স্টোরি অফ অ্যা বুকশপ

স্টোরি অফ অ্যা বুকশপ

একটা লাইব্রেরির গল্প এইটা। লাইব্রেরি বলতে যেয়ে একটা অসুবিধা হলো, লোকে ভেবে বসতে পারে এখান থেকে এন্ট্রি দিয়ে বাসায় নিয়া যাওয়া যায় বই কিংবা এইখানে বসে বসেই পড়ার সুযোগটা পাওয়া যায়। নো, এ-দুইটার কোনোটাই না। আমাদের ছেলেবেলায়, লাস্ট সেঞ্চুরির মিড-নাইন্টিজ পর্যন্ত, প্রোক্ত ধারার লাইব্রেরি ছিল পাড়ায় পাড়ায়। দুইটাকা মাসিক চাঁদা, মান্থলি সাবস্ক্রিপশন ফি যাকে বলে, এবং একটা এন্ট্রি মেম্বার্শিপ ফি দিতে হতো রিফান্ডেবল, বইয়ের ক্ষয়ক্ষতি বা বই-তছরূপজনিত কারণে সেই রিফান্ডেবল জামানত থেকে একটা অ্যামাউন্ট অফ মানি কর্তন যাইত। অ্যানিওয়ে। এখন সেই-ধরনের পাঠাগার বা লাইব্রেরি নাই আর। এখন দোকান আছে, বই বিকিকিনির, আছে দোকানদার। তারা অতিশয় ভালো, সমাজের জন্য উপকারী, উনারা প্রায়শ নিজেরাই শিল্পসাহিত্য। বইদোকানিরাই স্বয়ং শিল্পসাহিত্য। উনারা সাক্ষাৎ শিল্পসাহিত্য। অত্যন্ত সমুজদার, পোশাক-সচেতন ও অতীব মার্জিত। ফলে বই বিকিকিনি চালানোর পাশাপাশি নিজের মডারেইট মাত্রার সেলেব্রেটি সত্তাটাকেও বেশ জলপানি দিতে পারেন বইবেচুয়া সেই দোকানদার। চিত্র সচরাচর এ-ই। ব্যত্যয় ক্বচিৎ-কদাচিৎ।

গিয়েছিলাম এমনই একটা বই-বিক্কিরির দোকানে। বুকশপে। মস্ত বড় শহর সেইটি। মস্ত বড় দালানকোঠা, মস্ত দোকানপাট, মস্ত মানুষ মস্ত গাড়িঘোড়া। সেই শহরের সমস্তকিছুই মস্ত মস্ত। মস্ত প্রেম, মস্ত হিংসা, মস্ত হানাহানি। মস্ত কবি, মস্ত গায়ক, মস্ত নায়িকার আঙ্গিক-প্রকরণ। মস্ত মর্দানি, মস্ত প্রতারণা, মস্ত মিনমিনে ক্ষ্যামতার হুঙ্কারসর্বস্ব কিসিম কিসিম সিন্ডিকেট। সেই মস্ত শহরের বইয়ের দোকান সাইজে কেমন মস্ত হতে পারে, এবার আপনারাই আন্দাজ করে নিন।

সুপরিসর দোকান। সুবিস্তৃত প্রান্তরের ন্যায় স্পেইস। বই রাখার সাজসজ্জা ব্যাপক আধুনিক। কাচের ডিসপ্লে একাধারে একশ, ছড়ানো-ছিটানো, পরিমিত স্বাস্থ্যের আলো-সচ্ছ্বল পরিবেশ, টুং টুং মিউজিক বাজিছে আবহ স্যুদিং করে, সব মিলিয়ে বেহেশতখানা। বাতানুকূল। বিক্রয়-সহায়িকা আছেন কয়েকজন, সকলেই অ্যাস্থেটিক-অ্যাস্থেটিক একটা ভাব রাখেন অবয়বে ধরে, এর মধ্যে একজনকে দেখে আপনার তিনকাপ চা পরপর পিয়ে চেহারা মুছতে হয়েছে মন থেকে। কাজেই ভালো।

