পেইন্টার বুশ : জর্জ ডব্লিউ বুশের পেইন্টিং : ছোটখাটো প্রদর্শনীরিভিয়্যু

পেইন্টার বুশ : জর্জ ডব্লিউ বুশের পেইন্টিং : ছোটখাটো প্রদর্শনীরিভিয়্যু

খবর শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম প্রথমে, দেখি কি যে, জর্জ ডব্লিউ বুশ (আব্বা বুশ নয়, ল্যাড়কা বুশ) অচিরে একজন কলাকার হিশেবে প্রেজেন্ট করতে চলেছেন নিজেরে! এর আগে অবশ্য জানতাম যে, বুশ একটা কুত্তাচিত্র অঙ্কিয়াছেন। তখন খবরও বেরিয়েছিল ভূবাংলার পত্রপত্রিকায় এই নিয়া, বুশের জিগরি-জান কুত্তাটা মারা যাবার পর তিনি এক্কেরে মুষড়ে পড়েছেন খবর হয়েছিল। শোক সামলানোর থেরাপি হিশেবে তিনি তুলি ও কালিঝুলি হাতে লয়ে শিল্পচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং অ্যাজ-আ-রেজাল্ট পয়দা হয় সেই মৃত কুত্তাটার, যার ছবি নিউজপেপারে দেখেছিলাম, এবং যেই কুত্তাটার জনক জর্জ ডব্লিউ বুশ।

তো, বুশ নামে একজন চিত্রশিল্পী পৃথিবীর জন্য তো আহ্লাদেরই খবর, সেইজন্যই কি পয়লা এমন সংবাদে হেসে কুটিপাটি গিয়াছিলাম? বলা যাচ্ছে না যদিও, হাসির উৎস অথবা কারণ ও ক্রমবিকাশ, তবে হেসে উড়িয়ে দেয়াটা আদৌ উচিত হয় নাই স্বীকার করছি। সেই গিল্টি ফিলিং থেকেই হয়তো খবরটা সম্পর্কে কনফার্ম হয়ে মনস্থির করে ফেলি যে বেচারার এক্সিবিশনে একটা চক্কর মেরে আসা দরকার। নবাবির্ভূত এই শিল্পীর নিজের নামে একটা ভেন্যু রয়েছে ডালাস নগরীতে, জর্জ বুশ প্রেসিডেনশিয়্যাল লাইব্রেরি অ্যান্ড্ মিউজিয়াম, এক্সিবিশনের প্রিমিয়ার সেইখানেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে শুনে পয়লা দফা একটু দমে যেতে হলো। সমস্যা যাওয়া নিয়া না, ডালাস তো যাওয়া যাইতেই পারে, হাইস্কুলে পড়ার সময় এভ্রি সানডে একবার ডালাস না-গেলে পেটের পেস্ট্রি-পিৎসা হজম হইত না। তখন বিটিভি  নিয়া যাইত ওখানটায়, প্রত্যেক রবিবার, রাত দশটার ইংরেজি সংবাদের পরে। অনেকদিন হলো ওইদিকটা আর মাড়ানো হয় নাই। শিডিউলজনিত ঘাপলাটাই মুখ্য।

অ্যানিওয়ে। এইবার মনে হলো, নো, আর দেরি নয়, ডালাসে একবার যাওয়া লাগে অ্যাট-লিস্ট প্রেসিডেন্টপেইন্টিং দেখতে। যেই ভাবা সেই কাজ। গ্যুগল ফ্লাইট একটু ঝামেলা পাকাইলেও — মোডেমটা আমার হাতছাড়া ছিল নজিরবিহীন সময় ধরে, এইটাও একটা কারণ বটে, বাসায় আমার মোডেম দিয়াই নেট চালাইতে হয় — শেষমেশ রিচ করতে পেরেছি বুশ-এক্সিবিশন ভেন্যুতে। যেয়ে দেখি ডিপ ব্লু ওয়ালে ঝুলানো ছবির পর ছবি, পোর্ট্রেইট সবগুলো, সর্বসাকুল্যে ডজন-দুয়েক, অয়েল পেইন্টিং, পোলিটিশিয়্যান ও ব্যুরোক্র্যাটদের খোমা সবগুলো। পুতিন আর ব্লেয়ার তো অবশ্যই, হামিদ কার্জাই মুহতারামও রয়েছেন রঙিন লিবাস পরিধান করিয়া, আরও যারা আছেন তারা প্রত্যেকেই আমাদের পরিচিত ও গত দুই দশকের নানান প্রহসনের নির্মাতা বা নায়ক ও নায়িকা।

যা-হোক, প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দেখতে বোর্ডাম কাটাইতে এর-ওর সঙ্গে হাই-হ্যালো কথা বলে একপ্রকার অপিনিয়ন হান্ট করতে থাকি। তাতে একটা লাভ হয় যে, টাইমটা পাস্ করা যায় ইজিলি, আরেকটা লাভ হয় যেইটা আমার মতো চিত্রমূর্খ দর্শকের জন্য আশমান হাতে পাওয়ার শামিল, ছবিগুলো সম্পর্কে একটা আইডিয়া পাইতে শুরু করি নানান শ্রেণি ও পেশার মানুষের ইম্প্রেশন থেকে। বেশিরভাগ দর্শকের প্রতিক্রিয়াই মিশ্র প্রকৃতির, তারা ফান পাইতে এসেছেন এবং বদখত ফান পেয়েছেনও বললেন কেউ কেউ, তবে এমনধারা ফান বেশিক্ষণ এঞ্জয় করা আদৌ সম্ভব নয় এইটা তারা জানাইতে কসুর করেন নাই। আর্টের নাম ভাঙিয়ে এইটা ভাঁড়ামো ছাড়া কিছুই না, বলছেন অনেকেই। ডেবোরা সলোমন নামীয় ভদ্রমহিলা, আর্টক্রিটিক হিশেবে একটা পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রদর্শনী কাভার করতে এসেছেন, ভ্লাদিমির পুতিন থেকে শুরু করে শিল্পীপিতা সিনিয়র বুশ পর্যন্ত অঙ্কিত প্রভাবশালী পোলিটিশিয়্যান ক্রীড়নক ব্যক্তিবর্গের পোর্ট্রেইটগুলোতে যেই আজব ধরন ফুটে উঠেছে আঁকার, সেইটাকে strangely intriguing figurative style বলিয়া আখ্যায়িত করতে চাইলেন। দর্শক হিশেবে তিনি একেবারেই ইম্প্রেসড হইতে  পারেন নাই,এইটাও বললেন। পেইন্টিং হিশেবে বিবেচনা করতে বসলে এগুলো, বলতেই হবে, খুবই বোকাসোকা ব্যাপার হয়েছে এবং বুশ যেমন কায়দায় গেঁয়ো-গর্দা গাণ্ডুমার্কা আচরণ করে বেড়িয়েছেন বিশ্বময়, আম্রিকান আইডল জোকার হিশেবে টেলিভিশনচ্যানেলগুলোকে খোরাক যুগায়ে গেছেন বছরের পর বছর ধরে, এই চিত্রদুষ্কর্মগুলো ওইসব আচরণের একটা এক্সটেনশন মাত্র্র। কথাগুলো মিজ্ ডেবোরার সঙ্গে আলাপনসূত্রেই পাওয়া গেল।

অনেকেই জোর দিয়ে বলতে চাইলেন, এইগুলো কপি করা কাজ, আমি ঠিক মানেটা ঠাহর করতে না-পেরে একটু প্রশ্নচোখ নিয়া হা-মুখে তাকাতেই তারা ব্যাপারটা বিস্তারে বুঝিয়ে বললেন। অনেকেই ব্যাখ্যা করলেন stressing the fact that Bush likely projects photographs onto a panel and copies them, a process known to the masses as ‘tracing’.

ভালো কথা মনে পড়ে গেল আমার, ছেলেবেলায় আমরা প্র্যাক্টিক্যাল খাতায় বিচ্ছু-ব্যাঙ-জবাফুল-নৌকা আঁকতাম এই কায়দায়। কিন্তু আমরা কাজটা করতাম লুকিয়ে, স্যার ধরতে পারলে পিঠের ছাল তুলে ফেলবেন এমন একটা বিকট ভয় শিল্পী হিশেবে আমাদেরে প্রতিষ্ঠিত হইতে দেয় নাই। কিন্তু বুশের পিঠছাল তো, দোহাই আল্লা, মহাভারতীয় টাটা কোম্প্যানির ট্রাক-লরির ডানলপ টায়ার দিয়া বানাইছেন মৌলায়। তা নাইলে এত কথা শুনিয়াও লোকটা বেহায়াপনা ছাড়িতে নারিলো। লোকটা আমাদের এরশাদের ধর্মভাই নির্ঘাৎ। তবে এইটা আজকাল তো বেশ চালু একটা টেক্নিকও বলতে গেলে, ট্রেসিং টেক্নিক, এবং কমপ্লিটলি লেজিটিমেইটেড একটা মেথড, বিশেষত কন্টেম্পোরারি পোস্টমডার্ন আর্টের ডোমেইনে। এখানে বুশ সাহেবের ঘাপলাটা হলো, বলছেন দর্শকবোদ্ধারা, Bush doesn’t transform his imagery in any way beyond simply copying it. আগ বাড়িয়ে এমনও বলতে শোনা যাইল যে, কেউ কেউ ফোড়ন কাটার মতন করে বললেন, It’s unlikely that Bush is partaking in a postmodern exploration of the proliferation of images.

কিন্তু তাই বলে কি আমরা আমাদের সাধের পোস্টমডার্ন তুলিয়া গালিগালাজ খিস্তিখাস্তা ঝাড়িব? কদাপি নহে। এই জিনিশ তো কবিতায়-সিনেমায় হরদম হচ্ছে। কলিকাল, বুঝলা আম্বিয়ার বাপ, ঘোর কলিকাল! হোয়াটেভার। ন্যুইয়র্ক টাইমস  পত্রিকার আর্টক্রিটিক মুহতারিমা রোবের্তা স্মিথ প্রদর্শনী দেখে ফিরে বললেন, Mr. Bush has an uncanny ability to translate photographs into more awkward images enlivened by distortions and slightly ham-handed brushwork. হো হো হেসে উঠবেন না প্রিয় কবিচিত্রীসাহিত্যিক ভাইবোনশ্রোতাবন্ধুরা আমার! শ্রীমতী স্মিথ আরও বলতে উদ্যত হইলেন এরপরে এই কথাগুলো : His skill may be disconcerting for people who love painting and dislike the former president, but still, everyone needs to get a grip, especially those in the art world who dismiss the paintings without even seeing them. ডেবোরা সলোমনও কথাগুলো বলেছিলেন একটু ঘুরিয়ে : I think a lot of us wish he had become a painter as opposed to a president. We all could have been saved a lot of trouble. দি টেলিগ্রাফ  পত্রিকার একটা রিভিয়্যু কোটেবল হইতে পারে এখানে, রিভিয়্যুটার টাইটেল ‘all the hallmarks of outsider art’, একটা প্যারা পড়ে দেখলাম ইন্টারেস্টিং : It turns out that, whether artfully or not, Bush paints in a similar fashion to the way he talks – affecting a folksy, homespun, plain-speaking tone, with just enough ham-fisted strangeness and bungling missteps to keep things interesting. In fact, Bush’s paintings exhibit many of the hallmarks of so-called “outsider art” – which, as visitors to last summer’s Venice Biennial will know, is very modish at the moment within the world of contemporary art. As a result, while history is unlikely to be kind to his presidency, the man who once suffered the indignity of a poll branding him the most unpopular political leader in modern American history, is now finding favour as an artist.

হাসতে নাকি জানে না কেউ, কে বলেছে ভাই? এই শোনো-না কত্ত হাসির খবর বলে যাই! কিন্তু হাসি পাবে কেন, অথবা স্পেসিফিক্যালি বলতে গেলে আমার কেন হাসি পেল, সুরাহা হইল না। মাইকেল ম্যুরের ম্যুভিগুলো তো রসিকতা-রঙ্গ হিশেবে তেমন মার্গীয় উচ্চাঙ্গ হইতে পারে নাই, কিন্তু মজা পেয়েছিলাম বুশের কাণ্ডকারখানার ফ্যুটেজগুলোতে। সেসবের একটা প্রভাব থেকে যেতে পারে এই হাসির পেছনে। অ্যানিওয়ে। বুশ নিশ্চয় নিজের ভাবমূর্তি নিয়া খানিক শরমিন্দা হইয়া এখন কি করবেন কূলকিনারা পাচ্ছেন না, হাতড়াচ্ছেন, তাই আইডি বদলাইতে চাইছেন। কষ্টও করছেন বেচারা। আহা! আমাদের দেশে একটা দৈনিক পত্রিকা আছে, যারা গ্যারান্টি দিয়া চোরডাকাইত-ন্যাংটাবাটপার সবগুলোরে সমুদ্রতীরে নিয়া যাইয়া ট্রাকের উপর তুইলা দিয়া নাচাইয়া পাছা-বুক কাঁপাইয়া কালো পোলাপাইন ও বালিকা এমনকি থার্ড লৈঙ্গিক এডিটর-শিল্পচোর সবাইকে বদলাইয়া শাদা সাহেবসুবো বানাইয়া প্যারিস ক্যাটওয়াকের যোগ্য করিয়া তুলিতে পারে। বুশ ওই ধন্বন্তরী নিউজপেপারওয়ালা শপথগাড়ির সঙ্গে ল্যান্ডলাইনে বা সেলে কম্যুনিকেইট করে প্রভূত উবগার পাইতে পারেন।

ওহো, মনে পড়ল এই ফাঁকে যে, হের্ হিটলার ছিলেন আরেকজন আঁকতে পারতেন ভালো। উনি আঁকতেন ল্যান্ডস্কেইপ প্রধানত। অবশ্য বুশ ও তার ভাইবেরাদরদিগের ন্যায় হিটলার অতটা ক্লাউন ছিলেন না, আছিলেন কাঠখোট্টা, হিটলার একদম পাক্কা ক্ল্যাসিক্যাল ভিলেইন। ফলে এদের তুলনায় — বার্লুস্কোনি, সার্কোজি, এরশাদ এইসবেতের তুলনায় — একটা আলাদা হিম্যানশিপ তো ফুয়েরারের ছিলই। হিটলারের ল্যান্ডস্কেইপ আঁকা আমরা দেখেছি ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটা কৈশোরে পড়ার সময়, সেখানে একাধিক আর্টপ্লেটে হিটলারসৃজিত শিল্পকর্ম রঙিন ছাপা দেখতে পেয়েছিলাম। সমস্তই নিসর্গচিত্র। মনোহর লেগেছিল। বর্তমানে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া জুড়ে যা-কিছু বিরাজমান তা-সবকিছুই তো গ্যুগলে সুলভ। বুশ বলুন, বার্লুস্কোনি বা সার্কোজি, কিংবা মান্যবর বানোয়াট বিরোধীদলীয় মহানেতা এরশাদ, এই মিনসেগুলো তো টেকনাফ-তেঁতুলিয়া রেঞ্জের ভেতরেই বিরাজে, সব আইটেমই গ্যুগলে অ্যাভেইলেবল। কাজেই সার্চ দিন, খেলা দেখুন, মজা লুটুন। ধন্যবাদ আপনারে, আপনাদিগেরে, হের্ পাঠক-দর্শক ও চিত্রসমুজদারেরা!

লেখা / জাহেদ আহমদ এপ্রিল ২০১৪

… …

গানপার

COMMENTS

error: