স্থিতাবস্থায় ঝাঁকানি একটা : ডায়রিভুক্তি, কিশোরবিদ্রোহ ২০১৮ || সুমন রহমান

স্থিতাবস্থায় ঝাঁকানি একটা : ডায়রিভুক্তি, কিশোরবিদ্রোহ ২০১৮ || সুমন রহমান

SHARE:

১ অগাস্ট ২০১৮

অভূতপূর্ব সব স্লোগ্যান! ভীষণরকম তাৎক্ষণিক, রাগী, উইটি, প্রশ্নমুখর, এবং নানাবিধ পর্যবেক্ষণে ভরা। যে-কোনো পর্যবেক্ষণকেই স্লোগ্যান-আকারে পেশ করতে সক্ষম এই কিশোরবাহিনি। তাদের ঘাড়ে মতাদর্শের জোয়াল নাই, ইতিহাস আছে, কিন্তু ইতিহাসকে নোটবইয়ের মতো ম্যানুয়্যাল-আকারে পড়বার পাঁয়তারা নাই। বোঝা যাচ্ছে, একটা ভীষণ সফল আন্দোলনই একমাত্র প্রাপ্তি নয়। নতুন নন্দনতত্ত্বেরও দিশা দেখা যাচ্ছে।


ছাত্র আর শ্রমিককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে! এই শ্রমিক শ্রমিক নয়, কায়েমি পুঁজির পাহারাদার। জাবালে নূরের পার্মিট বাতিল কিংবা ফিটনেস চেক করার আইন দিয়ে অবস্থার বদল হবে না। প্রয়োজন পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। লুটেরাদের হাত থেকে মুক্ত করা। রাষ্ট্রীয়করণ করা। নিদেনপক্ষে, অল্প কয়েকটি বড় ও দায়িত্বশীল কোম্প্যানির মালিকানায় পরিচালিত করা। ডিজিটাইজড করা। ক্যাশ টাকার লেনদেন থেকে মুক্ত করা। পরিবহন শ্রমিকদের চাকরি ফর্মালাইজ করা। ড্রাইভারকে কন্ট্রাক্টে বাস চালাতে দেয়ার রীতি নিষিদ্ধ করা। ঢাকা শহরে ওভারটেকিং একদম নিষিদ্ধ করা। পরিবহনন্যায়পাল নিয়োগ। গণনজরদারির সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুমোদন নেয়া।

 

৩ অগাস্ট ২০১৮

এটি অতি অবশ্যই একটি বিপ্লবী আন্দোলন। বিপ্লবের চেহারা আপনের জানাশোনার ফর্মা মেনে নির্ধারিত হবে না। সব বিপ্লবের লক্ষ্যই সরকার উৎখাত হবে না। নিজেদের অধরা স্বপ্নের ভার বাচ্চাদের ওপর ছাড়বেন না। ওদের অ্যাজেন্ডা পরিষ্কার। সেইটারেই আত্মস্থ করেন। শিক্ষা নেন।

এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক। কালকে মাঠে ছিল ছাত্রলীগ। আজকে মাঠে নেমেছে পরিবহন শ্রমিকরা। লাগাতার ধর্মঘট চলছে। অত সহজে ছাত্রদের দাবি পূরণ হওয়ার নয়। এসব দাবি পূরণ করতে হলে সরকারকেই রীতিমতো বিপ্লবী ভূমিকায় নামতে হবে। সরকারের একাংশকে নামতে হবে অন্য অংশের বিরূদ্ধে। ফলে, সরকার-উৎখাতের অ্যাজেন্ডা নাই বলে ভাববেন না যে, এটা আপোসকামী বা ডোসাইল ম্যুভমেন্ট। এটা খোদ সরকারকে একটা বিপ্লবী রিফর্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কম বড় প্রাপ্তি নয়।

নিরাপদ সড়কের দাবি কি পূরণ হবে? কঠিন প্রশ্ন। আগেই বলেছি, ড্রাইভারের শিক্ষাদীক্ষা ও লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস বাহ্যিক শর্ত মাত্র। সমস্যার গোড়া আরো গভীরে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সেখানে হাত দিয়েছিলেন। পরিবহন সেক্টরের লুটেরা সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। গোটা পাঁচেক বড় কোম্প্যানির অধীনে পরিবহন সেক্টরকে আনতে হবে। ড্রাইভারের সাথে কোম্প্যানির সম্পর্ক হবে চাকরিভিত্তিক, কমিশনভিত্তিক নয়। এই পুরো জিনিসটা তদারকি করবে বিআরটিসি (অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত), একজন ন্যায়পালের অধীনে। ছাত্রদের পক্ষে সেসব দাবি তোলা সম্ভব নয়। তাদের যেসব দাবি, তার বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন না। কিন্তু তাতে সড়ক নিরাপদ হবে না। দুর্বৃত্ত দমে থাকবে মাত্র।

আজকে সড়কে ছাত্ররা নাই। খুব ভালো সিদ্ধান্ত। বিপ্লবকে সকালসন্ধ্যার চাকরি হিসাবে নেয়ার কিছু নাই। তবে তারা নিশ্চয় তাদের নিয়মে ফলোআপ করবে।

এই ম্যুভমেন্ট রাষ্ট্রের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে মোরালি ব্যাংকরাপ্ট আকারে আমাদের সামনে হাজির করে ফেলেছে। এটা অবশ্যই তাদের জন্য বিব্রতকর স্মৃতি। শুধু স্নেহের দাবিতে সেসব তারা উপেক্ষা করবে না। এই স্মৃতির মোকাবেলা করতে চাইবে তারা কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে। কিশোরদের মোরালি ডাউনসাইজড ইমেজ হাজির করবার মাধ্যমে। কিন্তু যেহেতু কিশোররা এখন গরহাজির, যেহেতু তাদের মধ্যে এখনো একটা ইমরান এইচ সরকার উৎপাদিত হয়নি, যেহেতু (ধরে নিচ্ছি) তারা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্ন ফলো করবে না, ফলে তাদেরকে বাগে পাওয়া কঠিনই হবে।

কিশোরদের প্ল্যাকার্ডের ভাষা নিয়ে অনেকেরই আপত্তি। আমার বিশেষ নাই। অত ন্যায্য ভাষা আমি খুব কমই দেখেছি। শুধুমাত্র ভাষার ব্যবহারই আন্দোলনটিকে বিপ্লবী করে তুলেছে। এই ভাষার ব্যবহারই তাদের ডোসাইল সুশীল সমাজের মুখস্ত প্যাটার্নে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে।

 

৫ অগাস্ট ২০১৮

সকালবেলা সন্তানদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলাম। সাইন্স ল্যাব থেকে ফিরতে হলো। রাস্তা বন্ধ। আমার ন’বছর বয়সী ছেলে মনঃক্ষুণ্ন।বাসায় ফিরে বলল, বাবা এরা এখনো কেন মিছিল করছে?

আমি বললাম, এরা যা চাইছে, তা এখনো পায় নাই। এজন্য।.

স্পষ্টতই কিছু ভাবছিল সে। অল্প পরে আবার প্রশ্ন করল, আমরা যদি বাসচাপা পড়ি, তাহলেও কি ওরা রাস্তায় এসে মিছিল করবে?

স্কুলে যাওয়ার পথে ওকে একটা বড় রাস্তা পার হতে হয়। ফলে এই আশঙ্কার ভেতরই বেড়ে উঠছে সে।

বললাম, বাবা, আরো পাঁচ বছর পর, যখন তোমাকে একা একা স্কুলে যেতে হবে, তখন তুমি অনেক সুন্দর একটা রাস্তা পাবে পার হওয়ার জন্য। সেই রাস্তায় জেব্রাক্রসিং থাকবে, সিগ্ন্যাল থাকবে। বাচ্চাদের দেখামাত্র গাড়ির ড্রাইভার ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে রাখবে। আজকে পথে যে ভাইয়াদের দেখেছো, তারা দিনরাত খেটে খেটে তোমার জন্য সেই দিনটি নিয়ে আসছে।

দুপুর থেকেই অবস্থা বদলে যেতে থাকল। আতঙ্ক, আর্তচিৎকার, রক্ত আর গুজবে সয়লাব হয়ে গেল ফেসবুকফিড, তার মধ্যে অসহায় মাছির মতো আটকে থাকলাম সারা বিকাল। পরশুদিনই এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলাম এভাবে — “লুটেরা পুঁজি ও কায়েমি স্বার্থবাদী রাজনীতি কি এই পরাজয় মেনে নেবে? কেমন হবে ওদের পাল্টা আঘাতের চেহারা? তাতে কতটুকু ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে তোমাদের বানানো এই অদ্ভূত সুন্দর ইউটোপিয়া? কতখানি বেদনার্ত হয়ে সাক্ষি হতে হবে তার?”

সাক্ষি হলাম আজ। আরো ভয়ার্ত হয়ে চেয়ে আছি আগামীকালের দিকে।

… …

COMMENTS

error: