সালাম সালাম হাজার সালাম  || আহসান রফিক

সালাম সালাম হাজার সালাম  || আহসান রফিক

শিল্পী আব্দুল জব্বার, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি একটি সূত্রে গাঁথা। বাংলাদেশী সংগীতের ভুবনে এক উজ্জল নক্ষত্র মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. তকিলউদ্দিন। ৮ ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আব্দুল জব্বারের সংগীতের প্রতি অনুরাগ জন্মে শিশুকাল থেকেই। তিনি ১৯৫৬ সালে এসএসসি পাশ করেন। গান শিখেছেন শিবকুমার চ্যাটার্জি, ফজলুল হক, ওসমান গনি, লুৎফুল হকের কাছে। গান শেখার নেশায় গিয়েছেন কলকাতায়। গান শিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত শিল্পী শ্যামল মিত্রের কাছেও। তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান। রেডিওর অডিশনে পাশ করেন ১৯৫৯ সলে। রবীন ঘোষের সুরে প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৬২ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে। গানটি ছিল ফেরদৌসী রহমানের সাথে একটি ডুয়েট “তুমি কাছে আছো তাই”। একই ছবিতে প্লেব্যাকে অভিষেক হয় কিশোরী গায়িকা শাহনাজ বেগমের (রহমতুল্লাহ)। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই গেয়ে আসছেন এই শিল্পী।

abduljabbar১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গান দিয়ে বাঙালির চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেছেন আব্দুল জব্বার। মূলত আধুনিক গানের শিল্পী আব্দুল জব্বারের দরাজ কণ্ঠের দেশাত্মবোধক গান সময়ের সীমাকে অতিক্রম করে গেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে-আসা গণচেতনাজাগরণী গান “সালাম সালাম হাজার সালাম”, “হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে / বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে”, “আমার বাংলা সোনার বাংলা”, “মুজিব বাইয়া যাও রে”, “সাড়ে-সাতকোটি মানুষের আরেকটি নাম মুজিবর” প্রভৃতি গান স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রেরণাদায়ক মাত্রা যোগ করেছিল।

দরদী কণ্ঠের শিল্পী আব্দুল জব্বার হৃদয়ের পুরো আবেগ নিয়ে শ্রোতার সামনে নিজেকে নিবেদন করেন গান গাইবার সময়। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি চিরদিন বাংলাদেশী সংগীতের সেবায়। গান গেয়েছেন ‘কাগজের নৌকা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘এতটুকু আশা’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’, ‘বিনিময়’, ‘আলিঙ্গন’, ‘নাচের পুতুল’, ‘যে-আগুনে পুড়ি’, ‘ঘূর্ণিঝড়’, ‘অধিকার’, ‘বাবলু’, ‘মানুষের মন’, ‘লাঠিয়াল’, ‘সাধু শয়তান’, ‘পীচঢালা পথ’, ‘স্লোগান’, ‘অবুঝ মন’, ‘সখি তুমি কার’, ‘সারেং বৌ’, ‘মতিমহল’, ‘বেঈমান’, ‘মাস্তান’, ‘সঙ্গিনী’ সহ তিনশতাধিক ছায়াছবিতে। তার গাওয়া অজস্র গান আজো লোকের মুখে মুখে ফেরে। আব্দুল জব্বারের গাওয়া বহুল জনপ্রিয় কিছু গান হলো :

১। তুমি কী দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়
২। কে যেন আমায় ডাকে প্রিয় নাম ধরে
৩। হে পৃথিবী আমার প্রশ্ন শোনো
৪। তোমরা যাদের মানুষ বলো না
৫। ঘুরে এলাম কত দেখে এলাম
৬। গোস্বা তুমি কইরো না
৭। আমার সে-প্রেম আমাকে ফিরিয়ে দাও
৮। আমার দাদু লক্ষ্মী দাদু ঘুমায় রে
৯। তোমার অসীম সুদৃঢ় পথের ’পরে
১০। নীরব পৃথিবী দূয়ারে তোমার
১১। তোমার ভুবনে এত অসহায় মানুষের মন কেন কাঁদে
১২। এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি
১৩। আমি তো বন্ধু মাতাল নই
১৪। পীচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি
১৫। ওরে নীল দরিয়া
১৬। রাগ করবার আরো-যে কত সময় আছে-যে পড়ে
১৭। একটি মনের আশীষ তুমি
১৮। সুচরিতা যেওনাকো কিছুক্ষণ থাকো
১৯। শুধু গান গেয়ে পরিচয়
২০। যার কেউ তো নেই পৃথিবীতে

শাহনাজ রহমতুল্লাহর সাথে তাঁর গাওয়া “আমি সাত সাগরের ওপার হতে তোমায় দেখেছি”, নীলুফার ইয়াসমীনের সাথে “এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে” সহ অনেক ডুয়েট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অগণিত শ্রোতার মুখে মুখে ফেরা তাঁর কিছু স্মরণীয় রেডিওর আধুনিক গান হলো :

১। নিঠুর পৃথিবী দিয়েছ আমায় আঁখিজল উপহার
২। কলসি কাঁখে ঘাটে যায় কোন রূপসী
৩। শিল্পী আমি তাই কবিতা আমার ভালো লাগে
৫। ভাবনা আমার আহত পাখির মতো
৬। ডাকপিয়নে সারাটা দিন চিঠি বিলি করে বেড়ায়
৭। একটি নদীর গান শোনাব
৮। প্রেম তুই দে না আমায় একটু পরিচয়
৯। তারাভরা রাতে
১০। পথ চিরদিন সাথী হয়ে রয়েছে আমার

প্রকৃতপক্ষে আব্দুল জব্বারের গাওয়া শ্রোতাপ্রিয় গান অজস্র। তাঁর গাওয়া অনেক গান সংরক্ষণ ও প্রচারের অভাবে হারিয়েও গেছে।

প্রেম ও বিপ্লব, দ্রোহ আর আবেগ, ইতিহাস আর দেশপ্রেমের অসাধারণ গায়ক, মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার আজ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আমাদের সংস্কৃতির অস্থিমজ্জায় মিশে-যাওয়া আব্দুল জব্বারের বিস্তৃত অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।

… …

আহসান রফিক

COMMENTS

error: