মুখোমুখি গুন্টার গ্রাস || মৃদুল মাহবুব

মুখোমুখি গুন্টার গ্রাস || মৃদুল মাহবুব

SHARE:

প্যারিস রিভিউ-এ গুন্টার গ্রাস দীর্ঘ একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। অবসরে সেটা অনুবাদ করেছিলাম একদা। কম্পোজ করার অনীহার কারণে এই সাক্ষাৎকারের একটা বিশাল অংশ এখনো অকম্পোজিত অবস্থায় রয়ে গেছে। সেটা পরে একদিন ধীরে ধীরে দেওয়া যাবে। গ্রাসের যতগুলো সাক্ষাৎকার পাঠ করেছি তার মধ্যে এটাকেই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে। এখানে তিনি প্রাণ খুলে নিজের লেখালেখি, শৈশব, নিজ পরিবার, রাজনৈতিক মতাদর্শ ছাড়াও নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। — মৃমা, অনুবাদক

এলিজাবেথ : আপনি কীভাবে লেখক হয়ে উঠলেন?
গ্রাস : আমার মনে হয় যে-সামাজিক পরিবেশের মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা, সে-পরিবেশে এটা করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ। আমাদের ছোট্ট দু-কামরার একটা বাড়ি ছিল। আমি আর আমার বোন জানতাম না নিজস্ব রুম বলে কারও কিছু থাকতে পারে। আমরা থাকতাম একই ঘরে — সেই ঘরের দুই জানালার ফাঁকে ছোট এক কোনায় আমার বইগুলো রাখতাম। শুধু কী বই — জলরঙ করার জিনিশপত্র — এমন অনেককিছু। মাঝে মাঝে আমি অভাব অনুভব করতাম। ছোটবেলাতেই আমি আমার আত্মার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম। আর সেজন্যই ছোটবেলা থেকে লিখতে আর আঁকতে শুরু করি। আজ আমার যে সহায়-সম্পত্তি তার সমস্তই হয়তো সেই সূচনার ফলাফল। চারটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেছি। আমার শৈশবের সেই রূঢ় বাস্তবতা আর একটা ঘরের ছোট্ট কোনায় আমি আর আমার বোনের বেঁচে থাকার সেই স্মৃতিকে আমি আজও ভয় পাই।

এলিজাবেথ : এমন পরিপার্শ্বের ভেতর খেলাধুলা অথবা অন্য কোনো সহজ কাজ না করে পড়া আর লেখালেখির মতো কঠিন একটা বিষয় কেন বেছে নিলেন?
গ্রাস : শিশুকালে আমি খুব মিথ্যাবাদী ছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে আমার মা আবার আমার এই মিথ্যাগুলোকে খুব পছন্দ করত। আমি তাকে মহান কিছু বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমার বয়স যখন দশ বছর তখন মা আমাকে পিয়ার গিয়স্ট  নামে ডাকত। সেই সময় আমাদের নেপলস ভ্রমণের কথা ছিল। মা আমাকে সেই ভ্রমণ সম্বন্ধে একটা গল্প লিখতে বলেছিল। আর তখন থেকেই আমি মিথ্যা লেখা শুরু করি। আর সেই মিথ্যাচার আমি চালিয়েই গেলাম। বারো বছর বয়সে আমি উপন্যাস লেখা শুরু করি। এটা ছিলো Kashubium সর্ম্পকিত, যা বহু বছর পর The Tin Drum-এ Oskar-এর দাদি Anna চরিত্রে রূপান্তরিত হলো। প্রথম এই উপন্যাসে আমি একটা ভুল করেছিলাম। উপন্যাসটির প্রথম অধ্যায়ের শেষের দিকে সমস্ত চরিত্রের মৃত্য ঘটে গেল। আমার আর শেষ করা হলো না। তবে এটাই হলো আমার উপন্যাস লেখার প্রথম শিক্ষা — চরিত্র সম্বন্ধে সচেতনভাবে খুব সাবধান থাকতে হয়।

এলিজাবেথ : কোন মিথ্যা আপনাকে সব থেকে বেশি আনন্দ দিয়েছে?
গ্রাস : যে-মিথ্যা কাউকে আঘাত করে না, কাউকে বাঁচায়। আমার অভিনব মিথ্যাচার গুতানুগতিক মিথ্যাচার থেকে বেশ আলাদা। এটা আমার পেশা নয়। সত্য বড় ক্লান্তিকর, তুমি মিথ্যার সাথে সত্যকে ব্যবহার করতে পারো। এতে দোষের কিছু নেই। আমি এটা বুঝেছি যে আমার ভয়ঙ্কর মিথ্যার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যদি কয়েক বছরের জার্মানির রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে কিছু লিখতাম তবে লোকে বলত, কী নিদারুণ মিথ্যাবাদী।

এলিজাবেথ : প্রথম উপন্যাসে ব্যর্থতার পর আপনি কি করলেন?
গ্রাস : কবিতা আর ড্রয়িং নিয়ে আমার প্রথম কবিতার বই। প্রকৃতপক্ষে আমার কবিতায় ছিল ড্রয়িং আর গদ্যের সমাবেশ, কখনও কখনও তা চিত্রকল্পের বাইরে, এমনকি কখনও তা শব্দ-বাক্যহীন। এরপর চব্বিশ বছর বয়সে আমি টাইপরাইটার কেনার সামর্থ্য অর্জন করি। দুই আঙুলে লেখার পদ্ধতি আমার ভালো লাগল। The Tin Drum-এর প্রথম অংশ টাইপরাইটারে লেখা। আমার বয়স বাড়তে লাগল। আমি শুনছি আমার বন্ধুরা কম্পিউটারে লেখে। প্রথম খসড়া আমি হাতে লিখি। প্রিন্টার থেকে The Rat-এর প্রথম সংস্করণ লাইনহীন বড় কাগজে বই আকারে পাই। যে-কোনো বই প্রকাশের আগে সাদা কাগজ সহ একটা ব্লাইন্ড কপি আমি প্রকাশকের কাছ থেকে চেয়ে নেই। প্রথমবার হাতে লেখার পর বাকি দুই-তিনবার টাইপরাইটারে লিখে লেখাটা শেষ করি। তিনবার না লিখলে আমি কোনো বই শেষ করতে পারি না। সাধারণত চারবার সংস্করণের পরই তা মুক্তি পায়।

এলিজাবেথ : প্রতিটা খসড়া লেখার সময় কি ঘটে? প্রথম থেকে শুরু করে আবার শেষ পর্যন্ত পুনরায় লেখেন?
গ্রাস : না। প্রথমবার আমি খুব দ্রুত লিখি। সেক্ষেত্রে আমার পছন্দ নয় এমন অনেক বিষয় থাকে। কিন্তু দ্বিতীয়বারে লেখার সময় লেখাটি হয় দীর্ঘ, বিস্তরিত ও চূড়ান্ত। হয়তো লেখাটি যথার্থ হলো তারপরও আমার মনে হতে থাকে যে ঠিক রসোত্তীর্ণ হলো না। আবার লিখতে শুরু করি প্রথমবারের স্বতস্ফূর্ততা নিয়ে; দ্বিতীয়বার যা-কিছু প্রয়োজনীয় ছিল তৃতীয়বার তা-ই পূরণ করি। কাজটা খুব সোজা নয়, বেশ কঠিন।

এলিজাবেথ : আপনি যখন লেখার ভেতর থাকেন তখন আপনার দৈনন্দিন কাজ কি?
গ্রাস : যদি কিছু লিখি আর যদি তা হয় প্রথম খসড়া তবে সেক্ষেত্রে আমি প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ পৃষ্ঠা লিখি। আর এটা যদি হয় তৃতীয় থসড়া সেক্ষেত্রে ৩ পৃষ্ঠার বেশি আর আগায় না প্রতিদিন। খুব ধীরে ধীরে অগ্রসর হই।

এলিজাবেথ : সাধারণত সকালে দুপুরে না রাতে লিখেন?
গ্রাস : কখনোই রাতে নয়। আমি রাতে লেখা বিশ্বাস করি না কারণ তখন লেখা খুব সহজে এসে যায়। আর সকালে যখন লেখাটা পড়তে বসি তখন মনে হয় কিছু হয়নি। শুরু করার জন্য আমার দিনের আলো জরুরি। ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আমি নাস্তা করি। নাস্তার পর লিখতে বসি। দুপুরে কফি পানের বিরতি তারপর আবার লেখা চলতে থাকে সন্ধ্যা ৭টা অব্দি।

এলিজাবেথ : কিভাবে বোঝেন একটা বই এরপর আর লেখার দরকার নেই অর্থাৎ বুঝেন এখানেই লেখা শেষ করা ভালো?
গ্রাস : একটা দীর্ঘ বই লেখা আমার কাছে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একটা বই লিখতে ৪/৫ বছর লেগে যায়। যখন আমার মনে হয় আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি তখন আমার মনে হয় এখানে ইতি টানা আবশ্যক।

এলিজাবেথ : ব্রেখট সর্বদা তার লেখা পুনর্লিখন করতেন। প্রকাশিত হবার পরও তিনি ভাবতেন না যে লেখাটা শেষ হয়েছে।
গ্রাস : আমার মনে হয় আমি কখনও এমন করব না। জীবনের একটা বিশেষ সময়ে আমি The Tin Drum অথবা From the Diary of a Snail লিখেছি। ঐ সময়ের ভাবনাই বইগুলোর পরমাত্মা। আমি নিশ্চিত আমি যদি এখন The Tin Drum অথবা Dog Years অথবা From the Diary of a Snail পুনরায় লিখি তবে লেখাগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।

এলিজাবেথ : আপনি কিভাবে ‘ফিকশন’ আর ‘ননফিকশন’-এর মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন?
গ্রাস : ‘ফিকশন বনাম ননফিকশন’ এই ধারণাটাই অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়। এটা বইবিক্রেতা প্রাতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। কারণ তারা শিল্পকে নানা ভাগে বিভক্ত করে কেজি দরে বিক্রি করে থাকে। কিন্তু আমি আমার বইয়ের এমন শ্রেণিবিভাজন করতে প্রস্তুত নই। আমার সবসময় মনে হয়েছে বইবিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা রকম সমিতি আছে যারা নির্দিষ্ট করে দেয় এটা ফিকশন আর ওটা ননফিকশন।

এলিজাবেথ : ঠিক আছে। তবে আপনি যখন আপনার প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর ছোটগল্প বা উপন্যাস নিয়ে কাজ করে থাকেন তখন নিশ্চয়ই আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করেন। তাহলে আপনি কিভাবে এদের পার্থক্য করে থাকেন?
গ্রাস : হ্যাঁ, এরা পরস্পর থেকে অলাদা কারণ আমি সরাসরি ঘটনাগুলোর মুখোমুখি হই। একে আমি পরিবর্তন করতে পারি না। সাধারণত আমি আমার সাথে কোন ডায়রি রাখি না। কিন্তু From the Diary of a Snail লেখার জন্য সবসময় আমাকে একটা ডায়রি সাথে সাথে রাখতে হয়েছে। আমার মনে হয় ১৯৬৭ সালটা খুবই গুরত্বপূর্ণ একটা সাল আমার জন্য। তখন সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক পটভূমির একটা বিশাল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। ১৯৬৯-এর মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ একটা সময় পথে পথে ক্যাম্পেইন করার সময় আমি একটা ডায়রি রেখেছিলাম নিজের সাথে। কলকাতাতে যখন গেছি তখনও একই কাজ করেছি। আর সেই ডায়রিই একদিন From the Diary of a Snail-এ রূপান্তরিত হলো।

এলিজাবেথ : একদিকে রাজনীতি আর অপরদিকে আপনার লেখালেখি। এ-দুটো ভিন্ন বিষয়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?
গ্রাস : লেখক মানে নয় আত্মার গভীরতাসন্ধানী কোনো বোদ্ধা। দৈনন্দিন জীবনের চাওয়াপাওয়ার সাথে সে সম্পর্কযুক্ত। আর আমার ক্ষেত্রে আমি বলব লেখালেখি, চিত্রকলা আর রাজনীতি এই তিনটি বিষয়কে আলাদা আলাদা শখ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে প্রত্যেকটিরই আলাদা নিজস্ব গতি ও শক্তি আছে। আমি যে-সমাজে বাস করি সে-সমাজের কিছু কিছু বিষয় পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। আমার লেখালেখি বা ছবি সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে রাজনীতিসম্পৃক্ত। তবে আমার লেখার জন্য খুব পরিকল্পনামাফিক আমি রাজনীতিকে টেনে আনতে প্রস্তুত নই। এমন কোনো গল্প লিখি না যা খুব সাদামাটা নির্দিষ্ট বাস্তব কোনো রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। লেখালেখি থেকে রাজনীতিকে বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব কারণ আমাদের যাপিত জীবনের উপরই এর একটা বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। এটা জীবনের আশাভরসাকে নানা দিক থেকে প্রভাবিত করতে পারে।

এলিজাবেথ : ইতিহাস, পদ্ধতি, গীতিভঙ্গিমা — এমন বিচিত্র বিষয়কে আপানি একত্রিত করেছেন।
গ্রাস : … চিত্রকলা, কবিতা, সংলাপ, উদ্ধৃতি, বক্তব্য, চিঠি — তুমি দেখবে যখন আমি পৌরাণিক ঢঙে কাজ করি তখন ভাষার যত রকম সক্রিয় রূপ আছে তা তো ব্যবহার করিই, সাথে ভাষার নানা উপকরণও এর সাথে যুক্ত হয়। মনে করে দেখো আমার Cat and Mouse আর The Meeting At Telgte খুবই বিশুদ্ধ ফর্মে করা দুটি কাজ।

এলিজাবেথ : আপনার শব্দ আর ছবি নিয়ে একত্রিত যে-কাজগুলো আছে সেগুলো অনবদ্য।
গ্রাস : ছবি আর লেখা — এ-দুটো আমার কাজের প্রাথমিক উপাদান, তবে একমাত্র উপাদান বলা যাবে না। আমার যখন সময় থাকে তখন আমি ভাস্কর্য তৈরি করি। আমার ক্ষেত্রে চিত্রকলা আর লেখালেখি — এ-দুটোর মধ্যে খুব দেওয়ানেওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। কখনও কখনও এই সম্পর্ক খুব গভীর হয়ে ওঠে। তবে কখনও কখনও দুর্বলও হতে পারে। গত কয়েক বছর আমি এদের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক যে আছে তা অনুভব করছি। Show Your Tongue এমনই একটা উদাহরণ, এটা আমি কলকাতাতে শুরু করি। ড্রয়িং ছাড়া এই বইয়ের অস্তিত্ব ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল না। কলকাতায় অবিশ্বাস্য দরিদ্রতা, ভাষায় একে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একমাত্র ড্রয়িং একে ফুটিয়ে তুলেছে নির্দ্বিধায়।

এলিজাবেথ : এই বইটিতে শুধু কবিতাই ছাপা হয়নি, হাতের লেখাও ড্রয়িঙের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এই হাতের লেখা শব্দগুলোকে কি আপনার ড্রয়িঙের অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে?
গ্রাস : কবিতার কিছু কিছু উপাদান এই ড্রয়িংগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত। কবিতা যখন আসা শুরু করে তখন আমি এই ড্রয়িংগুলোর উপর তা লিথতে শুরু করি। ড্রয়িং আর কবিতা একসাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। যদি তুমি ড্রয়িঙের ভেতরের লেখাগুলো পড়তে পারো তবে ভালো, কেননা তা লেখা হয়েছে পড়তে পারার জন্যই। ড্রয়িংগুলো সাধারণত এঁকে থাকি প্রথম খসড়া তৈরির আগে টাইপরাইটারে বসার আগে। এর কারণ অবশ্য জানা নেই। এই বইটা কলকাতা বিষয়ক। আমি সেখানে দুইবার গিয়েছি। Show Your Tongue শুরু করার বারো বছর আগে একবার গিয়েছিলাম। সেটাই প্রথম ভারতভ্রমণ। মাত্র কয়েকদিন কলকাতায় ছিলাম। আমি ফেরার সময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই ইচ্ছা ছিল সেখানে আবার যাব, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে থাকব, অনেককিছু দেখব আর লিখব। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশে আমি গিয়েছি — কিন্তু যখনই আমি হংকং, ম্যানিলা বা জাকার্তার বস্তিগুলো দেখি, তখন আমার কলকাতার কথা মনে পড়ে। প্রথম বিশ্বের সমস্যা তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এভাবে মিশে একাকার হয়ে আছে — এমন দৃশ্য আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।

তাই আমি আবার কলকাতায় ফিরে গেলাম। আর আমি আমার ভাষাদক্ষতা হারিয়ে ফেললাম। আমি একটা অক্ষরও লিখতে পারিনি। সেই মুহূর্তে ড্রয়িং খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল আমার কাছে। ভারতের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার অন্য রকম প্রচেষ্টা ছিল এটা। এই ড্রয়িংগুলোর সাহায্যে আমি আমার গদ্য লেখার শক্তি পুনরায় ফিরে পেতে থাকলাম। এটাই হলো এই বইয়ের প্রথম অংশ, খানিকটা নিবন্ধের মতো। এরপর তৃতীয় অংশ — বারো ভাগে বিভক্ত একটা দীর্ঘ কবিতা। এটা ছিল কলকাতা বিষয়ক একটা নাগরিক কবিতা। তুমি যদি নাগরিক গদ্য, পদ্য আর ড্রয়িংগুলো দেখো তবে দেখবে এর সব-কয়টিই কলকাতা বিষয়ক। তবে তারা পরস্পরের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে যুক্ত। এদের মধ্যে এক রকম গোপন কথোপকথন আছে, তবে ব্যাপারটা বেশ একটু জটিল।

এলিজাবেথ : কবিতা, ড্রয়িং আর ভাস্কর্য — এই তিনটি কাঠামোর মধ্যে কোনোটি কি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে?
গ্রাস : এই প্রশ্ন যদি আমাকে করে থাকো, তবে একমাত্র নিজের ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, আমার কাছে কবিতা অনেক বেশি অর্থবহ। একটা উপন্যাসের জন্ম হতে পারে একটা কবিতা থেকে। তবে আমি বলছি না এটাই শেষ কথা। তবে আমি কবিতা ছাড়া কিছুই গড়ে তুলতে পারব না। এই বিষয়টাকে আমি খুব সরাসরি দেখি।

এলিজাবেথ : অন্যান্য শিল্পমাধ্যম থেকে চিত্রকলার বিশেষ একটা ভূমিকা রয়েছে আপনার কাজের মধ্যে।
গ্রাস : না না। তা ঠিক নয়। গদ্য, পদ্য, ড্রয়িং সমস্তই আমার কাজের মধ্যে অনায়াসেই ঢুকেছে।

এলিজাবেথ : ড্রয়িঙের ভেতর অনুভবগত বা দৃশ্যগতভাবে এমন কিছু কি আছে যা লেখনীর ভেতর নেই?
গ্রাস : হ্যাঁ, লেখালেখি আসলেই একটা কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপার। বিমূর্তও বটে। লেখার আনন্দ ড্রয়িঙের আনন্দ থেকে একদমই আলাদা। ড্রয়িঙের ক্ষেত্রে একখণ্ড শাদা কাগজের উপর আমি আমার সৃষ্টিকে ফুটিয়ে তুলি। এটা খুবই স্পর্শকাতর একটা ব্যাপার যা তুমি লেখালেখির ক্ষেত্রে পাবে না। প্রায়ই আমি লেখালেখির ভেতর ফিরে আসার জন্য ড্রয়িং করে থাকি ।

এলিজাবেথ : লেখালেখি খুব বেদনাদায়ক?
গ্রাস : এটা একটা মূর্তি গড়ার মতো কাজ। মূর্তি গড়ার সময় তোমাকে এর চারপাশে চোখ রাখতে হয়। তুমি যদি কোনো একপাশে কোনোরকম পরিবর্তন করো তবে অন্যপাশেও তোমাকে পরিবর্তন করতে হবে। যদি হঠাৎ কোনো পরিবর্তন করে বসো তবে তা কিন্তু আর মূর্তি হবে না। তাকে সেক্ষেত্রে অন্যকিছু বলা ভালো। এর ভেতর একটা সংগীতধর্ম আছে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। আমি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খসড়া নিয়ে একই কাজ বারবার করতে থাকি। সমস্তই ঠিক আছে তবে কী যেন নেই। এই নেইটাকে ঠিক করার জন্য সামান্য কিছু পরিবর্তন করি। আমার মনে হয় এটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এরপর আমি এগিয়ে যাই। কাজ করতে থাকি।

এলিজাবেথ : কবিতায় ফিরে আসি। উপন্যাসের অংশ হিসাবে আপনি যে-কবিতা লেখেন সেই কবিতা আর সচরাচর আমরা কবিতা বলতে যা বুঝি তার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে?
গ্রাস : এক সময় কবিতা লেখার ক্ষেত্রে আমি পুরনো ধ্যানধারণার অধিকারী ছিলাম। আমি ভাবতাম বেশ-কটা কবিতা লেখা হয়ে গেলেই সেই কবিতাগুলো আর কিছু ড্রয়িং নিয়ে একজন প্রকাশকের কাছে চলে যাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে একটা দারুণ কবিতার বই পাওয়া যাবে কবিতাপ্রেমিকদের জন্য। সেই সময়, From the Diary of a Snail লেখার সময়, আমি গদ্য আর পদ্য উভয়ই একসাথে রেখে দিলাম এক বইয়ে। এই কবিতাগুলোর আলাদা একটা সুর আছে। গদ্য আর পদ্যকে আলাদাভাবে দেখার কোনো কারণই আমি দেখি না। বিশেষত জার্মান সাহিত্যে গদ্য-পদ্য মিশ্রণের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আছে। প্রতিটি অনুচ্ছেদে কবিতা ঢোকানোর ঝোঁক আমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগল। এবং এর মধ্যেই আমি গদ্যের বুনন খুঁজে পেতে চাইলাম। যে-সমস্ত পাঠক ভাবেন ‘কবিতা খুবই কঠিন’ তারা দেখে থাকবেন কিছু কিছু কবিতা গদ্য থেকে অনেক সহজ।

এলিজাবেথ : যারা ইংরেজিতে আপনার বই পড়ে তাদের তো এর মূল স্বাদ থেকে অনেককিছুই হারাতে হয়?
গ্রাস : এর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। কারণ আমি ইংরেজিপাঠক নই। তবে আমার বই অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি আমার অনুবাদকদের সাহায্য করে থাকি। The Flounder নিয়ে আমি যখন আমার জার্মান প্রকাশকের কাছে গেলাম তখন তারা আমাকে আরও একটা কাজের সাথে সম্পৃক্ত করে দিলো। আমার পাণ্ডুলিপি শেষ করার পর আমার অনুবাদকরা এটা পড়ে। আমার প্রকাশকই সব দায়িত্ব পালন করে থাকে। The Flounder, The Meeting At Telgte, The Rat — প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটেছে। অনুবাদক আমার বইয়ের নানা বিষয় জানতে চেষ্টা করে। বইটি সম্বন্ধে নান প্রশ্ন করে। আমার মনে হয় এই কাজগুলো অনুবাদকার্যকে বেশ সহায়তা করে। আমার মনে হয় বইটি সম্পর্কে তারাই আমার চেয়ে বেশি জানে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এটা বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অনেক সময় তারা বইয়ের কিছু বিষয়কে ভুল বলে প্রমাণ করতে চায়। এবং আমাকে সে-সম্পর্কে বলেও। ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান আর স্প্যানিশ অনুবাদকেরা নানা বিষয়ে কথা বলে এ-জাতীয় সাক্ষাৎকারের সময়। এবং সত্যিকার অর্থে তারা অনুবাদটিকে তাদের নিজস্ব ভাষায় উদ্ভাসিত করে তুলতে চায়। আমি অনুবাদকে সমর্থন করি কারণ যখন আমি কোনো অনুবাদ পড়ি তখন আমি কখনোই ভাবি না যে বইটি অনূদিত। আমার সৌভাগ্য যে রাশিয়ান সাহিত্যের চমৎকার কিছু অনুবাদ আমরা জার্মান ভাষায় পেয়েছি। তলস্তয় বা দস্তোয়ভস্কির অনুবাদ একদম নিখুঁত — মনে হয় যেন বইগুলো জার্মান ভাষাতেই লেখা হয়েছে। শেক্সপিয়র বা তাদের মতো রোমান্টিকদের যে-সমস্ত অনূদিত বই আমি দেখেছি তা ভুলে ভরা, তবে সুপাঠ্য। নতুন অনুবাদকদের অনুবাদে ভুল কম — ভুল নেই বললেই চলে। তবে Fridrich Schlegel-এর মতো যথার্থ আর কেউ নেই। প্রতিটা বই অনুবাদের ক্ষেত্রে — তা কবিতা বা উপন্যাস যা-ই হোক না কেন, সেক্ষেত্রে অনুবাদককে বইটিকে তার নিজস্ব ভাষায় পুনরুৎপাদন করতে হয়। বই অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি এই নীতিকে সমর্থন করি।

এলিজাবেথ : আপনি কি মনে করেন না যে আপনার Die Rättin-এর ইংরেজি অনুবাদ The Rat যথার্থ হয়েছে? (জার্মান ভাষায় প্রতিটা বিশেষ্য আগে পুং বা স্ত্রীবাচক Article বসে। Der পুং অর্থে, Die স্ত্রী অর্থে Das ক্লীব অর্থে অনুবাদক ) জার্মান ভাষা তো Die Rättin বলতে মেয়েইঁদুরকে বোঝায়। আর স্প্যানিশে একে Rattessa লেখার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ মেয়েইঁদুরের তো একটা বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু ইংরেজিতে The Rat এমন একটি শব্দ যা কুৎসিত দেঁতো একটা প্রাণীকেই বোঝায়।
গ্রাস : এই জাতীয় শব্দ আমাদের জার্মান ভাষাতেই নেই। আমি এটা তৈরি করেছি। আমি আমার অনুবাদকদের সবসময় নতুন কিছু আবিষ্কার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকি। আমি তাদের বলি, যদি এমন কোনো শব্দ পাও যা আমাদের ভাষায় আছে কিন্তু তোমাদের ভাষায় নেই সেক্ষেত্রে নতুন শব্দবন্ধন তৈরি করো। She-Rat শব্দটা আমার ভালোই লাগছে। খারাপ না।

এলিজাবেথ : আপনার বইয়ের ইঁদুরটি মেয়েইঁদুর কেন? যৌনকাতরতা, নাকি নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, নাকি রাজনৈতিক কোনো অভিলক্ষ্য এর পেছনে আছে?
গ্রাস : The Flounder এটি পুরুষ। আরও একটু বয়স বাড়ার পর আমি দেখলাম আমি আবারও আরেক নারীর প্রেমে জড়িয়ে পড়েছি। এর থেকে মুক্তির কোনো পথই আমার জানা ছিল না। সে নারী কিংবা ইঁদুর বা She-Rat যা-ই হোক না কেন। আমি একটা আইডিয়া পেলাম। সে আমাকে উদ্বেলিত, উত্তেজিত করল — আমি শব্দ খুঁজে পেলাম, গল্প পেয়ে গেলাম এবং পুনরায় মিথ্যাচার শুরু করলাম। মিথ্যা বলার জন্য এটা অত্যাবশ্যকীয়। একজন পুরুষের পাশে বসে মিথ্যা বলার কোনো মানেই হয় না। তবে ভাবো, একজন উজ্জ্বল তরুণীর সাথে মিথ্যাচার কেমন উত্তেজনাকর!

এলিজাবেথ : আপনার অধিকাংশ বই যেমন The Rat, The Flounder, From The Diary Of A Snail, Dog Years — এ উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রস্থলে কোনো-না-কোনো প্রাণীই আমরা দেখতে পাই। এর কি বিশেষ কোনো কারণ আছে?
গ্রাস : সম্ভবত। আমার মনে হয় আমরা মানবজাতি সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলি। পৃথিবীতে কি শুধু মানুষ আছে, আর কিছু নেই? পশু, পাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ সব আছে। তারা আমাদের আবির্ভাবের পূর্বেই তারা পৃথিবীতে ছিল। এবং এমন একদিন আসবে যখন আমরা থাকব না অথচ আমরা বাদে পুরো প্রাণীজগতই টিকে যাবে। একদিন তাদের আর আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। জাদুঘরে কি দেখো? লক্ষ লক্ষ বছর আগের ডাইনোসর আর বাইসনের হাড়। তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাদের হাড়ে কোনো বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়নি। তুমি দেখতে পারো। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটে না। আমরা মৃত্যুর পূর্বে বিষ ছড়িয়ে যাই বাতাসে বাতাসে। আমাদের মনে রাখা দরকার পৃথিবীতে আমরা একা নই। ধর্মগ্রন্থ আমাদের ভুল শিক্ষা দিয়েছে। সেখানে বলা আছে পশু-পাখি-মাছ-গরু সমস্ত জীবজগতের উপর প্রভুত্ব করো। সমস্ত পৃথিবী আমরা যুদ্ধ করে জয়লাভ করতে চেয়েছি। এই ভুলের ফলাফল বড় বেদনাদায়ক।


অর্ধসমাপ্ত অনুবাদটা ‘লাল জীপের ডায়েরী’ পত্রিকায় ডিসেম্বর ২০১২ ও জানুয়ারি ২০১৩ দুই কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। দুই কিস্তি একত্রিত করে এইখানে পুনর্প্রকাশিত হলো। বর্তমান প্রকাশের আগে এই অনুবাদের পূর্বপ্রকাশক ও অনুবাদক উভয়েরই প্রয়োজনীয় সম্মতি ও অনুমোদন আদায় করা হয়েছে। অনুবাদকের কনভিনিয়েন্স অনুসারে রেস্ট-অফ-দি ট্র্যান্সল্যাশন কখনো গানপারে ছাপানোর ব্যাপারে তৎপরতা জারি আছে। — গানপার

… …

COMMENTS

error: