চয়নের অধিকার ও আমাদের সন্তানসন্ততি

চয়নের অধিকার ও আমাদের সন্তানসন্ততি

SHARE:

আমার মনে হয় আমাদের এটা সৌভাগ্য যে আমাদের বাবা-মা-রা কিঞ্চিৎ অশিক্ষিত ছিলেন। … সৌভাগ্য এই জন্যে বলছি যে, আমাদের কমবেশি অশিক্ষিত বাবা-মা-রা তথাকথিত ‘সেরা আধুনিক সাহিত্যসম্ভার’ আমাদের সামনে হাজির করে কখনোই বলেননি যে, ‘এগুলোই ভালো বই। বাছা, এগুলো দ্রুত পড়ে ফেলো ও সংস্কৃতিসম্পন্ন হও।’ … ভাগ্যিস, বেঁচে থাকার মতো পড়াশোনার ব্যাপারেও তারা আমাদের অ্যাম্বিশ্যাস করে তোলেননি। আমরা কৃতজ্ঞ।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যেমনটা, আমরাও তা-ই, আমরাও কৃতজ্ঞ আমাদের বাপ-মায়ের কাছে। একই কৃতজ্ঞতানুভূতি আমাদেরও, যদিও সন্দীপনের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মপার্থক্য তিন-দশকের কম হবে না। ওভার থ্রি ডিকেইডস, কমসে-কম। তখনও দুনিয়াটা আজকের ন্যায় এত অ্যাক্টিভিটিবিহ্বল ছিল না অবশ্য, দুই-তিন বা তারও বেশি দশকের ব্যবধানে একেকটা চেইঞ্জ হতো হয়তো। এনগেইজমেন্টে মেতে থাকা ছিল না যদিও, অখণ্ড না-হলেও খণ্ড খণ্ড অবসরের তো প্রচুরতাই ছিল। তবে এনগেইজমেন্টও তো তখনকার ধরনে একটা থাকতই। যার যার আলাদা অ্যাজেন্ডা থাকত। বাপ যা করছে, পোলায়-মায়ে-মেয়েতে মিলে একই জিনিশ করছে এখন; মন্দ না, সাম্যবাদ কায়েম হয়েছে। ফেসবুক জেনরেশন সাম্যবাদ।

তখন, ফেসবুকপূর্বাব্দে, ক্ল্যাসিফিকেশন ছিল নানা দিক থেকে। এইটা ভালোও ছিল, মন্দও ছিল। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, সে-যুগে প্যারেন্টিং করতে যেয়ে কেউ কন্ট্রোলিং করত না। দৃশ্যত যতটা মনে হতো কন্ট্রোলিং, প্রকৃত প্রস্তাবে তা ছিল ফস্কা গেরো। বই পড়ার ক্ষেত্রে এইটা আমরা টের পেয়েছি। ইশকুলের টেক্সটবুকের বাইরেকার সবকিছুই ছিল আউটবই, মনে করা হতো পোলাপান বখে যাবে এইসব পড়ে, কিন্তু যদি শরৎ-বঙ্কিম-বিমল-সমরেশের বই পড়ার বদনেশায় পেয়েই বসে ছেলেমেয়েদিগেরে, সেক্ষেত্রে স্পেস দিতেও কঞ্জুসি করা হতো না। খালি এক্সামের সময় ডান্ডা গরম রাখা হতো। তবু ডিক্টেট করা হয়নি কখনো যে এইটা ভালো, বা আংরেজি নভেল পড়ে জাতে ওঠো বাছা হে, বলা হয় নাই অমুক ইংরিজি ইশকুলে অ্যাডমিশন না-পেলে বাপের সমাজ বেচারা বাপেরে ছিছিক্কার দেবে। এইসব ছিল না। আমরা শ্লীল-অশ্লীল জাত-বেজাত বাছবিচার ছাড়াই গোগ্রাসে একটা সময় পর্যন্ত বই পড়তে পেরেছি।

ভিডিওগেমস এসেছে অ্যাডাল্ট হয়ে সেরে যখন আমরা বুড়িয়ে যাবার গেটে পৌঁছেছি তখন। ছিল তখন পাড়ার বইলাইব্রেরি, মেম্বার্শিপ নেয়া যাইত, দুই-তিনটাকা জামানত দিয়া বাড়িতে নিয়া যাও সচিত্র আরব্য রজনী। ওমর খৈয়ামের বইয়ের তর্জমা ইত্যাদিতেও ঝুঁকিপূর্ণ ছবি থাকত, শুধু আম্মাকে একটু পটাতে পারলেই অ্যাপ্রুভ্যাল মিলে যেত, পিতা-পিতৃব্য হদিস পেতেন না আমরা যে কাজী নজরুলের বা কান্তিঘোষের বইয়ের পাতায় পারস্য ছবিকলার প্রেমে পড়ে বই গিলছি দেদারসে। পেয়ালা হাতে সাকি কিংবা গাছতলায় স্বচ্ছবসনা নারীর সখাসখিবেষ্টিত ছবি দেখতে দেখতে হেল্দি একটা বয়ঃসন্ধি আমাদের পারায়েছে।

সেদিন একটা স্থানীয় বইমেলায় যেয়ে অনেকক্ষণ একটা আড়ং পাহারা দিতে বসতে হয়েছিল অগত্যা। বাচ্চাদের বই নিয়া সাজানো স্টল। অভিভাবকদের কাণ্ডকারখানা খেয়াল করে গেলাম, গ্রন্থপ্রশাসক পিতামাতা বাচ্চাদের বাছাইয়ের অধিকার হরণ করছেন কর্কশভাবেই। শিশুরা সচিত্র বই কিনতে চাইছে, প্যারেন্টস মনে করছেন শুধু শুধু পয়সাবিনাশ। খালি তো ছবিই দেখি, লেখা কই? অঙ্গুলিনির্দেশে দেখায়ে দেয়া হলো তাদেরে টেক্সটঅংশ প্রত্যেক পৃষ্ঠাতেই আছে প্রোপোর্শনেইটলি, কিন্তু ছবির তুলনায় সেসব অবশ্য ওয়ান-থার্ড বা তারও কম। বাপমায়ের মন ভরে না, তারা বিরক্ত হন পঁয়তাল্লিশ টাকায় এইটুকু খুদে লেখা খরিদ করতে হবে! এই টাকায় তো রবিঠাকুরের বই তিনটে কেনা যাবে মিনিমাম, বলে ফেলেন একজন। বাচ্চাটা ঝুঁকে প্যান্টের খুঁট ধরে বাপকে ঝাঁকাচ্ছে সে এই রবিমারা সাহিত্যধসানো ছবির বইটাই কিনবে, বিদ্যাশিক্ষা কিনবে না, জ্ঞান কিনবে না। বাপ তখন বাপের কাজ করেন, সুশীল একটা ধমকানি দেন সন্তানেরে, এইটার দরকার ছিল সভ্যতার খাতিরে। বাচ্চাটাও সভ্যতা বাঁচাতে বেশি বিদ্যাশিক্ষাবাহক বই খুঁজতে বাপের সঙ্গে হেঁটে যায় পরের কোনো স্টলের দিকে। গ্যালারিওয়াক সেরে ফেরার কালে এই বাচ্চাটার সঙ্গেই ঘটনাচক্রে চোখাচোখি হয়ে যায়, দেখি যে এদিকটাতেই করুণ ও খাজুল মুখে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সচিত্র বইগুলো দেখতে দেখতে।

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই সকরুণ চোখে, এইটে ভেবে আমি আশঙ্কায় কেঁপে উঠি কিঞ্চিৎ। অমর্ত্য সেনের বিদ্যা পেটে থাকলে, ভাবছিলাম বাড়ি ফিরে রাত্তিরে, সেই শিশুটার বই চয়নের অধিকার নিয়ে একটা আর্টিক্যল লিখতে পারতাম। সচিত্র পারস্য উপকথা, আরব্য রজনী, মালাইকাটের ঝাঁপি, স্তেপের প্রান্তর আর লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি শীর্ষক জিনিশগুলা আমাদের সমস্ত অমর্ত্য সম্ভাবনা বিনষ্ট করেছে অঙ্কুরেই। কাজেই সেই বাপের-প্যান্টের-খুঁট-ধরে-কন্সট্যান্টলি-মিনতি-করে-যাওয়া সাতবছরের শিশুসন্তানের বাপ সম্ভাব্য অমর্ত্য সেনের গর্বিত জনক ভেবে সান্ত্বনা পাচ্ছিলাম।

সচিত্রকরণ : আহমদ সায়েম ।। লেখা : জাহেদ আহমদ ২০১৫

… …

আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: