ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৫ / পৃথিবীতেই স্বর্গ ।। তিক নাত হান ।। ভাষান্তর : জয়দেব কর

ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৫ / পৃথিবীতেই স্বর্গ ।। তিক নাত হান ।। ভাষান্তর : জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

প্রিয় ধরিত্রী মা,
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা সারাটি জীবন ধরে কোনও এক প্রতিশ্রুত ভূমির খোঁজে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ায়, অথচ বুঝতে পারে না, তুমিই সেই বিস্ময়কর স্থান, যাকে আমরা সারাটা জীবন ধরে খুঁজে ফিরছি। তুমিই সেই অপূর্ব সুন্দর স্বর্গরাজ্য—সৌরজগতের সবচেয়ে সুন্দর গ্রহ, আকাশের বুকে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর স্থান। তুমিই সেই নির্মল ভূমি, যেখানে অগণিত অতীত বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব আবির্ভূত হয়েছেন, বোধিলাভ করেছেন এবং ধর্ম শিক্ষা দিয়েছেন।

পশ্চিম দিকে বুদ্ধের পবিত্র ভূমি কল্পনা করার প্রয়োজন আমার নেই, কিংবা এমন কোনও ঈশ্বররাজ্যের কল্পনাও প্রয়োজন নেই, যেখানে আমাকে মৃত্যুর পর গিয়ে পৌঁছাতে হবে। কারণ স্বর্গ তো এখানেই, এই পৃথিবীতেই। ঈশ্বরের রাজ্যও এখানেই, এই মুহূর্তেই বর্তমান। ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করতে আমাকে মরতে হবে না। বরং আমাকে সম্পূর্ণভাবে জীবিত হতে হবে। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে আমি সেই রাজ্যকে স্পর্শ করতে পারি। যখন আমি বর্তমান মুহূর্তকে গভীরভাবে অনুভব করি, ইতিহাসের ধারার ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করি, তখন আমি সেই ঈশ্বরের রাজ্যকে স্পর্শ করি, নির্মল ভূমিকে স্পর্শ করি, চরম সত্য ও অনন্তকালকে স্পর্শ করি। যখন আমি ধরিত্রী ও জীবনের বিস্ময়গুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করি, তখন আমি আমার প্রকৃত স্বরূপকে স্পর্শ করি। অপূর্ব অর্কিড ফুল, সূর্যের কোমল রশ্মি, কিংবা আমার নিজের এই আশ্চর্য দেহ—যদি এগুলো ঈশ্বরের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত না হয়, এর স্থলে আর কীই বা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? পৃথিবীকে গভীরভাবে চিন্তা করলে—হোক তা ভেসে থাকা কোনও  মেঘ, কিংবা ঝরে পড়া একটি পাতা—অস্তিত্বের যে জন্ম নেই, মৃত্যুও নেই—এই চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি। প্রিয় ধরিত্রী মা, তোমার সঙ্গে আমরা চিরন্তনতার পথে বহমান। আমরা কখনও জন্মাইনি, আর কখনও মরবও না। এই সত্য একবার উপলব্ধি করতে পারলেই, আমরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পূর্ণভাবে অনুভব ও উপভোগ করতে পারি। তখন আর বার্ধক্যের ভয় থাকে না, মৃত্যুর আতঙ্ক আমাদের স্পর্শ করতে পারে না; নিজের সম্পর্কে কোনও  হীনমন্যতা পোষণ করা বা বিভ্রান্ত ধারণায় জড়িয়ে পড়ার কোনও কিছু থাকে না; জিনিসগুলো যেমন, তেমনই হতে দিই, ফলে বস্তুগুলো যেমন আছে, তেমনটির বদলে ভিন্ন হওয়ার জন্য আর আকাঙ্ক্ষা থাকে না। আমরা যে জিনিসের খোঁজ করছি, তা ইতোমধ্যেই আমাদের মধ্যে আছে, আর আমরা ইতিমধ্যেই সেই অবস্থায় আছি।

স্বর্গরাজ্য আমাদের বাইরে কোথাও নেই; বরং সেটি আমাদের নিজের হৃদয়ের গভীরেই অবস্থান করছে। আমরা প্রতি পদক্ষেপে সেই ঈশ্বরের রাজ্যকে স্পর্শ করতে পারব কি না, তা নির্ভর করে আমাদের দেখার ধরন, শোনার ভঙ্গি, আর চলার পথের মনোভাবের ওপর। যদি আমার মন শান্ত ও স্থির থাকে, যদি মনে প্রশান্তি বিরাজ করে, তাহলে যে মাটির ওপর আমি হাঁটছি, সেই মাটিই রূপ নেয় এক পরম স্বর্গে।

অনেকে বলেন, তাদের স্বর্গে কোনও  দুঃখ নেই। কিন্তু যদি দুঃখ না-ই থাকে, তবে সুখ কোথা থেকে আসে? ফুল ফোটাতে কম্পোস্টের প্রয়োজন, আর পদ্ম ফোটাতে লাগে কাদা। তেমনি, আমাদের উপলব্ধিতে পৌঁছাতে প্রয়োজন কষ্ট ও বাধার অভিজ্ঞতার। কারণ জ্ঞানালোক সবসময়ই কোনও কিছু সম্পর্কে জ্ঞানালোক।

প্রিয় মা,আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এই দৃষ্টিভঙ্গিকে লালন করব। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, বর্তমান মুহূর্তে এখানে মনোযোগিতার সঙ্গে শান্তভাবে অবস্থান করার এই অনুশীলনকে উপভোগ করব, যেন আমি দিনরাত বিশুদ্ধ ভূমি, ঈশ্বরের রাজ্যকে স্পর্শ করতে পারি। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, প্রতিটি পদক্ষেপে আমি চিরন্তনতাকে স্পর্শ করব; প্রতিটি পদক্ষেপে আমি এই ধরিত্রীতেই স্বর্গকে স্পর্শ করব।


তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you