গোল বাঁধবে যখন আপনি বইয়ের তাকিয়াগুলো বিহার করতে যাবেন। না, ইংরেজি বই থাকাটা আদৌ গঞ্জনাকর কিছু তো না, আপনি মোটামুটি এই যুগে বেঁচে থেকে লেইটেস্ট ইংরেজি বইয়ের খোঁজখবর রাখেন, অন্তত কোন বইটা আংরেজ দেশে রিভিয়্যুড হচ্ছে, ভ্যালুড হচ্ছে ক্রিটিকদের কাছে, এইসব তো জানা হয়েই যায় আপনি না-চাইলেও। ওই দোকানের তাকিয়াগুলো ভরে রাখা বইগুলো দেখে বুঝতে বেগ হয় না এইসব ইংরেজি পাঠক আসলে স্রেফ ক্রেতা, গৃহসজ্জার বাড়তি একটা আইটেম বই যাদের কাছে, সেইসব পয়সাটাইকুন এই বইবেচুয়ার টার্গেট অডিয়েন্স। প্রদর্শিত সমস্ত বই ইনডিড কফিটেবিলবুক ধরনের। সুন্দর, ঝকঝকে, ঝলমলে। ফ্যাশন অ্যান্থোলোজি। হাইপার সেক্সি মলাটের বই। কাগজ ও ছাপা বাঁধাই স্টিম্যুলেইটিং। দাম আপনার বাপের সাধ্যিতে কুলাবার নয়, আপনার খবর বলা যাচ্ছে না।

ব্যাপারটা হলো, এই ধরনের দোকান দরকার আছে। যারা রেফ্রিজার বা ডানলোপিলোর ন্যায় বই সাজিয়ে রাখতে চায়, তাদের জন্য ল্যুক্রেটিভ আইটেম দিয়া সাজানো বইয়ের দোকানগুলো থাকুক, তবে এইগুলো সমাজে চিহ্নিত থাকাটা ভালো। তাতে একজন পাঠকের হয়রানি কম হয়। এমন বৃহদাকার সেই দোকান, এমন অতিকায় কলেবর, এত শো-শা, আপনি একবার ঢুকে বেরোতে বেরোতে দেড়-দুই ঘণ্টা। কাজেই চিহ্নিতকরণ জরুরি।

আরেকটা ব্যাপার ভাবুন, একজন বিদেশি লোক এসে এই কিসিমের বই দোকানে দেখে এই গোটা জাতি সম্পর্কে যেই ধারণা টানবে, জেনারালাইজেশন সত্ত্বেও তো ফরেনার লোকটাকে দোষ দেয়া যাবে না। আগাথা ক্রিস্টি দিয়া দোকান ভরে রাখে যেই জাতি, তার সম্পর্কে তো এহেন উচ্চ ধারণা পোষণ করবেই একজন বিদেশি, কি বলেন আপনারা, করবে না? হালে অ্যাড হয়েছে বেস্টসেলার কোয়েলো, মুরাকামি আর লাইফসায়েন্স নিয়া গ্যাঁজানো কতিপয় লেখকের লম্বা লাইন।

বুকশপ থেকে বেরোবার সময় খেয়াল হলো ব্যাপারটা। সিঁড়িতে এবং সিঁড়ির ল্যান্ডিং ভরে গাদাগাদি রাখা হয়েছে একগাদা বই। যাওয়া-আসার পথের ধারে পায়ের-ধুলা-খাওয়া বাংলা বই। দুঃখিনী বর্ণমালার বই। বেহায়া বাংলা কবির বই। এর মধ্যে এক-দুইজনকে ইম্পোর্ট্যান্ট কবি বলিয়াই মনে হয় আমার কাছে। এরা পড়ে আছেন সিঁড়ির সাইডে, ঘরের বাইরে, বেজন্মার ন্যায়। দেখে দুঃখ হলো। মনে হলো দোকানদার লোকটাকে ডেকে এনে জিগাই, ব্যাটা তোমার ইংরিজিপ্রীতি মন্দ লাগে নাই, কিন্তু তোমার বাংলাভাগ চক্রান্ত তো সুবিধের মনে হচ্ছে না হে! এই বাংলা কবির বইগুলা, তা না-হয় বেচারা নাছোড়বান্দা হয়ে বড় দোকানে জোর করে গছিয়ে গেছে, তারে তুমি এইভাবে উষ্টাইবা — এইটা তো মানা যাচ্ছে না। তা, আমার সঙ্গী বন্ধুত্রয় ছিলেন জোয়ান তাগড়া, তারপরও কেন-যে তারা এনকাউন্টারে যেতে নারাজ হলেন, বুঝতে চেষ্টা করতে করতে বেরিয়ে আসি ল্যান্ডিং থেকে।

যারা গর্ব করেন এই বলে যে, আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের বুকশপ গড়ে উঠছে, আমরা আন্তর্জাতিক বলিয়া যারা পাছায় প্যাড পরে দুনিয়া দুলিয়ে হাঁটেন রাস্তা দিয়া, তাদের জন্য এই গল্পের মোরাল লেসনটুকু বুঝিয়ে বলতে পারলে শান্তি লাগত। অবশ্য বলদের আবার মোরাল সেন্স পরিমাণে একটু বেশিই।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

COMMENTS

error: