ঘটনাজাত অথবা আততায়ীর হাতে মৃত্যু, তবুও তো সেইটা স্বাভাবিকই বলতে হবে, এবং ঘটনাটা তা-ই। কিন্তু অন্য সেলেব্রিটির সঙ্গে লেখালেখিলিপ্ত মশহুর লোকদের একটা ফারাক এইখানেই যে, একজন লেখককে/কবিকে তার কাজের বৈশিষ্ট্যের কারণে যেভাবে ব্যক্তিক কামনাবাসনা সহ উপস্থিত পাই খোদ কবির/লেখকের কৃত কাজে/প্রোডাক্টে, একজন অভিনয়কলাবিদ বা বিজ্ঞানী বা ব্যবসাসফল বণিককে সেইভাবে দেখতে পাই না। লেখকের/কবির কাজেই তিনি উপস্থিত থাকেন, বলা বাহুল্য যে কেউ কেউ সঙ্গত কারণেই মনে করেন কবি/লেখক তার লেখার বাইরে বিরাজেন না। ব্যবসায়ী কিন্তু তার বিজনেসের বাইরেও/বাইরেই বিরাজেন। অথবা অভিনেত্রী/নেতা বা মিউজিশিয়্যান। প্রথমোক্ত দলের ইচ্ছে-অনিচ্ছে-অভিপ্রায় তারা আত্মজৈবনিক রচনা না-লিখলেও আমরা ঠাহর করে নেই তাদের টুটাফাটা সৃজনকর্ম থেকে, কিন্তু অভিনেতানেত্রী/বিজনেসপার্সনদেরে আমরা অন্য কোনো মাধ্যমবাহিত না-হয়ে ব্যক্তিতথ্য জানতে পারি না।
…
যেমন ধরেন একজন লেখক, বিশেষত কবি, নিজের জন্ম তথা জন্মের দিনটি নিয়ে লেখাপত্র লেখেন। সব কবিই লিখেছেন। যারা লেখেন নাই সরাসরি, তারা তাদের ‘জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’ নিয়া নানানভাবে বলেছেন। কিন্তু মৃত্যু নিয়া, মানে মৃত্যুদিন নিয়া, লেখার স্কোপ তো নাই। যারা আত্মহননের ডিসিশন নিয়েছিলেন, তাদের কথা আলাদা। তারা হয়তো নোট লিখে বেশ প্ল্যানড ওয়েতে বিদায় নিয়েছেন। মায়াকোভস্কি প্রমুখ। বা নিকটকালে বাংলা সাহিত্যে এমন কয়েকজন বের করা যাবে। কিন্তু এর বাইরে যারা, আত্মহত্যা করেন নাই যারা, তাদের মৃত্যুচিন্তা তাহলে নাই? নিশ্চয় আছে। নিশ্চয় তারা তাদের মৃত্যুচিন্তা চোলাই করেছেন অধিক উন্নত প্রকৌশলে লেখার ভেতরগভীরে। সেইটা জ্ঞানত হোক বা অচেতনে/অবচেতনে।
…
ইন্ট্রেস্টিং ব্যাপার দেখবেন যে রবীন্দ্রনাথ বর্ষা ভালবাসতেন খুব, স্বভাবেও ছিলেন শ্রাবণশোভন অবিরল সৃজনমুখর সারাজীবন, ইন্তেকালও করেছেন তিনি শ্রাবণকালে। জীবনানন্দ শীতপ্রিয় কবি। শিশিরের, কুয়াশার, হেমন্তের, অঘ্রানের অক্ষর বুনেছেন দিনরাত লুকিয়ে লুকিয়ে ঘাড় নুইয়ে। লোকটা আড়ালও নিয়েছেন হেমন্তেই। নজরুল সম্ভবত ফ্লাই করেছেন ভাদ্রে। ব্যাপার কি তাহলে এ-ই যে, যে যেমনটা চায় সে তেমনটাই পায় তার শেষযাত্রাকালে? এখন দেখতে হবে যে উল্লিখিত কবিরা মরণমুহূর্ত নিয়ে সে-রকম কোনো অছিয়ত করেছিলেন কি না। তা, যা আমি ভালোবাসি, যা আমি চাই, তা আমি মুখে না-বললেও তো আমার আচরণে হরদম প্রকাশ থাকে। নিকটকালের ভেতরে এমন কয়েকটা মৃত্যু নজর করে দেখতে পারেন যে-কেউ। কখন তথা কোন ঋতুতে বিদায় নিয়েছেন তারা, লেখক/কবিরা, তার সঙ্গে খাপে-খাপ তাদের আজীবনের ফ্যাসিনেশন মিলিয়া যায়। যেমন হুমায়ূন আহমেদ ঝুম আষাঢ়-শ্রাবণে গেছেন, তার লেখাভরতি দেখবেন বৃষ্টিমুখরতা। এই-রকম কথাবার্তা আমরা কেউ কেউ মনে মনে ভেবেছি জীবনানন্দপ্রয়াণদিবসে। এই জীবনানন্দসন্ধ্যায়। এই কার্তিকের অস্ফুট নরম অলস সন্ধ্যাহাওয়ায়।
লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৫
- ‘আমি ইয়াসিন আমি বোরো ধান’ : নতুন কবিতার আঘ্রাণ || শামীম হোসেন - February 22, 2026
- আধুয়া গ্রামের নৌকাপূজা : নানান ধারার গানের গ্রামীণ মেলা || বিমান তালুকদার - February 2, 2026
- ঊষর দিন ধূসর রাত : উপন্যাসের তন্তু ও তাঁত || রাশিদা স্বরলিপি - January 24, 2026

COMMENTS