পুরুষালি তিড়িংবিড়িং

পুরুষালি তিড়িংবিড়িং

SHARE:

‘কাবির সিং’ নামে একটি সিনেমা আউট হয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝি, মে বা জুন ২০১৯ নাগাদ, হিন্দি ভাষায় বলিউডি ম্যাসালা ম্যুভিই ছিল। জমে নাই। বিক্রিবাট্টা কেমন হয়েছিল, পরিচালকের পকেটে মালপানি কতটা ঢুকেছিল, খবর নিই নাই। কিন্তু ব্যবসাপাতি যদি না-ও করে থাকে তাতেও সমস্যা দেখি না। কারণ এর পূর্বসূরি কিন্তু ধুমিয়ে ব্যবসা করতে পেরেছিল।

‘অর্জুন রেড্ডি’ ছিল পূর্বসূরি সেই তামিল সিনেমাটার নাম। পরিচালকের নামের পদবিটাও তা-ই, রেড্ডি, হিন্দি এবং তামিল উভয় ফিল্মেরই ডিরেক্টর অভিন্ন ব্যক্তি। সন্দিপ রেড্ডি ভঙ্গা। তার মানে হচ্ছে যে কাবির সিং ফ্রেম-টু-ফ্রেম নকল হইয়াও নকল নহে। যেহেতু আসলের পরিচালক নকলেও উপস্থিত, অতএব উহা অফিশিয়্যাল রিমেইক। এই এক তামশা আজকাল বলিউডের কমন ফিচার। মলয়লম আর তামিল-তেলেগুর চুটিয়ে রিমেইক। অফিশিয়্যাল রিমেইক। বাপ্রে বাপ! বাটপারির নয়া তরিকা। বাটপারিটা দর্শকের লগে, ডেফিনিটলি। বিকজ দর্শক তো চোরাই পথে টরেন্টে-ইউটিউবে রেড্ডি ২০১৭-তেই হলপ্রিন্ট হোক বা হাইডেফ দেখে সেরেছে। বেজায় বিজনেসও করেছে মূলের ম্যুভিটা। আবার হিন্দি ধ্বজভাঙ্গা দিয়া রেভিনিউ পকেটস্থ করবার ধুন্দুমার কারবার। ডিসগাস্টিং।

কাবির সিং  ম্যুভির মতো ভুয়া মালে বলিউড তো সয়লাব। শাহিদ কপুর অভিনয় করেছেন কাবিরের ক্যারেক্টারে। এই অভিনয়কারীটিকে অ্যালার্জি লাগে আমার কাছে, এমনকি তার সেরা হায়দারেও। তব্বুজির জন্যই হায়দার হাজারবার উঁকি দিয়া যাইতে মন চায়। আহা! হ্যাভেনলি কিশমিশ! অ্যানিওয়ে। কাবির সিং সিনেমায় কাবির মেডিক্যাল কলেজের টপার স্টুডেন্ট। সিনিয়ার ইয়ার। জুনিয়ার নায়িকা কিয়ারা আডবানি। হুম্! মনে পড়ে? লাস্ট স্টোরিসের চারটার একটায় সেই ভাইব্রেটর ইস্তিমাল করা নায়িকাটিরে ইয়াদ নাই? উনিই, জি। খুবই মাইনর আর পুতুপুতু রোল। দেখতে উনি মাশাল্লা, আমাদের পরিমনির মতো, পুতলাপুতলা। সাজসজ্জা আর-কি। রিয়্যাল জিনিশ অল্পই। ফেইক ফেইক মনে হয়।

যেই কথাটা বলতে চাই তা এ-ই যে, নেটফ্লিক্স-অ্যামাজনের এই সিনেমাযুগে এখনও বলিউড কাবির সিঙের মতো মাল পয়দায়। আজব! প্রোডিউস্যরও পায়! আর লোকে সেইটা মুম্বইর মতো সিটিতে প্রেক্ষাগৃহে দেখতেও যায়! হিন্দিতে এসে এই স্ক্রিপ্টটা তামিলের সমস্ত সম্ভাব্যতা হারায়। এম্নিতে শাহিদ তো পুরুষালি তিড়িংবিড়িং করে গেছেন সারাক্ষণ জান দিয়া। তারে দোষ দেই না। আর পরিচালকও তো মূলেরই। তাইলে ঘাপলাটা ঘটল কোথায়?

অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট নিয়া কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। হিরো সাইকোলোজিক্যালি এই সমস্যাটায় ভুগতেসে দেখানো হয়। বেচারা রাগ সামলাইতে পারে না। আর খুব পসেসিভ। অবধারিত ও অনিবার্যভাবে অ্যাগ্রেসিভ। ধুমায়া মানুষজনেরে পিটায়। রাগ উঠলেই পিটায় ক্লাসমেটদেরে। খারাপ-ভালো বিচার তো পরের বাত। শাহিদ কপুরের তো পোয়াবারো। চব্বিশঘণ্টা মাথা নাড়ানোয় এই হিরোর জবাব নাই। স্ক্রিপ্ট তার মনপসন্দ্ হবে না তো রণবিরের হবে?

প্রেম করেন নায়কজি যার সঙ্গে তার নাম প্রিতি সিক্কা। আডবানিজি আর-কি। পিচ্চি একটা মেয়ে, অ্যাক্টিং দিয়া বিচারি ভীষণ পিচ্চিই হয়ে থেকেছেন আগাগোড়া। প্রাইজটাইজ যদি জোটানো যায়! ইচ্ছা ছিল না তার কাবিরের লগে প্রেম করে। বেচারি বাধ্য হয়। কাবির তারে ব্যুকিং দিয়া ফালায় ফার্স্ট সাইটেই। কাবিরের টেররে সবাই ট্রেম্বলিং এম্নিতেই। কাবির পয়লা দরিশনেই সবার সামনে এলান করে, ‘ইয়ে মেরি বন্দি হ্যায়’! ভাবা যায়! কিন্তু সমস্যার খাতিরে যদি ভাবিও যে এমন চরিত্র তো সমাজে আছে, সেক্ষেত্রে সমস্যা থাকে যে সিনেমায় জিনিশটা বিশ্বাসযোগ্য করবার বদলে পরিচালক বিরক্তিকরই করে গেছেন টেনে টেনে পুরা ম্যুভিজুড়ে।

কাহিনিতে ফাঁকফোকরের অন্ত নাই। ফিচলামি আর ফাইজলামির চূড়ান্ত। ক্রোধ সংবরণ করতে পারে না, নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ নাই, নিজের ইগো শোআপ করা থেকে নিজেরে বিরত রাখতে পারে না, ক্যারেক্টার এমন হলে তো সিনেমায় সেইটা হিম্যানশিপ হবার কথা না। অ্যাংরি ইয়াংম্যানের ইমেইজ বানায়ে এই বিরক্তিকর বস্তুটা নামানোর মানে হয়? ম্যাস্কুলিন বানাইবার ম্যুভি কিন্তু চরিত্রে-চিত্রনাট্যে আলাদা আদলের হয়। এই সিনেমা তেমন হবার চান্সই ছিল না। অথচ হয়ে গেছে তা-ই। ছিল সজারু হবার কথা, বা হাঁস, হয়ে গেল হাঁসজারু। সুকুমার রায়ের জয় এখনও হয়।

সেক্স আছে, প্রেম আছে, রাগ আছে, রগরগে ব্যাপারস্যাপারও লভ্য, চুম্মাচাট্টি ডাইলভাত। মদগাইঞ্জা ইঞ্জেকশন ইত্যাদি তো বলা বাহুল্য। যত্রতত্র নায়ক চুম্মা খায়, লিপলক, নায়িকার অনিচ্ছায়। মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে নায়কনায়িকা সারাদিন সেক্স করে, সংসারধর্ম করে পুরোতঠাকুর না ডাইকাই। কাজেই পয়সা উশুল। অবশ্য এই বিদঘুটা ব্যাপারগুলাই তামিলের হার্টথ্রব সেন্সেশন বিজয়  দেব্রাকুন্ডা আরও চমৎকারভাবেই ডিল করেছিলেন। শাহিদ বড় শহরের পোলা, আর তার জন্মগত অভিনয়বিদ্যার ঘাটতি, কাজেই জিনিশগুলার ডোজ্ একটু অধিক হয়ে গেছে। এইটুকুই যা সমস্যা।

গানগুলা ভাল্লাগতে পারে রেগ্যুলার ভারতীয় ম্যুভিখোরদের। আর যারা ফাঁক খুঁজে বের করতে পারলে আনন্দিত হন ম্যুভি দেখতে যেয়ে, এইটা তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। ফোকরের এপিক বানায়ে ফেলতে পারবেন যে-কেউ গোটা ছায়াতামাশাখানা সধৈর্য দেখে গেলে।

পুরুষতান্ত্রিক পুংটামিটা দেখাইতে যেয়ে পেহলোয়ানি দেখানো হয়ে গেছে। এই কিসিমের রিগ্রেসিভ পুরুষতন্ত্র বিকাইবার সিনেমা টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরিতে একমাত্র নরেন মোদির নেতৃত্বাধীন অণ্ডকোষওয়ালা ভারতই পয়দাইতে পারে। এতই নির্লজ্জ আর বেহায়া এই সাম্প্রদায়িক হিংসাহিংস্র শ্বাপদ মোদি আর তার গোমূত্রপায়ীরা।

লেখা / বিদিতা গোমেজ

… …

পরের পোষ্ট

COMMENTS

error: