সাধুর কবরে গন্ধরাজ || সরোজ মোস্তফা

সাধুর কবরে গন্ধরাজ || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

চোখের মণি মিশিয়ে এই একটা ছবিই তুলতে পেরেছি। ফ্রেমের বন্ধুরা সবাই পরম। আড্ডায় আড্ডায় নিমগ্ন মধ্যরাতে এককাতারে দাঁড়ালেন সাধুদের চোখ। জীবনের খাতিরে এরা সঞ্চয় কিছু করেন বলে মনে হয় না। এরা যাপন করেন। এরা জানেন, আচ্ছন্ন রাতের শেষে ভোর হবে। এরা জানেন, জীবনের চেয়ে জীবনের গন্ধরাজ শ্রেয়। ভৃত্য কিংবা প্রভু নয়; এরা আজ্ঞাবহ আপনার। এদের মরমি চক্ষুকে  কোনো তাঁবুতেই  আটকে রাখা যায় না। এরা থামতে জানেন; সুরের ভেতরে নামতে জানেন। আকাশ আর মাটি ছাড়া আর কোনো দর্প ও দর্পণে তাকান না এরা। সারাজগতের সবচেয়ে নরম সাধুর রাত ছিল সেটা। সে-রাতে ঝাঁপিয়ে নামছিলো কথা ও বিদেহ আত্মার জল। জগতে কথা ও বিদেহ — দুটোই দুর্লভ।

দুর্লভ সে-রাতে বারী সিদ্দিকী কথা বলছিলেন। চাইছিলেন ভেতরের সব কথা ঢেলে দিতে। আকাশের নিচে চোখের নির্জনতাগুলো রেখে যেতে চাইছিলেন। মহান সাধনার পাত্র থেকে নামছিল কথা। শোন হাসান, শোন মামুন, শোন স্বপন বলে ঢালছিলেন মহান শব্দ ও সংগীত। মহত্ব কখনো বড়াই করে না। বারী সিদ্দিকীর চোখে ঠিক বড়াই নয়; অহম ছিল। ছিল আত্মবিশ্বাস। প্রতিষ্ঠা কিংবা হাততালি দিতে না পারলেও সাধনা শিল্পীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। নিজের চৈতন্য রক্ষায় সাধক নিজেকেই সংস্কার করেন। সাধকের অধরাকে কিংবা অসামান্যকে সামান্য করে বলেন। সে-রাতেই বুঝেছি, শুধুমাত্র অনুভব আর প্রজ্ঞান ছাড়া বুদ্ধি আর জ্ঞান দিয়ে বারী সিদ্দিকীর সাধনাঘরে প্রবেশ  করা যাবে না। সে-রাতেই বুঝেছি, সারাদিন জ্ঞান জ্ঞান করলে কিছুই হয় না জানা; প্রীতির ঘরে টোকা দিলে জ্ঞান আপনিই নামে।

সাধুর তপস্যা দেখা যায় না। অতিথির মতো বসে থাকলে পাশে, সাধুর জ্ঞান বরফের মতো নামে। কী দেখব, কী বুঝব, আমার তো পাশে বসে থাকতেই ভালো লাগে। নেত্রকোণা থেকে চলে যেতাম শ্যামলীতে। স্বপনভাইয়ের অফিস কাম আস্তানায়। কবি মামুন খানই নিয়ে যেতেন। আসতেন কবি হাসান মাহমুদ, কবি জুয়েল মোস্তাফিজ। বারী সিদ্দিকীর ছেলে গাড়ি করে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন। প্রতিমাসে কিডনি ডায়ালিসিস করতেন। মালয়েশিয়ার পানি খেতেন। বুঝতে পারতাম, উনার খুব কষ্ট হচ্ছে। চিরকালের শক্তি ও সাধনার কথা মানুষ কোথাও-না-কোথাও বলে যেতে চান। রেখে যেতে চান। মানুষটার চোখে খুব আক্ষেপ ছিল। অধিগত সুরের মোকামটা কারো কাছে রেখে যেতে চাইছিলেন।

বলছিলেন, সুরের খাতা রেখে যাওয়ার মতো একজনকেও পাইনি। সাবাই রাতারাতি বিখ্যাত হতে চায়। সুর কি রাতারাতি ধরা দেয়! সুর কি আঙুলে না-কি ঠোঁটে থাকে? — সুর থাকে দিলে। — এই কথা বলে তিনি গুরুগৃহের কথা বলতে থাকেন। তিনি ভারতের পুনে গিয়েছিলেন ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিখতে। সেখানে গুরুর গৃহই হচ্ছে পাঠশালা। পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের পাঠশালায় স্নাত হয়েই সাধনায় মগ্ন হয়েছেন। সকালে উঠে স্নান করে পবিত্র মনে প্রার্থনার মতো সারাদিন মিউজিকের তালিম নিতেন। ভিজি কার্নাডের বাড়িতে থাকার প্রাক্কালে একটি ঘটনা ঘটে। ওস্তাদ তাকে একটি সুরের তালিম দেন। বলেন, সুরটি বাজাও। রপ্ত করো।  বিকালেই বারী সিদ্দিকীর মনে হলো সুরটি তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন। কিন্তু ওস্তাদ তাকে কিছুই বলছেন না। একদিন, দু’দিন, সাতদিন চলে গেলও ভিজি কার্নাড সাহেব তাকে কিছুই বলছেন না। শেষে ভিজি কার্নাড সাহেব শিষ্যকে বললেন, ‘বেটা তুমি চলে যাও। এই বিদ্যালয়ে তুমি তেমনকিছু শিখতে পারবে না। কারণ, তুমি ওস্তাদের কথা মনে নিতে পারোনি। আমি তোমাকে সুরের যে তালিম দিয়েছি, তুমি বিকালেই ভেবেছ সেটা তুমি রপ্ত করে ফেলেছ। কিন্তু সুর কি এত সহজে রপ্ত হয় বেটা! তুমি সহজেই যেটা করতে পারছ সেটার জন্য আমার শিষ্যত্ব দরকার নেই। তুমি যেটাকে সহজ ভাবছ, সেটা মোটেই সহজ নয়। সুর তো যন্ত্রে থাকে না বেটা, সুর থাকে দিলে। — ভিজি কার্নাড সাহেব বারী সিদ্দিকীকে আর গৃহে রাখতেই চাইছিলেন না। শেষে ক্ষমা চেয়ে গুরুর আশ্রমে প্রার্থনা করেছেন। পেয়েছেন কিংবা সুরের শুয়াচান পাখির অনুসন্ধান করেছেন।

ভিজি কার্নাড সাহেব হাত ধরে একদিন নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখালেন নিজের বিছানায় বালিশের পাশে নিজের গুরুর ছবি।  কার্নাড সাহেব নাকি বলেছিলেন, গুরু ছাড়া তালিম হয় না। গুরু ছাড়া সুরের সমুদ্রে ভাসা যায় না। গুরুর ছায়ার পাশে রেখে দিতে হয় নিজের ছোট্ট ছায়া।

পুনেতে বারী সিদ্দিকীও নাকি তার বিছানার বালিশের পাশে গুরু ভিজি কার্নাডের ছবি এবং তার দাদাগুরুর ছবি রেখে তালিম নিতেন। তিনি বলতেন গুরুর ছবি সাথে থাকলে মন ঠাণ্ডা থাকে; মন পবিত্র ও সাধনায় থাকে। তিনি বলছিলেন, ‘জীবনে কত কত ওস্তাদ আর কত কত পাঠশালার ভেতর দিয়ে যে যেতে হয়! ওস্তাদের আশ্রম ছাড়া আয়ত্ত হয় না সুরের জীবন’।

তিনি বলছিলেন, ‘সুরের মাটিতে আমার জন্ম। কংসের তীরে মানুষের মনে থাকে সহজাত সুর। আমার নানার বাড়ির লোকেরা গান গাইতেন। পুঁথি পাঠ করতেন। ছোটবেলায় আমিও পুঁথিপাঠ করতাম। আমার সুর ও পঠন মানুষেরা খুব পছন্দ করতেন। ছোটবেলায় পাতার বাঁশি বাজাতাম। কংসের তীরে ফসল তুলতে তুলতে, গরু চরাতে চরাতে এখানে সবাই মনের সুখে বাঁশি বাজায়। আমিও এই এদের সাথে মিশতে মিশতে বাঁশির সুরের ভেতরে প্রবেশ করি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সুরের প্রতি আপ্লুত থাকত মন। আসলে সুর আমার রক্তে। আমি সেই রক্তের প্রবাহে মিশে গেছি। কিংবা আমার রক্তই আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে সুরের মন্দিরে। পরিবারই আমার সুরচর্চার প্রথম আশ্রম।  আম্মাই আমার প্রথম ওস্তাদ’।

পরিবারের কাছে গানশেখার হাতেখড়ি হওয়ার পরে বারো বছর বয়সেই তিনি নেত্রকোণায় ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তারপরে ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষ সহ অসংখ্য গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য ও তালিম গ্রহণ করেন।

বেসুরো গান ও গায়কীকে তিনি খুব অপছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, ‘আমাদের বাউলেরা কেউ সুরের চর্চা করেন না। ফোকগান কোনো বেসুরো জিনিস না। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লাসিক্যালি মিউজিক হচ্ছে ফোক। লোকগানের ভেতরেই মানুষের যাপিত জীবন ও মাটির সংস্কৃতিকে টের পাওয়া যায়’।

বলা যায়, বারী সিদ্দিকীর গায়কীর ভেতর দিয়েই নেত্রকোণা অঞ্চলের বাউলদের গান পৃথিবীব্যাপী পরিচিত ও সমাদৃত হয়। প্রথাভাঙার এই আয়োজনে অনেকেই তার প্রতি নাখোশ। কিন্তু উকিল মুন্সি, রশিদ উদ্দিনের লেখা গানগুলো তার গায়কীর ভেতর দিয়েই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

রজনী তুই হইস না অবসান
আজ নিশিতে আসতে পারে আমার বন্ধু কালাচান।
কত নিশি পোহাইলো মনের আশা মনেই রইল রে
কেন বন্ধু না আসিল নিষ্ঠুর পাষাণ।।

ক্লাসিক্যাল সুরের প্রবাহে এই গান যে কী মধুর তা বারী সিদ্দকীর সুরে প্রবেশ না করলে বোঝা যাবে না।

সাধনায় সাধনায় বারী সিদ্দিকী নিজেও গান লিখেছেন। ‘অপরাধী হইলেও আমি তোর’ কিংবা ‘ভাবের দেশে চলে রে মন’-এর মতো অসাধারণ বাংলা গান তিনি সংযোজন করেছেন। এ-রকম সাধকের সান্নিধ্যে খুব নত হই মগ্নতায়। কাজে ব্যস্ত না হওয়া তখন খুব লাভজনক।  কী পবিত্র কিংবা কী দুখি একটা মুখ! এই মানুষটাই বাংলা গানে সুরের পবিত্রতা ঢেলেছেন। বাংলা লোকগানকে নিয়ে গেছেন চিরায়ত ক্লাসিক মন্দিরে।

মৃত্যুর সময় মানুষের দেহটা শুকাতে শুকাতে  ঝরে যায়। কিন্তু রুমির কবিতা ঝরে না। বাউলবাড়ির মাটির কবরে বারী সিদ্দিকী ঘুমিয়ে আছেন। তার কবরের উপরে সাদা রুমালের মতো সাদা গন্ধরাজ। ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’ কিংবা কার্তিকের ‘নিলুয়া বাতাস’-এ ভেসে ভেসে যায় সাদা গন্ধরাজ। শিল্পীরা, সাধকেরা কাউকে দুঃখ দিয়ে যান না। পৃথিবীকে তারা সুরের সাদা রুমালে পবিত্র রাখেন। রাবী সিদ্দিকী পৃথিবীকে পবিত্র রেখেছেন মাটির গানের ক্লাসিক্যাল সুরে।

১৫ নভেম্বর। এই পরম সাধুর জন্মদিন।

কৃতজ্ঞতা সাধু। বাউলবাড়ির উঠান থেকে আজ ভেসে আসছে বকুল ও গন্ধরাজ।

… …

COMMENTS

error: